
ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।
কৃষ্ণ, ভীম ও অর্জুনকে সঙ্গে নিয়ে, মগধরাজ্যে পৌঁছে, রাজধানীর সার্বিক উন্নতি লক্ষ্য করলেন। কেমন ছিল সেই রাজধানী? কৃষ্ণের বর্ণনানুসারে, সেখানে রয়েছে প্রচুর পশু, জলের অভাব নেই। রোগহীন, সুন্দর বাড়িঘরে সমৃদ্ধ, কল্যাণময় বাতাবরণবিশিষ্ট মগধরাজধানীর শোভা বেশ উজ্জ্বল। সৌন্দর্যের কারণ বৈহার, বিপুল, বরাহ, বৃষভ এবং চৈতক নামে পাঁচটি পাহাড়। এই পর্বতগুলি, পাঁচটি মহাশিখরযুক্ত ও বহু (ছায়াশীতল) শীতল তরুবিশিষ্ট। পর্বতগুলি সকলে মিলে সংহতভাবে ওই গিরিব্রজ নামে নগরটিকে রক্ষা করছে। মনোহর পাহাড়গুলি লুকিয়ে রেখেছে, মনোহর লোধ্রফুলের বন। এর ফুলেভরা শাখায় আছে সুগন্ধি,কামিমানুষদের প্রিয় ফুলরাশি। এখানে গৌতমের পিতা ব্রতনিষ্ঠ, মহান, দীর্ঘতমা মুনি ঔশীনরীর (শূদ্রাদাসী) গর্ভে কাক্ষীবান প্রভৃতি পুত্রের জন্ম দিয়েছিলেন। দীর্ঘতমামুনি (রাজার প্রতি প্রীতিহেতু) রাজার আবাসে থেকে, মগধরাজকুলের প্রতি অনুগ্রহবশত, মগধরাজবংশের সেবা করতে লাগলেন। অঙ্গ, বঙ্গের মহাবলশালী (দীর্ঘতমার ঔরসজাত) রাজারা, দীর্ঘতমার গৃহে এসে বাল্যকালে খেলা করতেন। কৃষ্ণ, দীর্ঘতমামুনির বাড়ির কাছের অশ্বত্থ ও লোধ্রপূর্ণ, মনোরম, শুভ তরুরাজির প্রতি, পার্থ অর্জুনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন।তিনি জানালেন,এর কাছেই আছে,শত্রুদের ত্রাস অর্বুদ, শক্রবাপী নামে দুই নাগ এবং স্বস্তিক ও মণিনাগের শ্রেষ্ঠ বাসস্থান। প্রজাপতি ব্রহ্মার, সৃষ্ট মেঘ, মগধদেশটির জন্য অপরিহার্য ছিল।কৌশিক এবং মণিমান্, এই দুই মুনির অনুগ্রহধন্য ছিল মগধরাজ্য।কৃষ্ণ, মগধরাজসম্বন্ধে আরও তথ্য জানালেন। মগধরাজ জরাসন্ধ, মনে করেন, তিনি অতুলনীয় স্বার্থসিদ্ধি লাভ করেছেন। কৃষ্ণ ঘোষণা করলেন,আমরা এই সত্য জেনে নিয়ে আজ তাঁর দর্প হরণ করি। বয়মাসাদনে তস্য দর্পমদ্য হরেমহি। এই বলে মহাতেজস্বী সকল ভাইরা (কৃষ্ণ এবং ভীম ও অর্জুন), মগধের রাজধানীর উদ্দেশে যাত্রা করলেন।
হৃষ্টপুষ্টমানুষে অধ্যুষিত, রাজধানী গিরিব্রজনগরটিতে ছিল চতুর্বর্ণের বাস। সর্বদা উৎসবমুখর এবং দুরতিক্রম্য সেই নগরে তাঁরা প্রবেশ করলেন। একটি উঁচু পাহাড়ে পৌঁছেলেন। সেখানে প্রবেশদ্বারের অভাব ছিল। কৃষ্ণ ও দুই পাণ্ডবভাই, বৃহদ্রথরাজবংশীয় এবং মগধবাসীদের সম্মানিত সেই মনোরম চৈত্যকপর্বতের ভিতরে এসে উপস্থিত হলেন। সেখানে জরাসন্ধের পিতা বৃহদ্রথ,মাংসভোজী বৃষরূপধারী এক অসুরকে পেয়ে,তাকে হত্যা করেছিলেন। তার মাংসের ভিতরের নাড়ি ও চামড়া দিয়ে তিনটি ভেরী (বাদ্যযন্ত্র দুন্দুভি) নির্মাণ করে, সেগুলি তিনি নগরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। স্বর্গীয়ফুলসজ্জিত সেই ভেরীগুলি (বাদ্যযন্ত্রের) শব্দ করত। প্রতিহিংসার ইচ্ছা নিয়ে কৃষ্ণের সঙ্গে দুই পাণ্ডব, যেন মগধবাসীদের মাথায় আঘাত করবার লক্ষ্যে সুন্দর চৈত্যক পর্বতে আশ্রয় নিলেন। পর্বতের নিশ্চল, স্থূল, শিখরটি ছিল অতিদীর্ঘ এবং পুরানো, গন্ধদ্রব্য ও মালা দিয়ে সর্বদাই পূজিত এবং সুরক্ষিত। বীরগণ (কৃষ্ণ ও তাঁর দল), তাঁদের বিশাল বাহু দিয়ে সেগুলি ভেঙ্গে দিলেন। তারপরে তাঁরা সন্তুষ্ট হয়ে মগধের নগরটিতে প্রবেশ করলেন। এই সময়ে প্রতাপান্বিত জরাসন্ধ, কোন যজ্ঞে দীক্ষিত (প্রবৃত্ত) হয়ে, ব্রহ্মচর্যের নিয়ম পালন করছিলেন। তাই উপবাসজনিত কারণে ক্ষীণদেহ হয়েছিলেন। কৃষ্ণ এবং পাণ্ডবভাই দু’ জন, ব্রহ্মচর্যের শেষে যেন তাঁরা স্নাতকব্রাহ্মণ, এমন বেশে, শস্ত্রবিহীন অবস্থায়, একমাত্র বাহুবলমাত্র সম্বল করে,যুদ্ধে উৎসুক হয়ে সেখানে প্রবেশ করলেন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫০: দণ্ডকারণ্যে শূর্পনখা—একটি নাটকীয় চমক ও দ্বৈতসত্তায় অনন্য রাম

দোলি হ্যায়!

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৩ : অপারেশন উদ্বাস্তু এবং গুরু-শিষ্য সংবাদ

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৭ : ঘুঘুর ফাঁদ
তাঁরা ভোজ্যদ্রব্য ও মালা প্রভৃতি সমস্ত কাঙ্খিত সামগ্রীতে সমৃদ্ধ দোকানগুলির অনন্য সৌন্দর্য দেখতে লাগলেন। শ্রেষ্ঠ পুরুষ কৃষ্ণ, ভীম ও অর্জুন, তরুসজ্জিত পথে চলমান অবস্থায়, সেগুলির সমৃদ্ধি দেখতে দেখতে এক মালীর থেকে বলপ্রয়োগ করে,মালা ও অঙ্গের প্রসাধন দ্রব্য ছিনিয়ে নিলেন। তাঁরা, পরিধেয়বসনগুলি রং দিয়ে রাঙিয়ে নিলেন, গলায় মালা পড়ে, পরিষ্কার করে নিলেন কুণ্ডলগুলি। হিমালয়ের সিংহরা, গোশালাকে যে নজরে দেখে, ঠিক তেমনই, বুদ্ধিমান জরাসন্ধের ভবনটি নজরবন্দী করে তাঁরা সেখানে উপস্থিত হলেন। বাহুবলে বলী, কৃষ্ণ, ভীম ও অর্জুনের শালস্তম্ভতুল্য চন্দন ও অগরুরঞ্জিত বাহুগুলি ছিল দর্শনীয়। হাতির মতো বলবান,শালগাছের মতো কাঁধ ও বিশাল বুক যাঁদের, তাঁদের দেখে মগধবাসীরা বিস্মিত হলেন। তিনজন, জনবহুল তিনটি বীথিপথ অতিক্রম করে, উদ্বেগহীন হয়ে সগর্বে রাজার কাছে হাজির হলেন।
আরও পড়ুন:

সংসার ভেঙে… চলে গেলেন শঙ্কর

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৫: ত্রিপুরায় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রভাব
