
মঙ্গল ওঝা কালাদেওর থানে সন্ধ্যাকালীন পূজা দিতে যাওয়ার কথা বলে উঠে পড়েছিল। স্পষ্টই বুঝিয়ে দেওয়া যে, আর সে উল্লাসকে সময় দিতে রাজি নয়।
উল্লাসও উঠে পড়ল। এভাবে সোজাসুজি কোনও খবরাখবর যে সে আদায় করতে পারবে, এমন আশা তার ছিল না। দেখল, সে যা ভেবেছিল, সেটাই ঠিক। মঙ্গল কালাদেও সম্পর্কে যদি কিছু জানেও, তাকে বলবে না। তাছাড়া কালাদেওকে অতর্কিতে দেখেছে কি-না জানতে চাওয়ায়, মঙ্গল যেভাবে রেগে আগুন হয়ে উঠল, তাতে বোঝা যাচ্ছে, স্থানীয় লোকজন কালাদেওকে দেখতে পাক, তা সে চায় না। এর পিছনে তার স্বার্থ কী, তা যদিও বুঝতে পারল না উল্লাস, তবে কিছু-যে একটা গপ্পো আছে, তা বোঝাই যায়।
মঙ্গল উঠে ঘরের ভিতর চলে গিয়েছিল, সম্ভবত থানে যাওয়ার উপযুক্ত পোষাকআশাক করে বেরোবে বলে। ভেক না ধরলে তো ভিক্ষা মেলে না, ফলে ও-টুকু করতেই হবে। তবে সন্ধ্যের দিকে বিশেষ দিন ছাড়া বেশিক্ষণ পূজাপাঠ হয় না। ওই থালায় কিছু ভোজ্যবস্তু দিয়ে দু-একটা ফুল ছড়িয়ে ধূপ-দীপ দেখানো। তারপরেই চলে আসতে হয়, পিছনে একবারও না তাকিয়ে। তাদের বিশ্বাস, কালাদেওর থানে পূজা দিয়ে ফিরে আসার সময় পিছু ফিরে তাকালেই কালাদেও রুষ্ট হন। পাদ্য-অর্ঘ্য যা নিবেদন করা হয়, কালাদেও প্রসন্নমনে গ্রহণ করেন। কিন্তু যদি কেউ সেই সময় তাঁকে দেখে ফেলে, তাহলে সে আর জীবিত ফিরতে পারে না। তিন দিনের ভিতর অপঘাতে মৃত্যু হবেই হবে। বেশ কয়েকবার এমন না-কি হয়েছিল।
তবে উল্লাস নিজের জীবনে তেমন কোনও ঘটনা ঘটতে দেখেনি। সে-জন্যই তার মনে একটা খটকা লেগেই আছে। কালাদেও নিবেদিত খাবার গ্রহণ করতে আসেন, এটি কতটা সত্য আর কতটাই বা মিথ্যে রটনা, তা নিয়ে তার সংশয় চিরদিনই। এমনকি বাৎসরিক পূজার দিন যে-পাঁঠাকে উৎসর্গ করা হয়, পরে এসে দেখা যায়, পাঁঠাটি অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে, সেটিও যে কালাদেও গ্রহণ করেন, সে-ব্যাপারে সে সন্দিহান। কিন্তু কয়েকটি কারণে সে জনসমক্ষে এ-ব্যাপারে কোন প্রশ্ন তোলেনি। এক, তার মনে হওয়াটা সকলের মনে হওয়া নয় বলেই সে একঘরে হয়ে যাবে। এ লড়াই জনগণের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস-সংস্কারের সঙ্গে লড়াই। একা লড়তে গেলে পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। স্কুলে থাকতে যদিও রামমোহন, বিদ্যাসাগরের মানুষের চিরপ্রচলিত বিশ্বাস-সংস্কারের বিরুদ্ধে প্রায় একক লড়াইয়ের কথা সে পড়েছে, কিন্তু নিজের বেলায় সে মনে করে, তার অত সাহস নেই।
