রবীন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল ‘ছেলেদের মানুষ করে তোলবার জন্য যে-একটা যন্ত্র তৈরি হয়েছে, যার নাম ইস্কুল, সেটার ভিতর দিয়ে মানবশিশুর শিক্ষার সম্পূর্ণতা হতেই পারে না।’ এই ভাবনা-দুর্ভাবনা থেকেই আশ্রম-বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা। হাজার ব্যস্ততার মধ্যেও সেই বিদ্যালয়ের জন্য রবীন্দ্রনাথ অনেক সময় দিয়েছেন। ত্যাগ-তিতিক্ষা স্বীকার করেছেন।
কবির ছিল জহুরির চোখ। বুঝতেন, কে শিক্ষক হওয়ার যোগ্য। কাছের হোক, দূরের হোক, তাঁকে ঠিক নিয়ে আসতেন শান্তিনিকেতনে। নিয়োগ করতেন পড়ানোর কাজে। নিজেও নিয়মিত ক্লাস নিতেন। তাঁর পড়ানোর পদ্ধতি ছিল একেবারে অন্যরকম। রথীন্দ্রনাথের ‘পিতৃস্মৃতি’ বইতে আছে, ‘বাবা প্রায়ই ক্লাস নিতেন। তিনি ছোটোদের পড়াতে ভালোবাসতেন। তিনি যেভাবে পড়াতেন তাতে তাদের মনে হত না যে তারা ক্লাসে পড়ছে— পড়তে যথেষ্ট আনন্দ পেত। মাস্টারমশায়রা বাবার কাছ থেকে তাঁর পড়াবার প্রণালী শিখতে চেষ্টা করতেন।’
রবীন্দ্রনাথের ছিল আশ্চর্য ধৈর্যশক্তি। ছোটোদের পড়াতেন আনন্দে, খেলাচ্ছলে। কীভাবে পড়াতে হবে,তা আশ্রম-শিক্ষকদেরও শেখাতেন। পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীর লেখায় আছে, ‘খানিকটা সময় শিক্ষকদের ক্লাস নিতেন। সেসব ক্লাসে তিনি তাঁর নিজের পড়াবার পদ্ধতি শিক্ষকদের বিশেষভাবে বুঝিয়ে দিতেন।’ ত্রিপুরা থেকে শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করতে এসেছিলেন ধীরেনকৃষ্ণ দেববর্মা। শিল্পী হিসেবে প্রভূত খ্যাতির অধিকারী এই মানুষটি বড় হয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে, আশ্রমিক-ঘরানায়। শান্তিনিকেতন সম্পর্কে তাঁর অনেক সুখকর অভিজ্ঞতা ছিল। অভিজ্ঞতার সেই ভাণ্ডারটি ছিল যথেষ্ট সমৃদ্ধ।
রবীন্দ্রনাথ আশ্রম-বিদ্যালয়ে ‘বলাকা’ পড়াতেন। ছাত্ররা তা মুগ্ধ হয়ে শুনত, শুনতেন শিক্ষকরাও। ধীরেন্দ্রকৃষ্ণের লেখা থেকে জানা যায়, সবসময়ই রবীন্দ্রনাথের ক্লাসের শেষের দিকে বসে থাকতেন ক্ষিতিমোহন সেন। এই পণ্ডিত-মানুষটি শেষের দিকে বসে তন্ময় হয়ে শুনতেন গুরুদেবের মুখে ‘বলাকা’-র ব্যাখ্যা। পরবর্তীকালে তিনি ‘বলাকা কাব্য পরিক্রমা’ নামে একটি বইও লিখেছিলেন। সে বইয়ের ভূমিকায় ক্ষিতিমোহন নিজে এই ঘটনাটির কথা স্বীকার করেছেন।
আশ্রম-বিদ্যালয়ে যত্ন করে পড়ানো হত, শিক্ষার্থীরা সারাক্ষণ পড়ায়, শিক্ষকমশায়রা পড়ানোয় ব্যস্ত থাকতেন, তা নয়। আনন্দধারা বয়ে যেত আশ্রমের আকাশে-বাতাসে। আশ্রমের সবাইকে নিয়ে কবি সন্ধের দিকে বসতেন। চলত সাহিত্যপাঠ, সাহিত্য নিয়ে আলোচনা। মাঝেমধ্যেই ওদেশের কবিদের কবিতা শোনাতেন। কখনো ব্রাউনিং-কীটস্, কখনো শেলি-ওয়ার্ডসওয়ার্থ। গুরুদেবের কণ্ঠে তাঁর নিজের কবিতা বা ভিনদেশি কবিদের কবিতা শোনা ছিল সমবেত শ্রোতৃমণ্ডলির কাছে এক অভিজ্ঞতা। শুধু কবিতা নয়, কবি নিজের লেখা নাটকও পাঠ করেছেন এই সান্ধ্য-আসরে।
