
ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।
স্নিগ্ধ মন্থরনির্ঘোষ সৃষ্টি করতে করতে মহাযশস্বী প্রভু ভরতের রথ দ্রুত অযোধ্যায় এসে পৌঁছল। অযোধ্যায় বিচরণ করছে বিড়াল ও পেঁচারা, মানুষ হোক বা হাতি কোথাও কারও অস্তিত্ব নেই যেন, তমসাবৃতা নিশার তুল্যা কালিমালিপ্ত অপ্রকাশিতা অযোধ্যা নগরী যেন চন্দ্রের প্রিয়া রোহিণীর মতো রাহুগ্রস্ত হয়েছে। এমন দশায় উপনীত হয়েছে বিখ্যাত নগরী। শীর্ণা পাহাড়ী নদী,যার স্বল্প জল উষ্ণ ও সংক্ষুব্ধ, মৎস্য ও জলচর প্রাণীরা যেখানে নিশ্চিহ্নপ্রায়, সেখানে পাখিরা রৌদ্রতাপদগ্ধ ঘর্মাক্ত, অযোধ্যা নগরীর যেন তেমনই অবস্থা।
অযোধ্যা নগরী যেন ঘৃতাহুতির ফলে স্বর্ণাভ উদ্গতা অগ্নিশিখার ধূমাবৃত ম্রিয়মাণ রূপ। মহারণে, যুদ্ধে প্রস্তুত সেনার, সুরক্ষাবলয়বর্ম বিধ্বস্ত হলে যে অবস্থা হয়, কিংবা যে সেনাবাহিনীর হাতি, ঘোড়া, রথধ্বজা ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে তার চিহ্নমাত্র বহন করছে, এমন দশা হয়েছে অযোধ্যার। সেই নগরী যেন ঊর্ধ্বে উত্থিত সফেন, সশব্দ তরঙ্গমালাটি, যেটি বায়ুতাড়িত হয়ে স্তব্ধ, প্রশান্ত হয়েছে।
অযোধ্যা যেন যজ্ঞোপকরণ ও যাজকদের উপস্থিতিরহিতা সেই পরিত্যক্তা নিস্তব্ধা যজ্ঞবেদীটি। গোঠে বৃষ হতে বিচ্ছিন্না গাভীটির যেমন নবতৃণাস্বাদনে অনীহা, কাতরা সে যেমন উৎসুক হয়ে থাকে, অযোধ্যা যেন বিরহিনী পত্নীর ঔৎসুক্য নিয়ে অপেক্ষমানা। সুস্নিগ্ধপ্রভায় উজ্জ্বল, শ্রেষ্ঠ মণিবিহীন মুক্তাহারের মতো নিষ্প্রভা হয়েছে অযোধ্যা নগরী। পুণ্যক্ষয়ের ফলে অন্তরীক্ষ হতে বিচ্যুত, নিস্তেজ, ভূপতিত তারকার মতো অযোধ্যা নগরী যেন, বসন্তসমাগমে প্রমত্তভ্রমরযুক্তা, কুসুমিতা হয়েও সহসা দাবদহদগ্ধা, বনলতার পরিশ্রান্তরূপ ধারণ করেছে। অযোধ্যার বণিকসম্প্রদায় তৎপরতাহীন, সেখানে পণ্যবিপণনকেন্দ্রগুলি শূন্যপ্রায়, মেঘাচ্ছন্ন আকাশে চন্দ্রতারকা অপ্রকাশিত।
অযোধ্যা নগরী যেন ঘৃতাহুতির ফলে স্বর্ণাভ উদ্গতা অগ্নিশিখার ধূমাবৃত ম্রিয়মাণ রূপ। মহারণে, যুদ্ধে প্রস্তুত সেনার, সুরক্ষাবলয়বর্ম বিধ্বস্ত হলে যে অবস্থা হয়, কিংবা যে সেনাবাহিনীর হাতি, ঘোড়া, রথধ্বজা ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে তার চিহ্নমাত্র বহন করছে, এমন দশা হয়েছে অযোধ্যার। সেই নগরী যেন ঊর্ধ্বে উত্থিত সফেন, সশব্দ তরঙ্গমালাটি, যেটি বায়ুতাড়িত হয়ে স্তব্ধ, প্রশান্ত হয়েছে।
