
একটা দীর্ঘ শাওয়ার নেওয়ার পর শাক্য দেহ-মনে কিছুটা শান্তি এবং এনার্জি ফিরে পেল। দু’দিন ধরে নাগাড়ে ছোটাছুটি চলছে। এখানে আসা ইস্তক কাজের চাপে ফ্রি-হ্যান্ড করার সময়টুকুও পাচ্ছে না ভালো করে। কাল ভোরে উঠে অন্তত চল্লিশ মিনিট সে ফ্রি-হ্যান্ডের পিছনে খরচ করবে ঠিক করল। বনদপ্তরের বাংলো এই মুহূর্তে সুনসান। টাওয়েল দিয়ে শরীরের জল ভালো করে মুছে খাটো সাদা বক্সার পরে বারান্দায় এসে বসল সে। বারান্দায় সর্বক্ষণ একটা টি-টেবল আর চেয়ার রাখা থাকে। এই মুহূর্তে দরকার ছিল ছোট্ট দু’ পেগ। কিন্তু এখন আর তা চাওয়ার কোন মানে হয় না। সুদীপ্ত তাকে তার কোয়ার্টারে আজ রাতটা থেকে যেতে অনুরোধ করেছিল। আসলে ড্রিকংস নিয়ে বসাই ছিল উদ্দেশ্য। মালাকারের পরিবর্তে আপাতত তাকেই এই থানার ইনচার্জের দায়িত্ব সামলাতে বলা হয়েছে। মেইলও পেয়ে গিয়েছে সে। মনটা খুশি খুশি আছে তার। কিন্তু শাক্য রাজি হয় নি। এখন আনন্দ করার সময় নয়। এত সহজে নিশ্চিন্ত হলে আড়াল থেকে কে যে কখন আক্রমণ শাণাবে তার ঠিক নেই। আসল কুশীলব যে নকল ফাদার আন্তোনিও ওরফে আনাতোল নয়, সে-ব্যাপারে শাক্য একশো শতাংশ নিশ্চিত। হয়তো কোনও আন্তর্জাতিক বড় গ্যাং। এই অঞ্চলে আনাতোল হয়তো তাদের বোড়ে, বেতনভুক কর্মচারী। কিন্তু আনাতোল যতই হোক বহিরাগত। একেবারে ভিন্ন দেশ থেকে এসে এখানে তাঁকে কাজকারবার চালাতে হয়েছে। অতএব লোকাল সহায়ক না থাকলে সেটা এত মসৃণভাবে করা সম্ভব ছিল না তাঁর পক্ষে।
এই সহায়ক আনাতোলের চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু কে সে? এতকাল শাক্য অবশ্য এ-ব্যাপারে অন্ধকারেই ছিল। কোণ কুলকিনারা করতে পারছিল না। কিন্তু কালাদেওর গুহায় অভিযানের দিন তার পরামর্শমতো বাইরে ড্রোন উড়িয়ে যে ফুটেজ কালেক্ট করা হয়েছিল, যাতে উৎসাহী চাক্ষিকদের ভিড়ের উপর নজরাদারি করা যায়, সেই ফুটেজ তাকে কিছুটা হলেও অন্ধকারে আশার আলো জুগিয়েছে। কিন্তু বিভ্রান্তি কাটেনি। এমন একজনকে সে দেখতে পেয়েছে ভিড়ের মধ্যে, যার সঙ্গে ঘটনাপ্রবাহের লিংক সে কিছুতেই করতে পারছে না। আবার তার ওখানে উপস্থিতিটাও সে ভুলতে পারছে না কিছুতেই, কারণ, তার সেখানে উপস্থিত থাকাটা একেবারেই অসম্ভব ঘটনা। তারপরেও সে ছিল। কিন্তু কেন? এই কেনর উত্তর তাকে খুঁজতে হবে। মন শান্ত না হলে, দেহ শান্ত না হলে, চিন্তা তার কাজ সুষ্ঠুভাবে করতে পারে না। এই কারণেই সে ফিরে এসেছে। বাইরে সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে। যদিও বারান্দায় ফ্যানও আছে। সেটাও ফুল স্পিডে ঘুরছে। খেয়ে এসেছিল সে। এসপি অর্ডার দিয়ে আনিয়েছিলেন। তাঁর