নীরস সাহিত্যপাঠ নয়, আলোচনায়, আলাপচারিতায় কৌতুক মিশে থাকত, ছোটরা তা উপভোগ করত, উপভোগ করত বড়রাও। প্রমথনাথ বিশী লেখক হিসেবে সুখ্যাতির অধিকারী, অধ্যাপক হিসেবে তাঁর খ্যাতি বহুদূর বিস্তৃত ছিল। ‘রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন’ নামে একটি বই লিখেছিলেন তিনি। সে বইতে আছে রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য-সুখ লাভ করার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সজীব বিবরণ। রবীন্দ্রনাথ তখন থাকতেন আশ্রম-গৃহের দোতলায়।
প্রমথনাথ বিশী দোতলার সেই গৃহে দেখেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে জড়ো হওয়া ছাত্রদের ইংরেজি শেখাচ্ছেন। ক্লাসের এক ছাত্রর নাম ছিল সবি। অন্য এক ছাত্রকে কবি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আচ্ছা, ইংরেজিতে বল্ তো — সবির একটা গাধা আছে।’ যার উদ্দেশে এই জিজ্ঞাস্য, নির্বিকারচিত্তে সে বলে, ‘সবি ইজ এ্যান এ্যাস’। উপস্থিত কেউই সেদিন হাসেনি। গাধা থাকার ও গাধা হওয়ার মধ্যে তফাৎ কী, তা বোধহয় বুঝতে পারেনি তারা। কেউ হাসল না, হাসাহাসি করল না, শেষে হাসলেন রবীন্দ্রনাথ। হেসে বললেন, ‘দেখলি সবি, তোকে গাধা বানিয়ে দিলে?’ প্রমথনাথের বই থেকে জানা যায়, এরপরও সবি হাসেনি।
ছাত্রদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ কত নিবিড়ভাবে মিশতেন, তার এক অভাবনীয় নজির আছে প্রমথনাথের লেখায়। জানা যায়, সন্ধের দিকে কবি ছাত্রদের ঘরে ঢুকে পড়তেন। মিল নিয়ে খেলা চলত। আবার কখনো গল্প-বলার খেলা। ছোটদের আনন্দ-লাভের আরও আয়োজন থাকত। প্রমথনাথ লিখেছেন, ‘আবার অনেক সময়ে তিনি একটা গল্পের সূত্রপাত করিয়া পালাক্রমে আমাদের চালাইয়া লইতে বলিতেন। বলা বাহুল্য, আমাদের দু-এক ধাপ পরেই গল্পটা ভুতুড়ে ধরনের হইয়া উঠিত, তখন তিনি ভূত ছাড়াইয়া গল্পটাকে সংগত পরিণামে পৌঁছাইয়া দিতেন। ইহা ছাড়া মাঝে মাঝে নিজের কবিতা পড়িয়া শুনাইতেন। সন্ধ্যাবেলা যখন যে বাড়িতে তিনি থাকিতেন, নূতন গান শিখাইবার আসর বসিত।’
রবীন্দ্রনাথ মাঝেমধ্যেই ছাত্রদের কাছে গল্প বলতেন। ছাত্রদের সঙ্গে নাটকও করতেন। কখনও ‘শারদোৎসব’, কখনো-বা ‘ডাকঘর’, ‘ফাল্গুনী’। নাটকে ছাত্রদের সঙ্গে অন্যান্য শিক্ষকরাও অংশ নিতেন। সুধীরঞ্জন দাস ছিলেন আশ্রম-বিদ্যালয়ের ছাত্র । এই কৃতী মানুষটি পরবর্তীকালে বিশ্বভারতীর উপাচার্য হয়েছিলেন। তাঁর স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, লাইব্রেরি-ঘরের মেঝেতে বসে ছাত্রদের গুরুদেব শুনিয়েছিলেন তাঁর ‘গুপ্তধন’ গল্পটি। মুগ্ধ হয়ে গল্প শুনেছিলেন তাঁরা। গল্প শেষ হলেও মনের মধ্যে রেশ রয়ে গিয়েছিল। রাতে বিছানায় শুয়েও ঘুম আসেনি। গা ছমছম করেছে। জটাজুটধারী সন্ন্যাসীর সুবিশাল মূর্তি মনের অলিগলিতে ঘুরে বেড়িয়েছে। বলা বাহুল্য গল্প শুনে বালক সুধীরঞ্জন যথেষ্টই ভয় পেয়েছিলেন।
