মঙ্গলবার ১০ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) পলায়মান কামপাখি। (মাঝখানে) বর্ণময় কামপাখি। (ডানদিকে) সতর্ক কামপাখি। ছবি: সংগৃহীত।

স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে, ঠিক যেখানে হাট্টিমা পাখিদের দেখেছিলাম সেই মাঠের পাশ দিয়ে যখনই আমি অতিক্রম করি তখনই নিজের অজান্তে চোখ চলে যায় পশ্চিম দিকে, ওই মাঠে। প্রায় প্রত্যেকদিন জলপিপি, গোবক, কুরচে বক, কোঁচ বক, ডাহুক আর মাঝে মাঝে হাট্টিমাদের দেখতে পাই। হঠাৎই একদিন যেন মনে হল লাল ঝুঁটিওয়ালা কোন‌ও পাখি ওই মাঠে ঘাসের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাথা, গলার কিছুটা আর পিঠের দিকটা দেখতে পেয়েছিলাম। বাকি অংশ ছিল ঘাসের ভিতর। টোটোতে বসে অতিক্রম করার সময় যেটুকু দেখলাম তাতে মনে হল মাথার রঙ ধূসর কিন্তু লাল রঙের ঝুঁটি আছে, গলার রং বেগুনি আর পিঠের দিকের রঙ খয়েরি। ঠিক দেখলাম তো? ঘাসের মধ্যে আশেপাশের বাড়ির মুরগি ঘুরে বেড়াচ্ছে না তো? কিন্তু পরমুহুর্তেই মনে হল, মুরগি আর যাই হোক জলের মধ্যে ঘুরে ঘুরে খাবার খাবে না। সন্দেহ নিরসন করতে হলে এরপর ভালোভাবে লক্ষ্য করতে হবে। কেটে গেল আরও ৫-৬ দিন, কিন্তু ওইরকম পাখি আর দেখতে পেলাম না।
যখন আমি আমার দৃষ্টিবিভ্রম বলে প্রায় ধরে নিয়েছি তখনই এক শনিবার বিকেল দুটো নাগাদ স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে আবার‌ও যেন মনে হল সেই রকম দুটো পাখি দেখলাম ঘাসের ঝোপে যাদের ধূসর মাথায় মাথা লাল ঝুঁটি আর গলার রং বেগুনি। এবার আমার চোখকে অবিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই। কয়েকদিন পরেই পরীক্ষার কারণে সেদিন স্কুল একটু আগে ছুটি হয়ে গিয়েছিল। স্থির করলাম, করবাড়ি বাস স্টপেজে নেমে একবার খোঁজ করব ওই পাখিগুলোকে। ভালোভাবে দেখা দরকার। টোটো থেকে নেমে দেখি মাঠে আমার দেখা সেই পাখিগুলো নেই। জলপিপি ও ডাহুক অবশ্য রয়েছে। মাঠের ওপারেই মৃতপ্রায় ঘিয়াবতী খাল। পুরোপুরি কচুরিপানায় ভরে রয়েছে। জলই দেখা যায় না। ভাবলাম রাস্তা ধরে ওই খালের কাছে এগিয়ে যাই। কাছাকাছি যেতেই দেখি সেই দুটো পাখি মাথা তুলে ভয়ার্তভাবে এদিক-ওদিক তাকাল। আর এটুকু দেখলাম যে ডাহুক পাখির মতো ছোট্ট লেজটা দ্রুত উপরে ও নীচে নাড়াচ্ছে। লেজের নিচের দিকের রঙ ধবধবে সাদা। আমি পকেট থেকে মোবাইল বার করে তাক করতে যাব, ঠিক তখনই ওরা লম্বা লম্বা পা ফেলে দৌড়ে কচুরিপানার মধ্যে দিয়ে খালের পশ্চিমপাড়ে ঘন ঝোপের মধ্যে হারিয়ে গেল। মোবাইলে ছবি না তুলতে পারলেও ক্ষতি নেই, মনের মধ্যে তো ছবি ধরা হয়ে গিয়েছে ততক্ষণে! আমার চোখ তাহলে ঠিকই দেখেছিল।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৯: হাট্টিমা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৫ ন হন্যতে

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৩: মহর্ষিকে অনুসরণ করে তাঁর পত্নীও বাড়ির পুজোতে যোগ দিতেন না