তাঁরা (ছদ্মবেশ ধারণহেতু) পাদ্য, মধুপর্ক ও গোদানগ্রহণের যোগ্য (স্নাতকব্রাহ্মণ) প্রার্থী ছিলেন। তাই রাজা জরাসন্ধ, উঠে দাঁড়িয়ে যথানিয়মে তাঁদের সম্বর্ধনা জানালেন। রাজা বললেন, আপনাদের স্বাগত জানাই। স্বাগতং বোঽস্ত্বিতি। বৃহদ্রথপুত্র রাজশ্রেষ্ঠ মহাপরাক্রমশালী ও যুদ্ধজয়ী জরাসন্ধের পৃথিবী জুড়ে বিশেষ খ্যাতি ছিল এই মর্মে যে, তিনি নিষ্ঠাসহকারে (ব্রহ্মচর্যের শেষে) স্নাতকব্রাহ্মণদের আগমনবার্তা শুনে, অর্দ্ধরাত্রিতেও নিজে তাঁদের অভ্যর্থনা জানাতেন। নৃপশ্রেষ্ঠ জরাসন্ধ, তাঁদের এমন অপূর্ববেশে দেখে, (আসনদান প্রভৃতি) সম্মান প্রদর্শন করলেন। তিনি বিস্মিতও হলেন। রাজাকে দেখে পুরুষশ্রেষ্ঠ এবং শত্রুনিহন্তা কৃষ্ণ,ভীম ও অর্জুন বললেন, স্বস্ত্যস্তু কুশলং রাজন্নিতি হে রাজন্ আপনার কল্যাণ হোক, কুশল হোক। এই শুভকামনা জানিয়ে তাঁরা পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করলেন। রাজা জরাসন্ধ, ছদ্মবেশী যাদব কৃষ্ণ ও পাণ্ডবদের আসন গ্রহণ করতে অনুরোধ জানালেন। মহাযজ্ঞে কান্তিমান অগ্নিত্রয়তুল্য (যজ্ঞের দক্ষিণাগ্নি, গার্হপত্যাগ্নি ও আহবনীয়াগ্নি), অত্যন্ত উদ্দীপিত (বিশেষ কাজের দরুণ) উৎসাহী, যাদব ও পাণ্ডবদের সম্মিলিত ত্রয়ী, সেখানে উপবেশন করলেন। সত্যনিষ্ঠ রাজা জরাসন্ধ বিশেষভাবে ধিক্কার দিয়ে, ছদ্মবেশধারণের ফলে বিকৃত-আকার তাঁদেরকে বললেন, এই পৃথিবীতে সকলের জানা আছে, স্নাতকব্রতধারী ব্রাহ্মণরা বাইরে মালা ও অনুলেপনে অভ্যস্ত নন— আমারও এই বিষয়ে পূর্ণ জ্ঞান আছে। ন স্নাতকব্রতা বিপ্রা বহির্মাল্যানুলেপনাঃ। ভবন্তীতি নৃলোকেঽস্মিন্ বিদিতং মম সর্বশঃ।। জরাসন্ধ যেন সন্দেহপ্রবণ হয়ে প্রশ্ন করলেন, কে যূয়ং মাল্যবন্তশ্চ ভুজৈর্জ্যাঘাতকর্কশৈঃ। বিভ্রান্ত ক্ষাত্রমোজশ্চ ব্রাহ্মণ্যমিহ শংসত।।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪১: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — গড়িয়োল

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৯ : দুই সাপের বিবাদ ও রাজকন্যার গুপ্তধন লাভ! প্রাকারকর্ণের চাণক্য-নীতিতে মুগ্ধ উলূকরাজ
মালা ধারণ করেছেন অথচ হাতগুলি ধনুকের জ্যা-আকর্ষণজনিত কারণে কঠোরাকৃতি, আবার ক্ষত্রিয়সুলভ তেজও ধারণ করছেন,আপনারা কে? আপনাদের পরিধেয়বসন বিচিত্র রঙে রাঙানো, বাইরে মালা ও অনুলেপনের প্রসাধন।বোধ হয়, কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে রাজা প্রশ্ন তুললেন, *সত্যং বদত কে যূয়ং সত্যং রাজসু শোভতে।* সত্য বলুন,আপনারা কে? কারণ, সত্যাবলম্বন রাজাদের শোভা হয়ে থাকে। জরাসন্ধের প্রশ্ন—তাঁরা চৈতকপর্বতের শিখরটি ভেঙ্গেছেন। এই কারণে রাজার কাছে অপরাধী প্রতিপন্ন হয়েও, নির্ভীকভাবে ছদ্মবেশে (যেটি দ্বার নয়) এমন অদ্বার দিয়ে প্রবেশ করেছেন, কেন? ব্রাহ্মণের মুখের কথায় নিহিত আছে ব্রাহ্মণের শক্তি, এ কাজ তো অন্য কোন বর্ণের (ক্ষত্রিয়ের) কাজের পরিচয় বহন করছে। এই বিষয়ে নিজেদের জ্ঞানবুদ্ধি অনুসারে তাঁরা কি বলেন? জরাসন্ধ, কৃষ্ণ এবং পাণ্ডবদের দুই ভাইকে জিজ্ঞাসা করলেন, তাঁরা এইভাবে উপস্থিত হয়েছেন, তবুও রাজা তাঁদের যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করেছেন। তবু তাঁরা কেন সেই পূজা গ্রহণ করলেন না? কোন প্রয়োজনে তাঁরা এখানে এসেছেন? বাক্যপ্রয়োগে নিপুণ, উদারমনা কৃষ্ণ, স্নিগ্ধ ও মধুর স্বরে প্রত্যুত্তর শুরু করলেন। রাজার কাছে, তাঁদের পরিচয়—তাঁরা স্নাতক ব্রাহ্মণমাত্র। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্যরা স্নাতক ব্রহ্মচারী এবং স্নাতক ব্রতধারী হয়ে থাকেন। কৃষ্ণ জানালেন, এই বিষয়ে বিশেষ নিয়ম যেমন আছে, সাধারণ নিয়মেরও অভাব নেই। বিশেষ নিয়মের আয়ত্তাধীন ক্ষত্রিয়রা সর্বদাই সমৃদ্ধি লাভ করে থাকেন। মালা ধারণ করেন যে ক্ষত্রিয়রা, সম্পদ নিশ্চিতভাবেই তাঁদের অধীন। তাই আমরা মালা ধারণ করেছি। ক্ষত্রিয়ের বাহুতে বল,কিন্তু সে বাক্যে পটু নয় মোটেই। তাই তাঁদের মতো অপ্রগলভ কথা অর্থাৎ কৌশলহীন কথাচালাচালি করে চলেছি। স্বয়ং ব্রহ্মা ক্ষত্রিয়ের শক্তির উৎস বাহুবল প্রদান করেছেন। রাজা প্রত্যক্ষ করতে ইচ্ছুক হলে, আজই সেটি নিঃসংশয়ে দেখতে পাবেন। ধীর প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি, অদ্বার দিয়ে শত্রুদের গৃহে এবং দ্বার দিয়ে মিত্রালয়ে প্রবেশ করেন। এগুলি ধর্মের দ্বার বলে মনে করা হয়। কৃষ্ণ যেন কিছুটা দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, কাজের সূত্রে আমরা এই গৃহে এসেছি। শত্রুতাবশত আপনার প্রদত্ত সম্মান গ্রহণ করিনি।আপনার অবগতির জন্যে জানাই, এটাই আমাদের চিরকালীন নিয়ম। কার্য্যবন্তো গৃহানেত্য শত্রুতো নার্হণাং বয়ম্। প্রতিগৃহ্ণীম তদ্বিদ্ধি এতন্নঃ শাশ্বতং ব্রতম্।।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৬ : অগ্নি সংস্কার

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
স্বেচ্ছাচারী এবং অন্যান্য রাজাদের ত্রাস,রাজা জরাসন্ধের রাজ্য ও রাজধানীটি তাঁর সমৃদ্ধির প্রতীক। পাঁচটি পাহাড় যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজধানী গিরিব্রজ নগরটিকে সুরক্ষিত রেখেছে। মগধরাজ্যের প্রাকৃতিক দৃশ্য মনোরম। গুণীজন-অধ্যুষিত মগধদেশটি।এই সবকিছুর অধীশ্বর, অপ্রতিহত ক্ষমতাশীল মগধরাজ মনে করেন,তাঁর স্বার্থসিদ্ধির অনুকূল যা কিছু সবই তাঁর আয়ত্তাধীন। কৃষ্ণ এবং ভীম ও অর্জুন, রাজাদের সন্ত্রাস, জরাসন্ধকে দমন করতে ছদ্মবেশে এসেছেন মগধরাজ্যে। জরাসন্ধের জীবন মহাদেবের আশীর্বাদধন্য,তিনি মুনি দীর্ঘতমা ও অন্যান্য মুনিদের অনুগ্রহ লাভ করেছেন। তবু রাজা জরাসন্ধের হয়তো উচ্চাশার শেষ নেই, তাই তিনি আরও দৈব আনুকূল্যের প্রত্যাশী হয়েছেন। নির্দিষ্ট লক্ষ্যপূরণের উদ্দেশে পরাজিত রাজাদের উৎসর্গ করবেন স্থির করেছেন। একদা তাঁর দ্বিখণ্ডিত দেহ যুক্ত করে তাঁকে জীবনদান