নিজেরও খিদে পেয়েছিল। নান এবং চিকেন রেশমি কাবাব। এখানে হোটেল-রিসর্টের রমরমা এবং কলকাতার বাবুদের ঘন ঘন আগমনের ফলে দুটি জিনিস খুব সুলভ—নানা স্বাদের বিরিয়ানি এবং নান-কুলচা-কাবাব জাতীয় খাবার। অন্যসময় হলে শাক্য অস্বীকার করত এ-সব খেতে। সে জিম করে বলে নির্দিষ্ট খাদ্যবিধি মেনে চলে কঠোরভাবে। কলকাতায় থাকলে তার কম্বাইন-হ্যান্ড তো আছেই। কিন্তু জেলায় সফরে গেলে সে সতর্ক থাকে যাতে এ-সব খাবার বেশি না খেয়ে ফেলে।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-১৫৪: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮৭: স্কুপ-নিউজ

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৭০ : ঘটজাতক/৫ : সে আসিছে আজ কাল-বৈশাখে
এখানে এসে ফরেস্ট বাংলোর কুককে শাক্য বলে দিয়েছিল, কেমন খাবার তার জন্য করতে হবে। সেইভাবেই কুক খাবার প্রস্তুত করে। দু’-একদিন সুদীপ্তর ওখানে উল্টোপাল্টা খাওয়া হয়েছে, এ-টুকুই। আজ এসপির বদান্যতায় আবার হল। আজকের দিনটাকে চিট ডে হিসাবে ধরে নিয়েছে সে। খেয়েছে যদিও অল্প। একেই ওই সব খাবার, তার উপর দীর্ঘ পরিশ্রমের পর এমন এক ক্লান্তি গ্রাস করে যে খাওয়া-দাওয়া করতেও ইচ্ছে হয় না। মাহাতোকে দরকার ছিল। সুদীপ্ত অবশ্য তাকে ফোন করেছিল, কিন্তু সে কোন বন্ধুর সঙ্গে বাইরে গিয়েছে। কাল দুপুরের দিকে ফিরবে। আগামীকাল সন্ধ্যাটা সে শাক্য এবং সুদীওতর জন্য রাখবে কথা দিয়েছে। আজ ঘুম হবে না। আসবে না ঘুম এত তাড়াতাড়ি। কুককে ফিরে কেবল একটা ফ্লাস্কভর্তি ব্ল্যাক কফি রেখে যেতে বলেছিল সে। কুক রেখেও গিয়েছে। বয়স্ক মানুষ। কম কথা বলেন, কিন্তু কাজ করেন গুছিয়ে। আর ব্ল্যাককফিটা ভালৈ বানান। বারান্দায় এসে বসার সময় ফ্লাস্ক এবং কফিমগ এনে রেখেছিল সে টেবিলে। ফ্লাস্ক থেকে মগে ঢেলে সে চুমুক দিল হালকা করে। ট্যাবটা পাশে এনে রেখেছে। ইরাবতীর পাঠানো ফাইলখানা যতক্ষণ না ঘুম আসে, পড়বে সে। এমন নয় যে সে, পাঠানো ফাইল এখন খোলেইনি। খুলেছে। কিছুটা পড়েছেও। ইরাবতী খুব মুন্সিয়ানার সঙ্গে ফাইলটা রেডি করেছেন। সংক্ষিপ্ত ইনফরমেশান। যেখানে যেখানে ভাবনার অবকাশ আছে সেখানে হাইলাইট করে দিয়েছেন। এতে অনেক সুবিধা হবে শাক্যর। সময় যেমন বাঁচবে, তেমনি ঠিক কোথায়-কোথায় ভাবনাচিন্তা করা দরকার, অন্য এক ভিউপয়েন্ট থেকে তারও একটা আভাস মিলবে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৯: রাজসূয়যজ্ঞে চেদিপতি শিশুপাল ও কুরুপ্রধান ভীষ্মের কথোপকথনে সদর্থক ও নঞর্থক চিন্তার সংঘাত,মহাকাব্যে প্রতিফলিত জীবনবোধ

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!
