শনিবার ৭ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
কাঞ্চনজঙ্ঘা, ১৯৬২ সালের রঙিন কাহিনিচিত্র। অরণ্যের দিনরাত্রি, ১৯৭০ সালে আত্মপ্রকাশ। একটিতে হিমালয়ের অজ্ঞেয় মায়ালোক, অন্যটিতে আদিম অরণ্যভূমির রহস্যলোক। দুটিতেই চেনা পৃথিবীর বাইরে আত্ম-উন্মোচনের বিস্তৃত লীলাভূমি, যেখানে নানা স্তরের চরিত্র ক্রমশ যেন বদলে যায়, কুয়াশা আর জঙ্গলের আলো-ছায়ার তালে তালে। তারা উদ্ঘাটিত হয়, বিনির্মাণ-ও ঘটতে থাকে তাদের সত্তার, আন্তরপ্রকৃতির। কাঞ্চনজঙ্ঘা তার হিরণ্যময় আদিত্যবর্ণ নিয়ে তমসার পরপারের সেই শাশ্বতলোকের বার্তা দিয়ে যায়। চরিত্রগুলি সম্পর্কের কানাগলি পার হতে হতে ওই স্বর্ণশিখরের অনির্বাণ ক্ষণিকদীপ্তির স্পর্শে শুদ্ধ, সমাহিত হতে চায়, হয়ে উঠতে পারে তার উত্তর থেকে যায় উত্তরাধুনিক বোধ ও অনুভূতির গভীরে।
স্বাধীনতার পর যথাক্রমে পনেরো ও তেইশ বছর পর নির্মিত দুটি ছবিতে আছে স্বাধীন দেশের বুকে গড়ে উঠতে থাকা নবযৌবনের একটা অন্যতর সংজ্ঞা। ছবির মুখ্য নবীন চরিত্রগুলির বয়স কুড়ি থেকে তিরিশের মধ্যে, সুতরাং তাদের জন্ম স্বাধীনতার পূর্বলগ্নে অথবা সদ্যস্বাধীন দেশে। কাঞ্চনজঙ্ঘার অশোক কিংবা অরণ্যের দিনরাত্রির অসীম, কাঞ্চনজঙ্ঘার মনীষা অথবা অরণ্যের দিনরাত্রির অপর্ণা কী ভাবে? কীভাবে ভাবে? কেমন করে দেখে জীবনকে? আমরা এবার ক্রমে ক্রমে প্রবেশ করবো, দুটি ছবির দুটি নির্বাচিত অংশে। প্রথমে কাঞ্চনজঙ্ঘা। রহস্যময় সুউচ্চ হিমালয়ের বুকে মন, চেতনা, অহং ও বোধ কীভাবে উত্তীর্ণ হতে চায় অসীম অলকায়?
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৫ : Twoকি!

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১০: চাঁদের ওপিঠে কালো

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪২: কুইক অ্যাকশন

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৪৫: আকাশ এখনও মেঘলা

অশোক নামের গভীরে আছে চর্চিত ঐতিহাসিক পরিসর, বিতর্ক এবং শোকোত্তীর্ণ সদানন্দের ভাব। মনীষা মানসিক ইচ্ছা আর তার পরিপূরণের পথে দ্বন্দ্বদীর্ণ এক অন্তর্মুখী সত্তা। অশোক হয়ে ওঠে শোকোত্তীর্ণ, মনীষা যেন খুঁজে পায় নিজেকে, এও এক আত্মজাগরণ ও মুক্তির পরিসর। অথচ, অশোক খানিক সসঙ্কোচে চলে, মনীষা যেন নিজের সত্তার দাবীটিকেই অনুধাবন করতে পারে না, পারলেও প্রতিবেশকে উপেক্ষা করে উত্তীর্ণ হতে পারে না।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৭: জৌরালি

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪১: ঘটি চেয়ে বঁটি

তখন প্রতিবেশ তৈরি হতে থাকে কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলে, হিমালয়ের বুকে, সমভূমি থেকে অনেকটা ওপরে, কুয়াশাচ্ছন্ন রহস্যময়তার মাঝে ছুটে বেড়ায় কিছু মানুষ, নিজেদের ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে। এরপর আপন থেকে বাইরে বেরোনোর একটা করে পথ যেন খুলে যায় গীতিকবিতার মতো। যে ব্যথা একান্ত নিজের ছিল, তা বুঝি বিশ্বজনীন হয়ে উঠতে চাইল। মানুষগুলোর দূরত্ব কখনও ঘুচল, কখনও আকস্মিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত নৈকট্য থেকে মুক্তি এল সহসা, চারিদিকে তখনও ঘিরে রেখেছে কুয়াশার মোহজাল, তা কখনও সরে, ঘিরে ধরে আবারও। সেই মায়ালোকে দৈনন্দিন মরজগতের অহং, বস্তুনিষ্ঠ আকাঙ্ক্ষা, নিতান্ত সংকীর্ণ প্রেয়ের তাগিদগুলো ক্ষণিকের জন্য হলেও শ্রেয়ঃ হয়ে ওঠে। বাস্তবের না পাওয়া, হতাশাগুলো সরে সরে অপূর্ব পূর্ণতা যেন গ্রাস করে নিতে চায় সেই মায়ালোকে, যে উচ্চতা শহরে-নগরে-বন্দরে অকল্পনীয়, যা মাটির পৃথিবীর বাসের ধোঁয়া, কারখানার সাইরেন, টাইমকলের জল অথবা অফিসের টাইমের জগতে হতো না, হতে পারে না, হয়ে উঠতে পারে না।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৬: এক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রামচন্দ্রের অরণ্যবাস