করেছিল এক রাক্ষসী, তাই অসুরশক্তির ছায়া হয়তো তাঁর জীবনকে আবৃত করে রেখেছে। করুণাময়ী রাক্ষসীর সহানুভূতির স্পর্শে তিনি জীবন লাভ করেছেন। সাদা ও কালো দুই দ্বৈতসত্তার প্রতিফলন তাঁর ব্যক্তিত্বে। মুনিদের আশীর্বাদ তাঁর জীবনের আলোকিত শুভ্রতা,অমানবিক বিবেকহীনতা তাঁর চরিত্রে কলঙ্কিত কালো দিক। মানুষের অন্তর্লোকে এই দ্বৈতসত্তা বিরাজমান। মানুষের সেই দ্বৈতমানসিকতার প্রতীক যেন জরাসন্ধ। আসুরিক জৈবিক প্রবৃত্তি চরিতার্থতায় তার সম্পূর্ণতা লুকিয়ে থাকে, যার অন্তরালে ছায়া হয়ে রয়ে যায়, রাক্ষসী জরার মায়াময় সাদাকালোর মেলবন্ধনের সন্ধিক্ষণটি। অনেকসময়ে সন্ধি অর্থাৎ মিলন, শুভ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হলেও অনেকক্ষেত্রেই তার অকল্যাণময়,অশুভ পরিণতি ঘটে থাকে, সাদাকে জয় করে কালো। তাই জরাসন্ধের উপস্থিতি এখনও সর্বত্র।

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।
সদলবলে কৃষ্ণ, সমৃদ্ধ ও সুস্বাস্থ্যর অধিকারী মগধরাজ্যবাসীদের সুরক্ষাবলয়টি নিশ্চিহ্ন করতে চৈত্যকপাহাড়ের শীর্ষে আঘাত হানলেন। নাশকতা শুরু হল। অশুভর বিরুদ্ধে অভিযানে শুভশক্তির ছদ্ম আবরণ প্রয়োজন, এ যে চিরন্তন সত্য। কৃষ্ণ ও তাঁর সঙ্গীদের স্নাতকব্রাহ্মণবেশ, বুদ্ধিমান জরাসন্ধের প্রখরদৃষ্টিতে ধরা পড়েছে। তাঁদের দৈহিক আকৃতির সঙ্গে সাযুজ্যহীন বেশ দেখে, সাধারণ মগধবাসীরা বিস্মিত হয়েছেন, রাজার বুদ্ধিবৃত্তি তো বলাইবাহুল্য। তাই কৃষ্ণের সাগ্রহ কল্যাণকামনার প্রত্যুত্তরে রাজা জরাসন্ধ, সদলে সমাগত ব্রাহ্মণবেশীদের স্বাগত সম্ভাষণ জানিয়েছেন। জরাসন্ধ কিন্তু তাঁর সৌজন্যবোধ বিসর্জন দেননি। তারপরে ছদ্মবেশধারীদের সন্দেহের কারণগুলি সযৌক্তিক ব্যাখ্যা করেছেন। ক্ষত্রিয়রা যেন রাজনীতিবিদদের প্রতিনিধিত্ব করছেন। রাজনীতির ময়দানে খেলা সর্বদাই কি পরিচ্ছন্ন হয়? সেখানে আছে ছদ্ম আবরণ, মেকি প্রতিশ্রুতি, অসত্যের আশ্রয়,নাশকতার বীজবপন, প্রবেশদ্বারে কারচুপি এমন সব জটিলতা। জরাসন্ধের শাণিত যুক্তির ধারে, কৃষ্ণ ও তাঁর সঙ্গীদের ছদ্মবেশ ছিন্ন হয়েছে, তাঁরা ধরা পড়েছেন। নগ্নতা কি ঢেকে রাখা যায়? তাই শুরু হল দুই নিপুণ রাজনীতিবিদের কূটনৈতিক চাল, কথার লড়াই, যার লক্ষ্য অবিলম্বে একটি রাজশক্তিকে নির্মূল করা এবং সেই সঙ্গে শুরু হল প্রতিপক্ষের প্রতিরোধের প্রস্তুতি। রাজনীতিতে এমন বাগবিতণ্ডা চলতেই থাকে, ঐতিহাসিক জয়পরাজয়ের নিরিখে, উত্থানপতনের নতুন কোন সূচনার সন্ধিক্ষণে সেটি শেষ হয়। মহাভারতে জরাসন্ধের কাহিনিটি তেমনই কোনও এক আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা যায় কী?—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।


















