কলকাতায় বৃষ্টি

চন্দ্রবোড়ার বাচ্চারা। ছবি : সংগৃহীত।

সুন্দরবনের পশ্চিমাংশে গত দেড় দশকে চন্দ্রবোড়া সাপ কেউ দেখেছে বা কাউকে চন্দ্রবোড়া সাপ দংশন করেছে শুনিনি। যদিও ছোটবেলায় আমি চন্দ্রবোড়া সাপ দেখেছি। তবে এই এলাকায় যে পরিমাণে কেউটে, গোখরো ও কালাচ সাপ দেখা যায় সেই তুলনায় অত্যন্ত কম পরিমাণে চন্দ্রবোড়া দেখা যেত। সুন্দরবনের পূর্ব অংশে অর্থাৎ ক্যানিং, গোসাবা, বাসন্তী, হিঙ্গলগঞ্জ, সন্দেশখালি ইত্যাদি এলাকায় এখনও চন্দ্রবোড়া সাপ উপস্থিত, যদিও সংখ্যা খুবই কম।
চন্দ্রবোড়া সাপ তার বিষের জন্য যতটা না ভয়াবহ তার থেকে অনেক বেশি সুন্দর তার রূপে। চন্দ্রবোড়ার গায়ের রং হলুদ। অনেকটা পুরনো হলুদের মতো রং। আর তার ওপরে পিঠের দিকে রয়েছে তিনটে সারিতে গোল গোল বা ডিম্বাকার চাকা চাকা দাগ। চাকা দাগগুলো সাধারণত কালচে হলুদ, তবে তার চারদিকে গাঢ় কালো রঙের পুরু বর্ডার রয়েছে। কখনো কখনও দুটো চাকা দাগ জুড়ে গিয়ে ইংরেজি ‘S’ এর মতো দেখায়। এই চাকা দাগের জন্যই এই সাপের বাংলা নাম হয়েছে চন্দ্রবোড়া। এদের পিঠের মাঝ বরাবর চাকা দাগের সংখ্যা হয় ৩৭টি, আর পিঠের দু’ধারে চাকা দাগ থাকে ২৭টি করে। দু’পাশের দাগগুলি তুলনামূলকভাবে একটু বড় হয়। পেটের দিকের রঙ ফ্যাকাসে হলুদ বা সাদা আর তার ওপর রয়েছে কালো রঙের ছোট ছোট ছোপ। ইংরেজিতে এই সাপের নাম হল Russell’s Viper, বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Vipera russelii’ (Daboia russelii)। ভারতে সর্পবিদ্যার জনক হিসেবে পরিচিত স্কটিশ প্রকৃতি বিজ্ঞানী প্যাট্রিক রাসেল প্রথম এই সাপের একটি নমুনা ব্রিটিশ মিউজিয়ামে প্রদান করেন। আর সেই নমুনার ভিত্তিতেই এই সাপের ইংরেজি নামকরণ রাসেলের নামে করা হয়।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৬: শাঁখামুটি

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮৮: প্রতিপক্ষ অন্ধকার

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৭০ : ঘটজাতক/৫ : সে আসিছে আজ কাল-বৈশাখে

একটি পূর্ণবয়স্ক চন্দ্রবোড়া লম্বায় হয় সর্বাধিক প্রায় ৫.৫-৬.৫ ফুট। তবে সুন্দরবনে প্রাপ্ত চন্দ্রবোড়া সাপের গড় দৈর্ঘ্য ৩.৫-৪.৫ ফুট। এরা একটু নাদুস-নুদুস আকৃতির সাপ। মাথাটা তিনকোনা এবং একটু চ্যাপ্টা, আর গলার কাছটা সামান্য সরু। এদের লেজ গোলাকার আর লেজের আগা সুচালো। দুটো চোখ কাচের গুলির মতো। চোখের চারিদিকে রয়েছে বৃত্তাকার সাদা বর্ডার। চোখের কনীনিকা সোনালি রঙের এবং তারারন্ধ্র ডিম্বাকার হয়। এদের মুখের ওপরের আঁশ আর পিঠের ওপরের আঁশ পিঠের দুপাশের আঁশের তুলনায় সামান্য ছোট। পেটের দিকে আঁশগুলো পেটের দু’প্রান্তে আড়াআড়ি বিস্তৃত। লেজের দিকের আঁশগুলি আবার দুটি সারিতে বিভক্ত।
কলকাতায় বৃষ্টি