শারদীয়ার গল্প-৬: দুর্গা রাগ

এই পাখির ছবি আমি আগে দেখেছি। কিন্তু নামটা মনে করতে পারছিলাম না। সালিম আলির লেখা বই আমার প্রথম ভরসা। এক মিনিটেই পরিচয় পেয়ে গেলাম। এ হল কামপাখি। ইংরেজিতে বলে ‘Purple moorhen’ বা ‘Purple Swamphen’, বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Porphyrio porphyrio’। কামপাখিদের চেহারা বিশেষভাবে নজর কাড়ে। গায়ের রং বেগুনি ও নীল মেশানো। পিঠের দিকে ও ডানার উপরে নীলচে বেগুনির সাথে সবুজ ও বাদামি আভা থাকলেও বুক, গলা ও ঘাড় নীলচে বেগুনি। আর উদর ও দেহের দু’পাশের রং গাঢ় বেগুনি। দুই ঊরুর রং অবশ্য ফ্যাকাসে নীল। মাথার রং ধূসর। এদের চঞ্চু টকটকে লাল, আর বেশ মোটাসোটা ও ত্রিকোণাকার। উপরের চঞ্চু নিচের দিকে সামান্য বাঁকা। সব থেকে নজরকাড়া অংশটি হল কপাল। পালকহীন কপালের রঙও টকটকে লাল। এটি আসলে শক্ত চামড়া দিয়ে তৈরি শিল্ড। দেখে মনে হবে যেন উপরের চঞ্চু বৃদ্ধি পেয়ে মাথার চাঁদি পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে! প্রথম দেখার সময় এটাকেই আমি লাল ঝুঁটি ভেবেছিলাম। এদের পা ও আঙুলের রঙও ইট-লাল তবে গাঁটগুলোর রং হালকা খয়েরি। পায়ে নখের রং কালচে লাল। লেজের উপরের দিকের রং কালচে হলেও লেজের নিচের রং সাদা। লেজটা খুবই ছোট। চলাফেরার সময় ছোট্ট লেজটা ডাহুক পাখিদের মতো অনর্গল ওঠানামা করে, ফলে নিচের সাদা রঙ দূর থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। কামপাখি লম্বায় হয় ১৮-১৯ ইঞ্চি অর্থাৎ প্রায় একটি দেশি মুরগির মতো। পুরুষ পাখিরা স্ত্রী পাখিদের থেকে সামান্য বড় হয়। পুরুষ কামপাখির গড় ওজন যেখানে ৭২০-১০০০ গ্রাম, সেখানে স্ত্রীদের ওজন হয় ৫২০-৮৭০ গ্রাম।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২: মালা বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১১ : অরিন্দম কহিলা বিষাদে

সুন্দরবনের যেখানেই জলজ আগাছা, কলমি, হিংচে, কচুরিপানা ইত্যাদি ভরা জলাশয় রয়েছে আর আশেপাশে প্রচুর ঝোপঝাড় রয়েছে সেখানে কাম পাখিদের থাকার সম্ভাবনা বেশি। তীরে ঝোপঝাড় রয়েছে এমন নদীর তীরেও দেখা যায়। অবশ্য সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামে শৈশব থেকে ৩০ বছর অতিক্রান্ত করলেও কখনও কোনও কামপাখি নজরে পড়েনি। এইরকম জায়গায় এরা অনর্গল ছোট্ট লেজটাকে ওঠানামা করিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে খাবার-দাবার খুঁজে বেড়ায়। অনেক সময় ধানক্ষেতের মধ্যেও এদের দেখা যায়। স্বভাবে কিন্তু এরা ভীষণ ভীতু। খাবার খুঁজতে খুঁজতে মাঝে মাঝেই মাথা তুলে চতুর্দিক দেখে নেয় কোনও বিপদ আছে কিনা। বিপদ বুঝলে দৌড়ে নিরাপদ আশ্রয় পালায়। সচরাচর এরা ওড়ে না। তবে যখন ওড়ে তখন অনেকটাই উড়ে যেতে পারে, আর ওড়ার সময় লম্বা পা দুটি জলপিপিদের মতো ল্যাগব্যাগ করে ঝুলে থাকে।
আরও পড়ুন:

আমার দুর্গা: বিজ্ঞানী রাজেশ্বরী চট্টোপাধ্যায়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩২: লৌকিকও অলৌকিকের টানাপোড়েনের বিনির্মাণ—ঋষিকবির মহাকাব্য রামায়ণ

এরা প্রধানত, উদ্ভিদভোজী। বিভিন্ন ধরনের বীজ, খাদ্যশস্য ও জলজ উদ্ভিদ এরা খাবার হিসেবে পছন্দ করে। কান্ডের নরম অংশ আর কচি ফল এদের বেশি পছন্দ। যখন এরা ধানক্ষেতে খাবারের সন্ধান করে তখন যত না খাবার খায় তার চেয়ে ভারী চেহারার জন্য ধান গাছ মাড়িয়ে বেশি ক্ষতি করে। ধান গাছের গোড়ার দিকে কেটে নরম শাঁস খায়। পাকা ধান খেতেও দেখা যায়। তবে কখনও কখনও পোকামাকড়, চিংড়ি, মাছ, ব্যাঙাচি, ব্যাঙ, জোঁক, ছোটখাটো শামুকও খায়। খাবারদাবার খোঁজার সময় এরা মুরগিদের মতো ‘কঁক কঁক’ করে ডেকে ডেকে ঘোরে। যখনই এই ডাক বেশি শোনা যাবে বুঝতে হবে প্রজনন ঋতু সমাগত। ঝিরঝির বর্ষা এবং মেঘলা দিনেও এদের ডাকাডাকি খুব বেড়ে যায়। সুন্দরবন সহ সারা ভারত, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায় কামপাখিদের পাওয়া যায়। সাধারণত ৫-১০ টি কামপাখি একটি দলে থাকে। তবে এর চেয়ে বেশি সংখ্যাতেও কোথাও কোথাও দেখতে পাওয়া যায়।
আরও পড়ুন:

