
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
রাজসূয়মহাযজ্ঞের আয়োজক যুধিষ্ঠির। পিতামহ ভীষ্মের নির্দেশে, স্থির হল কৃষ্ণকে পূজার্ঘ্যপ্রদান করা হবে। এই বিষয়ে চেদিরাজ শিশুপালের ভয়ানক আপত্তি। যুধিষ্ঠির কোমলভাষায় শিশুপাল যাতে কৃষ্ণের সমালোচনা থেকে বিরত থাকেন তার চেষ্টা করলেন।পিতামহ ভীষ্ম, কৃষ্ণার্চনার বিপক্ষে শিশুপালের যুক্তির বিপক্ষযুক্তির অবতারণা করলেন। কৃষ্ণ কেন সম্মানীয়? মাননীয় ভীষ্ম, যুক্তিপূর্ণভাষায় কৃষ্ণের মহিমা ব্যাখ্যা করলেন। সহদেব ভীষ্মের সমর্থনে অর্থপূর্ণ যুক্তিসঙ্গত বক্তব্য উপস্থাপিত করলেন। তিনি বললেন— এই কৃষ্ণ কেশিদানবকে হত্যা করেছেন, তাই তিনি কেশব।সেই অতুলনীয় পরাক্রমশালী কৃষ্ণের অর্চনা অন্য রাজারা সহ্য করতে পারছেন না। সহদেব কঠোরভাষায় ঘোষণা করলেন, সেই সব বলীদের মাথায় আমি পা রাখি। সর্ব্বেষাং বলিনাং মূর্দ্ধ্নি ময়েদং নিহিত পদম্। সহদেব বললেন, এই ঘোষণার পরে কেউ সঙ্গত উত্তর প্রদান করতেই পারেন। তবে তিনি কিন্তু নিঃসন্দেহে আমার বধ্য হবেন। স এব হি ময়া বধ্যো ভবিষ্যতি ন সংশয়ঃ।
সহদেব অন্যান্য রাজাদের সতর্ক করলেন, বুদ্ধিমান যে রাজারা আছেন তাঁরা পূজনীয় ও অর্চিত কৃষ্ণকে আচার্য, পিতা, গুরু বলে অর্ঘ্যদানের যোগ্য পাত্ররূপে স্বীকার করুন। সহদেব পা দেখালেন, তবু সেই বুদ্ধিমান, সজ্জন, সম্মানীয়, বলশালী রাজাদের মধ্যে কেউই প্রতিবাদ করলেন না। সহদেবের মাথার ওপরে পুষ্পবৃষ্টি হল। ‘সাধু’সাধু’ এমন অদৃশ্য বাণী ঘোষিত হল। অতীত ও ভবিষ্যত বিষয় ধ্যানযোগে নিরূপন করে, সকলের সংশয় নির্মূলকারী, সকল লোকের স্বরূপবিষয়ে অভিজ্ঞ, নারদ, সর্বদাই অপরাজিত কৃষ্ণকে উদ্দেশ্য করে বললেন, যে সব মানুষ, কমলনয়ন কৃষ্ণের অর্চনা করবেন না, তাঁরা জীবন্মৃত বলে জ্ঞাত হবেন।তাঁদের সঙ্গে কখনও বাক্যালাপ নয়।
ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের প্রাধান্যবিষয়ে অভিজ্ঞ, মানুষদের মধ্যে দেবতুল্য সহদেব, পূজনীয়দের অর্চনা করে অর্ঘ্যদানের কাজ সম্পন্ন করলেন। কৃষ্ণের অর্চনা সমাপ্ত হলে, শত্রুহন্তা, সুনীথ শিশুপাল, অস্বাভাবিক রক্তচক্ষু হয়ে, সক্রোধে রাজাদের বললেন, হে রাজন্যবর্গ, সম্প্রতি আপনাদের সেনাপতিরূপে অবস্থানকালীন আমায় আপনারা কি অনুমতি করেন? আমি রণসাজে সজ্জিত হয়ে, সম্মিলিত বৃষ্ণি ও পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত রইলাম। স্থিতঃ সেনাপতির্বোঽহং মন্যধ্বং কিন্নু সাম্প্রতম্। যুধি তিষ্ঠাম সন্নহ্য সমেতান্ বৃষ্ণিপাণ্ডবান্।।
ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের প্রাধান্যবিষয়ে অভিজ্ঞ, মানুষদের মধ্যে দেবতুল্য সহদেব, পূজনীয়দের অর্চনা করে অর্ঘ্যদানের কাজ সম্পন্ন করলেন। কৃষ্ণের অর্চনা সমাপ্ত হলে, শত্রুহন্তা, সুনীথ শিশুপাল, অস্বাভাবিক রক্তচক্ষু হয়ে, সক্রোধে রাজাদের বললেন, হে রাজন্যবর্গ, সম্প্রতি আপনাদের সেনাপতিরূপে অবস্থানকালীন আমায় আপনারা কি অনুমতি করেন? আমি রণসাজে সজ্জিত হয়ে, সম্মিলিত বৃষ্ণি ও পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত রইলাম। স্থিতঃ সেনাপতির্বোঽহং মন্যধ্বং কিন্নু সাম্প্রতম্। যুধি তিষ্ঠাম সন্নহ্য সমেতান্ বৃষ্ণিপাণ্ডবান্।।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭২: কামোদ্দীপক প্ররোচনা ও রাবণের পরস্ত্রী-অপহরণের লোলুপতা আজও অব্যাহত

উপন্যাস, পর্ব-৮8 : আকাশ এখনও মেঘলা

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৬৬ : ঘটজাতক/১ : নিয়তিঃ কেন বাধ্যতে?

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮১: সীমান্ত-সংঘাত
চেদিশ্রেষ্ঠ শিশুপাল এইভাবে স্বপক্ষের রাজাদের উৎসাহিত করে, যজ্ঞে বিঘ্ন সৃষ্টি করবার উদ্দেশ্যে সেই রাজাদের সঙ্গে মন্ত্রণা করতে লাগলেন। সেখানে আমন্ত্রিত ও সমাগত শিশুপাল প্রমুখ সমস্ত রাজারাই, ক্রুদ্ধ ও বিবর্ণমুখে দৃশ্যমান হলেন। তাঁদের মুখে এক কথা — যুধিষ্ঠিরের অভিষেক এবং কৃষ্ণের পুজো, যাতে না হয় সেই কাজটাই করতে হবে। সহদেবের পা দেখানর কাজটি অসম্মানজনক, এই সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে,রাজারা ক্রোধে আত্মহারা হলেন। তাঁরা নিজেদের অবমাননাহেতু, স্থিরনিশ্চিত হয়ে এই সব কথা বলতে লাগলেন। সিংহের খাদ্য, মাংস হতে দূরে সরিয়ে নেওয়া গর্জনরত সিংহের মতো সুহৃদ্বর্গের বারণসত্ত্বেও শিশুপাল প্রভৃতি (কৃষ্ণের বিরোধী) রাজাদের ক্রোধে কম্পমান শরীর, শোভা বিস্তার করল। সেই সময়ে, কৃষ্ণ বুঝতে পারলেন — সেই সম্মিলিত রাজসমূহের সমরশক্তি অপরিসীম ও সাগরতুল্য অক্ষয়। তাঁরা যুদ্ধের জন্যে শপথ করছেন।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৩: কেউটে

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!