এখানে তো কেবল মঙ্গল ওঝা নিজে নয়, গোটা গ্রামের মানুষ, রাজনৈতিক দল—এরাও জড়িয়ে। নিজের প্রাণ খোয়ান ছাড়া আর কিছু হবে না, তা সে জানে। রাজনৈতিক দলগুলিও যে চায়, এই কালাদেও-বিশ্বাসের লেজ ধরে ওদের জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করতে, ভোট এলেই তা ভালো বোঝা যায়। ভোট এলে যারা না-চাইতেই জোড়া পাঁঠা উৎসর্গ করে, সেই-সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলির কখনই চাইবে না, কালাদেও-মিথ যে মিথ্যা, তা প্রমাণিত হোক। তাহলে এই বিশ্বাসের জিগির তুলে নিজেদের যে-ভোটব্যাংক প্রতি ইলেকশনের আগে অটুট রাখে তারা, তা আর পারবে না। এই রাজনৈতিক-সিস্টেমের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস সে অর্জন করতে পারেনি বলেই তার সন্দেহের কথা সে প্রকাশ্যে বলে না কখনও।
উল্লাসও উঠে পড়ল। এভাবে সোজাসুজি কোনও খবরাখবর যে সে আদায় করতে পারবে, এমন আশা তার ছিল না। দেখল, সে যা ভেবেছিল, সেটাই ঠিক। মঙ্গল কালাদেও সম্পর্কে যদি কিছু জানেও, তাকে বলবে না। তাছাড়া কালাদেওকে অতর্কিতে দেখেছে কি-না জানতে চাওয়ায়, মঙ্গল যেভাবে রেগে আগুন হয়ে উঠল, তাতে বোঝা যাচ্ছে, স্থানীয় লোকজন কালাদেওকে দেখতে পাক, তা সে চায় না। এর পিছনে তার স্বার্থ কী, তা যদিও বুঝতে পারল না উল্লাস, তবে কিছু-যে একটা গপ্পো আছে, তা বোঝাই যায়।
মঙ্গল উঠে ঘরের ভিতর চলে গিয়েছিল, সম্ভবত থানে যাওয়ার উপযুক্ত পোষাকআশাক করে বেরোবে বলে। ভেক না ধরলে তো ভিক্ষা মেলে না, ফলে ও-টুকু করতেই হবে। তবে সন্ধ্যের দিকে বিশেষ দিন ছাড়া বেশিক্ষণ পূজাপাঠ হয় না। ওই থালায় কিছু ভোজ্যবস্তু দিয়ে দু-একটা ফুল ছড়িয়ে ধূপ-দীপ দেখানো। তারপরেই চলে আসতে হয়, পিছনে একবারও না তাকিয়ে। তাদের বিশ্বাস, কালাদেওর থানে পূজা দিয়ে ফিরে আসার সময় পিছু ফিরে তাকালেই কালাদেও রুষ্ট হন। পাদ্য-অর্ঘ্য যা নিবেদন করা হয়, কালাদেও প্রসন্নমনে গ্রহণ করেন। কিন্তু যদি কেউ সেই সময় তাঁকে দেখে ফেলে, তাহলে সে আর জীবিত ফিরতে পারে না। তিন দিনের ভিতর অপঘাতে মৃত্যু হবেই হবে। বেশ কয়েকবার এমন না-কি হয়েছিল।
তবে উল্লাস নিজের জীবনে তেমন কোনও ঘটনা ঘটতে দেখেনি। সে-জন্যই তার মনে একটা খটকা লেগেই আছে। কালাদেও নিবেদিত খাবার গ্রহণ করতে আসেন, এটি কতটা সত্য আর কতটাই বা মিথ্যে রটনা, তা নিয়ে তার সংশয় চিরদিনই। এমনকি বাৎসরিক পূজার দিন যে-পাঁঠাকে উৎসর্গ করা হয়, পরে এসে দেখা যায়, পাঁঠাটি অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে, সেটিও যে কালাদেও গ্রহণ করেন, সে-ব্যাপারে সে সন্দিহান। কিন্তু কয়েকটি কারণে সে জনসমক্ষে এ-ব্যাপারে কোন প্রশ্ন তোলেনি। এক, তার মনে হওয়াটা সকলের মনে হওয়া নয় বলেই সে একঘরে হয়ে যাবে। এ লড়াই জনগণের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস-সংস্কারের সঙ্গে লড়াই। একা লড়তে গেলে পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। স্কুলে থাকতে যদিও রামমোহন, বিদ্যাসাগরের মানুষের চিরপ্রচলিত বিশ্বাস-সংস্কারের বিরুদ্ধে প্রায় একক লড়াইয়ের কথা সে পড়েছে, কিন্তু নিজের বেলায় সে মনে করে, তার অত সাহস নেই।
