
ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।
মহর্ষি অত্রির আশ্রমের তপস্বীগণের নির্দেশানুসারে সংযতচিত্ত, দুর্দ্ধর্ষ, রাম, গভীর দণ্ডকারণ্যে প্রবেশ করলেন। সেখানে তিনি ঋষিগণের বহু আশ্রম দেখলেন। আশ্রমে কুশ বল্কল ছড়িয়ে রয়েছে, গগনমণ্ডল, নগ্নদৃষ্টিদ্বারা নিরীক্ষণ করা দুঃসাধ্য, যেন ব্রাহ্মী শ্রী বিরাজমান সেখানে। সকল প্রাণীর আশ্রয় আশ্রমটি, চতুর্দিকে সুষম পরিষ্কৃত প্রাঙ্গণে শোভিত, পশুপাখিসমাকীর্ণ। নৃত্যরত অপ্সরারা, আশ্রমটির গৌরব বৃদ্ধি করেছে। পবিত্র হোমকুণ্ড ও হোমভাণ্ড, বল্কল ও কুশ, যজ্ঞের সমিৎ কাঠ, জলকলস, ফলমূল প্রভৃতির দ্বারা আশ্রমটি পরিবেষ্টিত। সেখানে বনজ বিশাল মহীরুহগুলি ছিল সুস্বাদুফলে পরিপূর্ণ। আহুতির পূত হোমাগ্নি ও বেদপাঠধ্বনির নিনাদে মুখরিত ছিল আশ্রম। সেখানে কোথাও বিক্ষিপ্ত কুসুমরাজি,কোথাও বা কমলদলপূর্ণ সরোবর রয়েছে। আশ্রমে রয়েছেন, বয়োবৃদ্ধ সংযতেন্দ্রিয় বল্কল ও কৃষ্ণাজিনধারী মুনিগণ, যাঁদের আহার্য শুধু ফলমূল, তাঁরা সূর্য ও অগ্নিতুল্য দীপ্তিময়।
আশ্রমশোভা ছিলেন নিয়ত পরিমিত ভোজ্যগ্রহণে অভ্যস্ত মাননীয় পূত ব্রহ্মর্ষিগণ। তাঁদের উচ্চারিত বেদধ্বনিতে নিনাদিত আশ্রম যেন ব্রহ্মলোক বলে প্রতিভাত হচ্ছে। এই শ্রদ্ধেয় তাপসগণের শোভা দর্শন করে, লক্ষ্মীমন্ত, মহাতেজস্বী রাম, তাঁর মহাধনুকটি জ্যামুক্ত করে অগ্রসর হলেন। সেই মহান, অলৌকিক দিব্যজ্ঞানাধিকারী ঋষিগণ, রাম ও যশস্বিনী বৈদেহী সীতার দর্শনে প্রীত হয়ে, অগ্রসর হলেন। নবোদিত চন্দ্রতুল্য সুদর্শন ধার্মিক ব্রতনিষ্ঠ তাঁরা, রাম লক্ষ্মণ ও বৈদেহী, সকলের প্রতি শুভ আশীর্বাণী উচ্চারণ করে, সম্বর্ধনা জানালেন।বনবাসীরা রামের রূপমাধুর্য, কান্তি, সৌন্দর্য ও সুন্দর বেশ নিরীক্ষণ করে, বিস্ময়াবিষ্ট হলেন। আশ্চর্যান্বিত বনবাসীবৃন্দ বৈদেহী সীতা, লক্ষ্মণ ও রামকে, অনিমেষনয়নে দেখতে থাকলেন।
আশ্রমশোভা ছিলেন নিয়ত পরিমিত ভোজ্যগ্রহণে অভ্যস্ত মাননীয় পূত ব্রহ্মর্ষিগণ। তাঁদের উচ্চারিত বেদধ্বনিতে নিনাদিত আশ্রম যেন ব্রহ্মলোক বলে প্রতিভাত হচ্ছে। এই শ্রদ্ধেয় তাপসগণের শোভা দর্শন করে, লক্ষ্মীমন্ত, মহাতেজস্বী রাম, তাঁর মহাধনুকটি জ্যামুক্ত করে অগ্রসর হলেন। সেই মহান, অলৌকিক দিব্যজ্ঞানাধিকারী ঋষিগণ, রাম ও যশস্বিনী বৈদেহী সীতার দর্শনে প্রীত হয়ে, অগ্রসর হলেন। নবোদিত চন্দ্রতুল্য সুদর্শন ধার্মিক ব্রতনিষ্ঠ তাঁরা, রাম লক্ষ্মণ ও বৈদেহী, সকলের প্রতি শুভ আশীর্বাণী উচ্চারণ করে, সম্বর্ধনা জানালেন।বনবাসীরা রামের রূপমাধুর্য, কান্তি, সৌন্দর্য ও সুন্দর বেশ নিরীক্ষণ করে, বিস্ময়াবিষ্ট হলেন। আশ্চর্যান্বিত বনবাসীবৃন্দ বৈদেহী সীতা, লক্ষ্মণ ও রামকে, অনিমেষনয়নে দেখতে থাকলেন।