উত্তম কথাচিত্র পর্ব-৭৩ : ‘খেলাঘর’

তা-ই হয়ে ওঠে হিমালয়ের বুকে কাঞ্চনজঙ্ঘায়। সেখানে চাকরি-সন্ধানী যুবক অশোক পরিবেশের বশীভূত হয়ে ঔদ্ধত্যে ছুড়ে দেওয়া চাকরির প্রস্তাবকে এক কথায় নাকচ করে। তখন তাকে ওই শৃঙ্গের মতোই অত্যুন্নত মনে হয়। ওই জনৈক ধনকুবেরের সদ্যতরুণী কন্যা মনীষা তখন আপ্রাণ মুক্তি পেতে চাইছে মধ্যবয়স্ক অভিজাত পাত্র, ভাবী স্বামীর নৈকট্য থেকে। তো, সেই মুক্তিও আসে ক্রমেই, হয়তো স্থানমাহাত্ম্যেই মানুষ সেই উচ্চতা স্পর্শ করে। সেই স্থানমাহাত্ম্য-ই অশোককে অনর্গল করে, যার পরিধেয় বস্ত্রটুকুও ধার করা। এও এক ভারতবর্ষ।

স্থানমাহাত্ম্য নবযৌবনকে কোন অবিনশ্বর স্বর্ণশিখরে মুহূর্তে পৌঁছে দেয়?
অশোককে জিজ্ঞাসা করে মনীষা, “কলকাতায় গেলে আসবেন তো আমাদের বাড়িতে?”
বিচিত্র হেসে অশোক জানায়, “না।” ফেলে দেয় হাতের ভুক্তাবশিষ্ট সিগারেট। তাত্পর্যপূর্ণ।
“কেন?”
“আমাকে ঢুকতেই দেবে না।”
কে বলেছে?”
“আপনার বাবা, বলেছেন যে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লাগবে।”
“আমার বন্ধুদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট লাগে না।”
(মনীষার মামা দূর থেকে ডাকেন, তারপর বায়নোকুলারে চোখ রেখে হেসে চলে যান)
“আপনার খোঁজ হচ্ছে, আপনি যাবেন না?”
(মনীষাকে খানিক বিহ্বল, তবুও আগের মতো নিরুচ্চারে চলে যায় না)
“আপনি আসবেন তো?”
“দেখি।”
“আমাদের বাড়ি কুকুর নেই কিন্তু।”
“ও তাহলে আসতে পারি।” অশোক খানিক ব্যঙ্গের সুরেই ব্রিটিশরাজের অন্ধ আনুগত্যপ্রবণ মনীষার বাবার মতো রায়বাহাদুরদের-ই লক্ষ্য করে যেন বলে ওঠে, “আমাকে একবার গড়ের মাঠে এক সাহেবের কুকুর কামড়ে দিয়েছিল। তারপর থেকেই…”
কথা শেষ হয়ে গেলেও যেন ফুরোয় না, মনীষা ফুরোতে দেয় না যেন।
“আমার নাম মণিকা নয় কিন্তু…”
“ তবে?”
“মণীষা।”
“ও, আচ্ছা, মনে থাকবে।”
“আচ্ছা, আসি তাহলে, নমস্কার।”
“আচ্ছা, নমস্কার।”
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৩: ত্রিপুরা : ঊনকোটির বহু মূর্তি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে

পিতার ঔজ্জ্বল্য কখনও ম্লান হয়নি পুত্রের খ্যাতিতে

তখন কোনও কুয়াশা নেই, রাস্তা-ঘাট দিনের আলোয় ঢাকা।

এও আরেক ভারতবর্ষ, যেখানে নিঃসম্বল মানুষ-ও পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা ছুড়ে ফেলে নিজের চেষ্টায় উঠে দাঁড়ানোর কথাটুকু মুখ ফুটে বলতে পারে, স্থানমাহাত্ম্যে হলেও, বলতে পারে। এও এক নতুন ভারতবর্ষ যেখানে বৈবাহিক সম্পর্কে বিগত কয়েকশো বছরের নৈকট্য, প্রেম, নির্ভরশীলতার মাঝে মৈত্রী নামক একটি পরিসরের প্রস্তুতি চলে। সকল নৈকট্য ও মৈত্রীর নিশ্চিত সমাপ্তি পরিণয়-নামক ধারণার বাইরেও অন্যতর কোনও শুদ্ধ, ভোগাতীত কোনও আত্মবন্ধনের আহ্বান-ও কি থাকে সেখানে, সেই ছুড়ে ফেলা সিগারেটের দগ্ধাবশেষের ব্যঞ্জনায়? স্বাধীনতোত্তর ভারতবর্ষের যৌবনের স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, সম্পন্নতা, বিপন্নতা, পাওয়া না পাওয়ার হিসেব যেন অন্যতর কোনও দুনিয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, এর আট বছর পরের ছবি অরণ্যের দিনরাত্রির তরুণের স্বপ্ন, সেই “ইয়ুথ” কোথায় গিয়ে পৌঁছল? আমরা দেখব, পরবর্তী পর্বে। —চলবে।

* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content