এখানে তো কেবল মঙ্গল ওঝা নিজে নয়, গোটা গ্রামের মানুষ, রাজনৈতিক দল—এরাও জড়িয়ে। নিজের প্রাণ খোয়ান ছাড়া আর কিছু হবে না, তা সে জানে। রাজনৈতিক দলগুলিও যে চায়, এই কালাদেও-বিশ্বাসের লেজ ধরে ওদের জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করতে, ভোট এলেই তা ভালো বোঝা যায়। ভোট এলে যারা না-চাইতেই জোড়া পাঁঠা উৎসর্গ করে, সেই-সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলির কখনই চাইবে না, কালাদেও-মিথ যে মিথ্যা, তা প্রমাণিত হোক। তাহলে এই বিশ্বাসের জিগির তুলে নিজেদের যে-ভোটব্যাংক প্রতি ইলেকশনের আগে অটুট রাখে তারা, তা আর পারবে না। এই রাজনৈতিক-সিস্টেমের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস সে অর্জন করতে পারেনি বলেই তার সন্দেহের কথা সে প্রকাশ্যে বলে না কখনও।
সেইসঙ্গেই আর একটি কারণেও সে আপাত প্রতিবাদহীন। শহরের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে অনেক দূরে অবস্থিত তার এই গ্রাম, আশেপাশের আরও কয়েকটি গ্রামের মানুষদের একান্ত বিশ্বাসের পাত্র হলেন কালাদেও। রোগ-অসুখ-শোক-তাপে একমাত্র সান্ত্বনা, মানুষের মানসিক নিরাময় কিংবা বরাভয়ের একমাত্র আশ্রয় হলেন তিনি। তাঁকে মিথ্যা প্রমাণ করলে তার নিজের হয়তো মানসিক শান্তি আসবে, কিন্তু কয়েক হাজার মানুষ তাদের একমাত্র সান্ত্বনার, নির্ভরতার, শুশ্রূষার জায়গাটিও হারাবে। এখন তাও শোকে-তাপে কালাদেওর থানে ফুল-বাতাসা চড়িয়েও মানসিক শান্তি পায় যে, কালাদেও তুষ্ট হয়ে অভীষ্ট পূরণ করবেন।
আদতে পূরণ হোক-বা-না-হোক, কালাদেও আছেন, এ-টুকুই অনেকখানি ভরসার কথা। কালাদেওকে মিথ্যে প্রমাণ করলে সেই মানুষগুলির আর কোথাও দাঁড়াবার জায়গা থাকবে না। নিজের সুখের জন্য এতগুলি মানুষের নিরাময়ের পাত্র যিনি, সেই কালাদেওকে নিজের থেকে মিথ্যে প্রমাণ করতে পারবে না সে। তবে, কলকাতা থেকে আসা পুলিশের অফিসার যদি সেই কাজটি করতে পারেন, তাহলে তাতে তার আপত্তি নেই। সেই জন্যই সে রাজি হয়েছে সাহায্য করতে। যদিও কালাদেও সত্যি আছেন কি-না সে জানে না। নেই বলে পুরোপুরি বিশ্বাসও সে করে না। তবে সে চায়, যা সত্য, তা দিনের আলোয় বেরিয়ে আসুক। সে আসলে সত্যের সঙ্গে আছে, কালাদেও কিংবা কলকাতার গোয়েন্দাবাবুর সঙ্গে নেই।
“এখন বসে রইলি যে বট্যে? যাস্নি ক্যানে?”
মঙ্গল ওঝার বিরক্ত কন্ঠ শুনে উল্লাস মুখ তুলে দেখল, মঙ্গল তার দিকে বিরক্ত চোখে তাকিয়ে আছে। ঘরের পোশাক ছেড়ে, লাল ফতুয়া আর হলুদ ধুতি পরে সে এখন কালাদেওর থানে যাওয়ার জন্য রেডি। কাঁধে একখানা কাপড়ের ঝোলা।
মঙ্গল বিরক্তির সুরে বলল, “তুকে না যেতে বলেছিলাম। ইখনো যাস-নি ক্যানো?”
অপ্রস্তুতের ভঙ্গী করে বলে উল্লাস, “ভাবছিলাম ওঝা। খেয়াল ছিল না। এই যাই!”
“কী ভাবছিলি ?”
“আমাদের মতো মানুষের কি-আর একটা ভাবনা ওঝা? ব্যবসাপাতির অবস্থা ভালো নয়। পিশাচপাহাড় আর কতটুকুই বা জায়গা? কলকাতায় যদি যেতে পারতাম, তাহলে অনেক বেশি কামকাজ পেতাম। ইখানে তো আর চলছে না!”
