
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
শঙ্করকে চিঠি লিখেছেন বদ্যি বিশ্বাস। লিখেছেন, “কমরেড, উদ্বাস্তুরা আর মানুষ নেই। বিশেষ করে যারা সরকারি ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। জবরদখল কলোনির মানুষগুলো তবু লড়াই করে টিকে যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের চাষি থেকে স্কুল শিক্ষক—এককথায় গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত মানুষগুলো একেবারে সর্বহারা হয়ে পড়ছে। আমরা কমিউনিস্ট পার্টির মেম্বার। আজীবন সর্বহারার পাশে দাঁড়ানোর শপথ আমাদের। তাতে তোমাকেও সঙ্গী হিসেবে চাই শঙ্কর। কীভাবে কার কাছ থেকে তোমার সংবাদ আমরা পেয়েছি আপাতত তা গোপন থাক। তোমার সম্মতি ও সাক্ষাতের অপেক্ষায় রইলাম। সংগ্রামী অভিনন্দন সহ কমরেড বদ্যি বিশ্বাস।
চিঠিটা পড়তে পড়তে দিন থেকে রাত পার হয়ে যেতে পারে। তিলজলা বস্তির টিনের চালা ভেঙে বুঝি মিশে যাওয়া যাবে আকাশে। পাখির মতো ডানা মেলে উড়ে এক্ষুণি যদি পৌঁছে যাওয়া যেত চম্পারণ, নিদেনপক্ষে কুপার্স ক্যাম্পে! শঙ্করের ছাতি জুড়ে লক্ষ্য হাতির বল। গিজগিজ উদ্বাস্তুর মুখে একাই একশো জনের ক্ষমতা নিয়ে ও বুঝি ঢেঁকি ছাটা চালের গরম ভাত আর ডাল তরকারির ব্যবস্থা করতে পারে। স্বপ্নের পর স্বপ্ন। ছবির পর ছবি। চলমান শরীরী হয়ে দৌড়াচ্ছে চোখের উপর দিয়ে, নিজেকে আস্ত হিরো মনে হচ্ছে শঙ্করের। শাক্যসিংহ বুদ্ধদেবের মতো। যেন বোধিলাভ হয়েছে তার। বুকের ভিতরে আবেগের বেলুন ফুলছে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১০: চাঁদের ওপিঠে কালো

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪২: শূকরজাতক: কাপুরুষ? মহাপুরুষ?

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৯: রাজসূয় মহাযজ্ঞের মাহাত্ম্য ও আধুনিকতা

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪২: কাদম্বরীর পিতামহ ছিলেন ঠাকুরবাড়ির পাহারাদার, পিতা ছিলেন বাজারসরকার
ফোলার ধাক্কায় শঙ্করের পা ছুটে চলেছে বস্তি থেকে স্টেশনের দিকে। বিহারের চম্পারণ জেলার বেতিয়ায় পশ্চিমবঙ্গের বাইরে উদ্বাস্তুদের বৃহত্তম ক্যাম্প। ক্যাম্পে উদ্বাস্তুর সংখ্যা প্রায় সত্তর হাজারের মতো। পশ্চিমবঙ্গের কুপার্স ক্যাম্পের অবস্থাও তাই। পশ্চিমবঙ্গের ভিতর ও বাইরের সব উদ্বাস্তু ক্যাম্প আগে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। বাকি সব উধাও হয়ে গিয়ে সেই নিয়ন্ত্রণ আর অধীনতাই এখন মুখ্য।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৩: আঁধারে আছে আততায়ী

