২০২২ সালে জানুয়ারি মাসে অর্থাৎ করোনাকালের শেষ দিকে সপরিবারে বকখালি ও ফ্রেজারগঞ্জ ভ্রমণে গিয়েছিলাম। বাড়ি থেকে মাত্র ৩৯ কিলোমিটার। সুতরাং সকালবেলায় গিয়ে সারাদিন ঘুরে সন্ধেবেলা চলে আসা যায়। বকখালি পৌঁছে পূর্বদিকে যেদিকে এক সময় অসংখ্য ঝাউ গাছ ছিল কিন্তু আমফান ঝড়ের পর প্রায় পুরোটাই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে সেই দিকে বেশ কিছুটা হাঁটতে নজরে এল ৫-৬টি পাখি সমুদ্র সৈকতে প্রায় হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে খাবার খুঁজছে।
প্রাথমিকভাবে দেখে মনে হল এই পাখিগুলোকেই ২০০৯ সালে ফ্রেজারগঞ্জে দেখেছিলাম। কিন্তু একটু এগিয়ে ভালোভাবে লক্ষ্য করে দেখলাম না সেই পাখিগুলি নয়। ওদের সাথে এদের বেশ কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তিনটে পার্থক্য আমার স্পষ্ট নজরে এল। প্রথমত: এদের পিঠের ও ডানার রঙ এবং ছিট ভিন্ন প্রকৃতির। দ্বিতীয়ত: আগের পাখিগুলির চঞ্চুর আগা ছিল নিচের দিকে সামান্য বাঁকা, কিন্তু এদের চঞ্চু উপরের দিকে সামান্য বাঁকা। তৃতীয়ত: আগের পাখিগুলির মাথার চাঁদিতে তিলকের মতো সাদা ডোরা দাগ ছিল, কিন্তু এদের তেমন কিছু নেই। তাই মোটামুটি নিশ্চিত হলাম যে এরা ভিন্ন কোনও পাখি। বাড়ি ফিরে যথারীতি অজয় হোমের “চেনা অচেনা পাখি” খুলে বসলাম। কিন্তু ছবি মিলিয়ে দেখতে গিয়ে একটু ভুল করে ফেললাম। আর সেই ভুল থেকে ভুলভাবে পাখিটিকে চিহ্নিত করলাম জৌরালি বা Black Tailed Godwit। কিছুদিন পর সমাজমাধ্যমে পাখিপ্রেমীদের একটি গোষ্ঠীতে একজনের পোস্ট করা ছবি দেখে সেই পাখিগুলির কথা মনে পড়ে গেল।
পাখিটিকে শনাক্ত করা হয়েছে জৌরালির একটি ভিন্ন প্রজাতি হিসেবে। নাম ‘Bar-tailed Godwit’। স্মৃতির সঙ্গে ভালো করে মিলিয়ে নিলাম ছবিটাকে। একদম একই। “চেনা অচেনা পাখি” বইটি আবার খুললাম। সন্দেহ সম্পূর্ণভাবে নিরসন করা চাই। দেখলাম আমারই দেখার ভুল। অজয়বাবু ছবি ছাড়াই অপেক্ষাকৃত ছোট করে ‘Bar-tailed Godwit’-এর বর্ণনা দিয়েছেন যা আমার দেখা পাখির সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। আন্তর্জাল থেকে খুঁজে আরও ভালোভাবে নিশ্চিত হলাম যে সুন্দরবন অঞ্চলে পরিযায়ী পাখি হিসেবে ‘Black-tailed Godwit’ নয়, ‘Bar-tailed Godwit’ পাখিই দেখা যায়। এর কোনও বাংলা নাম কোনও বইতেই খুঁজে পেলাম না। স্থানীয় মানুষ কী নামে ডাকে তাও জানতে পারলাম না। যতদিন প্রকৃত বাংলা নাম খুঁজে না পাওয়া যায় ততদিন আমার দেওয়া ডোরা-লেজ জৌরালি নামটাই থাক।