“কালাদেওকে ডাক। ‘ইস্পেশাল’ পূজা চড়া। দেখবি, তোর সব চিন্তাই দূর হয়ে গেছে।”
উল্লাস উঠে পড়ে। বলে, “সেটাই তো রাখি ওঝা। আমাদের আর কে-ই বা আছে কালাদেও ছাড়া?” বলে আর দাঁড়ায় না। ব্যস্তসমস্ত ভাবে বলে, “চলি ওঝা। কথায়-কথায় অনেক দেরি হয়ে গেল!” বলে মঙ্গলের কোন প্রতিক্রিয়ার তোয়াক্কা না-করে হনহন করে এগিয়ে গেল।
আদতে পূরণ হোক-বা-না-হোক, কালাদেও আছেন, এ-টুকুই অনেকখানি ভরসার কথা। কালাদেওকে মিথ্যে প্রমাণ করলে সেই মানুষগুলির আর কোথাও দাঁড়াবার জায়গা থাকবে না। নিজের সুখের জন্য এতগুলি মানুষের নিরাময়ের পাত্র যিনি, সেই কালাদেওকে নিজের থেকে মিথ্যে প্রমাণ করতে পারবে না সে। তবে, কলকাতা থেকে আসা পুলিশের অফিসার যদি সেই কাজটি করতে পারেন, তাহলে তাতে তার আপত্তি নেই। সেই জন্যই সে রাজি হয়েছে সাহায্য করতে। যদিও কালাদেও সত্যি আছেন কি-না সে জানে না। নেই বলে পুরোপুরি বিশ্বাসও সে করে না। তবে সে চায়, যা সত্য, তা দিনের আলোয় বেরিয়ে আসুক। সে আসলে সত্যের সঙ্গে আছে, কালাদেও কিংবা কলকাতার গোয়েন্দাবাবুর সঙ্গে নেই।
“এখন বসে রইলি যে বট্যে? যাস্নি ক্যানে?”
মঙ্গল ওঝার বিরক্ত কন্ঠ শুনে উল্লাস মুখ তুলে দেখল, মঙ্গল তার দিকে বিরক্ত চোখে তাকিয়ে আছে। ঘরের পোশাক ছেড়ে, লাল ফতুয়া আর হলুদ ধুতি পরে সে এখন কালাদেওর থানে যাওয়ার জন্য রেডি। কাঁধে একখানা কাপড়ের ঝোলা।
মঙ্গল বিরক্তির সুরে বলল, “তুকে না যেতে বলেছিলাম। ইখনো যাস-নি ক্যানো?”
অপ্রস্তুতের ভঙ্গী করে বলে উল্লাস, “ভাবছিলাম ওঝা। খেয়াল ছিল না। এই যাই!”
“কী ভাবছিলি ?”
“আমাদের মতো মানুষের কি-আর একটা ভাবনা ওঝা? ব্যবসাপাতির অবস্থা ভালো নয়। পিশাচপাহাড় আর কতটুকুই বা জায়গা? কলকাতায় যদি যেতে পারতাম, তাহলে অনেক বেশি কামকাজ পেতাম। ইখানে তো আর চলছে না!”
“কালাদেওকে ডাক। ‘ইস্পেশাল’ পূজা চড়া। দেখবি, তোর সব চিন্তাই দূর হয়ে গেছে।”
উল্লাস উঠে পড়ে। বলে, “সেটাই তো রাখি ওঝা। আমাদের আর কে-ই বা আছে কালাদেও ছাড়া?” বলে আর দাঁড়ায় না। ব্যস্তসমস্ত ভাবে বলে, “চলি ওঝা। কথায়-কথায় অনেক দেরি হয়ে গেল!” বলে মঙ্গলের কোন প্রতিক্রিয়ার তোয়াক্কা না-করে হনহন করে এগিয়ে গেল।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৩: এ কে? এ কে গো?