অযোধ্যা যেন যজ্ঞোপকরণ ও যাজকদের উপস্থিতিরহিতা সেই পরিত্যক্তা নিস্তব্ধা যজ্ঞবেদীটি। গোঠে বৃষ হতে বিচ্ছিন্না গাভীটির যেমন নবতৃণাস্বাদনে অনীহা, কাতরা সে যেমন উৎসুক হয়ে থাকে, অযোধ্যা যেন বিরহিনী পত্নীর ঔৎসুক্য নিয়ে অপেক্ষমানা। সুস্নিগ্ধপ্রভায় উজ্জ্বল, শ্রেষ্ঠ মণিবিহীন মুক্তাহারের মতো নিষ্প্রভা হয়েছে অযোধ্যা নগরী। পুণ্যক্ষয়ের ফলে অন্তরীক্ষ হতে বিচ্যুত, নিস্তেজ, ভূপতিত তারকার মতো অযোধ্যা নগরী যেন, বসন্তসমাগমে প্রমত্তভ্রমরযুক্তা, কুসুমিতা হয়েও সহসা দাবদহদগ্ধা, বনলতার পরিশ্রান্তরূপ ধারণ করেছে। অযোধ্যার বণিকসম্প্রদায় তৎপরতাহীন, সেখানে পণ্যবিপণনকেন্দ্রগুলি শূন্যপ্রায়, মেঘাচ্ছন্ন আকাশে চন্দ্রতারকা অপ্রকাশিত।
পানান্তে মদ্যপশূন্য, ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ভগ্নসুরাপাত্র এই অবস্থায় অপরিশীলিত বিধ্বস্ত শুঁড়িখানার অবস্থা হয় যেমন, তেমন দশা হয়েছে অযোধ্যার। সেখানে যেন ধনুর্জ্যা যোদ্ধাদের বাণ হতে মুক্ত হয়ে ভূতলে খসে পড়েছে, কিংবা রণনিপুণ অশ্বারোহিবাহিত বড়বাগ্নি যেমন প্রতিপক্ষীয় সৈন্যদের দ্বারা বিনষ্ট হয়ে ভূপতিত হয় তেমনই হীনাবস্থায় উপনীত হয়েছে অযোধ্যা। রথস্থ দাশরথি ভরত সারথিকে বললেন, সংগীত বাদ্যধ্বনিতে মুখরিত পূর্বের সেই অযোধ্যানগরীর মন্দ্র গম্ভীর ধ্বনি আর শোনা যায় না কেন? বারুণীসুরার গন্ধ,মাল্যগন্ধে আমোদিত হয়ে,চতুর্দিকে চন্দন ও অগরুর সুগন্ধ প্রবাহিত হচ্ছে না কেন? রামের অবস্থানকালীন অতীতের অযোধ্যার, উত্তম বাহনের নির্ঘোষ, অশ্বের সুস্নিগ্ধ হ্রেষারব, প্রমত্ত হস্তীর বৃংহন,রথের চক্রধ্বনি, ইদানীং আর শ্রুতিগোচর হচ্ছে না।
রাম গেলেন বনে, সেই থেকে শোকাহত তরুণদের অগরুচন্দনগন্ধদ্রব্যে এবং মূল্যবান নবমালিকাধারণে আর রুচি নেই। বিচিত্র মাল্যসজ্জিত নাগরিকদের আর বাইরে যেতে আসক্তি নেই। রামের শোকাহত অযোধ্যাপুরীতে উৎসবের আবহ আর নেই। ভরতের উপলব্ধি হল, আমার ভ্রাতার সঙ্গে যেন অযোধ্যার সমস্ত ঔজ্জ্বল্য অপসারিত হয়েছে। মেঘাবৃত শুক্লা রাত্রির মতো এই অযোধ্যা আজ শোভাহীনা। সা হি নূনং মম ভ্রাতা পুরস্যাস্য দ্যুতির্গতা। ন হি রাজত্যযোধ্যেয়ং সাসারেবার্জ্জুনী ক্ষপা।। কবে আবার সমাগত মহোৎসব হয়ে,আমার ভাই উপস্থিত হবেন?কবেই বা গ্রীষ্মের মেঘের মতো আবার তিনি অযোধ্যায় আনন্দ সৃষ্টি করবেন? অযোধ্যার রাজপথগুলি তরুণ, সুবেশা, নির্ভীক, দলবদ্ধ মানুষের ভিড়ে সুশোভিত হয়ে ওঠেনি। দুঃখিত ভরত, সিংহহীন গুহাসদৃশ পিত্রালয়ে প্রবেশ করলেন। সম্পূর্ণ অন্তঃপুরটি জনশূন্য যেন সূর্যবিহীন দিবসের মতো নিষ্প্রভ, দেখে, সংযত ভরত, অঝোরে কাঁদতে লাগলেন।