চন্দ্রবোড়ার মাথা। ছবি : সংগৃহীত।

চন্দ্রবোড়া সাপ খুবই অলস এবং মন্থর গতিসম্পন্ন। স্বভাবেও এরা ভীষণ শান্ত। প্রচণ্ড রেগে না গেলে বা ভয় না পেলে সাধারণত এরা দংশন করে না। ভয় পেলে অনেক সময় ধরে বেশ জোরে হিস-হিস শব্দ করে। একমাত্র আত্মরক্ষার জন্যই এরা কামড়ায়। যখন কামড়ায় তখন তার ঠিক আগে শরীরটাকে গুটিয়ে নেয় আর তারপর ঝাঁপ দিয়ে দংশন করে। যেহেতু এরা অলস প্রকৃতির সাপ তাই গর্তের মধ্যে কিংবা ঝোপেঝাড়ে এরা দীর্ঘ সময় কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে পড়ে থাকে। এরা ভিজে স্যাঁতসেতে ও নিরিবিলি জায়গা পছন্দ করে। তাই সাধারণত লোকালয় থেকে দূরে খাল, বিল, ঝিল বা পুকুরের আশেপাশে ঝোপঝাড়ের মধ্যে এদের বেশি পাওয়া যায়।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৯: রাজসূয়যজ্ঞে চেদিপতি শিশুপাল ও কুরুপ্রধান ভীষ্মের কথোপকথনে সদর্থক ও নঞর্থক চিন্তার সংঘাত,মহাকাব্যে প্রতিফলিত জীবনবোধ

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-১৫৪: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য

চন্দ্রবোড়া মূলত রাতেই বেশি শিকার করে। তবে কখনো কখনো নির্জন দুপুরেও শিকারের সন্ধানে বেরোতে দেখা যায়। এদের প্রিয় খাবার হল মাছ। তাই যেখানে জল নিকাশি রয়েছে কিংবা জলের সামান্য স্রোত রয়েছে সেখানে এদের উপস্থিতি বেশি লক্ষ্য করা যায়। যে কায়দায় এরা ভয় পেয়ে দংশন করে একই কায়দায় মাছ শিকার করে। দেখা গিয়েছে, যে মাছকে এরা শিকার করবে বলে একবার টার্গেট করে তাকে সাধারণতঃ ফস্কায় না। অনেক সময় দেখা যায় পুকুর বা জমির আলে যে ঘোগ তৈরি হয় তার মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে মাছ শিকার করার জন্য অপেক্ষা করছে। মাছ ছাড়াও এরা বিভিন্ন জলজ সাপ যেমন জল ঢোঁড়া ও জল মেটেলি, ব্যাঙ, ইঁদুর, টিকটিকি, পাখি, ফড়িং, পঙ্গপাল ইত্যাদি শিকার করে।
আরও পড়ুন:

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার : শতফুল বিকশিত হোক

শ্রদ্ধাঞ্জলি : সঙ্গীতই আমার ফার্স্ট লাভ : শচীন দেববর্মণ

চন্দ্রবোড়া সাধারণত আড়াই বছর বয়সে প্রজননে সক্ষম হয়। এদের প্রজনন ঋতু জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি মাসে। এই সময় স্ত্রী ও পুরুষ চন্দ্রবোড়া সাপ জোড় বাঁধে। অন্যান্য সাপের থেকে এদের যৌনমিলন ভঙ্গি আলাদা। স্ত্রী ও পুরুষ সাপ ক্ষণিকের জন্য জড়াজড়ি করে, তারপর স্ত্রী সাপটি ছিটকে সরে যায়। এভাবেই চলতে থাকে অনেকক্ষণ ধরে। এভাবে চলতে চলতে খুব অল্প সময়ের মধ্যে এরা যৌনমিলন পর্ব সমাধা করে। যৌনমিলনের পর স্ত্রী চন্দ্রবোড়া কিন্তু ডিম পাড়ে না, বাচ্চা প্রসব করে। এদের গর্ভাবস্থা স্থায়ী হয় প্রায় ৬ মাস।
কলকাতায় বৃষ্টি