দশভুজা : আমার দুর্গা—বিজ্ঞানী রাজেশ্বরী চট্টোপাধ্যায়

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩২: কবিকন্যা মীরার স্বামী রবীন্দ্রনাথকে ভর্ৎসনা করেছিলেন

অন্য পূজা: ভি বালসারা আমাকে প্রথম হিন্দুস্থান রেকর্ডসে নিয়ে গিয়েছিলেন : সরোজ বড়ুয়া
মঙ্গল তাকিয়ে ছিল উল্লাসের দিকে। সে চোখের বা’র হলে, নিজেও নেমে এল দাওয়া থেকে। দরজায় তালা লাগাল এবং হাঁটা দিল কালাদেওর থানের দিকে। উল্লাস যা থানা গেড়ে বসেছিল, তাতে আজ সময়মতো থানে পৌঁছতে পারবে কি-না সন্দেহ। তবে এখন আপদ বিদেয় হয়েছে অবশেষে, এটাই আশার কথা।
মঙ্গল যদি চোখ-কান খোলা রাখত, তাহলে টের পেত যে আপদ বিদেয় হয়নি। আসলে সাময়িকভাবে বিদেয় হওয়ার ভান করছে। উল্লাস বাস্তবিকই বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়ে আসলে একটা ঝোপেঝাড়ের পিছনে লুকিয়ে বসেছিল। সামনের রাস্তাটা দিয়েই মঙ্গল ওঝা যাবে। রাস্তার দুপাশের ঝোপঝাড়-জঙ্গলের মাঝে লুকিয়ে তাকে যতটাসম্ভব অনুসরণ করাই উল্লাসের উদ্দেশ্য। যদিও সে জানে না যে, কেন মঙ্গলকে অনুসরণ করছে। কলকাতার পুলিশবাবু তাকে বলেননি যে, মঙ্গল ওঝাকে অনুসরণ করো। কিন্তু তারপরেও সে-যে অনুসরণ করছে, তা আসলে নিছক ব্যক্তিগত কৌতূহল।
তাছাড়া কলকাতার পুলিশবাবু তো তাকে বলেছিলেন, যা-কিছু সন্দেহজনক বলে মনে হবে, সে-সমস্তকিছুর উপরেই নজর রাখতে। মঙ্গল ওঝার হাবভাব এই-মুহূর্তে সন্দেহজন বলে মনে হচ্ছে বলেই সে চটজলদি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে যে, মঙ্গল ওঝার কার্যকলাপ সম্পর্কে গোপনে তত্ত্বতালাশ করে সে একখানা রিপোর্ট দেবে পুলিশবাবুকে। সে-কারণেই তার এত রিস্ক নেওয়া। মঙ্গল মোটেও মানুষ ভালো নয়। কালাদেওর পূজারী হয়েছে তাতে কী? এককালে চুরি-ডাকাতির অভিযোগে সে তো জেলে গিয়েছিল। তবে হালে ছাড়া পেয়ে সাধু বনে গেছে। যদিও উল্লাসের বিশ্বাস, এ-ভাবে কেউ সাধু হতে পারে না। সাধু হওয়ার জন্য আগে মনকে প্রস্তুত করতে হয়, শান্ত করতে হয়। মঙ্গল ওঝার আর যাই হোক-না-কেন, মন প্রশান্ত নয়।
মঙ্গল যদি চোখ-কান খোলা রাখত, তাহলে টের পেত যে আপদ বিদেয় হয়নি। আসলে সাময়িকভাবে বিদেয় হওয়ার ভান করছে। উল্লাস বাস্তবিকই বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়ে আসলে একটা ঝোপেঝাড়ের পিছনে লুকিয়ে বসেছিল। সামনের রাস্তাটা দিয়েই মঙ্গল ওঝা যাবে। রাস্তার দুপাশের ঝোপঝাড়-জঙ্গলের মাঝে লুকিয়ে তাকে যতটাসম্ভব অনুসরণ করাই উল্লাসের উদ্দেশ্য। যদিও সে জানে না যে, কেন মঙ্গলকে অনুসরণ করছে। কলকাতার পুলিশবাবু তাকে বলেননি যে, মঙ্গল ওঝাকে অনুসরণ করো। কিন্তু তারপরেও সে-যে অনুসরণ করছে, তা আসলে নিছক ব্যক্তিগত কৌতূহল।