অতঃপর সর্বপ্রাণীর কল্যাণকামী, মহান, ঋষিগণ, অতিথি রাঘব রামকে, পর্ণশালায় স্থান দিলেন। উদারমনা অগ্নিপ্রতিম সেই ঋষিগণ রামকে সমাদরসহকারে জলদান করলেন। মাঙ্গলিক মন্ত্রোচ্চারণ করে, পরমানন্দে, মহানহৃদয়, ধার্মিক মহর্ষিগণ, ফলমূলপুষ্পাদি এমন কি সমগ্র আশ্রমটি রামকে নিবেদন করে, করজোড়ে বললেন—রাজা মহান কীর্তির অধিকারী, কারণ তিনি ধর্মরক্ষক, দণ্ডধারণ করেন, তাই তিনি সকল লোকের পরিত্রাতারূপে বন্দিত ও সম্মানিত হয়ে থাকেন। দেবরাজ ইন্দ্রের চতুর্থাংশ রাজা, প্রজাদের রক্ষা করেন। সেইহেতু পূজনীয় রাজা, শ্রেষ্ঠ ভোগ্য বস্তু উপভোগ করে থাকেন। তাই রামের রাজ্যনিবাসী ঋষিদের রক্ষা করা তাঁর কর্তব্য। নরেন্দ্র রাম, নগরে বা অরণ্যে যেখানেই অবস্থান করুন, তিনিই তাঁদের রাজা। দমননীতি তপস্বীগণের জন্য নয়, তাঁরা ক্রোধজয়ী, সংযতেন্দ্রিয়, তপস্যা তাঁদের একমাত্র ধন। তাই গর্ভস্থ ভ্রূণের মতো ঋষিগণ আত্মরক্ষায় অসমর্থ। তাই তাঁদের রক্ষা করা,রামের কর্তব্য। এই বলে ফলমূল পুষ্প এবং অন্যান্য বিবিধ বন্য-আহার্যের অর্ঘ্য দিয়ে লক্ষ্মণসহ রামকে সম্মানিত করলেন তাঁরা। অনলসদৃশ, ন্যায়ানুসারী, অন্যান্য তাপস ও সিদ্ধপুরুষগণ যথাবিধি প্রভু রামকে পরিতুষ্ট করতে লাগলেন।
পরদিন সূর্যোদয়ের পরে আশ্রমস্থ মুনিদের সম্মতিক্রমে রাম,বনে প্রবেশ করলেন। অরণ্যে কি দেখলেন রাম ও লক্ষ্মণ? নানা মৃগসঙ্কুল,বাঘ ও ভল্লুকের বিচরণভূমি, ইতস্ততঃ বিনষ্ট বৃক্ষলতাগুল্মসমাকীর্ণ, জলাশয়গুলি দৃষ্টিগোচর নয়, পাখিরা কূজনবিহীন, অবিরাম ঝিল্লীরবে মুখর, এমনই ছিল সেই অরণ্যভূমি। সেই ভয়ঙ্করপ্রাণীবিশিষ্ট মহারণ্যে উৎকটশব্দকারী, এক পর্বতশৃঙ্গসদৃশ (দীর্ঘাকৃতি) রাক্ষস, সীতার সঙ্গে রামের দৃষ্টিগোচর হল। রাক্ষসের চক্ষু গভীর, বিকট মুখমণ্ডল, উৎকট উদর, কদর্য বিষম দীর্ঘ বিকৃত বীভৎসাকৃতি রাক্ষসটির পরণে ছিল চর্বির রসসিক্ত ও রক্তাক্ত ব্যাঘ্রচর্ম। মুখবিবর বিস্তৃত করে, যমতুল্য রাক্ষসটি সকল প্রাণীদের ত্রাস সৃষ্টি করছিল।