রাম গেলেন বনে, সেই থেকে শোকাহত তরুণদের অগরুচন্দনগন্ধদ্রব্যে এবং মূল্যবান নবমালিকাধারণে আর রুচি নেই। বিচিত্র মাল্যসজ্জিত নাগরিকদের আর বাইরে যেতে আসক্তি নেই। রামের শোকাহত অযোধ্যাপুরীতে উৎসবের আবহ আর নেই। ভরতের উপলব্ধি হল, আমার ভ্রাতার সঙ্গে যেন অযোধ্যার সমস্ত ঔজ্জ্বল্য অপসারিত হয়েছে। মেঘাবৃত শুক্লা রাত্রির মতো এই অযোধ্যা আজ শোভাহীনা। সা হি নূনং মম ভ্রাতা পুরস্যাস্য দ্যুতির্গতা। ন হি রাজত্যযোধ্যেয়ং সাসারেবার্জ্জুনী ক্ষপা।। কবে আবার সমাগত মহোৎসব হয়ে,আমার ভাই উপস্থিত হবেন?কবেই বা গ্রীষ্মের মেঘের মতো আবার তিনি অযোধ্যায় আনন্দ সৃষ্টি করবেন? অযোধ্যার রাজপথগুলি তরুণ, সুবেশা, নির্ভীক, দলবদ্ধ মানুষের ভিড়ে সুশোভিত হয়ে ওঠেনি। দুঃখিত ভরত, সিংহহীন গুহাসদৃশ পিত্রালয়ে প্রবেশ করলেন। সম্পূর্ণ অন্তঃপুরটি জনশূন্য যেন সূর্যবিহীন দিবসের মতো নিষ্প্রভ, দেখে, সংযত ভরত, অঝোরে কাঁদতে লাগলেন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৩: বিশ্বামিত্রের তপশ্চর্যায় বিঘ্নসৃষ্টিকারী দেবরাজ ইন্দ্র ও মেনকার কাহিনি কি আধুনিক যুগের সঙ্গে

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৫: অধিকার নয়, অবস্থানই বলে দেয় জায়গা কার– মালিকের? না দখলদারের?

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৩২: কপোত-জাতক: বন্ধু তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও
দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ভরত জননীগণকে অযোধ্যায় রেখে শোকার্তচিত্তে, গুরুজনদের বললেন,তিনি নন্দীগ্রামে যাবেন। ভরত তাঁদের আমন্ত্রণ জানালেন,সেখানে ভরত রাঘব রামের বিরহযাতনা সহ্য করবেন। শোকার্ত ভরত বললেন, পিতা দশরথ আজ স্বর্গত হয়েছেন, বনবাসী হয়েছেন আমার গুরুপ্রতিম সেই রাম, আমি রাজ্যের (রাজ্যশাসনের) জন্য রামের প্রতীক্ষা করব কারণ মহাযশস্বী রামই প্রকৃত রাজা। গতশ্চাহো দিবং রাজা বনস্থঃ স গুরুর্মম। রামং প্রতীক্ষে রাজ্যায় স হি রাজা মহাযশাঃ।।
পুরোহিত বশিষ্ঠ ও অন্যান্য মন্ত্রীরা সকলে ভরতের সেই সুপ্রস্তাব শুনে স্বীকার করলেন, ভ্রাতার প্রতি বাৎসল্যবশে, ভরত যে হিতকর প্রশংসাযোগ্য কথা বললেন, সেগুলি তাঁকেই মানায়। সর্বদা বন্ধুসঙ্গপ্রত্যাশী, ভ্রাতৃসৌহার্দ্যরক্ষায় আস্থাশীল, ভরত, আর্যগণের অনুসৃত সুপথ অবলম্বন করেছেন। এমন কোন ব্যক্তি আছেন যিনি সেটি অনুমোদন করবেন না? মন্ত্রীদের সেই কাঙ্খিত প্রিয় বাক্য শুনে, ভরত, সারথিকে আদেশ দিলেন, রথো মে যুজ্যতামিতি।