তাছাড়া কলকাতার পুলিশবাবু তো তাকে বলেছিলেন, যা-কিছু সন্দেহজনক বলে মনে হবে, সে-সমস্তকিছুর উপরেই নজর রাখতে। মঙ্গল ওঝার হাবভাব এই-মুহূর্তে সন্দেহজন বলে মনে হচ্ছে বলেই সে চটজলদি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে যে, মঙ্গল ওঝার কার্যকলাপ সম্পর্কে গোপনে তত্ত্বতালাশ করে সে একখানা রিপোর্ট দেবে পুলিশবাবুকে। সে-কারণেই তার এত রিস্ক নেওয়া। মঙ্গল মোটেও মানুষ ভালো নয়। কালাদেওর পূজারী হয়েছে তাতে কী? এককালে চুরি-ডাকাতির অভিযোগে সে তো জেলে গিয়েছিল। তবে হালে ছাড়া পেয়ে সাধু বনে গেছে। যদিও উল্লাসের বিশ্বাস, এ-ভাবে কেউ সাধু হতে পারে না। সাধু হওয়ার জন্য আগে মনকে প্রস্তুত করতে হয়, শান্ত করতে হয়। মঙ্গল ওঝার আর যাই হোক-না-কেন, মন প্রশান্ত নয়।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৮: ছোট বাবুইবাটান

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১১ : অরিন্দম কহিলা বিষাদে
মঙ্গল কালাদেওর থানে যাওয়ার চেনা পথ ধরেই যাচ্ছিল। তার যাওয়ার মধ্যে কোন তাড়া নেই। মাঝেমধ্যে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে নিচ্ছিল সে। জঙ্গলে যারা পথে চলে তাদের দু’দিকে খেয়াল রেখে চলতে হয়, বিশেষ করে নেই-নেই করে এ-সব জঙ্গলে যেহেতু বুনো শূকর, হাতি ইত্যাদির অভাব নেই। যদিও মঙ্গলকে দেখে মনে হচ্ছিল না যে, কোন টেনশন বা ভয় তার মধ্যে কাজ করছে। কষ্ট হচ্ছিল উল্লাসের। মঙ্গলের পিছু নিয়ে খানিকটা তফাতে থেকে সে তাকে অনুসরণ করছিল। কিন্তু কথায় বলে না যে, অনভ্যাসের ফোঁটা কপালে চড়চড় করে? উল্লাসের এখন সেই দশা। এভাবে ঝুঁকে নীচু হয়ে রাস্তার পাশের ঝোপঝাড়ের মধ্যে আত্মগোপন করে মঙ্গলকে অনুসরণ করাটা মোটেও সহজ কাজ নয়। মাঝেমধ্যেই তার মনে হচ্ছিল ধরা না পড়ে যায়।
কিন্তু নাহ্, ধরা পড়ল না সে। বেঁচে গেল এ-যাত্রা। দূর থেকে পিশাচপাহাড়ের টিলা দেখা যেতেই সে দাঁড়িয়ে পড়ল। টিলাটি বেশ বড়। তার একদিকের বাহু প্রসারিত হয়ে এখানে এই রাস্তার ধার পর্যন্ত চলে এসেছে। স্থানীয় মানুষ যেহেতু মনে করে যে, গোটা টিলাটিই কালাদেওর থান, সেজন্য টিলাপাহাড়ে যেখানে-সেখানে পা রাখা বারণ। কেবলমাত্র থানে ওঠার জন্য যে পাথর কেটে বানানো আদ্যিকালের সিঁড়ি আছে, তাতে পা-দেওয়াটা দোষের নয়।
একটা ব্যাপারে আফসোস হল উল্লাসের। এতদূর থেকে মঙ্গল কী করছে থানে, তা বোঝা যাচ্ছিল না। কাছে যে যাবে তার উপায় নেই এখন। একটু আগে নিজের বাড়ির দাওয়ায় তাকে বসে থাকতে দেখেছে মঙ্গল। চলে যেতেও প্রায় হুকুমই দিয়ছে। নিদান দেওয়া বাকি। এখন সে যদি কথা-না-শুনে কালাদেওর থানে গিয়েও পৌঁছয়, তাহলে মঙ্গল রাগে একেবারে ফেটে পড়বে। অথচ এই সময় তার যদি একটা শক্তিশালী দূরবীন থাকত, তাহলে সে দূর থেকেই এখন মঙ্গল ওঝাকে অনুসরণ করতে পারতো। কিন্তু তা না-থাকায় উল্লাসকে এখন এ-ভাবেই অনুসরণ করতে হচ্ছে।
কিন্তু নাহ্, ধরা পড়ল না সে। বেঁচে গেল এ-যাত্রা। দূর থেকে পিশাচপাহাড়ের টিলা দেখা যেতেই সে দাঁড়িয়ে পড়ল। টিলাটি বেশ বড়। তার একদিকের বাহু প্রসারিত হয়ে এখানে এই রাস্তার ধার পর্যন্ত চলে এসেছে। স্থানীয় মানুষ যেহেতু মনে করে যে, গোটা টিলাটিই কালাদেওর থান, সেজন্য টিলাপাহাড়ে যেখানে-সেখানে পা রাখা বারণ। কেবলমাত্র থানে ওঠার জন্য যে পাথর কেটে বানানো আদ্যিকালের সিঁড়ি আছে, তাতে পা-দেওয়াটা দোষের নয়।