লৌহশূলবিদ্ধ তিনটি সিংহ, চারটি বাঘ, দুটি বৃক (নেকড়ে বাঘ), দশটি পৃষৎমৃগ (চিতল হরিণ), দন্তযুক্ত চর্বিলিপ্ত প্রকাণ্ড হস্তীমুণ্ড, এই সব নিয়ে, সে ঘোররবে চিৎকার করছিল। রাম, লক্ষ্মণ ও সীতাকে দেখে, মনুষ্যসংহারকারী কালতুল্য রাক্ষস, সক্রোধে মহাবেগে ধাবিত হল। ভয়ঙ্করশব্দে, মৃত্তিকা প্রকম্পিত করে, বৈদেহীকে ক্রোড়ে তুলে নিয়ে, কিছুটা সরে গিয়ে বললেন, জটা ও বল্কল পরিধানে, অথচ হাতে রয়েছে ধনুর্বাণ, ক্ষীণজীবী তোরা ভার্যা সহ দণ্ডকারণ্যে প্রবেশ করেছিস। তোরা দু’জন তপস্বী, অথচ একজন নারীর সঙ্গে সহবাস। অধর্মচারী, পাপী, মুনিবৃত্তি কলুষিত করছিস, তোরা দুজন কে? কথং তাপসয়োর্বাঞ্চ বাসঃ প্রমদয়া সহ। অধর্ম্মচারিণৌ পাপৌ কৌ যুবাং মুনিদূষকৌ।।
পরদিন সূর্যোদয়ের পরে আশ্রমস্থ মুনিদের সম্মতিক্রমে রাম,বনে প্রবেশ করলেন। অরণ্যে কি দেখলেন রাম ও লক্ষ্মণ? নানা মৃগসঙ্কুল,বাঘ ও ভল্লুকের বিচরণভূমি, ইতস্ততঃ বিনষ্ট বৃক্ষলতাগুল্মসমাকীর্ণ, জলাশয়গুলি দৃষ্টিগোচর নয়, পাখিরা কূজনবিহীন, অবিরাম ঝিল্লীরবে মুখর, এমনই ছিল সেই অরণ্যভূমি। সেই ভয়ঙ্করপ্রাণীবিশিষ্ট মহারণ্যে উৎকটশব্দকারী, এক পর্বতশৃঙ্গসদৃশ (দীর্ঘাকৃতি) রাক্ষস, সীতার সঙ্গে রামের দৃষ্টিগোচর হল। রাক্ষসের চক্ষু গভীর, বিকট মুখমণ্ডল, উৎকট উদর, কদর্য বিষম দীর্ঘ বিকৃত বীভৎসাকৃতি রাক্ষসটির পরণে ছিল চর্বির রসসিক্ত ও রক্তাক্ত ব্যাঘ্রচর্ম। মুখবিবর বিস্তৃত করে, যমতুল্য রাক্ষসটি সকল প্রাণীদের ত্রাস সৃষ্টি করছিল।
লৌহশূলবিদ্ধ তিনটি সিংহ, চারটি বাঘ, দুটি বৃক (নেকড়ে বাঘ), দশটি পৃষৎমৃগ (চিতল হরিণ), দন্তযুক্ত চর্বিলিপ্ত প্রকাণ্ড হস্তীমুণ্ড, এই সব নিয়ে, সে ঘোররবে চিৎকার করছিল। রাম, লক্ষ্মণ ও সীতাকে দেখে, মনুষ্যসংহারকারী কালতুল্য রাক্ষস, সক্রোধে মহাবেগে ধাবিত হল। ভয়ঙ্করশব্দে, মৃত্তিকা প্রকম্পিত করে, বৈদেহীকে ক্রোড়ে তুলে নিয়ে, কিছুটা সরে গিয়ে বললেন, জটা ও বল্কল পরিধানে, অথচ হাতে রয়েছে ধনুর্বাণ, ক্ষীণজীবী তোরা ভার্যা সহ দণ্ডকারণ্যে প্রবেশ করেছিস। তোরা দু’জন তপস্বী, অথচ একজন নারীর সঙ্গে সহবাস। অধর্মচারী, পাপী, মুনিবৃত্তি কলুষিত করছিস, তোরা দুজন কে? কথং তাপসয়োর্বাঞ্চ বাসঃ প্রমদয়া সহ। অধর্ম্মচারিণৌ পাপৌ কৌ যুবাং মুনিদূষকৌ।।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৯: শকুন্তলারা আজও আছেন

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩১: যে পালিয়ে বেড়ায়

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৩৩: আকাশ এখনও মেঘলা