রজনীর রবি

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

কামপাখিদের প্রজনন ঋতু হল জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস। এই সময় পুরুষ পাখি চঞ্চুতে ঘাস নিয়ে নানা রকম অঙ্গভঙ্গি করে স্ত্রী পাখির দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। কখনও কখনও সে মাথা নিচু করে স্ত্রী পাখির দিকে বারবার এগিয়ে যেতে থাকে আর সঙ্গে বেশ জোরে জোরে ‘কঁক কঁক’ করে ডাকতে থাকে। ওদের এই মজাদার যৌন আবেদনের জন্য বাংলায় ‘কামপাখি’ বলা হয় কিনা তা অবশ্য আমার জানা নেই। যাইহোক, জুটি নির্বাচন হয়ে গেলে উভয়ে মিলে ভাসমান আগাছার জঙ্গলের ওপরে বিভিন্ন ঘাস, শুকনো কচুরিপানার পাতা, ধান গাছের পাতা, নলখাগড়ার পাতা, শুকনো ঘাস বা ধান গাছের গোড়া ইত্যাদি দিয়ে বুনে বেশ শক্তপোক্ত একটা বাসা বানায়। দেখলে মনে হবে যেন বাটির মতো ভাসমান গদি। বাসা বানানো শেষ হলে ফিকে হলুদ রঙের ৩-৭ টি ডিম পাড়ে। ডিমের উপর লালচে বাদামি ছিট থাকে। ডিমগুলি লম্বায় হয় প্রায় ৫০.৫ মিমি এবং ব্যাস ৩৫.৭ মিমি। কামপাখিদের মধ্যে বেশিরভাগ সময় একগামীতা দেখা গেলেও কখনও কখনও গোষ্ঠীবদ্ধ প্রজনন‌ও দেখা যায়। সেক্ষেত্রে একাধিক স্ত্রী পাখি একটি বাসায় ডিম পাড়ে, আর তখন অনেকে মিলে ডিমে তা দেয়। ২৩-২৭ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরিয়ে আসে। কামপাখিদের গোষ্ঠীতে যেসব প্রজননক্ষমতাহীন সদস্য থাকে তারাও মা-বাবার সাথে বাচ্চাদের লালন-পালনে অংশগ্রহণ করে। শিক্ষণীয় এই সামাজিক আচরণ দেখে মনে হবে যেন কামপাখিদের সত্যিই একটি সুখী পরিবার। পাখিদের জগতে কামপাখিরা অন্যতম সামাজিক পাখি।
কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁদিকে) ডিমে তা দিচ্ছে কামপাখি। (মাঝখানে) কামপাখির জুটি। (ডানদিকে) কামপাখি। ছবি: সংগৃহীত।

‘IUCN’ এর তালিকায় কামপাখিকে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত বলা হলেও সুন্দরবনে এদের সংখ্যা অনেকটাই কমেছে। এর পেছনে একাধিক কারণ বর্তমান। প্রথমত: এদের মাংস অত্যন্ত সুস্বাদু হওয়ায় অতীতে বিপুল পরিমাণে সাধারণ মানুষ এদের শিকার করেছে। এখন‌ও সুযোগ পেলে লুকিয়ে চুরিয়ে এদের শিকার করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত: জনবসতি বৃদ্ধি পাওয়ায় সুন্দরবনে জলাভূমির সংখ্যা বিপুল পরিমাণে কমে গিয়েছে। ফলে কামপাখিরা তাদের খাদ্য ও বাসস্থান হারিয়েছে। তৃতীয়ত: অতীতে সুন্দরবন অঞ্চলে দেশি ধান চাষ হত ফলে কোন‌ও কীটনাশক প্রয়োগ করতে হত না। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে উচ্চফলনশীল ধানের চাষ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে। আর এর ফলে এরাও বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের দ্রুত পরিবর্তন‌ই কামপাখিদের অস্তিত্বকে সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সুন্দরবনের এই রূপসী কামপাখিদের রক্ষা করতে হলে সুন্দরবনের স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করতেই হবে।

* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content