একটা ব্যাপারে আফসোস হল উল্লাসের। এতদূর থেকে মঙ্গল কী করছে থানে, তা বোঝা যাচ্ছিল না। কাছে যে যাবে তার উপায় নেই এখন। একটু আগে নিজের বাড়ির দাওয়ায় তাকে বসে থাকতে দেখেছে মঙ্গল। চলে যেতেও প্রায় হুকুমই দিয়ছে। নিদান দেওয়া বাকি। এখন সে যদি কথা-না-শুনে কালাদেওর থানে গিয়েও পৌঁছয়, তাহলে মঙ্গল রাগে একেবারে ফেটে পড়বে। অথচ এই সময় তার যদি একটা শক্তিশালী দূরবীন থাকত, তাহলে সে দূর থেকেই এখন মঙ্গল ওঝাকে অনুসরণ করতে পারতো। কিন্তু তা না-থাকায় উল্লাসকে এখন এ-ভাবেই অনুসরণ করতে হচ্ছে।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯০: শত্রুকে হারাতে সব সময় অস্ত্র নয়, ছলনারও আশ্রয় নিতে হয়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩২: লৌকিকও অলৌকিকের টানাপোড়েনের বিনির্মাণ—ঋষিকবির মহাকাব্য রামায়ণ
সে ভেবে পাচ্ছিল না, তা এখন কী-করা উচিত! মঙ্গল যেহেতু সারারাস্তা খুব স্বাভাবিকভাবেই মন্দিরের দিকে গিয়েছে, অতএব তাকে সন্দেহ করাটা কি ঠিক হবে? তার হয়তো এখন ফিরে যাওয়াই উচিত। আস্তে-আস্তে সন্ধ্যা নামছে। পাখিদের কলকাকলিতে স্থানটি ভরে উঠছে। এখন না-ফিরলে অন্ধকারে সে খুব মুশকিলে পড়ে যাবে। অনেক দোনামোনার পর সে ঠিক করল, মঙ্গল যখন ফিরবে, তখন ফেরার সময়ও তার পিছু-পিছু গেলেই হল। অসুবিধা হল, এতক্ষণ দিনের আলো ছিল বলে সবকিছুই মোটের উপর দৃশ্যমান ছিলো। কিন্তু ফেরার সময় আর তা থাকবে না। সাতপাঁচ ভাবছে, এমনসময় দেখা গেল, মঙ্গল ফিরে আসছে। এবারের অবশ্য মঙ্গলের হাঁটার মধ্যে ব্যস্ততার ভাব। কাঁধের ঝোলাটায় কিছু জিনিসপত্র এনেছে সে। কারণ, আসবার সময় ব্যাগটা তো পেটমোটা ছিল না এমন! তাহলে?
উল্লাস টিলারই একটি ছোট খাঁজের মধ্যে লুকিয়ে ছিল। সে মনেপ্রাণে চাইছিল যেন মঙ্গল তাকে না-দেখে ফেলে। কিন্তু মঙ্গল তখন বাড়ি ফেরার জন্য উদগ্রীব। অতএব সে সামনের দিকে তাকিয়েই হনহন করে হাঁটছিল। রাস্তাটি সোজা নয়। মাঝে দু’-তিনটি বাঁক আছে। দুপাশে ঘন জঙ্গল। তার মধ্যে ফেরবার দিক থেকে দ্বিতীয় বাঁকে হঠাৎ মঙ্গল দাঁড়িয়ে পড়ে এদিক-ওদিক তাকালো। তারপর হঠাৎ সে বাঁ-দিকের জঙ্গলের দিকে এগিয়ে গেল। চারপাশে ইতিউতি দেখে তরতর করে সে গিয়ে দাঁড়াল একটা বেশ বড় শালগাছের দিকে। তার গুঁড়িতে একটা ছোট্ট কোটরও আছে। মঙ্গল আর-একবার এদিক_ওদিক দেখে তারপর তার ঝোলা থেকে একটা পোঁটলা বার করে, চারদিকে আবার তাকিয়ে সেটা সেই কোটরের মধ্যে রেখে আবার রাস্তায় উঠে সামনে চলতে লাগলো। এবার আগের চেয়ে আরও দ্রুত।