এমন কত আয়োজনই না হত আশ্রমে। স্বতঃস্ফূর্ত, প্রাণের আনন্দে সেসব আয়োজন ছাত্রদের স্পর্শ করত, বড়ো হয়ে ওঠার, ‘মানুষ’ হয়ে ওঠার শিক্ষা পেত। পৌষ মেলায় অনেক বিশিষ্টজন অতিথি হয়ে আসতেন। ছাত্ররা অতিথিদের শুধু সঙ্গ দিত না, তাঁদের যাবতীয় প্রয়োজন তারাই মেটাত। বিছানা করার, ঘর ঝাঁট দেওয়ার দায়িত্বও পালন করত তারা। আশ্রমে শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রেও ছাত্রদের বড় ভূমিকা ছিল। একজন ‘দলপতি’ নির্বাচন করা হত। তার ওপর থাকত অনেক দায়িত্ব। কোনো ছাত্র ঠিক সময়ে ঘুম থেকে উঠেছে কিনা, তাও দেখতে হত তাকে। বুধবার ধোপা আসত। ধোপাকে কাপড় ধুতে দেওয়া, ধুয়ে নিয়ে আসা কাপড়চোপড় মিলিয়ে নেওয়া—সবই করতে হত ওই দলপতিকে।
ছাত্ররা অনেক দায়দায়িত্ব পালন করত ঠিকই, তবে বাড়ি থেকে দূরে থাকা ছাত্রদেরও সারাক্ষণ শিক্ষকরা আগলে রাখতেন। রবীন্দ্রনাথ এ কাজে কতখানি মনোযোগী ছিলেন, তা নানাজনের স্মৃতিচর্চায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কবিকন্যা মীরার স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ প্রতিদিনই রাতে ছাত্রদের ঘরগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতেন। দেখে আসতেন তারা ঠিকঠাক মশারি গুঁজেছে কিনা। ছাত্রদের কারও শরীর খারাপ হলে ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তেন। নিজের হাতে সময় মতো ওষুধও খাইয়া আসতেন।
ছাত্রদের প্রতি রবীন্দ্রনাথের এই ভালোবাসার সত্যিই তুলনা হয় না। ভিতর থেকে উঠে আসা অকৃত্রিম ভালোবাসা। ছাত্রদের সঙ্গে তাঁর ছিল মধুর ভালবাসার নিবিড় বন্ধন। নির্মলকুমারী মহলানবিশকে এক চিঠিতে কবি লিখেছিলেন, ‘আমার ক্লাসে ওরা মনে করে খেলা— এ তো পড়া নয়— আমি যেন ওদের খেলার সর্দার। সত্যিই আমি তাই— মনের ভিতর দিকে আমার আর বয়স হল না…।’ এভাবে খ্যাতির মিনার ছেড়ে মাটিতে নেমে আসা, ছাত্রদের সঙ্গে মিশে যাওয়া, তাদের হৃদয়ে স্থান দেওয়া —এসব সহজ নয়। পারতেন একজনই, তিনি রবীন্দ্রনাথ।
* গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি (Tagore Stories – Rabindranath Tagore) : পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Parthajit Gangopadhyay) অবনীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট। বাংলা ছড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণা, ডি-লিট অর্জন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে চলেছেন। বাংলা সাহিত্যের বহু হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছেন। ছোটদের জন্য পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন। সম্পাদিত বই একশোরও বেশি।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com