আমার রথ প্রস্তুত কর। জননীদের সম্ভাষণ করে প্রফুল্লমুখে ভরত শত্রুঘ্নসহ রথে আরোহণ করলেন। মন্ত্রী ও পুরোহিত পরিবৃত ভরত ও শত্রুঘ্ন, দ্রুত রথে আরোহণ করে পরমানন্দে যাত্রা করলেন।সম্মুখে পূর্বাভিমুখে বশিষ্ঠপ্রমুখ ব্রাহ্মণগুরুগণ, নন্দীগ্রামের উদ্দেশে চললেন। অনাহূত গজ-অশ্ব-রথসঙ্কুল সৈন্যদল ও পুরবাসিবৃন্দ প্রস্থানরত ভরতের অনুগমন করলেন। রথারোহী ধর্মাত্মা ভ্রাতৃবৎসল ভরত,রামের পাদুকাদুটি মাথায় নিয়ে সত্বর নন্দীগ্রামে রওনা দিলেন। অবিলম্বে নন্দীগ্রামে প্রবেশ করে, রথ হতে অবতরণ করে গুরুজনদের বললেন, আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রাম, এই উত্তম রাজ্যটি ন্যাসরূপে (গচ্ছিতধন) আমায় অর্পণ করেছেন। এই স্বর্ণমণ্ডিত পাদুকাদ্বয় যোগ ও ক্ষেম বহন করবে। অর্থাৎ লক্ষ্যবস্তুর লাভ ও লব্ধবস্তুর রক্ষণ এই দুইটি কাজের দায়ভার বহন করবে। গচ্ছিত ন্যাস সেই পাদুকাদুটি মাথায় নিয়ে, দুঃখাবেগে উত্তপ্ত ভরত, সমস্ত মন্ত্রিমণ্ডলের উদ্দেশে বললেন, আর্য রামের এই পাদুকাযুগল, রামের প্রতিনিধিরূপে গণ্য।মন্ত্রীগণ অবিলম্বে এদের ওপর রাজছত্র ধারণ করুন। গুরু রামের পাদুকাদুটিদ্বারা,রাজ্যে যথার্থ ধর্ম স্থাপিত হবে।
পুরোহিত বশিষ্ঠ ও অন্যান্য মন্ত্রীরা সকলে ভরতের সেই সুপ্রস্তাব শুনে স্বীকার করলেন, ভ্রাতার প্রতি বাৎসল্যবশে, ভরত যে হিতকর প্রশংসাযোগ্য কথা বললেন, সেগুলি তাঁকেই মানায়। সর্বদা বন্ধুসঙ্গপ্রত্যাশী, ভ্রাতৃসৌহার্দ্যরক্ষায় আস্থাশীল, ভরত, আর্যগণের অনুসৃত সুপথ অবলম্বন করেছেন। এমন কোন ব্যক্তি আছেন যিনি সেটি অনুমোদন করবেন না? মন্ত্রীদের সেই কাঙ্খিত প্রিয় বাক্য শুনে, ভরত, সারথিকে আদেশ দিলেন, রথো মে যুজ্যতামিতি।
আমার রথ প্রস্তুত কর। জননীদের সম্ভাষণ করে প্রফুল্লমুখে ভরত শত্রুঘ্নসহ রথে আরোহণ করলেন। মন্ত্রী ও পুরোহিত পরিবৃত ভরত ও শত্রুঘ্ন, দ্রুত রথে আরোহণ করে পরমানন্দে যাত্রা করলেন।সম্মুখে পূর্বাভিমুখে বশিষ্ঠপ্রমুখ ব্রাহ্মণগুরুগণ, নন্দীগ্রামের উদ্দেশে চললেন। অনাহূত গজ-অশ্ব-রথসঙ্কুল সৈন্যদল ও পুরবাসিবৃন্দ প্রস্থানরত ভরতের অনুগমন করলেন। রথারোহী ধর্মাত্মা ভ্রাতৃবৎসল ভরত,রামের পাদুকাদুটি মাথায় নিয়ে সত্বর নন্দীগ্রামে রওনা দিলেন। অবিলম্বে নন্দীগ্রামে প্রবেশ করে, রথ হতে অবতরণ করে গুরুজনদের বললেন, আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রাম, এই উত্তম রাজ্যটি ন্যাসরূপে (গচ্ছিতধন) আমায় অর্পণ করেছেন। এই স্বর্ণমণ্ডিত পাদুকাদ্বয় যোগ ও ক্ষেম বহন করবে। অর্থাৎ লক্ষ্যবস্তুর লাভ ও লব্ধবস্তুর রক্ষণ এই দুইটি কাজের দায়ভার বহন করবে। গচ্ছিত ন্যাস সেই পাদুকাদুটি মাথায় নিয়ে, দুঃখাবেগে উত্তপ্ত ভরত, সমস্ত মন্ত্রিমণ্ডলের উদ্দেশে বললেন, আর্য রামের এই পাদুকাযুগল, রামের প্রতিনিধিরূপে গণ্য।মন্ত্রীগণ অবিলম্বে এদের ওপর রাজছত্র ধারণ করুন। গুরু রামের পাদুকাদুটিদ্বারা,রাজ্যে যথার্থ ধর্ম স্থাপিত হবে।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৩৩: বকজাতক : শঠে শাঠ্যং

