রবিবার ১৪ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
সঙ্গের তরুণ পুলিশ ইন্সপেক্টর নিজের দ্বায়িত্বে অপরাধীকে শেষকৃত্যটুকু করবার অনুমতি দিলেন। কিন্তু দুলালকে নিভৃতে বললেন।
—আপনি একটা খুন করেছেন! তবু আমি আপনাকে আমার নিজের রিস্কে শেষ কাজটুকু করতে দিচ্ছি। দয়া করে পালিয়ে যাবেন না! আমি বিপদে পড়ে যাব।
—ভয় পাবেন না স্যার! আপনাকে বিপদে ফেলার কোন বদ-উদ্দেশ্য আমার নেই আর পালিয়ে যাবার মত কাপুরুষও আমি নই! আমার প্রয়োজনীয় কাজটুকু সেরে ফেলার পর আমি কিন্তু বন্দুক ফেলে হাত তুলে ধরা দিয়েছি এটা ভুলে যাবেন না।
—প্রয়োজনীয় কাজ?
—হ্যাঁ, যেটা আইন পারেনি। আর আমার হাতে বন্দুক ছিল বন্দুকে যথেষ্ঠ গুলি ছিল। নিশানায় মারতে না পারলেও এলোপাতাড়ি ফায়ার করে একটা ক্যাওস তৈরি করে আমি পালিয়ে যেতে পারতাম। সে সুযোগ আমার ছিল!
দুলাল জেলে ফিরল। এত বড় অপরাধের পরেও মানুষ তাকে হিরোর মতো সম্মান দিচ্ছে। এরকমই হয়। যখন পরিস্থিতি লোকটাকে অপবাদ দিচ্ছিল, লোকেও তাকে অপবাদ দিচ্ছিল। যখন লোকটা ঘুরে দাঁড়িয়ে ভয়ংকর প্রতিবাদ করল লোকে সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে গিয়ে তাকে হাততালি দিয়ে শুরু করলো। জনতার এই দু-মুখো নীতি বড়ই ভয়ঙ্কর!
মামলা কোর্টে উঠল। দুলাল তার স্বপক্ষে কোনও উকিলকে চায়নি! আদালতে বিচারকের প্রশ্নের উত্তরে দুলাল যা বলেছিল তা খবরের কাগজে হেডলাইন হয়েছিল!
—আপনি এ কাজ কেন করলেন? তিনবছর পরেই তো আপনি ছাড়া পেয়ে যেতেন! মানুষ খুনের মতো একটা গর্হিত অপরাধ আপনি কেন করলেন?
—তিন বছর পরে আমার আর সমাজে ফেরার কোনও উপায় ছিল না ধর্মাবতার! আমার মানসম্মান আমার অস্তিত্ব আমার চরিত্রকে ঠান্ডামাথায় চক্রান্ত করে খুন করা হয়েছিল। কিন্তু আমাদের আইন ব্যবস্থায় এইমুহুর্তে থাকা আইনকানুন ও তার একপেশে ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যে এই ঘটনার প্রকৃত অপরাধী, যে প্রকৃত দোষী দুর্ভাগ্যবশত মামলার রায় তার পক্ষে গিয়েছিল। আমার উকিলদের ঘুষ দিয়ে আমার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। এই মূহুর্তে সেই অপরাধের বিচার হবার মতো কোনও আইন নেই! কেউ জেনে বুঝে ঠান্ডামাথায় সত্যি অস্বীকার করলে, ক্রমাগত মিথ্যে বললে তাকে দিয়ে সত্যি বলানোর কোনও আইন নেই। মারধর না করার আইন আছে। সত্যি বলানোর আইন নেই।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩২: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী— গন্ধগোকুল

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৫০: আকাশ এখনও মেঘলা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৮: অপারেশন হেলথ সেন্টার

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৬: কবির টুপি, কবির জোব্বা

কাগজে পড়েছি নার্কো অ্যানালিসিস বা লাই ডিটেকশন পলিগ্র্যাফিক টেস্টে নাকি সত্যি বলানো যায়। কিন্তু সেখানেও অভিযুক্তকে রাজি হতে হবে। কলিযুগে এমন কোন ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির আছেন যিনি যেচে সত্যি বলবেন। আর মিথ্যে কথা বলাটা আমাদের শরীরের প্রতিটি কণায় এমনভাবে মিশে গিয়েছে, সেখানে কোনও কেমিক্যাল কোনও টেস্টের সাধ্য নেই আমাদের সত্যিকথা বলায়। হ্যাঁ, এসব কথা আজ বলছি কারণ আমি আজ সত্যি অপরাধী। শ্মশানঘাটে কমপক্ষে শ’-দেড়শো লোকের সামনে পুলিশের চোখের সামনে খুন করেছি। আজ আর আমাদের আইনসভা আমাকে কোনওভাবেই বাঁচাতে পারবেন না। এর আগে আমাকে ধর্ষণের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আইনের সুযোগ নিয়ে আমাকে ধর্ষণ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৮ : অপরাজিত: অপুর প্রত্যাবর্তন