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৪: ‘শিলালিপি সংগ্ৰহ’ গ্রন্থ অতীতের ত্রিপুরা নিয়ে গবেষণার দিশারী
রাক্ষস জানাল, সে বিরাধ নামে রাক্ষস। প্রত্যহ ঋষিগণের মাংস ভক্ষণ করে, সশস্ত্র হয়ে সে এই দুর্গমারণ্যে বিচরণ করে। এই নারী উত্তমাঙ্গনা, সে হবে আমার ভার্যা। যুদ্ধে তোদের, দুই পাপীর, রক্ত পান করব আমি। ইয়ং নারী বরারোহা মম ভার্য্যা ভবিষ্যতি। যুবয়োঃ পাপয়োশ্চাহং পাস্যামি রুধিরং মৃধে।। দুরাত্মা বিরাধের ঔদ্ধত্যপূর্ণ কুপ্রস্তাব শুনে, জনকতনয়া সীতা বিহ্বল হলেন। বিরাধের ক্রোড়ে, বায়ুবেগে প্রকম্পিতা কদলীবৃক্ষসদৃশী উদ্বিগ্না, সাধ্বী, সীতাকে দেখে, শুষ্কমুখে রাম, লক্ষ্মণকে বললেন, সৌম্য লক্ষ্মণ দেখুন, জনকাত্মজা, পবিত্র শুদ্ধাচারিণী ভার্যা সীতা, অত্যন্ত সুখে লালিতা যশস্বিনী রাজকন্যা, যিনি রামের পরম অভিপ্রেতা প্রিয়া। তিনি বিরাধের ক্রোড়ে, তার আয়ত্তাধীনা হয়ে রয়েছেন। গভীর ক্ষোভে রাম যেন ভেঙে পড়লেন। কৈকেয্যাস্তু সুসংবৃত্তং ক্ষিপ্রমদ্যৈব লক্ষ্মণ। যা ন তুষ্যতি রাজ্যেন পুত্রার্থে দীর্ঘদর্শিনী।। যয়াহং সর্ব্বভূতানাং প্রিয়ঃ প্রস্থাপিতো বনম্। অদ্যেদানীং সকামা সা যা মাতা মধ্যমা মম।।
কৈকেয়ীর অভীষ্ট, সুপরিকল্পনা অতি দ্রুত সম্পন্ন হল। দূরদর্শিনী যিনি, শুধু পুত্রের জন্য কাঙ্খিত রাজ্যেও তুষ্ট হননি। আমি সকলের প্রিয় ভরসার স্থান ছিলাম, তাই আমার অধিষ্ঠান হল বনে। আজ আমার মধ্যমা মাতার মনস্কামনা পূর্ণ হল। পিতা প্রয়াত হয়েছেন, তিনি নিজে রাজ্য হারিয়েছেন, বৈদেহীকে স্পর্শ করেছে পরপুরুষ-এর থেকে কষ্টকর আর কি আছে? দুঃখার্ত রাম এমন বলতে থাকলেন। লক্ষ্মণ অবরুদ্ধ সর্পের মতো নিঃশ্বাস ফেলে বলে চললেন, ইন্দ্রপ্রতিম রাম সর্বপ্রাণীর প্রভু, লক্ষ্মণতুল্য সেবকের উপস্থিতি সত্ত্বেও অনাথের মতো তাঁর এই অনুশোচনা কেন? এখনি যদি ক্রুদ্ধ হয়ে লক্ষ্মণ তাকে হত্যা করেন, নিষ্প্রাণ বিরাধের রক্ত পান করবে বসুন্ধরা। ইন্দ্র যেমন পর্বতের প্রতি বজ্র নিক্ষেপ করেন, তেমনই রাজ্যলোভী ভরতের প্রতি লক্ষ্মণের যে ক্রোধ হয়েছিল সেই ক্রোধ লক্ষ্মণ বিরাধের প্রতি নিক্ষেপ করবেন। তিনি ঘোষণা করলেন, তাঁর নিজ বাহুবলে নিক্ষিপ্ত শর, রাক্ষসের বিপুল বক্ষ বিদ্ধ করে, ভবলীলা সাঙ্গ করুক। রাক্ষস ঘূর্ণায়মান অবস্থায় ভূমিতে পতিত হোক।