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৪: দিগম্বরী দেবী : ঠাকুরবাড়ির সেরা সুন্দরী
ভ্রাতা স্নেহবশত রাজ্যটি আমার কাছে গচ্ছিত রেখেছেন, রামের আগমনকাল পর্যন্ত আমি রাজ্যটি প্রতিপালন করব। ভ্রাত্রা তু ময়ি সন্ন্যাসো নিক্ষিপ্তঃ সৌহৃদাদয়ম্। তমিমং পালয়িষ্যামি রাঘবাগমনং প্রতি।। ভরত ঘোষণা করলেন, পুনরায় রামের পাদুকাদ্বয় তাঁর চরণে পরিয়ে দিয়ে তবেই পাদুকাসহ রামকে দর্শন করবেন। গভীর শ্রদ্ধায় ভরত বললেন, প্রত্যাগত রামকে এই দায়িত্বভার অর্পণ করে, ভরত গুরু রামের সেবক হয়ে গুরুর ভজনা করবেন। রামের গচ্ছিত সুন্দর পাদুকাদ্বয় ও এই অযোধ্যারাজ্য প্রত্যর্পণ করে ভরত পাপমুক্ত হবেন। রাজ্যঞ্চেদমযোধ্যাঞ্চ ধূতপাপো ভবাম্যহম্। জটাবল্কল ধারণ করে, মুনিবেশধারী ভরত, সসৈন্যে নন্দীগ্রামে বাস করতে লাগলেন। ভরত নিজে রাজকার্যবিষয়ক সবকিছু পাদুকাযুগলে নিবেদন করে, পাদুকার ওপরে ছত্র ও চামর ধারণ করলেন। শ্রীমান ভরত পাদুকাদুটির অভিষেক সম্পন্ন করে, তার অধীনস্থ হয়ে রাজ্য শাসন করতে লাগলেন। তিনি রাজকার্যসম্বন্ধীয় বিষয় এবং যা কিছু মহার্ঘ উপহার, পাদুকাযুগলে প্রথমে নিবেদন করে, তারপরে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৭ : পাঠশালা-ক্লাসরুম

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৯: কোটরে প্যাঁচা
রাম মূর্ত আনন্দের প্রতীক। মনের আনন্দ যদি নিঃশেষিত হয় তবে মানুষ মৃতপ্রায় মুমূর্ষুর জীবনে বেঁচে থাকে মাত্র। অযোধ্যা নগরী যেন আনন্দহীন, নৈরাশ্যের অন্ধকারে নিমজ্জিতপ্রাণ। আশা, ভরসার সঙ্গে সম্পৃক্ত মনের স্ফূর্তি, বেঁচে থাকার আনন্দ। নিশাচর পেঁচা, বিড়ালের আবাস হয়ে ওঠে যে পরিত্যক্ত নগরী তেমনই হতাশার অন্ধকার, নৈরাশ্যের গাঢ় প্রলেপে ঢেকে দেয় মানুষের বোধ ও মনন। রাত্রির নিকষ কালো আঁধারে বিচরণকারী পশুর মতোই কালো নঞর্থক চিন্তার আবাস হয়ে ওঠে মন। সেই মন,কোন শরণাপন্নের আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে না। সেখানে শান্তির জল খুঁজে পায় না জীবনসংগ্রামের তাপিত কোন বিক্ষুব্ধ হৃদয়,সেখানে প্রবেশের দ্বার রুদ্ধ,রাহুগ্রস্ত মন নিজেই আশ্রয় খুঁজে বেড়ায় তখন,নিজে