প্রলয়ের ঝড়ের অভিঘাতে তাড়িত, ভয়ঙ্কর উত্তাল সমুদ্রের মতো রাজমণ্ডলকে ক্রোধে বিচলিত দেখে, মহাতেজস্বী এবং ইন্দ্রের মতো শত্রুনিধনকারী যুধিষ্ঠির, বুদ্ধিমানদের মধ্যে প্রধান, বৃহস্পতিতুল্য (নীতিজ্ঞ) প্রবীণ কুরুপিতামহ ভীষ্মকে এই কথাগুলি বললেন। পিতামহ, ওই যে ক্রোধে উদ্বেল বিশাল রাজসমুদ্র। এখানে যা যুক্তিসঙ্গত ব্যবস্থা নিতে হবে সেই সম্বন্ধে বলুন। অসৌ রোষাৎ প্রচলিতো মহান্ নৃপতিসাগরঃ। অত্র যে প্রতিপত্তব্যং তন্মে ব্রূহি পিতামহ!।। যুধিষ্ঠিরের অনুরোধ, পিতামহ ভীষ্ম এমন কিছু বলুন যাতে যজ্ঞের কোন বিঘ্ন না ঘটে, প্রজাদের মঙ্গল হয় এবং তাঁদের সববিষয়ে মঙ্গল সাধিত হয়। ধর্মজ্ঞ ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের অনুরোধে, কুরুপিতামহ ভীষ্ম তখন এমন কথা বলতে শুরু করলেন। হে কুন্তীপুত্র, তুমি ভয় পেয় না। কুকুর সিংহকে হত্যা করতে পারে না। আমি সুনীথ শিশুপালবিষয়ে আগেই একটি মঙ্গলময় পথ ভেবে রেখেছি। মা ভৈষীস্ত্বং ন কৌন্তেয়! শ্বা সিংহং হন্তুমর্হতি। শিবঃ পন্থাঃ সুনীথেঽত্র ময়া পূর্ব্বতমং বৃতঃ।। সিংহ যখন ঘুমন্ত,তার কাছে সমাগত কুকুররা,শুধুমাত্র সেখানে (সশব্দে) উপস্থিত হয় মাত্র, এই রাজারাও সেটাই করছে। নিদ্রিত বৃষ্ণিসিংহের (কৃষ্ণের) সম্মুখীন কুকুরগুলির মতো এই ক্রুদ্ধ রাজারা চিৎকার করছেন। অচ্যুত কৃষ্ণ যতক্ষণ নিদ্রিত সিংহের মতো সচেতন নন, ততক্ষণ চেদিপুঙ্গব শিশুপাল নরসিংহের মতো (গর্জনরত রাজাদের) এঁদের (ভাষণের মাধ্যমে) সিংহে পরিণত করেছেন। যুধিষ্ঠিরকে ভীষ্ম তাঁর আশঙ্কার কথা জানালেন— হে রাজশ্রেষ্ঠ, অল্পবুদ্ধি শিশুপাল, সমস্ত রাজাদের (স্বপক্ষের) যমালয়ে নিয়ে যেতে ইচ্ছুক। তাই তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন।
ভীষ্মের অনুমান —অধোক্ষজ কৃষ্ণ নিশ্চয়ই শিশুপালের এই তেজ আবারও গ্রহণ করতে ইচ্ছুক হয়েছেন। ভীষ্ম আশীর্বাদ করলেন, বুদ্ধিমানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ যুধিষ্ঠিরের মঙ্গল হোক। তিনি জানালেন, চেদিরাজ ও (তাঁর সমর্থক) অন্যান্য রাজাদের মতিভ্রম হয়েছে।নরশ্রেষ্ঠ কৃষ্ণের যাঁকে গ্রহণ করতে ইচ্ছা হয়, তখন সেই ব্যক্তির বুদ্ধি নাশ হয়, যেমন চেদিপতির হয়েছে। পিতামহ তাঁর বক্তব্যের গভীরে প্রবেশ করলেন। তাঁর মতে —কৃষ্ণ এই ত্রিলোকের চার প্রকার প্রাণীর (জরায়ু, অণ্ড, স্বেদ ও উদ্ভিদ হতে জাত) উৎপত্তির কারণ, আবার তিনি তাদের মৃত্যুরও কারণ। চতুর্বিধানাং ভূতানাং ত্রিষু লোকেষু মাধবঃ।প্রভবশ্চৈব সর্ব্বেষাং নিধনঞ্চ যুধিষ্ঠির।। ভীষ্মের কথা শুনে,চেদিরাজ শিশুপাল, তাঁর স্বপক্ষের রাজাদের সঙ্গে নিয়ে রূঢ়, কর্কশভাষায় ভীষ্মকে কথা শোনাতে লাগলেন।