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৫: ছবিমুড়ার ভাস্কর্য ত্রিপুরার গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ন সম্পদ
ওই বেতিয়া ক্যাম্প থেকেই শঙ্করের কাছে বদ্দি বিশ্বাসের চিঠি এসেছে। শোনা গিয়েছে উনিও আসছেন। এখনও ওই কমরেডকে চোখে দেখেনি শঙ্কর। কমরেড শব্দটা শুনলেই রক্তের মধ্যে কেমন ঢেউ ওঠে। কেন ওঠে জানে না সে। সেই কমরেড সম্বোধনে কিনা কোন সুদূর বিহার থেকে ওর নামে চিঠি। নবীন মন্মথ আর বিজয় তিলজলা ক্লাবে বদ্দি বিশ্বাসের পত্র বহনকারীর সঙ্গে শংকরের আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। বহনকারীর নাম অবিনাশ গুপ্ত। চিঠিখানা পড়ে বেতিয়া ক্যাম্পের অবিনাশ দাদাকে তীব্র আবেগে জড়িয়ে ধরেছিল শংকর। অবিনাশও একইভাবে জড়িয়ে ধরেছিল তাকে। নবীনরা একটু দূরে কেমন সজল ভেজা চোখে তাকিয়েছিল ওই যুগলবন্দির দিকে। তিলজলা বস্তির পচা খালমুখী একটা ভ্যাপসা কুঠরি উদ্বাস্তুদের ভালোবাসায় তখন স্বপ্নভূমি। আন্দোলনে নামবে পূর্ববঙ্গ থেকে আসা অগুন্তি উদ্বাস্তু। কমরেড বিশ্বাস চিঠিতে এমনটাই লিখেছেন।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৫ : অবাক পৃথিবী

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৬ : কাঞ্চনজঙ্ঘা: ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী?
সেই আন্দোলনে শঙ্করের নেতৃত্বে কলকাতা আর ডায়মন্ড হারবারের উদ্বাস্তু ছেলেদের তিনি একজোট করতে চান। পারবে তো শঙ্কর এই লিডারশিপ নিতে? পারতে তো হবেই। দল দল ভিটে হারা মানুষ তাড়ানো কুকুরের মত এদেশ ওদেশ করছে। কোনও অর্থনৈতিক পুনর্বাসন নেই। কোনও পরিকল্পনা নেই। একটা প্রকাণ্ড ‘না’ এর পৃথিবীতে ওদের বেঁচে থাকা। নবীন পড়াশোনা জানে না। মন্মথটাও আকাট। বিজয় শুধু পড়তে জানে। একটা ১৫ ওয়াট বাল্বের নোংরা চুঁইয়ে পড়া আলোর নীচে দাঁড়িয়ে বারবার রুদ্ধশ্বাসে একই চিঠি পড়তে থাকে শঙ্কর আর বিজয়। দু’জনে।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু! পর্ব-১১১: ডেসডিমোনার রুমাল/১০

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২৮: সোনালি বাটান
শিয়ালদা স্টেশনে খুব ভিড়। বদ্দি বিশ্বাস এসে তিলজলা ক্লাবে শংকরদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার আগে একদিনের জন্য চট করে চম্পারণ ক্যাম্পে ঘুরে আসবে শঙ্কর। টুকিটাকি জিনিস-সহ ছোট একটা ব্যাগ আগেই গুছিয়ে নিয়ে এসেছে। মায়ের কাছ থেকে দশটা টাকা ও যোগাড় করেছে। এ টাকা মাকে ফেরত দিয়ে দেবে শঙ্কর। অ্যাড এঁকেই তুলে দিতে পারবে টাকা। এখন হাতে বেশ কয়েকটা ব্যানার আঁকার কাজ আছে। সবটা করতে পারলে শ’খানেক তো হয়েই যাবে। অবশ্য এখন কাজ আরো বাড়াতে হবে। কমিউনিস্ট পার্টির মেম্বারশিপ নিতে হবে। পার্টি ফান্ডে নিয়মিত টাকা দিতে হবে। চম্পারণ বেতুয়া কুপার্স, অসংখ্য জনতার চোখে শঙ্কর তখন নায়ক। ওদের মুখে স্লোগান, ইনকিলাব জিন্দাবাদ! সেই একদিন, কি জানি, কখনও সম্ভব কিনা, হয়তো আজকের মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায়কেও আসতে হবে আর্জি নিয়ে শঙ্করের কাছে। আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে স্টেশনে পৌঁছে গিয়েছে শঙ্কর। —চলবে।
* ধারাবাহিক উপন্যাস (novel): দেওয়াল পারের দেশ (Dewal Parer Desh)। লিখছেন জয়িতা দত্ত (Dr. Jayita Dutta), বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, হুগলি মহসিন কলেজ।


