কারো আশ্রয় হতে পারে না। যেমন অযোধ্যা নগরী রাজার আশ্রয়ের অভাবে ম্রিয়মাণ, জনকোলাহলহীন, জীবনের অস্তিত্ব হারিয়ে নির্জীব হয়েছে ঠিক তেমন। ধূমাচ্ছন্ন নিষ্প্রভ অগ্নিশিখার ধূমায়িত বিষাদ যেন আনন্দহীন নৈরাশ্যের অন্ধকারে ডুবে থাকা বিষাদাচ্ছন্ন অযোধ্যা, যেখানে মূর্তিমান আনন্দরূপ রামের প্রতীক্ষায় প্রত্যাশার প্রদীপ জ্বলে না। অযোধ্যায় নেই কোন জনতরঙ্গের উত্তাল সংক্ষোভ, আবেগতাড়িত জনতার আনন্দের অভিব্যক্তিহীন নগরী যেন বিষাদপ্রতিমা। মনে আবেগোচ্ছ্বাসের প্রকাশ জীবনধর্মিতার পরিচয়। যাজকদের উপস্থিতি ও মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে প্রাণময় হয়ে ওঠে যজ্ঞবেদী, তেমনই সচল জনজীবনের প্রাণস্পন্দনে, জীবনযজ্ঞের বেদীটি আনন্দমুখর হয়ে ওঠে। পণ্যবিপণনহীন অযোধ্যা প্রেরণাদাতার অভাবে কর্মতৎপরতা হারিয়েছে। কর্মযজ্ঞের অনুপ্রেরণা হল উৎসাহশক্তি, যার মূলে রয়েছে সদর্থকতা। রমতে ইতি রামঃ। রাম স্বয়ং আনন্দের প্রতিমূর্তি, তিনি আবার রময়তি ইতি রামঃ সকলকে আনন্দ দেন যিনি তিনিই রাম।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৮: সকলের উপর মা সারদার ছিল সমান অধিকার

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭০: বিচারক
আনন্দের উৎস নির্বাসিত হলে উৎসাহহীনতা,নিস্পৃহতা গ্রাস করে জীবনকে। আকাশের আশ্রয়চ্যুত নক্ষত্রটির মতো গতপ্রাণ অযোধ্যা নগরী উৎসাহের আধার, মনের আনন্দ, হারিয়ে বিরহিণীর বিচ্ছেদবেদনায় আক্রান্ত হয়েছে। প্রিয় আনন্দময় রামের অপেক্ষায় দীর্ঘ দিনযাপনের গ্লানিময়তায় আচ্ছন্না অযোধ্যা যেন মদ্যপদের পরিত্যক্ত বিধ্বস্ত পানশালাটি।মদ্যপান নৈরাশ্যের শেষ আশ্রয়। ক্রমে সেটিও পরিত্যক্ত হয়, নৈরাশ্যবাদের কাছে সুরার সংজ্ঞাহীনতাও, স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে দিতে পারে না। যেমন নৈরাশ্যের কাছে হার মানে জীবনসংগ্রামের যত উদ্যম, সক্রিয় সদর্থক মনোভাব, তেমনই যুদ্ধে হতোদ্যম সৈনিকের দশা হয়েছে অযোধ্যার। ভরত যেন সদর্থক চিন্তার ধ্বজাধারী মনোবিদ সেই চিকিৎসক যিনি সাধারণের মনের আনন্দকে ফিরিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর।তাই তিনি অকপটে বলতে পারেন, কদা নু খলু মে ভ্রাতা মহোৎসব ইবাগতঃ। জনয়িষ্যত্যযোধ্যায়াং গ্রীষ্ম ইবাম্বুদঃ নিদাঘতাপদগ্ধ তৃষাতুর মনে কবে রাম জলদ মেঘ হয়ে দেখা দেবেন?কবে ফিরে আসবেন মহোৎসবের প্রতীক, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রাম? সহমর্মিতা, সহানুভূতি যে আনন্দের সঙ্গে সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ।