ভীষ্মের অনুমান —অধোক্ষজ কৃষ্ণ নিশ্চয়ই শিশুপালের এই তেজ আবারও গ্রহণ করতে ইচ্ছুক হয়েছেন। ভীষ্ম আশীর্বাদ করলেন, বুদ্ধিমানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ যুধিষ্ঠিরের মঙ্গল হোক। তিনি জানালেন, চেদিরাজ ও (তাঁর সমর্থক) অন্যান্য রাজাদের মতিভ্রম হয়েছে।নরশ্রেষ্ঠ কৃষ্ণের যাঁকে গ্রহণ করতে ইচ্ছা হয়, তখন সেই ব্যক্তির বুদ্ধি নাশ হয়, যেমন চেদিপতির হয়েছে। পিতামহ তাঁর বক্তব্যের গভীরে প্রবেশ করলেন। তাঁর মতে —কৃষ্ণ এই ত্রিলোকের চার প্রকার প্রাণীর (জরায়ু, অণ্ড, স্বেদ ও উদ্ভিদ হতে জাত) উৎপত্তির কারণ, আবার তিনি তাদের মৃত্যুরও কারণ। চতুর্বিধানাং ভূতানাং ত্রিষু লোকেষু মাধবঃ।প্রভবশ্চৈব সর্ব্বেষাং নিধনঞ্চ যুধিষ্ঠির।। ভীষ্মের কথা শুনে,চেদিরাজ শিশুপাল, তাঁর স্বপক্ষের রাজাদের সঙ্গে নিয়ে রূঢ়, কর্কশভাষায় ভীষ্মকে কথা শোনাতে লাগলেন।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১০ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ৩

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৭ : সূর্যশিখা
যুধিষ্ঠির-আয়োজিত রাজসূয়যজ্ঞে কৃষ্ণকে কেন্দ্র করে বিতর্ক ও মতবিরোধের সূচনা হল। এই বিতর্কের মূলে রয়েছেন চেদিরাজ শিশুপাল। যে কোনও বিতর্কের বিষয়বস্তুর পক্ষে ও বিপক্ষের সমর্থক থাকেন। যুক্তিসঙ্গত বক্তব্যের নিরিখে বিজয়ী নির্দ্ধারিত হয়ে থাকে এবং সুবক্তা প্রশংসিত হয়ে থাকেন। একজন আমন্ত্রিত মুখ্য অতিথিকে সম্মাননাপ্রদান সঠিক সিদ্ধান্ত কি না, এর যৌক্তিকতাবিষয়ক এই বিতর্ক। একজন ব্যক্তিত্বের আলোকিত গুণ ও নিন্দিত দোষগুলির সমালোচনায় ঋদ্ধ হল এই তর্কযুদ্ধ। উভয়পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে, সমর্থকদের প্রশংসা ও বিরোধীদের নিন্দাপ্রস্তাবে জড়িয়ে আছে একজন প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বের আলোকিত ও নিন্দিত দিকগুলি আবিষ্কারের উদ্ভাস।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?
কৃষ্ণ পূজনীয় কেন? স্থির হল, মাননীয় কুরুপ্রধান কুরুপাণ্ডবদের পিতামহের নির্দেশে, রাজসূয়যজ্ঞে কৃষ্ণকে সম্মান প্রদর্শন করে অর্চনা করা হবে। ভীষ্ম, কৃষ্ণের সর্বত্রচারী অবিসংবাদিত স্বরূপ বর্ণনা করেছেন। কনিষ্ঠ পাণ্ডবভাই সহদেবের অভিমত— কেশিদানবের হত্যাকারী কৃষ্ণের অর্চনা যিনি সহ্য করতে অক্ষম তাঁকে চূড়ান্ত অবমাননার সম্মুখীন হতে হবে। মনের গভীরে দানববৃত্তির সংহারক যিনি তাঁর স্থান নিঃসন্দেহে বিশিষ্ট এবং অদ্বিতীয়। প্রকারান্তরে তিনিই একজন প্রকৃত আচার্য যিনি শুভবোধ জাগরিত করে, অশুভকে নির্মূল করেন। কৃষ্ণ পিতার মতোই সন্তানসম সকলের শুভকামনায় নিয়োজিতপ্রাণ একজন পূজনীয় ব্যক্তিত্ব। গুরুতুল্য তাঁর ভাবমূর্তি। তিনি বার বার পাণ্ডবদের জীবনপথে সঠিক পথপ্রদর্শকরূপে