সুদীপ্ত তাকে দিতে এসেছিল। থানার ওভারঅল দায়িত্ব এভাবে পেয়ে সে-যে খুব খুশি হয়েছে, এমন নয়। যদিও মালাকারের বিরুদ্ধে তদন্তের দায়িত্ব তার উপর বর্তায়নি। সেটা করবেন সদর থানার পুলিশ এবং স্বয়ং এসপি। এসপি ফিরে গিয়েছেন সাংবাদিক সম্মেলনের পরে ডিনার সেরেই। মালাকারকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কয়েকদিনের জিনিসপত্র গুছিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সদরে যেতে। পালিয়ে যেতে পারেন এই বিবেচনায় তাঁর সঙ্গে স্পেশাল পুলিশও মোতায়েন করতে চেয়েছিলেন এসপি। কিন্তু মালাকার তুম্বোমুখে জানিয়েছিলেন, তিনি প্রস্তুত। এখনই যেতে চান। ফলে তাঁকে নিয়েই এসপি ফিরে গেছেন সদরে। ডিএম ফোন করে জানতে চাইছিলেন ঘটনার অগ্রগতি কতদূর। আনাতোলকে আগামীকাল কোর্টে তোলা হবে। যেহেতু তিনি বিদেশী নাগরিক, ফলে কিছু অফিসিয়াল ফরম্যালিটিজ আছে। সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। কলকাতায় তাদের কোনও দূতাবাস নেই। ফলে দিল্লি ছাড়া গতি নেই। সেখানে মেইল করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে ইতিমধ্যেই। সেই দায়িত্ব এসপি নিজেই নিয়েছিলেন। তাঁর অফিস থেকেই মেইল করা হয়েছে। আপাতত আনাতোল থানার কাস্টডিতে আছেন তাঁর সঙ্গীসাথীসহ। ফাদার আন্তোনিওকে অয়াম্বুলেন্সে করে সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তাঁড় কেবিনের বাইরে চব্বিশ ঘন্টা পুলিশি পাহারা থাকবে।
আরও পড়ুন:

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার : শতফুল বিকশিত হোক

শ্রদ্ধাঞ্জলি : সঙ্গীতই আমার ফার্স্ট লাভ : শচীন দেববর্মণ
সুদীপ্তকে এত পরিশ্রমের পর আজ রাতে থানায় কাটাতে হবে। কাল কোর্টে না তোলা পর্যন্ত শান্তি নেই তার। একটু ফাঁক পেলেই বলে যাচ্ছে, “দাদা, শেষ পর্যন্ত দোষ স্বীকার করানো যাবে তো? ফরেন মাল! কখন ভোকাট্টা হয়ে যায়, তার ঠিক নেই…”
“ভরসা রাখো সুদীপ্ত। আমাদের বিচারব্যবস্থা অত ঠুনকো নয়। তাছাড়া কেসটা এমনভাবে সাজাতে হবে যে আনাতোলের স্বীকার-অস্বীকারের উপর যেন কিছু নির্ভর না করে!”
“কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব, তা-ই ভাবছি!”
“চার্চে নিশ্চয়ই এতক্ষণে খবর পৌঁছে গিয়েছে?”
“আমি ফোন করেছিলাম। ওঁরা অবশ্য আগেই খবর পেয়ে গিয়েছিলেন। দু’জনকে পাঠিয়েও ছিলেন! আপনি তখন সাংবাদিক সম্মেলনে ছিলেন, তখন এসেছিলেন ওঁরা!”
“কী বলছেন?”