কৈকেয়ীর অভীষ্ট, সুপরিকল্পনা অতি দ্রুত সম্পন্ন হল। দূরদর্শিনী যিনি, শুধু পুত্রের জন্য কাঙ্খিত রাজ্যেও তুষ্ট হননি। আমি সকলের প্রিয় ভরসার স্থান ছিলাম, তাই আমার অধিষ্ঠান হল বনে। আজ আমার মধ্যমা মাতার মনস্কামনা পূর্ণ হল। পিতা প্রয়াত হয়েছেন, তিনি নিজে রাজ্য হারিয়েছেন, বৈদেহীকে স্পর্শ করেছে পরপুরুষ-এর থেকে কষ্টকর আর কি আছে? দুঃখার্ত রাম এমন বলতে থাকলেন। লক্ষ্মণ অবরুদ্ধ সর্পের মতো নিঃশ্বাস ফেলে বলে চললেন, ইন্দ্রপ্রতিম রাম সর্বপ্রাণীর প্রভু, লক্ষ্মণতুল্য সেবকের উপস্থিতি সত্ত্বেও অনাথের মতো তাঁর এই অনুশোচনা কেন? এখনি যদি ক্রুদ্ধ হয়ে লক্ষ্মণ তাকে হত্যা করেন, নিষ্প্রাণ বিরাধের রক্ত পান করবে বসুন্ধরা। ইন্দ্র যেমন পর্বতের প্রতি বজ্র নিক্ষেপ করেন, তেমনই রাজ্যলোভী ভরতের প্রতি লক্ষ্মণের যে ক্রোধ হয়েছিল সেই ক্রোধ লক্ষ্মণ বিরাধের প্রতি নিক্ষেপ করবেন। তিনি ঘোষণা করলেন, তাঁর নিজ বাহুবলে নিক্ষিপ্ত শর, রাক্ষসের বিপুল বক্ষ বিদ্ধ করে, ভবলীলা সাঙ্গ করুক। রাক্ষস ঘূর্ণায়মান অবস্থায় ভূমিতে পতিত হোক।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯০: শত্রুকে হারাতে সব সময় অস্ত্র নয়, ছলনারও আশ্রয় নিতে হয়

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১০ : নায়ক ও মহাপুরুষ
রাম দণ্ডকারণ্যে নিভৃত কোন আশ্রয় খুঁজেছিলেন। হয়তো অযোধ্যার থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে, একান্তে জনচক্ষুর আড়ালে বনবাস যাপনের উদ্দেশে, তাঁর এই উদ্যোগ। বোধ হয়, এই লক্ষ্যপূরণের উদ্দেশে তাঁর হিংস্রশ্বাপদসঙ্কুল, রাক্ষস-অধ্যুষিত, গহনারণ্যে প্রবেশ। অরণ্যের ভয়াবহ পরিবেশ তাঁর মনে কোন ত্রাস সৃষ্টি করতে পারেনি। কারণ তিনি অপ্রতিহত দুর্দ্ধর্ষঃ এবং সেইসঙ্গে সংযমী আত্মবান্ অর্থাৎ আত্মস্থ। তিনি সেই ব্যক্তিত্ব যাঁকে দহিয়াছে অগ্নি তারে, বিদ্ধ করিয়াছে শূল, ছিন্ন তারে করেছে কুঠারে, সর্ব্ব প্রিয়বস্তু তার অকাতরে করিয়া ইন্ধন চিরজন্ম তারি লাগি জ্বেলেছে সে হোম-হুতাশন;— সংসারের ক্লেদ, প্রতারণা, বঞ্চনার আকস্মিক অনলে দগ্ধ হয়েছেন, যন্ত্রণায় বিদ্ধ হয়েছেন রাম, তাঁর বহুকাঙ্খিত রাজপদ বিসর্জন দিয়ে, দুঃখের আগুনে আত্মহোমের বহ্নি, তিনি নিজে প্রজ্জ্বলিত করেছেন। সংসারে এমন বিরলতম ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁরা এই আত্মহোমের বহ্নিতে শুধু নিজেদের বহু অভীপ্সিত বস্তু নয়, স্বাচ্ছন্দ্য, পার্থিব সুখ, জীবনের চলার পথে সুখের যা কিছু অনুষঙ্গ সব কিছু আহুতি দিয়ে নিঃস্ব হন। রাম হয়তো সেই ব্যতিক্রমীদের দলভুক্ত একজন।
