কড়া পুলিশ পাহারায় দুলাল সেনকে শ্মশানে নিয়ে আসা হলো। পুলিশ, মর্গ থেকে ফেরত আসা তৃপ্তির মৃতদেহ দুলালকে তুলে দিলেন। তখনও ইলেকট্রিক চুল্লি হয়নি এখানে। সাজানো হলো কাঠের চিতা, তৃপ্তির মৃতদেহ শোয়ানো হলো সেই চিতায়!
কড়া পুলিশ পাহারায় দুলাল সেনকে শ্মশানে নিয়ে আসা হলো। পুলিশ, মর্গ থেকে ফেরত আসা তৃপ্তির মৃতদেহ দুলালকে তুলে দিলেন। তখনও ইলেকট্রিক চুল্লি হয়নি এখানে। সাজানো হলো কাঠের চিতা, তৃপ্তির মৃতদেহ শোয়ানো হলো সেই চিতায়!
মাসখানেক টানা শুনানির পর সাজা হল। প্রচুর মামলা জমে যাচ্ছে, মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করাটা খুব জরুরি! দশজন অপরাধী মুক্তি পেলেও কোনও নিরাপরাধী যেন সাজা না পায়- দুলাল এই শব্দবন্ধটা কোথায় যেন শুনেছিল। তবু তার সাজা হল, প্রাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে আইপিসি ৩৫৪ অনুযায়ী দু’ বছরের সশ্রম কারাদন্ড এবং ২৫ হাজার টাকা জরিমানা। জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড!
পাঁচদিনের পুলিশ কাস্টডির পর দুলাল সেনকে আবার কাঠগড়ায় তোলা হলো। শুরু হল কুৎসিত কালিমা লেপন। স্নিগ্ধা ইনিয়ে বিনিয়ে কোর্টে নানান মিথ্যে কথা বলল। বলল এই দুলাল সেন তার বিবাহিত জীবন নষ্ট করে দিয়েছে। দুলালকে জিজ্ঞেস করা হলে সে এ ব্যাপারে কোন উত্তর দিল না। আর বহু খরচাপাতি করে গয়নাবন্ধক রেখে টাকা ধার করে মণির বর যে উকিল জোগাড় করেছিলেন, তিনিও শুরুতে দুলালের পক্ষে নানান যুক্তি সাজালেও পরের দিকে অদ্ভুতভাবে চুপ করে গেলেন।
কলঘরে স্নান করার নাম করে ঢুকে নিঃশব্দে অনেকক্ষণ কাঁদলো তৃপ্তি। মাঝরাতে চৌবাচ্চায় ধরা কনকনে ঠান্ডা জল মাথার ওপর থেকে ঢালছে আর হাউ হাউ করে কাঁদছে। শরীরের বাইরের আর ভিতরের অবিরল জলের ধারায় মনটা যেন ক্রমশ কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠল। কাপড়জামা বদলে দোতলার অন্ধকার ছাদে নিয়ে গেল ছেলে অতনুকে!
দুলাল এসে দাঁড়াতেই তার নাটকে ফেঁসে গিয়ে দুলাল ড্রাইভারকে মারল। স্নিগ্ধা গায়ের পাতলা স্কার্ফটা ড্রাইভারের পিছনের সিট-পকেটে লুকিয়ে ফেলে তৈরি। ড্রাইভার মার খেয়ে হতভম্ব। দুলাল স্নিগ্ধার ওপর পড়েছে। কিন্তু গোটা রাস্তা তো তখন শুনশান। লোকজন কেউ কোত্থাও নেই। স্নিগ্ধা ভাবছে এরপর কী? ঠিক তখনই দেবদূতের মতো মোটরবাইক নিয়ে ওই বিয়েবাড়ির ভিডিয়ো করা ছেলেদুটো উপস্থিত! এদের ব্যাপারটা স্নিগ্ধা ঘুণাক্ষরেও জানতো না! ঠিক যেমন মহেশ্বরীর ড্রাইভার জানতোই না আজ কী ঘটতে যাচ্ছে!