“কিছুই নাকি বুঝতে পারেননি। চার্চের দোষ নেই। ফাদার আন্তোনিও ভেবে আনাতোলের উপর তাঁরা পূর্ণ ভরসা করেছিলেন, আসল ফাদার আন্তোনিও কোথায় ছিলেন, কেউ নাকি জানত না… এইসব আর-কি!”
“মিথ্যে সকলেই বলবে না। কিন্তু কেউ-কেউ বলবে। চার্চের কিছু লোকের সাহায্য না থাকলে এই কাজ সম্ভব নয়। তাও দীর্ঘদিন।”
“হ্যাঁ দাদা, আমিও সেটাই বলেছি। ওঁরা বলেছেন, ওঁদের উকিল এসে কথা বলবে…”
“সেটা ওঁদের ব্যাপার। নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে হলেও এখন ওঁদের কোর্টে দৌড়াতে হবে। এতে আর আশ্চর্যের কী আছে!”
“হ্যাঁ। সেটাই।”
“সুদীপ্ত !”
“দাদা!”
“এখন আমাদের বিশ্রাম নেওয়ার অবকাশ নেই। যত দেরি হবে, আসল কুশীলবেরা কিন্তু হাতের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে!”
“আরও কেউ আছে বলছেন?”
“পিশাচ পাহাড় রিসর্টের হত্যাকাণ্ডগুলির কিন্তু কিনারা হয়নি। তার উপর কালাদেওর গুহায় ছানবিন করার পরেও অরণ্যবাবুর উপর কালাদেওর আক্রমণ মোটেও হালকা ভাবে নিয়ো না!”
“না। নিচ্ছি না দাদা। কিন্তু কালাদেওই কি? আপনি এখনও বিশ্বাস করেন যে, কালাদেও বলে কিছুর অস্তিত্ব আছে? আর সে-ই এই সব কাণ্ড ঘটাচ্ছে?”
“যতক্ষণ না কালাদেওর পিছনের ভূতকে ধরতে পারছি আমরা, ততক্ষণ যত দোষ নন্দ ঘোষের মতো কালাদেওর উপরেই দায়ভার চাপবে। কিন্তু আমি জানি কালাদেওর ছায়ার পিছনে আছে অন্য কারুর কায়া। একাধিক জন হতে পারে, একজন হতে পারে।”
“খড়ের গাদায় সূঁচ খুঁজবেন নাকি সূঁচের বাক্সের সন্ধান পেয়েছেন?”
“আবছাভাবে পেয়েছি। কিন্তু হিসেব মেলাতে পারছি না। মেলানো যায় কিনা তা তদন্তসাপেক্ষ।”
“আমাদের করণীয় কী এখন ? মানে কোন পথে তাহলে এগোবো আমরা?”
“সেই মধুপুর না যশিডির ওখানে বেদের দলের ছেলেটিকে ধরা গেল?”
“এসপি সাহেব টিম পাঠিয়েছেন। যতপদূর জানি টিমের মাথা যে ভার্গব, খুব করিতকর্মা লোক। ঠিক কিছু একটা ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু ছেলেটি কি খুব গুরুত্বপূর্ণ এই কেসে? হয়তো প্রতারণা করেছিল। এটুকুই তার দোষ!”
“সুদীপ্ত, বুধন কোন কোটিপতির ঘরের ছেলে তো দূরের কথা, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেও ছিল না। তার বাবা-মাকে প্রতারণা করে অতএব আর্থিক কোন হতো না বেদের দলের। তাহলে? তোমার কথা আমি বুঝতে পারছি। ছেলেটি হয়তো কারুর কথায় এই কাজটি করেছে। তার জন্য সামান্য টাকাও হয়তো পেয়েছে। কিন্তু সেই ‘কারুর’টি কে? কেনই বা সে এমন রিস্ক নিল? যে-কোন মুহূর্তে বুধনসাজা ছেলেটি ধরা পড়ে গেলে তো তার মুখোশ খুলেই যেত। ধরাও পড়ছিল। হেলথ সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার পর ডাক্তারের হাত থেকে পালানো সেই কারণেই। ছেলেটিকে পাওয়া খুব দরকার। কারণ, এই কেসে যত বেশি সাক্ষীসাবুদ তুমি জোগাড় করতে পারবে, ততই ভালো। কেসের গোড়া থেকে যারা-যারা সামান্যতম পরিমাণেও এই কেসে জড়িয়ে পড়েছে, তাদের সকলকে একজোট করতে হবে বুঝলে!”
