মঙ্গলবার ৯ জুন, ২০২৬


শ্রীমা।

শরৎ মহারাজ মা সারদাকে রোগমুক্ত করার কোন চেষ্টারই ত্রুটি রাখলেন না। কিছুদিন কবিরাজ রাজেন্দ্রনাথ সেন চিকিৎসা করেন। সেই সময় কবিরাজ কালীভূষণ সেনও শ্রীমাকে দেখতেন। তারপর কবিরাজ শ্যামাদাসকে আবার ডাকা হয়। তাঁর ছাত্র কবিরাজ রামচন্দ্র মল্লিক রোজ এসে শ্রীমাকে দেখে যেতেন আর নিজের হাতে ওষুধ তৈরি করে দিতেন। শেষ দুদিন ডাঃ কাঞ্জিলাল হোমিওপ্যাথি ওষুধ দিলেন। এরমধ্যে একদিন ডাঃ সুরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য ও ডাঃ নীলরতন সরকারকে আনা হয়েছিল। আর ডাঃ জেএম দাশগুপ্ত শ্রীমার রক্ত পরীক্ষা করেছিলেন। শুধুমাত্র মানবীয় চিকিৎসায় ফল হচ্ছে না দেখে শরৎ মহারাজ দৈব প্রতিকার আরম্ভ করালেন। একত্রিশে বৈশাখ থেকে কিছুদিন ধরে শান্তিস্বস্ত্যয়ন হতে লাগল।
স্বামী বিশ্বেশ্বরানন্দ মহারাজ লিখেছেন যে, মা সারদার জন্য পূজনীয় শরৎ মহারাজ যত স্বস্ত্যয়ন করিয়েছিলেন, তার সবগুলোতেই তিনি উপস্থিত ছিলেন। শ্রীমার বাড়ি কালী, তারা, ভুবনেশ্বরী, ছিন্নমস্তা, এবং কমলাত্মিকা এই পাঁচ মহাবিদ্যা, যাঁরা ক্রিয়া ও জ্ঞান শক্তির আধার, তাঁদের অর্চনা করা হয় সঙ্গে পাঁচটি গ্রহপুজোও করা হয়। বাগবাজারের সিদ্ধেশ্বরীর বাড়িতে শতরূপ চণ্ডীপাঠ হয়েছিল। সবশেষে বারাসতের শ্মশানে একটি স্বস্ত্যয়ন হয়। মহারাজের কথায়, কোন স্বস্ত্যয়নেই কোনওরূপ ত্রুটি বা বিঘ্ন ঘটেনি।

চপলা বসু বলেছেন যে, শ্রীমাকে একটা দৈব ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। ওপরে যেতেই শ্রীমা তাকে বলেন, ‘মা, কিছু জিজ্ঞাসা কোরো নি, এরা কী ওষুধ দিয়েচে তার গুণ থাকবেক নি’। চপলাদেবী বলেন, ‘শরৎ মহারাজ আগেই আমাকে সেকথা বলে দেহ সম্বন্ধে প্রশ্ন করতে মানা করেছিলেন’। ঠাকুরের দুই প্রধান অন্তরঙ্গ শিষ্য স্বামীজি আর রাখাল মহারাজও শরৎ মহারাজের মতো মা সারদার কাছে এলেই ভাবাবিষ্ট হয়ে পড়তেন। শরৎ মহারাজকে যেমন অতুল চৌধুরী একবার জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আপনারা যে মাকে এত ভক্তি করেন সেটা কি গুরুপত্নী বলে?’ শরৎ মহারাজ বললেন, ‘না, তা নয়। ঠাকুর ও মা অভেদ, আলাদা নন। তবে ঠাকুরের সঙ্গে তর্ক করা চলত, মার সঙ্গে চলে না’।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯৮: মা সারদার জন্মতিথিতে তাঁর অপূর্ব অমানবীয় রূপ ফুটে উঠল