রাম আশ্রমের পবিত্র পরিমণ্ডলে ঋষিগণের আদরণীয় অতিথি হয়েছেন। তাঁরা, রামকে পরমানন্দে স্থান দিয়েছেন তাঁদের পর্ণকুটিরে। তাঁদের সাধ্যানুযায়ী অতিথিসৎকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।বনবাসী রামকে রাজধর্মবিষয়ে অবহিত করলেন ধার্মিক মহর্ষিগণ। ধর্ম্মপালো জনস্যাস্য শরণ্যশ্চ মহাযশাঃ। পূজনীয়শ্চ মান্যশ্চ রাজা দণ্ডধরো গুরুঃ।। ধর্মের প্রতিভূ, মহাযশের অধিকারী, রাজা, সাধারণের আশ্রয়, তিনি বন্দিত ও মাননীয় এবং দণ্ডধারী গুরুপ্রতিম। হয়তো সেই কারণেই তাঁরা বন্দিত হন, শ্রেষ্ঠ ভোগ্য বস্তু উপভোগ করে থাকেন। শ্রেষ্ঠবস্তু উপভোগ, তার বিনিময়ের সাম্মানিক হল, সাধারণের সুরক্ষাদান। তাই হয়তো সেটি প্রশাসনিক আধিকারিকের অবশ্যকর্তব্যের পর্যায়ভুক্ত হতে পারে।
রাম আশ্রমের পবিত্র পরিমণ্ডলে ঋষিগণের আদরণীয় অতিথি হয়েছেন। তাঁরা, রামকে পরমানন্দে স্থান দিয়েছেন তাঁদের পর্ণকুটিরে। তাঁদের সাধ্যানুযায়ী অতিথিসৎকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।বনবাসী রামকে রাজধর্মবিষয়ে অবহিত করলেন ধার্মিক মহর্ষিগণ। ধর্ম্মপালো জনস্যাস্য শরণ্যশ্চ মহাযশাঃ। পূজনীয়শ্চ মান্যশ্চ রাজা দণ্ডধরো গুরুঃ।। ধর্মের প্রতিভূ, মহাযশের অধিকারী, রাজা, সাধারণের আশ্রয়, তিনি বন্দিত ও মাননীয় এবং দণ্ডধারী গুরুপ্রতিম। হয়তো সেই কারণেই তাঁরা বন্দিত হন, শ্রেষ্ঠ ভোগ্য বস্তু উপভোগ করে থাকেন। শ্রেষ্ঠবস্তু উপভোগ, তার বিনিময়ের সাম্মানিক হল, সাধারণের সুরক্ষাদান। তাই হয়তো সেটি প্রশাসনিক আধিকারিকের অবশ্যকর্তব্যের পর্যায়ভুক্ত হতে পারে।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩০: ঠাকুরবাড়ির জামাই রমণীমোহনকে মন্ত্রী করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৬: তালচোঁচ
মহর্ষিগণ, রামের প্রতি গভীর আস্থা প্রকাশ করে বলেছেন, রাজ্যবাসীদের রক্ষা করা রাজার কর্তব্য, নগরে বা বনে যেখানেই থাকুন রাম তাঁদের রাজা। তে বয়ং ভবতো রক্ষ্যা ভবদ্বিষয়বাসিনঃ। নগরস্থো বনস্থো বা ত্বং নো রাজা জনেশ্বরঃ।। এত যাঁদের তপশ্চর্যার শক্তি,যাঁরা ষড়রিপুর অন্যতম ক্রোধ জয় করেছেন এবং জিতেন্দ্রিয়, তাঁরা আত্মরক্ষায় সক্ষম নন, কেন? এ বিষয়ে তাঁরা রাজার মুখাপেক্ষী কেন?কারণ মহর্ষিগণ ন্যস্তদণ্ডাঃ তাঁরা দমননীতি পরিহার করেছেন। তাঁরা যে গর্ভস্থশিশুর মতোই আত্মরক্ষায় অক্ষম গর্ভভূতাস্তপোধনঃ তাঁদের রক্ষক প্রয়োজন। বিদ্যাচর্চা ও উচ্চচিন্তায় নিরত যাঁরা, তাঁদের সুরক্ষাদান, শুধু রাজা নয়, যে কোনও প্রশাসকের আবশ্যিক প্রশাসনিক কার্যের অন্তর্গত। ঋষিগণের রাজধর্মের উপদেশদানের মধ্যে বোধ হয় এই সকারণ চিরন্তন সত্য প্রতিফলিত হয়েছে।