“ভরসা রাখো সুদীপ্ত। আমাদের বিচারব্যবস্থা অত ঠুনকো নয়। তাছাড়া কেসটা এমনভাবে সাজাতে হবে যে আনাতোলের স্বীকার-অস্বীকারের উপর যেন কিছু নির্ভর না করে!”
“কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব, তা-ই ভাবছি!”
“চার্চে নিশ্চয়ই এতক্ষণে খবর পৌঁছে গিয়েছে?”
“আমি ফোন করেছিলাম। ওঁরা অবশ্য আগেই খবর পেয়ে গিয়েছিলেন। দু’জনকে পাঠিয়েও ছিলেন! আপনি তখন সাংবাদিক সম্মেলনে ছিলেন, তখন এসেছিলেন ওঁরা!”
“কী বলছেন?”
“কিছুই নাকি বুঝতে পারেননি। চার্চের দোষ নেই। ফাদার আন্তোনিও ভেবে আনাতোলের উপর তাঁরা পূর্ণ ভরসা করেছিলেন, আসল ফাদার আন্তোনিও কোথায় ছিলেন, কেউ নাকি জানত না… এইসব আর-কি!”
“মিথ্যে সকলেই বলবে না। কিন্তু কেউ-কেউ বলবে। চার্চের কিছু লোকের সাহায্য না থাকলে এই কাজ সম্ভব নয়। তাও দীর্ঘদিন।”
“হ্যাঁ দাদা, আমিও সেটাই বলেছি। ওঁরা বলেছেন, ওঁদের উকিল এসে কথা বলবে…”
“সেটা ওঁদের ব্যাপার। নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে হলেও এখন ওঁদের কোর্টে দৌড়াতে হবে। এতে আর আশ্চর্যের কী আছে!”
“হ্যাঁ। সেটাই।”
“সুদীপ্ত !”
“দাদা!”
“এখন আমাদের বিশ্রাম নেওয়ার অবকাশ নেই। যত দেরি হবে, আসল কুশীলবেরা কিন্তু হাতের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে!”
“আরও কেউ আছে বলছেন?”
“পিশাচ পাহাড় রিসর্টের হত্যাকাণ্ডগুলির কিন্তু কিনারা হয়নি। তার উপর কালাদেওর গুহায় ছানবিন করার পরেও অরণ্যবাবুর উপর কালাদেওর আক্রমণ মোটেও হালকা ভাবে নিয়ো না!”
“না। নিচ্ছি না দাদা। কিন্তু কালাদেওই কি? আপনি এখনও বিশ্বাস করেন যে, কালাদেও বলে কিছুর অস্তিত্ব আছে? আর সে-ই এই সব কাণ্ড ঘটাচ্ছে?”
“যতক্ষণ না কালাদেওর পিছনের ভূতকে ধরতে পারছি আমরা, ততক্ষণ যত দোষ নন্দ ঘোষের মতো কালাদেওর উপরেই দায়ভার চাপবে। কিন্তু আমি জানি কালাদেওর ছায়ার পিছনে আছে অন্য কারুর কায়া। একাধিক জন হতে পারে, একজন হতে পারে।”
“খড়ের গাদায় সূঁচ খুঁজবেন নাকি সূঁচের বাক্সের সন্ধান পেয়েছেন?”
“আবছাভাবে পেয়েছি। কিন্তু হিসেব মেলাতে পারছি না। মেলানো যায় কিনা তা তদন্তসাপেক্ষ।”
“আমাদের করণীয় কী এখন ? মানে কোন পথে তাহলে এগোবো আমরা?”
“সেই মধুপুর না যশিডির ওখানে বেদের দলের ছেলেটিকে ধরা গেল?”