বিখ্যাতদের বিবাহ-বিচিত্রা, পর্ব-১৭: একাকিত্বের অন্ধকূপ/২: অন্ধকারের উৎস হতে

মহারাজের কথা মনে করিয়ে দেয় বৃন্দাবনের স্বয়ং শ্রীগোপালের কথা যাঁর সঙ্গে তাঁর সখারা, এমনকি শ্রীহরিদাস প্রমুখ ভক্তিবাদী সাধুরাও খেলা করতেন, ঝগড়াও করতেন। কিন্তু শ্রীমতী রাধারানি স্বয়ং আদিশক্তির পঞ্চম স্বরূপ (দ্রষ্টব্য, শ্রীমদ্দেবীভাগবত্পুরাণ)। তাই ভগবতীস্বরূপাকে সন্তান ‘রাধে রাধে’ বলে নিত্য স্মরণ করতে পারে, তবে জগদীশ্বরীর সঙ্গে তর্ক বা ঝগড়া করা চলে না, জগৎপ্রসবিনী কিনা! স্বামীজী নৌকা করে হরি মহারাজের সঙ্গে শ্রীমাকে দর্শন করতে যাচ্ছেন। তিনি বারবার গঙ্গাজল খাচ্ছেন দেখে হরি মহারাজ বলে উঠলেন, ‘ঘোলাজল বারবার খাচ্চ, শেষকালে কি সর্দি করে বসবে?’ স্বামীজী বললেন, ‘না ভাই, ভয় করে, আমাদের তো মন, মার কাছে যাচ্চি, ভয় করে’।

নীলকান্ত চক্রবর্তী প্রমুখ ভক্তরা বাবুরাম মহারাজকে বলেছিলেন যে, স্বামীজী যেদিন শ্রীমার কাছে যাবেন, তার আগে থেকেই নিজেকে তৈরি করে নিতেন। একদিন ভোরে উঠে গঙ্গাস্নান করতে গিয়ে বারবার ডুব দিতে লাগলেন। কিছুতেই যেন পবিত্রতা আনতে পারছেন না। শেষে যদিও বা উঠলেন, সেবককে বললেন, ‘ওরে, আমার গায়ে গঙ্গাজলের ছিটে দে’। কোনওভাবে শ্রীমার ঘরের দরজা পর্যন্ত গিয়েছেন আর চলতে পারলেন না। ভাবে বিহ্বল হয়ে পড়ে গেলেন। মা সারদা তাড়াতাড়ি এসে তাঁর নরেনকে তুলে ধরলেন। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। স্বামী শুদ্ধানন্দের কথায়, আমেরিকা থেকে ফিরে স্বামীজী শ্রীমাকে দর্শন করতে এসেছেন।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৫: গেমপ্ল্যান

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০০: নীল কটকটিয়া

শ্রীমা স্বামীজীর গুণকীর্তন করে বললেন, ‘তুমি যা করেচ এমনটি আর কেউ করেনি’। স্বামীজি বলে উঠলেন, ‘এসব কী ছাইপাঁশ বলচ? এসব আমি করেচি না তুমি করেচ? তুমি ইচ্ছামাত্র আমার মতো লাখো বিবেকানন্দ করতে পার তা কি আমি জানিনা?’ শুনে মা সারদা হাসতে লাগলেন। শ্রীমা নিজে বলেছেন, ‘বোসপাড়ার বাড়িতে আমরা আছি। শুনতে পাচ্চি নীচের তলায় নরেন এসে গোলাপকে বলচে, গোলাপমা, আমার বড় খিদে পেয়েচে’। গোলাপ কিছু মিছরির টুকরো নিয়ে নরেনের হাতে দিয়েচে। নরেন তো রেগেই খুন। আমি একটা থালায় করে খাবার পাঠিয়ে দিলুম। নরেন খায় আর বলে, একেই বলি মা। ঠাকুর আঙুল দেখিয়ে, এইটি আমার বাবুরাম খাবে, এইটি আমার ও খাবে, বলতেন। পুজুরু বামুনের মেয়ে মা কেমন করে এমন হল আমি বুঝতে পাচ্চি না’।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৬: শান্তিনিকেতনে কবির প্রথম জন্মোৎসব

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৭: আলাস্কায় এমন অপরূপ দৃশ্যও দেখা যায়, যেখানে পাহাড়-সমুদ্র-হিমবাহ একসঙ্গে বিরাজমান