গুরুর মহিমান্বিত ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। কৃষ্ণসম্বন্ধে সহদেবের অভিমত— মতিমন্তশ্চ যে কেচিদাচার্য্যং পিতরং গুরুম্। অর্চ্চ্যমর্চ্চিতমর্ঘার্হমনুজানন্তু তে নৃপাঃ।। বুদ্ধিমানরা স্বীকার করেন কৃষ্ণ একাধারে আচার্য, পিতা এবং গুরু। কৃষ্ণ পূজনীয় এবং (সজ্জনদের) নিত্য পূজিত, তাই তিনি অর্ঘ্যদানের যোগ্য পাত্র। এই বহুমাত্রিক কৃষ্ণপ্রীতির রঙে রঞ্জিত ভারতীয় জীবন।সহদেবের মতো কোটি কোটি ভরতবংশীয়দের মনোজগতের অধীশ্বর। কৃষ্ণ আজও বহুভারতীয়ের শিক্ষাগুরু, পিতৃতুল্য অভিভাবক এবং জীবনবোধের গুরুপ্রতিম নিয়ন্তা।

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
শিশুপাল কৃষ্ণের কঠোর সমালোচক। তিনি কৃষ্ণবিরোধিতার শেষ আশ্রয়, অস্ত্রধারণেও পিছুপা নন। তিনি অন্যান্য রাজাদের উত্তেজিত করেছেন। চেদিরাজ, রাজসূয়যজ্ঞে বিঘ্ন সৃষ্টি করে, যজ্ঞ পণ্ড করতে উৎসাহী হয়েছেন। একটি অশুভ প্রচেষ্টার প্রয়াস, বৃহত্তর কোন ধ্বংস ডেকে আনে। কৃষ্ণের প্রতি শিশুপালের ব্যক্তিগত আক্রোশ, রাজসূয়যজ্ঞের আয়োজক পাণ্ডবদের বৃহত্তর স্বার্থের (যজ্ঞসম্পাদনের মাধ্যমে সর্বত্র একচ্ছত্র আধিপত্যলাভ) পরিপন্থী হল। বৃহৎ কোনও আয়োজনে ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থ উপেক্ষিত হওয়া আবশ্যক। সেই কারণেই হয়তো প্রাজ্ঞ বিজ্ঞ প্রবীণতম কুরুপ্রধান শিশুপালের কৃষ্ণবিরোধিতা অবজ্ঞা করেছেন। তাঁর আশঙ্কা—অল্পবুদ্ধি শিশুপাল এক ধ্বংসাত্মক মৃত্যুলীলায় মেতে উঠেছেন, যার ফলে তাঁর অনুগামী রাজাদের ভাবি গন্তব্য যমালয়। সর্ব্বান্ সর্ব্বাত্মনা তাত! নেতুকামো যমক্ষয়ম্। বিরোধিতার চরম পরিণতি যদি হত্যা বা মৃত্যু হয় তবে সেটা কোনমতেই কাম্য নয়। কৃষ্ণ অধোক্ষজ। তিনি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতির ঊর্দ্ধে। কিংবা যাঁর অধঃপতন বা বিচ্যুতি নেই। যিনি স্থিতাবস্থায় বিরাজমান। ভীষ্ম শিশুপালের মনোভাবের সদর্থক ব্যাখ্যা করেছেন।ভীষ্মের মতে, কৃষ্ণ শিশুপালের তেজ হরণ করতে ইচ্ছুক হয়েছেন। তাই হয়তো এই সব কিছু ঘটে চলেছে। ভীষ্ম মনে করেছেন, কৃষ্ণ সেই অতিলৌকিক শক্তি। তিনি যাঁকে গ্রহণ করতে ইচ্ছুক হন তখন তাঁদের মতিভ্রম হয় যেমন হয়েছে চেদিপতি শিশুপালের। এক অমোঘ অতিলৌকিক শক্তি যা চিরন্তন ও শাশ্বত এবং সর্বদাই স্থিতিশীল তাঁর অমোঘ নির্দেশে শিশুপালের মতিভ্রম, কৃষ্ণবিরাগ এবং সেই শক্তির প্রতি অনাস্থাপ্রকাশ। এই আস্থা অনাস্থার দোলাচলে দোদুল্যমান ভারতীয়জীবনে ঐশ্বরিক শক্তির প্রতি অবিচলবিশ্বাস স্থিতিশীল রয়েছে এখনও, যার স্থিতিস্থাপকতা রক্ষা করে চলেছেন যুগযুগান্তরে কৃষ্ণপ্রীতির বহমান ধারা।—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।


