“এসপি সাহেব টিম পাঠিয়েছেন। যতপদূর জানি টিমের মাথা যে ভার্গব, খুব করিতকর্মা লোক। ঠিক কিছু একটা ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু ছেলেটি কি খুব গুরুত্বপূর্ণ এই কেসে? হয়তো প্রতারণা করেছিল। এটুকুই তার দোষ!”
“সুদীপ্ত, বুধন কোন কোটিপতির ঘরের ছেলে তো দূরের কথা, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেও ছিল না। তার বাবা-মাকে প্রতারণা করে অতএব আর্থিক কোন হতো না বেদের দলের। তাহলে? তোমার কথা আমি বুঝতে পারছি। ছেলেটি হয়তো কারুর কথায় এই কাজটি করেছে। তার জন্য সামান্য টাকাও হয়তো পেয়েছে। কিন্তু সেই ‘কারুর’টি কে? কেনই বা সে এমন রিস্ক নিল? যে-কোন মুহূর্তে বুধনসাজা ছেলেটি ধরা পড়ে গেলে তো তার মুখোশ খুলেই যেত। ধরাও পড়ছিল। হেলথ সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার পর ডাক্তারের হাত থেকে পালানো সেই কারণেই। ছেলেটিকে পাওয়া খুব দরকার। কারণ, এই কেসে যত বেশি সাক্ষীসাবুদ তুমি জোগাড় করতে পারবে, ততই ভালো। কেসের গোড়া থেকে যারা-যারা সামান্যতম পরিমাণেও এই কেসে জড়িয়ে পড়েছে, তাদের সকলকে একজোট করতে হবে বুঝলে!”
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৮: চন্দ্রবোড়া
সুদীপ্ত মাথা নাড়ল। বুঝেছে সে। তারপর কী ভেবে বলল, “কালাদেও আর পিশাচ পাহাড় রিসর্টের দুট কেস সম্পূর্ণ আলাদা। লোকে বলতে শুরু করেছে, কালাদেওর উপর গুরুত্ব দিতে গিয়ে আমরা পিশাচ পাহাড় রিসর্টের হত্যাগুলি এবং হত্যার চেষ্টাকে গুরুত্ব দিচ্ছি না। ওই কেসগুলি আনসলভড্ থেকে যাবে!”
“লোককে তার মতো করে বলতে দাও। দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের কেস হাতে এলে একের পর এক ধরতে হয়। নাহলে দুটোই জট পাকিয়ে কোনটাই আর সমাধান করতে পারবে না তুমি।”
“হ্যাঁ। সেটা ঠিক কথা। আমি বুলতাম না। কিন্তু আজ ফিরে শুনলাম, পিশাচ পাহাড় রিসর্টের ম্যানেজার কাপাডিয়া এসে মালাকারের কাছে দরবার করে গেছে। অভিযোগও করেছে। পুলিশ তাদের রিসর্টের কেসগুলিকে কম গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বলেই আততায়ী ধরা পড়ছে না।”
“কে এসেছিল? কাপাডিয়া?”
“হ্যাঁ।”
“তাঁর চিন্তা স্বাভাবিক। পিশাচ পাহাড় রিসর্টের উপর বার বার আক্রমণ নেমে আসছে বলে তাদের ব্যবসা লাটে ওঠার জোগাড়। সেজন্য তাঁর চাড় বেশি। আপাতত সাক্ষীসাবুদ, প্রত্যক্ষদর্শী যাকে যাকে পাও থানায় তুলে আনো। ইন্টারোগেট করা প্রয়োজন আবার। আগে আমরা বিলকুল অন্ধকারে ছিলাম। এখন কিছু হলেও আলোর আভাস পাচ্ছি। অতএব এখনকার বোঝাপড়া অন্যরকম হবে।”
“আপনি কি কিছু অনুমান করেছেন? কিংবা সন্দেহ?”