উল্লাস টিলারই একটি ছোট খাঁজের মধ্যে লুকিয়ে ছিল। সে মনেপ্রাণে চাইছিল যেন মঙ্গল তাকে না-দেখে ফেলে। কিন্তু মঙ্গল তখন বাড়ি ফেরার জন্য উদগ্রীব। অতএব সে সামনের দিকে তাকিয়েই হনহন করে হাঁটছিল। রাস্তাটি সোজা নয়। মাঝে দু’-তিনটি বাঁক আছে। দুপাশে ঘন জঙ্গল। তার মধ্যে ফেরবার দিক থেকে দ্বিতীয় বাঁকে হঠাৎ মঙ্গল দাঁড়িয়ে পড়ে এদিক-ওদিক তাকালো। তারপর হঠাৎ সে বাঁ-দিকের জঙ্গলের দিকে এগিয়ে গেল। চারপাশে ইতিউতি দেখে তরতর করে সে গিয়ে দাঁড়াল একটা বেশ বড় শালগাছের দিকে। তার গুঁড়িতে একটা ছোট্ট কোটরও আছে। মঙ্গল আর-একবার এদিক_ওদিক দেখে তারপর তার ঝোলা থেকে একটা পোঁটলা বার করে, চারদিকে আবার তাকিয়ে সেটা সেই কোটরের মধ্যে রেখে আবার রাস্তায় উঠে সামনে চলতে লাগলো। এবার আগের চেয়ে আরও দ্রুত।
আরও পড়ুন:

রজনীর রবি

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান
উল্লাস পড়ল মহাসঙ্কটে। মঙ্গলের পিছু নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেলে বড় গাছের কুটুরিতে মঙ্গল কী রাখল, তা জানার কোন উপায় নেই। কালাদেওকে তুষ্ট করার জন্য ফলমূল-নৈবেদ্য দিল মঙ্গল? কিন্তু সে-সব তো মন্দিরে দিলেই চলত। এখানে কেন? নাহ্, ব্যাপারটা যত মুশকিলের হোক না কেন, মঙ্গল গাছের গুঁড়িতে কী রাখল তা না-দেখে সে এখান থেকে এক পাও নড়তে পারবে না। তা-না-হলে বাড়ি ফিরেও সে শান্তি পাবে না। কৌতূহলে সারারাত এপাশ-ওপাশ করতে হবে। অতএব সামান্য সময় অপেক্ষা করে সে এগিয়ে গেল সেই প্রকাণ্ড শালগাছের দিকে।
শালগাছটি সত্যিই প্রকাণ্ড। একশো বছরের কাছাকাছি হওয়া অসম্ভব নয়। সচরাচর এতবড় গুঁড়িওয়ালা শালগাছ দেখা যায় না। গুঁড়ির নীচের দিকেই কুটুরিটি। এইসব কুটুরি সাপখোপের আড্ডা। কিন্তু উপায় নেই। যা-থাকে-কপালে বলে উল্লাস তার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিল সে।
মুহূর্তেই তার হাতে উঠে এল একটি কাপড়ে বাঁধা পোঁটলা। পোঁটলাটি হাল্কা হবে বলে ভেবেছিল সে। কিন্তু এখন দেখছে, বিলক্ষণ ভারি। কী আছে এই পোঁটলায়? এখানে এইরকম প্রকাশ্য স্থানে পোঁটলা রাখার কারণটাই বা কী!
এখনই খুলবে না সে। কারণ, ফিরতে হবে। সামান্য একটু ফাঁক করে বড়জোর একঝলক দেখে নেওয়া যেতে পারে। সেটা দেখতে গিয়েই বিপত্তি। আঁতকে উঠল উল্লাস! এ-সব-কী দেখছে সে? — চলবে
শালগাছটি সত্যিই প্রকাণ্ড। একশো বছরের কাছাকাছি হওয়া অসম্ভব নয়। সচরাচর এতবড় গুঁড়িওয়ালা শালগাছ দেখা যায় না। গুঁড়ির নীচের দিকেই কুটুরিটি। এইসব কুটুরি সাপখোপের আড্ডা। কিন্তু উপায় নেই। যা-থাকে-কপালে বলে উল্লাস তার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিল সে।
মুহূর্তেই তার হাতে উঠে এল একটি কাপড়ে বাঁধা পোঁটলা। পোঁটলাটি হাল্কা হবে বলে ভেবেছিল সে। কিন্তু এখন দেখছে, বিলক্ষণ ভারি। কী আছে এই পোঁটলায়? এখানে এইরকম প্রকাশ্য স্থানে পোঁটলা রাখার কারণটাই বা কী!
এখনই খুলবে না সে। কারণ, ফিরতে হবে। সামান্য একটু ফাঁক করে বড়জোর একঝলক দেখে নেওয়া যেতে পারে। সেটা দেখতে গিয়েই বিপত্তি। আঁতকে উঠল উল্লাস! এ-সব-কী দেখছে সে? — চলবে
* ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (novel): পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক (Pishach paharer Aatanka) : কিশলয় জানা (Kisalaya Jana) বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজ।


