ভরত আনন্দরূপ রামের প্রতিনিধি হয়েই থাকতে ইচ্ছুক। কারণ সকলে রাম হতে পারেন না। আনন্দের মূর্ত বিগ্রহে আছে প্রাণের আরাম, মনের তৃপ্তি। ভরত সেই পুরোহিত, ভক্তের অর্ঘ্যের ডালা সাজিয়ে নিবেদনের আনন্দেই তাঁর আত্মতৃপ্তি। বনবাসী রামের অনুপস্থিতিতে তিনি রামের পাদুকাদুটিতেই নিবেদনের অর্ঘ্য সাজিয়ে দেন। দেবমন্দিরের গচ্ছিত ধন, রাজ্যটি, পরম যত্নে রক্ষা করেন যদিও তিনি সেই ধানাধিকার অস্বীকার করেন অক্লেশে। দেবতার প্রতীক, তাঁর বাহনটিকে যেমন মানুষ সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে দেখেন, রক্ষা করেন, ভরত রামের গচ্ছিত পাদুকাদুটিকে তেমনই ভক্তিভরে রক্ষা করবেন ভরত, এটাই রাম ও রামের রাজ্যের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতাপালনের অঙ্গীকার।
রামায়ণের আছে লৌকিক জীবনের আধারে দার্শনিক চিন্তার আনাগোনা।আজও রাম আনন্দের মূর্তবিগ্রহ। অথচ কত আপন জ্যেষ্ঠ,যাঁর নির্বাসনজনিত উপস্থিতির অভাবে, ভরতের তথা অযোধ্যাবাসীর শোক যেন আপামর জনগোষ্ঠীর মন স্পর্শ করে। জাতীয়জীবনের হর্ষ ও বিষাদের উৎস রামায়ণ শুধু মহাকাব্য নয়, দৈনন্দিন ঘরোয়া জীবনের হাসি কান্নার দিনলিপি হয়ে ওঠে।—চলবে।
ভরত আনন্দরূপ রামের প্রতিনিধি হয়েই থাকতে ইচ্ছুক। কারণ সকলে রাম হতে পারেন না। আনন্দের মূর্ত বিগ্রহে আছে প্রাণের আরাম, মনের তৃপ্তি। ভরত সেই পুরোহিত, ভক্তের অর্ঘ্যের ডালা সাজিয়ে নিবেদনের আনন্দেই তাঁর আত্মতৃপ্তি। বনবাসী রামের অনুপস্থিতিতে তিনি রামের পাদুকাদুটিতেই নিবেদনের অর্ঘ্য সাজিয়ে দেন। দেবমন্দিরের গচ্ছিত ধন, রাজ্যটি, পরম যত্নে রক্ষা করেন যদিও তিনি সেই ধানাধিকার অস্বীকার করেন অক্লেশে। দেবতার প্রতীক, তাঁর বাহনটিকে যেমন মানুষ সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে দেখেন, রক্ষা করেন, ভরত রামের গচ্ছিত পাদুকাদুটিকে তেমনই ভক্তিভরে রক্ষা করবেন ভরত, এটাই রাম ও রামের রাজ্যের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতাপালনের অঙ্গীকার।
রামায়ণের আছে লৌকিক জীবনের আধারে দার্শনিক চিন্তার আনাগোনা।আজও রাম আনন্দের মূর্তবিগ্রহ। অথচ কত আপন জ্যেষ্ঠ,যাঁর নির্বাসনজনিত উপস্থিতির অভাবে, ভরতের তথা অযোধ্যাবাসীর শোক যেন আপামর জনগোষ্ঠীর মন স্পর্শ করে। জাতীয়জীবনের হর্ষ ও বিষাদের উৎস রামায়ণ শুধু মহাকাব্য নয়, দৈনন্দিন ঘরোয়া জীবনের হাসি কান্নার দিনলিপি হয়ে ওঠে।—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।


