ডোরা-লেজ জৌরালির বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Limosa lapponica’। ল্যাটিন শব্দ ‘Limus’ থেকে ‘Limosa’ কথাটা এসেছে যার অর্থ কাদা। যেহেতু জলাভূমির জল-কাদাযুক্ত এলাকা এদের বাসস্থান তাই গণ হিসেবে ‘Limosa’ নাম সার্থক। আবার ‘Lapponica’ কথাটি এসেছে ‘Lapland’ থেকে। ল্যাপল্যান্ড হল ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন ও রাশিয়ার উত্তরাংশ। যেহেতু ল্যাপল্যান্ড ও স্ক্যান্ডিনেভিয়া (উত্তর ইউরোপ) হল এদের মূল বাসস্থান এবং প্রজননস্থল তাই প্রজাতি হিসেবে ‘Lapponica’ কথাটিও সার্থক। ইংরেজিতে ‘Godwit’ নামকরণের পিছনে রয়েছে এক মজাদার তথ্য। না, ‘God’ অর্থাৎ ঈশ্বরের সাথে কোনও সম্পর্ক নেই। এদের জাতভাই কালো-লেজ জৌরালি (Black-tailed Godwit)-এর ডাক শুনলে মনে হবে ‘উইট উইট উইট’ শব্দ করে ডাকছে। আর এর মাংসের স্বাদও নাকি খুব ভালো হওয়ায় পাখি শিকারিদের খুব পছন্দ। তাই এরা হল ভালো অর্থাৎ ‘Good’ পাখি। এই ‘Good’ এবং ‘Wit’ শব্দযুগল দিয়ে নাম হয়েছে ‘Godwit’। এ তো গেল কালো-লেজ জৌরালির কথা। আমাদের আলোচ্য ‘Bar-tailed Godwit’ বা ডোরা-লেজ জৌরালির ডাক ওদের মতো নয়, আর মাংসের স্বাদও ভালো নয়। কিন্তু জাতভাই হওয়ায় ‘Godwit’ নামটা থেকে গিয়েছে।
ডোরা-লেজ জৌরালির নামেই বোঝা যায় এদের লেজটা কেমন। ডাহুক পাখিদের মতো ছোট্ট লেজের ওপরের দিকে সাদা ও বাদামি আড়াআড়ি ডোরা, অনেকটা জেব্রা ক্রসিং-এর মতো। পিঠের উপরের দিকের রং পাঁশুটে বাদামি। তবে পিঠ আর ডানা জুড়ে বাদামি রঙের ছিট। একই রকম ছিট ঘাড়ে ও বুকের কাছে রয়েছে। তবে ডানা ও পিঠের ছিটগুলো তুলনায় বেশ বড়। পেট আর লেজের নিচের দিকে রঙ সাদা। মাথার চাঁদির রং ধূসর আর সেখানেও একটু ঘনভাবে ছোট ছোট ছিট আছে। চোখের উপর, গলা ও চিবুক অপেক্ষাকৃত ফ্যাকাশে। আগেই বলেছি, এদের চঞ্চু বেশ লম্বা আর আগার দিকটা সামান্য উপরের দিকে বাঁকানো। চঞ্চুর গোড়ার দিকের রং গোলাপি আর আগার দিকের রঙ কালচে। চঞ্চুর গোড়ার দিকে কালো রঙের লম্বা দুটো নাসারন্ধ্র দেখা যায়। সরু ও লম্বা পায়ের রঙ ধূসর। সব জাতির জৌরালির লেজে পালকের সংখ্যা ১২টি। আর এদের লেজে ডোরা দাগের সংখ্যা ৭। কালো-লেজ জৌরালি যখন ওড়ে তখন ওদের ডানায় সাদা রঙের একটা পটি দেখা যায় কিন্তু ডোরা-লেজ জৌরালির ক্ষেত্রে তেমনটা দেখা যায় না। উড়ন্ত অবস্থায় তাই এদের শনাক্ত করা সহজ।