বিপদসঙ্কুল ভয়াবহ গহনারণ্যে প্রবেশের মুহূর্তে রামচন্দ্র, সীতা ও লক্ষ্মণ, বিশালদেহী রাক্ষসের মুখোমুখি হয়েছেন। আকস্মিক ভয়ঙ্কর বিপদের অভিঘাত, এমনই বিপর্যস্ত করে তোলে জীবন। রামের জীবনের সুখ, শান্তি নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে তার ছায়া যেন রাক্ষস বিরাধের, সীতাকে ক্রোড়ে তুলে ছিনিয়ে নেওয়ার মধ্যে লক্ষিত হয়েছে। মানুষের দাম্পত্যজীবনের সুখ, শান্তি, নির্ভরতার জায়গা হলেন স্ত্রী। অরণ্যের কঠোর, বিপদসঙ্কুল অনিশ্চিত জীবনে, বৈদেহী সীতা সেই শান্তির গৃহকোণের নিভৃত দীপালোক, যাঁকে আশ্রয় করে, রাম, হয়তো, গ্লানিময় জীবনের ক্লেদাক্ত অন্ধকারমুক্ত হন। যে কোনও প্রতিকূলতা, তাঁকে ছিনিয়ে নেয় যদি, তবে সাধারণের মতোই অবলম্বনহীন রামের মনের অবস্থা কেমন হয়েছিল সেটি সহজেই অনুমান করা যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় বীর্যবান, আত্মশক্তিতে ভরপুর রামের আত্মবিশ্বাস এক মুহূর্তে ভেঙ্গে পরেছে। তাঁর মনে রয়েছে স্বজনকৃত বিশ্বাসভঙ্গের স্মৃতি।
বিপদসঙ্কুল ভয়াবহ গহনারণ্যে প্রবেশের মুহূর্তে রামচন্দ্র, সীতা ও লক্ষ্মণ, বিশালদেহী রাক্ষসের মুখোমুখি হয়েছেন। আকস্মিক ভয়ঙ্কর বিপদের অভিঘাত, এমনই বিপর্যস্ত করে তোলে জীবন। রামের জীবনের সুখ, শান্তি নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে তার ছায়া যেন রাক্ষস বিরাধের, সীতাকে ক্রোড়ে তুলে ছিনিয়ে নেওয়ার মধ্যে লক্ষিত হয়েছে। মানুষের দাম্পত্যজীবনের সুখ, শান্তি, নির্ভরতার জায়গা হলেন স্ত্রী। অরণ্যের কঠোর, বিপদসঙ্কুল অনিশ্চিত জীবনে, বৈদেহী সীতা সেই শান্তির গৃহকোণের নিভৃত দীপালোক, যাঁকে আশ্রয় করে, রাম, হয়তো, গ্লানিময় জীবনের ক্লেদাক্ত অন্ধকারমুক্ত হন। যে কোনও প্রতিকূলতা, তাঁকে ছিনিয়ে নেয় যদি, তবে সাধারণের মতোই অবলম্বনহীন রামের মনের অবস্থা কেমন হয়েছিল সেটি সহজেই অনুমান করা যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় বীর্যবান, আত্মশক্তিতে ভরপুর রামের আত্মবিশ্বাস এক মুহূর্তে ভেঙ্গে পরেছে। তাঁর মনে রয়েছে স্বজনকৃত বিশ্বাসভঙ্গের স্মৃতি।
আরও পড়ুন:

টিচার্স ডে