দুলালের চরিত্রকে খুন করার জঘন্য ষড়যন্ত্রে হাত মেলালো স্নিগ্ধা! দুলাল, দুলালের সংসার বৌ তৃপ্তিকে একেবারে দুমড়ে মুচড়ে শেষ করে দিয়েছে স্নিগ্ধা! তৃপ্তির সিঁথিতে দেওয়া সিঁদূর,দুলালের হাতে পরানো এটা ভাবলেই শরীরের মধ্যে একটা অদ্ভুত জ্বালা শুরু হয়। এখন সে জ্বালাটা কমবে, ওদের দূর্দশা যত বাড়বে তত শান্তি হবে মনে। এবার স্নিগ্ধা নিজেকে ইন্দ্রিয়সুখে ভাসিয়ে দেবে। আর কোথাও ফেরার নেই। এবার ধ্বংসের খেলায় মাতবে স্নিগ্ধা।
প্রিন্সিপাল ম্যাডাম রাইটিং ক্লিপে লাগিয়ে ফুলস্কেপ কাগজ দিয়েছিলেন। পাশে একটা খাম। স্টেপলার এবং সেলোটেপ। উনি জানেন খোলা চিঠি রেখে যেতে কেউ চাইবেন না। তাই বলার আগেই সব গুছিয়ে দিয়েছেন। লম্বা সাদাপাতাটার দিকে তাকিয়ে স্নিগ্ধা ভাবছিল কী লিখবে? কী লেখা উচিত? স্কুলে খুব ইচ্ছে ছিল, কিন্তু চিঠি লিখে প্রেম করা হয়নি।
খুব সমস্যা! শুনলাম বিবাহিত লোকজন ফ্যামিলি না এনে ব্যাচেলরস মেস অকুপাই করে আছেন। আমি কথা বলতে গেলে যাঁদের থেকে সবচেয়ে রেজিস্ট্যান্স পেলাম তাঁরা হলেন তোমার স্বামী আর তাঁর এক বন্ধু-সহকর্মী! পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম, মেসে শুধু একটা ট্রিপল শেয়ারিং রুম! সেটা উনি আর অনার বন্ধু মাস্টারমশাই ডাবল শেয়ারিং করে বহুদিন রয়েছেন! আর ওঁদের মানে…দু’জনের মধ্যে সম্পর্কটা শুনেছি স্বাভাবিক নয়। দেয়ার গে! আই মিন…
পাশের ঘরে রাতপোশাক পরতে পরতে স্নিগ্ধা ভাবতে লাগল। এতদিন হিন্দি সিনেমাতে সুহাগ রাতের যা যা দৃশ্য দেখেছে সেসব কি সাজানো? বিবাহিতা বান্ধবীরা বিয়ের পর ‘ধুলোপায়ে’ বাপের বাড়ি এসে, হেসে খুটিপাটি হয়ে যেসব গল্প বলতো….সেগুলো কি মিথ্যে?
পাল্টাপাল্টি করে নবকাকুর সিটে গিয়ে বসল ছোট্ট স্নিগ্ধা। আর নবকাকু এসে বসল তাঁর মায়ের পাশে স্নিগ্ধার সিটে। নিষিদ্ধ শারীরিক ঘনিষ্ঠতার সেই শুরু! দীর্ঘদিন দাম্পত্যসুখ বঞ্চিত ছন্দা পারিবারিক সম্পর্কের আগল ক্রমশ ভেঙে যেন ভেসে গেল। ন্যায়-অন্যায়ের বিচার চুলোয় দিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে গেল কমবয়েসী যুবক নবকুমারকে! আড়াল-আবডালের এই শরীরী অনাচার নিয়ম হয়ে গেল!
ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের ছাতাপড়া কালো কোর্টপরা উকিলবাবুকে সেদিন সন্ধেবেলায় কলকাতার চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউর হতশ্রী ঘুপচি ডিউক রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে দেখা গেল। আরএন মুখার্জী রোডের অফিস থেকে একজন কর্মচারী এসে সাদা খামে কালো টাকা ভরে দিয়ে গিয়েছে। সেখান থেকেই দু-চারগাছা আঁশটে গন্ধের একশটাকার নোটের সুবাদে পরোটা মাংসের সঙ্গে জলের বদলে বিয়ার নিয়েছেন উকিলবাবু! হুইস্কির দাম চড়া, তাছাড়া এরপর মিনিবাসে হাওড়া স্টেশন, ট্রেনে চেপে চুঁচুড়া! নেশা হয়ে গেলে কেলেঙ্কারি! বৌকে বলেছে, কলকাতায় কর্পোরেট ক্লায়েন্ট মিটিং!
থানা থেকে ফিরতে গেলে, বড় রাস্তা থেকে স্নিগ্ধাদের বাড়ির সামনের দিয়ে আসা গলিটা দিয়েই ফিরতে হবে। যাওয়ার সময় যখন ওই রাস্তা দিয়ে গেছে তখন তাদের বাড়ির সামনে কিছু মানুষের গুঞ্জন দেখেছিল কিন্তু তখন আশপাশে কি ঘটছে সেদিকে তাকানোর মতো মনের অবস্থা ছিল না। এখন থানা থেকে ফেরবার সময় তৃপ্তি দূর থেকে দেখতে পেল স্নিগ্ধাদের বারান্দার আলো জ্বলছে সেখানে কেউ দাঁড়িয়ে আছেন।
মুহূর্তের জন্য তৃপ্তির মনে হল আশপাশের দেওয়াল দরজা বা সামনের লোকগুলো আচমকা কেমন একটা দূরে চলে গেছে ছেলেটার হাতধরা আছে। কিন্তু সেও যেন অনেকটা দূরে। ছোটবেলায় একবার পুজোর সময় খুব জ্বর হয়েছিল। তখন সবেসবে মা-বাবা একসঙ্গে চলে যাওয়ার দুর্ঘটনাটা ঘটে গেছে। দুপুরবেলায় ঘোর ভেঙ্গে মনে হল ছাদটা যেন অনেকটা উঁচুতে। জানলাগুলো লম্বাটে দরজাটা লম্বাটে পাখাটা ঘুরতে ঘুরতে একবার উঠে যাচ্ছে একবার নেমে আসছে।
কারখানার গেট থেকে খবর পেয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের লোকজন ছুটে গিয়েছিল থানায়! সেখানে কোনও সুবিধা করতে না পেরে তাদের ক’জন পার্টির এক নেতার বাড়িতে ছুটল আর জনাকয়েক গেল দুলালের বাড়িতে। তখন অনেক রাত। সদর দরজা বন্ধ। খানিকক্ষণ ধাক্কাধাক্কির পর কেউ দরজা খুলল না!
দুলালের পিছন দিক থেকে একটা কালো অ্যাম্বাসেডর গাড়ি যাওয়ার সময় ভিতর থেকে যেন স্নিগ্ধা চিৎকার করে বলল, “দুলাল দা!”। বড় রাস্তাটা বাঁক নিয়ে খানিকটা এগিয়ে এলেই রাস্তার বাঁদিকে যে গলি ঢুকে গিয়েছে তার প্রথম দিকেই স্নিগ্ধাদের বাড়ি আরো খানিকটা এগিয়ে গেলে দুলালদের বাড়ি। এত রাতে গাড়ির মধ্যে স্নিগ্ধাকে দেখে এবং তার চিৎকার শুনে দুলাল ধরেই নিলো স্নিগ্ধার কোনও বিপদ হয়েছে।