স্বামীজি বলেছেন, ‘মায়ের কৃপা আমার উপর লক্ষগুণ বড়…’। এক সকালে রাখাল মহারাজ, বাবুরাম মহারাজ প্রমুখ শ্রীমাকে প্রণাম করতে এসেছেন, পরদিন তিনি দেশে যাবেন। প্রণাম করে রাখাল মহারাজ শরৎ মহারাজের ঘরে নীচে এসে বসলেন, যেন এক শিশু। ওপর থেকে শ্রীমার প্রসাদী মিষ্টান্নাদি আসতেই তিনি ভাবের ঘোরে তাড়াতাড়ি খেয়ে যেতে লাগলেন। সেই খাবার শেষ হলে মুড়িপ্রসাদ এল। তাও শেষ হতে চলেছে দেখে শরৎ মহারাজ শীঘ্র একথালা কচুরী আনালেন। শ্রীমাকে দর্শন করিয়ে সেই কচুরি রাখাল মহারাজের সামনে রাখা হল, মহারাজ খেয়ে যাচ্ছেন। তখন শরৎ মহারাজ ‘মহারাজ, আর খেয়ো না’ বলতে বলতে সেই প্রসাদ কেড়ে নিজে খেতে লাগলেন ও অন্য সকলকে খেতে ইঙ্গিত করলেন। সকলে তাড়াতাড়ি সেই প্রসাদ শেষ করে ফেললে রাখাল মহারাজ কিছুকাল চুপ করে বসে রইলেন। কাশীতে তিনি প্রতিদিন সকালেই শ্রীমার বাড়িতে যেতেন, তাঁর উড়ে চাকরের সঙ্গে মজাও করতেন। কিন্তু শ্রীমার সামনে যেতেন না, একথা বিভূতিবাবু বলেছেন। শ্রীমাও শুনেছেন যে, মহারাজ নীচের বারান্দায় রয়েছেন।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৭৯: সময় বুঝে প্রত্যাঘাতের জন্য রাজনীতিতে অনেক সময় পিছিয়েও দাঁড়াতে হয়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৪: জীবনের নশ্বরতা ও আত্মানুসন্ধান বিষয়ে রামের উপলব্ধি যেন এক চিরন্তন সত্যের উন্মোচন

বিভূতিবাবুর কথায়, কেবল একবার হাওড়া স্টেশনে শ্রীমা জয়রামবাটি যাচ্ছেন আর মহারাজ ভুবনেশ্বরে। দুজনের গাড়ি দুদিকে দাঁড়িয়ে। শ্রীমার গাড়ি ন’টায় ছাড়বে আর মহারাজের দশটা ছয় মিনিটে। স্টেশন তখন ভক্ত ও সাধুদের ভিড়ে পরিপূর্ণ। শ্রীমার গাড়ি ছাড়ার একটু আগে মহারাজ শ্রীমার গাড়ির দ্বিতীয় কামরায় উঠে অন্যদিকে মুখ করে বললেন, ‘মা, আপনাকে ভুবনেশ্বরে যেতে হবে, আমি ভুবনেশ্বরে ঠাকুরের বেশ ভাল মঠ করেচি’। মা সারদা ঘোমটার ভিতর থেকে মাথা নেড়ে সায় দিলেন। সে কি দৃশ্য, সে মিলন ধ্যানের বিষয়। চন্দ্রমোহন দত্ত লিখেছেন যে, ‘একদিন বিকেলে শ্রীমা ঠাকুরঘরের বারান্দায় বসে জপ করছিলেন। তাঁকে প্রণাম করার সময় হঠাৎ মনে হল মহারাজ তো একদিনও এখানে এসে মাকে প্রণাম করেন না’। তিনি শ্রীমাকে সেকথা বললেন। বাবুরাম মহারাজ, শরৎ মহারাজ, খোকা মহারাজ, হরি মহারাজ সকলেই শ্রীমাকে প্রণাম করে যান, মহারাজ আসেন না কেন? একথা শুনে শ্রীমা বললেন, ‘রাখাল যে সাক্ষাৎ নারায়ণ, আমাকে যখন ইচ্ছা করে তখুনি দেখতে পায়’।—চলবে।
* আলোকের ঝর্ণাধারায় (sarada-devi): ড. মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় (Dr. Mousumi Chattopadhyay), অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, বেথুন কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content