“শাক্য সিংহ পাকাপোক্ত প্রমাণ না পেয়ে তার নিছক সন্দেহের কথা কাউকে বলে না সুদীপ্ত। আগে যা বলছি তা করো, তারপর সমস্ত কিছু তোমার সঙ্গে শেয়ার করব। তার আগে ফিরে কলকাতা থেকে আসা মিস্ ইরাবতী মিত্রের ফাইলটা নিয়ে বসতে হবে। সামান্য যা চোখ বুলিয়েছি, তাতে ইন্টারেস্টিং বলে মনে হয়েছে। কিছু ক্ল্যু ওই ফাইলের মধ্যেই আছে!”
“যথা আজ্ঞা। আপনি ফাইল পড়ে অন্ধকার কাটান, আর আমি ধরে এনে অন্ধকার দূড় করার চেষ্টা করি। অন্ধকার আমাদের দুজনেরই প্রধান প্রতিপক্ষ দেখতে পাচ্ছি!”
হেসে উঠল শাক্য। হাসলে তাকে অন্যরকম দেখায়। মনেই হয় না সে পুলিশের জাঁদরেল একজন গোয়েন্দা। —চলবে।
“লোককে তার মতো করে বলতে দাও। দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের কেস হাতে এলে একের পর এক ধরতে হয়। নাহলে দুটোই জট পাকিয়ে কোনটাই আর সমাধান করতে পারবে না তুমি।”
“হ্যাঁ। সেটা ঠিক কথা। আমি বুলতাম না। কিন্তু আজ ফিরে শুনলাম, পিশাচ পাহাড় রিসর্টের ম্যানেজার কাপাডিয়া এসে মালাকারের কাছে দরবার করে গেছে। অভিযোগও করেছে। পুলিশ তাদের রিসর্টের কেসগুলিকে কম গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বলেই আততায়ী ধরা পড়ছে না।”
“কে এসেছিল? কাপাডিয়া?”
“হ্যাঁ।”
“তাঁর চিন্তা স্বাভাবিক। পিশাচ পাহাড় রিসর্টের উপর বার বার আক্রমণ নেমে আসছে বলে তাদের ব্যবসা লাটে ওঠার জোগাড়। সেজন্য তাঁর চাড় বেশি। আপাতত সাক্ষীসাবুদ, প্রত্যক্ষদর্শী যাকে যাকে পাও থানায় তুলে আনো। ইন্টারোগেট করা প্রয়োজন আবার। আগে আমরা বিলকুল অন্ধকারে ছিলাম। এখন কিছু হলেও আলোর আভাস পাচ্ছি। অতএব এখনকার বোঝাপড়া অন্যরকম হবে।”
“আপনি কি কিছু অনুমান করেছেন? কিংবা সন্দেহ?”
“শাক্য সিংহ পাকাপোক্ত প্রমাণ না পেয়ে তার নিছক সন্দেহের কথা কাউকে বলে না সুদীপ্ত। আগে যা বলছি তা করো, তারপর সমস্ত কিছু তোমার সঙ্গে শেয়ার করব। তার আগে ফিরে কলকাতা থেকে আসা মিস্ ইরাবতী মিত্রের ফাইলটা নিয়ে বসতে হবে। সামান্য যা চোখ বুলিয়েছি, তাতে ইন্টারেস্টিং বলে মনে হয়েছে। কিছু ক্ল্যু ওই ফাইলের মধ্যেই আছে!”
“যথা আজ্ঞা। আপনি ফাইল পড়ে অন্ধকার কাটান, আর আমি ধরে এনে অন্ধকার দূড় করার চেষ্টা করি। অন্ধকার আমাদের দুজনেরই প্রধান প্রতিপক্ষ দেখতে পাচ্ছি!”
হেসে উঠল শাক্য। হাসলে তাকে অন্যরকম দেখায়। মনেই হয় না সে পুলিশের জাঁদরেল একজন গোয়েন্দা। —চলবে।
* ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (novel): পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক (Pishach paharer Aatanka) : কিশলয় জানা (Kisalaya Jana) বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজ।


