চন্দ্রবোড়ার বিষদাঁত। ছবি : সংগৃহীত।

সাধারণত জুন জুলাই মাসেই বাচ্চাদের জন্ম হয়। এক একবারে ২০-৪০ টি বাচ্চার জন্ম হয়। তবে সর্বাধিক ৭৫ টি বাচ্চার জন্ম হতেও দেখা গিয়েছে। জন্মের সময় বাচ্চাদের দৈর্ঘ্য হয় ৮.৫-১০ ইঞ্চি। জন্মের পর বাচ্চারাও কিন্তু থাকে বিষাক্ত। জন্মের পর সাধারনত বাচ্চারা দেড় থেকে দু সপ্তাহ কিছু খায় না, ডিমের মধ্যে থেকে যে পুষ্টি পায় তাতেই চলে যায়। তারপর ছোট ছোট মাছ, ব্যাঙ, পোকামাকড় খাওয়া শুরু করে।
চন্দ্রবোড়া সাপের বিষের প্রকৃতি হল হিমাটোটোক্সিক, অর্থাৎ এই বিষের প্রভাবে লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে যায়। চন্দ্রবোড়ার দুটি বিষ দাঁত খুব বড় হয়। দেখা গিয়েছে ৪ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। তাই যখন এরা দংশন করে তখন অনেকটা গভীর পর্যন্ত ক্ষত তৈরি হয়। ফলে দংশনের স্থান থেকে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে। দংশনের পরেই ক্ষতস্থানে যন্ত্রনা শুরু হয় এবং জায়গাটা ফুলতে শুরু করে। রোগীর দেহের ভেতরের রক্তক্ষরণ শুরু হয়। তখন মাড়ি, মূত্র এবং কফের মধ্যে রক্তের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। রোগী কাশলে বা বমি করলে তার সাথে রক্ত উঠে আসে। রোগীর দৃষ্টি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যায়। রক্তচাপ এবং হৃৎস্পন্দন হার দ্রুত কমতে থাকে। দংশনের জায়গায় ফোসকা পড়তে দেখা যায় এবং সংশ্লিষ্ট অঙ্গেও সেই ফোসকা শুরু হয়। রোগীর বমি শুরু হয় এবং মুখমণ্ডল ফুলতে শুরু করে। কখনও কখনও কিডনি আক্রান্ত হয়। তখন প্রস্রাব পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। রোগীর প্রবল কাঁপুনি শুরু হয়। অনেক সময় চোখ থেকেও রক্তপাত হতে থাকে। মস্তিষ্কেও রক্তক্ষরণ হতে দেখা যায়। সঠিক সময়ে প্রতিষেধক না পেলে রোগী নিশ্চিতভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!

চন্দ্রবোড়ার বিষথলিতে প্রায় ৩০০ মিলিগ্রাম বিষ থাকতে পারে। এর মধ্যে ৪২ মিলিগ্রাম বিষ মানুষের রক্তে মিশলেই তা মৃত্যু ঘটাতে সক্ষম। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে মাত্র ১৫ মিলিগ্রাম বিষ মৃত্যু ঘটিয়েছে। তাই চন্দ্রবোড়া সাপ কামড়ালে যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে চিকিৎসা কেন্দ্রে এনে অ্যান্টিভেনাম ইনজেকশন দিতে হবে।
কলকাতায় বৃষ্টি

বিশ্রামরত চন্দ্রবোড়া। ছবি : সংগৃহীত।

চন্দ্রবোড়া সাপ ধীর গতিসম্পন্ন এবং অলস প্রকৃতির হওয়ায় সহজেই এদের মেরে ফেলা সম্ভব হয়েছে। তাই যত জনবসতি গড়ে উঠেছে ততই সুন্দরবনের বসতি অংশে চন্দ্রবোড়ার সংখ্যা কমেছে। তাছাড়া এই সাপ নির্জনতা বেশি পছন্দ করে। আবার ঘন জঙ্গলও এদের অপছন্দ। তাই সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে যেমন এদের তেমন দেখা মেলে না তেমনই দেখা মেলে না ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকায়। বিষধর হলেও প্রকৃতির এই সুন্দর প্রাণীটিকে রক্ষা করা একান্ত জরুরি, বিশেষ করে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষার জন্য।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content