সমস্ত জৌরালির প্রধান খাবার হল শামুক, ঝিনুক, চিংড়ি, কাঁকড়া ইত্যাদি প্রাণী। এছাড়াও বিভিন্ন জলজ পোকা এবং জলজ ঘাসের বীজ খেতে দেখা যায়। জলের ধারে জলে পা ডুবিয়ে, কখনওবা বুক পর্যন্ত জলে হেঁটে হেঁটে খাবার শিকার করে। চঞ্চু ওপরের দিকে সামান্য বাঁকা হওয়ায় খাদ্য শিকারের ক্ষেত্রে এরা কী সুবিধা পায় তা অবশ্য আমার জানা নেই। অনেক সময় এদের জলের ধারে কোনও উঁচু জায়গায় অনেকে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে থাকে। এই সময় এরা গলা গুটিয়ে হাঁসের মতো মাথাটা ধড়ের কাছাকাছি নিয়ে চলে আসে। আর এরা যখন দলবেঁধে ওড়ে তখন সোজা না উড়ে একটু এঁকে বেঁকে ওড়ে। এদের ডাকও অন্যদের থেকে আলাদা। এরা দলবদ্ধভাবে থাকার সময় “কিটিউ কিটিউ” করে ডাকে। ভারি মিষ্টি সেই ডাক। আবার একা থাকলে ‘কিউ কিউ’ বা দ্রুত লয়ে বারংবার ‘কিটি কিটি কিউ’ করে ডাকে।
আগেই বলেছি এরা হল পরিযায়ী পাখি। উত্তর ইউরোপ ও আলাস্কা হল এদের বাসস্থান। প্রবল শীত শুরু হলে ওরা দক্ষিণ গোলার্ধে পরিযান করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় এদের পরিযান করতে দেখা যায়। আবার দক্ষিণ গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল শুরু হলে ওরা ফিরে যায় নিজস্ব বাসভূমি উত্তর গোলার্ধে। অবশ্য প্রজননে অক্ষম কিছু পাখি থেকে যেতে দেখা যায়। সুন্দরবন অঞ্চল এদের উপযুক্ত খাদ্য সংগ্রহের এবং বিশ্রামের জায়গা হওয়ায় শীতকালে সুন্দরবন অঞ্চলে এদের যথেষ্ট পরিমাণে দেখা যায়। আবার থেকে যাওয়া কিছু পাখিও এখানে দেখা যায়। সমুদ্র সৈকতে, মোহনার কাছে খাঁড়ি ও নদীর তীরে, নদীর চড়ায় এদের দেখা মেলে। একেবারে উত্তরতম গোলার্ধ থেকে দক্ষিণতম গোলার্ধ পর্যন্ত এরা পরিযান করে।
স্যাটেলাইট ট্যাগ সমন্বিত একটি তরুণ ডোরা-লেজ জৌরালির পরিযান পথ চিহ্নিত করে জানা গিয়েছে, ২০২২ সালে সে আলাস্কা থেকে ওড়া শুরু করে কোথাও না থেমে, কোনও খাবার না খেয়ে একটানা ১১ দিন এক ঘণ্টা উড়ে ১৩৫৬০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়াতে পৌঁছেছিল। এটাই এ যাবৎ কোনও পাখির একটানা এত দূরত্ব অতিক্রম করার রেকর্ড। এই পাখিটি ২০২১ সালে একটি পুরুষ ডোরা-লেজ জৌরালির ১৩০৩৫ কিলোমিটার পথ (আলাস্কা থেকে অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস) একটানা অতিক্রম করার রেকর্ডকে চূর্ণ করেছে। এদের মতো একটানা এত দীর্ঘ পথ পরিযানকারী পাখি পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। দক্ষিণ গোলার্ধে যখন এরা থাকে তখন এদের অপ্রজনন ঋতু। উত্তর গোলার্ধে বাসভূমিতে ফিরে যাওয়ার ঠিক আগে এদের পালকে রঙের পরিবর্তন আসে। স্ত্রী পুরুষ নির্বিশেষে তখন এদের মাথা, বুক, পেট ও গলার রঙ হয় মরচে লাল, আর মাথার চাঁদিও হয় অনেক কালচে। স্ত্রী ও পুরুষ ডোরা-লেজ জৌরালি দেখতে একই রকম হলেও পুরুষের তুলনায় স্ত্রীর আকার কিছুটা বড়। এরা গড়ে ১৪.