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৮: অসম-মিজোরাম সীমান্তে ঘাড়মুড়ার নব আবিষ্কৃত ভাস্কর্যও সুপ্রাচীন

এই ভয়ংকর অবমাননার পর আমার স্ত্রী আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু সেদিন তাঁর জ্বলন্তচিতার সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হল সে এই পৃথিবী থেকে চিরকালের মতো এতবড় অপমান মাথায় নিয়ে চলে যাবে? এ হতে পারে না! মনে হল এই জীবন সকলকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয়! তৃপ্তির মৃত্যু, আমার প্যারোলে তাঁর শেষকৃত্যে যাওয়া আর ঠিক সেইমুহুর্তে প্রকৃত দোষীর সেখানে উপস্থিত হওয়া সবকিছু যেন ভবিতব্য ছিল! এখন আমার মৃত্যুদণ্ড হলেও আমার কোনও আক্ষেপ নেই! আমি মনেপ্রাণে চাই আইন আমায় মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ন্যায়-অন্যায়ের দাঁড়িপাল্লাকে সঠিক রাখুক। আজ আমি তৃপ্ত – দেশের আইনব্যবস্থা যা পারেনি আমি নিজে হাতে সেই শাস্তি দিতে পেরেছি!
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৩: জরাসন্ধের ঔদ্ধত্য ও কৃষ্ণের ভূমিকা যুধিষ্ঠিরকৃত রাজসূয় যজ্ঞের প্রাসঙ্গিক সূচনা

দশভুজা, অন্য লড়াই: এই স্বাধীনতার জন্য আমরা লড়াই করিনি

দুলালের জবাব শুনে চমকে উঠলেন বিচারপতি। লাঞ্চ ব্রেক দেওয়া হল আদালতে। এবং একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। একজন খুব নামি অ্যাডভোকেটের জুনিয়র আদালতে হাজির ছিলেন। পুরো ঘটনা শোনার পর তিনি তার সিনিয়রকে ফোন করে বিষয়টা জানান। সিনিয়র তাঁকে নিয়ম অনুযায়ী আদালতে ওকালতনামা জমা দিয়ে দুলাল সেনের কেস প্রো-বোনো মানে নিখরচায় লড়তে চাইলেন। জুনিয়র খুব অবাক হল তবু তার সিনিয়ারকে প্রশ্ন করার ঔদ্ধত্য না দেখিয়ে আদালতে আবেদন জমা দিল।
বিচারক ওকালতনামায় আবেদন দেখে অবাক হলেন এবং দুলাল সেনের কাছে জানতে চাইলেন।
—দেখুন শহরের একজন অত্যন্ত খ্যাতনামা ব্যারিস্টার আপনার এই কেস প্রো-বোনো মানে বিনাখরচায় লড়তে চান। আপনি কি রাজি আছেন?
—কে তিনি? আমার এই ডুবন্ত নৌকোয় আমার সঙ্গে ডুবতে চাইছেন!
—দেখুন আমি তার জুনিয়রকে বলছি তার নামটা আপনাকে জানানোর জন্য আপনি রাজি হলে তখন আমি সর্ব সমক্ষে সে নামটা বলব আর আপনি যদি রাজি না হন তাহলে আমি এই ওকালতনামাতে আর কোন অ্যাকশন নেব না।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৯ : উত্তরমেঘ

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৫: পরবাস প্রস্তুতি (এক)

দুলালের কাছে জুনিয়র গিয়ে তার সিনিয়র-এর নামটা জানালেন। নামটা শুনে দুলাল চমকে উঠল রাজনীতি করার সূত্রে সে এই নামটার সঙ্গে পরিচিত। সে জানে এই মানুষটির একদিনের অ্যাপিয়ারেন্স ফী জোগাড় করতে পারবে না সে। তাঁকে না বলার ক্ষমতা তার নেই। তাই সে হ্যাঁ বলল! বিচারক একমাস পরে দিনধার্য করলেন।

দু’ তিনজন জুনিয়রকে নিয়ে সেই মহানুভব অ্যাডভোকেট অবনী চৌধুরী জেলে দুলালের সঙ্গে দেখা করলেন! —চলবে।
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকের রচয়িতা, ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১/২/৩ খণ্ড)’ ও নাটক ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’। এখন লিখছেন ‘হ্যালো বাবু’এবং ‘আকাশ এখনও মেঘলা’।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content