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান
রাজ্য, পিতা, সব কিছু হারিয়েছেন তিনি, পরপুরুষ স্পর্শ করেছে তাঁর প্রিয়া মৈথিলীকে— এই সব ঘটনার অভিঘাতে বিপর্যস্ত হয়েছেন রাম। হঠাৎ কোনও বিপর্যয়ের সম্মুখীন সাধারণ একজন গৃহস্থের মতোই দুঃখদীর্ণ রামের এই দুরবস্থায়, তাঁর অবতারত্ব নয়, ঘরোয়া মানবিক রূপ প্রকট হয়েছে। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর অপরিসীম শক্তিমত্তা প্রকাশ করে সীতার উদ্ধারে তৎপর হতে পারতেন। হতবুদ্ধি হয়েছেন তিনি। দুঃখকষ্টময় জীবনযুদ্ধে বিধ্বস্ত সাধারণের ভূমিকায়, রাম। অতিলৌকিক ক্ষমতার প্রকাশে নয়, একান্তনির্ভর পার্শ্বচর লক্ষ্মণের কাছে কষ্টভার লাঘবে,তাঁর বিনম্রতা প্রকাশিত হয়েছে। সেবক, অনুচর, ভাই, লক্ষ্মণ, হতোদ্যম জ্যেষ্ঠকে আশ্বস্ত করেছেন, উৎসাহিত করেছেন, অনাথ ইব ভূতানাং নাথস্ত্বং বাসবোপমঃ। ময়া প্রেষ্যেণ কাকুস্থ কিমর্থং পরিতপ্যসে।। রামের ভাবখানা যেন তিনি, প্রভুত্বহীন অনাথ। অথচ তিনি সব প্রাণীর রক্ষক।
সত্যিই প্রশাসকমাত্রই সব প্রাণীদের রক্ষক। তার ওপরে পাশে আছেন সেবক লক্ষ্মণ। অর্থাৎ বিশ্বস্ত অনুচর সঙ্গে থাকলেতো কথাই নেই। জীবনযুদ্ধে এমন উৎসাহ প্রয়োজন, হতবিধ্বস্ত মানুষের পিঠে একটি বিশ্বস্তহাতের স্পর্শের আবশ্যকতা নিশ্চয়ই আছে। এরপরেই আছে পটপরিবর্তনের সূচনা। আত্মবিশ্বাসী রামের সাহসী পদক্ষেপগ্রহণ, বিরাধের পতন, মানব থেকে অতিমানবে উত্তরণের একটি পর্যায়ক্রম। অনুভূতির প্রকাশে রাম সাধারণ মানুষ,বাহুবলের শক্তিমত্তায় তাঁর অলৌকিক সত্তার উদ্ভাস। সমাজজীবনেও এই দুইয়ের টানাপোড়েনে ভারতীয় জীবনের পথপরিক্রমা, যুগে যুগে, কালে কালে।— চলবে
সত্যিই প্রশাসকমাত্রই সব প্রাণীদের রক্ষক। তার ওপরে পাশে আছেন সেবক লক্ষ্মণ। অর্থাৎ বিশ্বস্ত অনুচর সঙ্গে থাকলেতো কথাই নেই। জীবনযুদ্ধে এমন উৎসাহ প্রয়োজন, হতবিধ্বস্ত মানুষের পিঠে একটি বিশ্বস্তহাতের স্পর্শের আবশ্যকতা নিশ্চয়ই আছে। এরপরেই আছে পটপরিবর্তনের সূচনা। আত্মবিশ্বাসী রামের সাহসী পদক্ষেপগ্রহণ, বিরাধের পতন, মানব থেকে অতিমানবে উত্তরণের একটি পর্যায়ক্রম। অনুভূতির প্রকাশে রাম সাধারণ মানুষ,বাহুবলের শক্তিমত্তায় তাঁর অলৌকিক সত্তার উদ্ভাস। সমাজজীবনেও এই দুইয়ের টানাপোড়েনে ভারতীয় জীবনের পথপরিক্রমা, যুগে যুগে, কালে কালে।— চলবে
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।


