৫ ইঞ্চি লম্বা হয় এবং বিস্তার করলে এক একটি ডানার দৈর্ঘ্য হয় প্রায় ৮.৫ ইঞ্চি। আর চঞ্চুর দৈর্ঘ্য হয় ৩-৪.৪ ইঞ্চি। পুরুষদের চঞ্চু স্ত্রীদের তুলনায় সামান্য ছোট। পুরুষদের ওজন হয় প্রায় ১৯০ থেকে ৪০০ গ্রাম এবং স্ত্রীদের ওজন হয় প্রায় ২৬০ থেকে ৬৩০ গ্রাম। সাধারণত দুই বছর বয়স হলে এরা প্রজননক্ষম হয়।
দুই থেকে চার বছর বয়সে এরা প্রজননক্ষম হলে উত্তর গোলার্ধের প্রজননভূমিতে পৌঁছে যায়। আলাস্কা, উত্তর এশিয়া ও ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভিয়া হল এদের প্রজননস্থল। সাধারণতঃ মাটির ওপর আঁচড়ে এরা একটা অগভীর বাসা বানায়। বাসার উপর দেয় মস বা লাইকেনের আস্তরন। কখনও কখনও বাসায় ঘাস পাতাও বিছিয়ে দেয়। বাসা তৈরির জন্য অপেক্ষাকৃত একটু শুকনো জায়গা এরা বেছে নেয়। স্ত্রী ডোরা-লেজ জৌরালি একবারে ২-৫টি ডিম পাড়ে, তবে গড়ে সাধারণতঃ ৪টি ডিম পাড়ে। ডিমের এক প্রান্ত বেশি স্ফীত ও বিপরীত প্রান্ত বেশি সরু। ডিমের রঙ কালচে হলুদ এবং ডিমের উপর বাদামি ছোপ দেখা যায়। স্ত্রী ও পুরুষ পাখি উভয়ে মিলে ডিমে তা দেওয়ার পর ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরিয়ে আসে। স্ত্রী পাখি দিনে ও পুরুষ পাখি রাতে তা দেয়। বাচ্চাদের লালন-পালনের দায়িত্ব বাবা-মা উভয়েই পালন করে। প্রায় ২৮ দিন বয়স হলে বাচ্চারা উড়তে শেখে। উড়তে শিখেই এরা দীর্ধ পথ পরিযানের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। সাধারণতঃ বছরে এরা একবারই বাচ্চার জন্ম দেয়।
আইইউসিএন (IUCN)–এর তালিকায় ডোরা-লেজ জৌরালিরা প্রায় বিপন্ন (Near Threatened) প্রজাতির পরিযায়ী পাখি। সুন্দরবনে এদের সংখ্যা কমেছে কিনা কোনও তথ্য না থাকলেও সাইবেরিয়া, পূর্ব আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ডে এদের সংখ্যা যে কমেছে তার গবেষণাভিত্তিক তথ্য আছে। বলা হয়েছে, বাসস্থান ধ্বংসই এদের সংখ্যা হ্রাসের অন্যতম কারণ। সুন্দরবন অঞ্চলেও যেভাবে ম্যানগ্রোভ ধ্বংস হচ্ছে এবং জলস্তর বাড়ছে তাতে ভবিষ্যতে ডোরা-লেজ জৌরালিদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয় কিনা তা ভবিষ্যতই বলবে।—চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com