
ছবি: প্রতীকী।
এত সব শান্তিপাঠ, স্বস্ত্যয়ন করা হলেও মা সারদার শারীরিক অবস্থার কোন উন্নতি হল না। তবে এই অসুস্থতার মধ্যেও পাহারায় নিযুক্ত সেবকদের বুঝতে না দিয়ে অথবা তাদের অনুরোধ না শুনে শ্রীমা ভক্ত-সন্তানদের মনস্কামনা পূর্ণ করেছেন। যেমন কাউকে তার ইষ্টদর্শন করিয়ে, কারওকে দীক্ষা দিয়ে, আবার কারও সেবা গ্রহণ করে ধন্য করেছেন। দুর্গেশ দাস চৈত্রমাসে তাঁর আত্মীয়া প্রিয়ংবদা মজুমদারকে সঙ্গে নিয়ে আসেন শ্রীমার কাছে। তখন সকলে নিষেধ করা সত্ত্বেও তিনি প্রিয়ংবদাকে মন্ত্রদান করেছিলেন।
চপলা বসুও সেই সময় শ্রীমার কাছে দীক্ষা নেওয়ার ইচ্ছায় আসা-যাওয়া করতেন। শ্রীমা সেবকের নিষেধ না মেনে ‘ও যে দূরদেশ থেকে এসেচে’, একথা বলে তিনি তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন। তিনি সুস্থ নন, তাই লক্ষ্মীদেবীর কাছে তাঁর দীক্ষা নেবার কথা চলছে শুনেই মা সারদা বললেন, ‘না,না, আমিই তোমাকে মন্ত্র দেব, স্বামী ও স্ত্রীর এক গুরু করতে হয়’। জৈষ্ঠ্যমাসের প্রথম সপ্তাহে তিনি চপলাকে মন্ত্রদান করেন। মহামায়া মিত্র তার ভাইয়ের বালিকা ছেলের বৌ হিরণ্ময়ী ঘোষকে দীক্ষিত করার জন্য সঙ্গে নিয়ে আসতেন। তিনি যেহেতু ঠাকুরের সময়ের ভক্ত, তাই নতুন সাধুদের বাধানিষেধ তেমন মানতে চাইতেন না। তখন মা সারদা দুদিক রাখতে গিয়েই যেন বললেন যে, ঠিক আছে দীক্ষা ঠাকুরের ভাইঝি লক্ষ্মীর কাছেই হবে।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯৯: সারদা মায়ের রোগ নিরাময়ের প্রচেষ্টা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৬: বিপদে মোরে রক্ষা করো
ঠাকুরও বহু আগে লক্ষ্মী সম্পর্কে জানিয়েছিলেন যে, ভবিষ্যতে তার অনেক মন্ত্রশিষ্য হবে। তবে এক্ষেত্রে হিরণ্ময়ী যেই আভূমি নত হয়ে শ্রীমাকে প্রণাম করলেন, তখনই মা সারদা তার মাথায় নিজের হাত রেখে অপরে যাতে শুনতে না পায়, এমনভাবে তাকে ইষ্ট মন্ত্রদান করলেন। এই বিষয়ে মাখনলাল সেন লিখেছেন যে, বিনয়বালা সেনের বাড়ি ঢাকার সোনারং গ্রামে। যখন সে তার স্বামীর গৃহে থাকত, তখনই সে শ্রীমার কথা জানতে পারে এবং তাঁকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তিনি কলকাতায় আছেন জেনে সে কোনও রকমে তার বাবার কাছে চলে আসে। তার বাবা কালীঘাটে থাকতেন।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৭: রবীন্দ্রনাথ ব্যারিস্টার হতে চেয়েছিলেন

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৮: হেলিকপ্টারে সওয়ার হয়ে চূড়ার কাছাকাছি গিয়ে পাহাড় দেখার রোমাঞ্চটাই আলাদা
বিনয়বালা জেনেছিল যে, শ্রীমা উদ্বোধন অফিসের বাড়িতে থাকেন। সেই জায়গা কোথায় বা কোন পথে যেতে হয়, কিছুই না জেনে আর কাউকে কিছু না জানিয়ে পাড়ার এক ছোট ছেলেকে নিয়ে সে ট্রামে উঠে পড়ল। ট্রামে দু’একজনকে উদ্বোধন অফিসের ঠিকানা জিজ্ঞাসা করে যখন জানতে পারল না, তখন বিডন বাগানের কাছে নেমে পড়ল। সেখানে দু’ চারজন পথচারীকে জিজ্ঞাসা করে আবার ট্রামে উঠে পড়ল। এই ভাবে সে উদ্বোধন অফিসে গিয়ে যখন পৌঁছল, তখন বিকেল হয়ে গেছে। শ্রীমার বাড়িতে সেসময় যথারীতি পাহারা ছিল, সকলকে উপরে উঠতে দেওয়া হত না।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৭৯: সময় বুঝে প্রত্যাঘাতের জন্য রাজনীতিতে অনেক সময় পিছিয়েও দাঁড়াতে হয়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৫: অগ্নির কি শুধুই দহনজ্বলা? মহর্ষি মন্দপালের অগ্নিস্তুতিতে অগ্নির কোন সদর্থকতার ইঙ্গিত?
তবে বিনয়বালা যখন গিয়েছিল, তখন কোন পাহারা ছিল না। সে সোজা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল। শ্রীমাও ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, ‘তুমি মা মন্ত্র নিতে এসেচ, ওখানে কলঘর আছে, তুমি গিয়ে হাত, পা ধুয়ে এস, তোমাকে মন্ত্র দেব’। বিনয়বালা বলল যে, মন্ত্র নেবার জন্য সে তো কিছুই নিয়ে আসেনি। শ্রীমা তাকে বললেন, ‘তোমার ওসব কিছু লাগবে না’। যখন দেহরক্ষার আগে শ্রীমার কঠিন পীড়া হয়, তখন একদিন বিনয়বালা তাঁর কাছে এসেছিলেন। সেই সময় এমন কঠিন পাহারার ব্যবস্থা ছিল যে, শ্রীমার পুরোনো ভক্তরাও তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারত না। কিন্তু এবারও তেমনি ঘটল যে বিনয়বালা যখন আসে, তখন পথে বা সিঁড়িতে কেউই পাহারায় ছিল না। সে সোজা শ্রীমার ঘরে চলে গেল।
আরও পড়ুন:

গীতা: সম্ভবামি যুগে যুগে, পর্ব-২৩: বন্ধু হে আমার…

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০১: ছিট ঘুঘু
তিনি বিনয়বালাকে দেখেই বললেন, ‘মা, এসেচ? বোস মা, বোস। এবার এমন অসুখ হয়েছে যে আর শরীর থাকে না! তুমি এসেচ, ভাল হয়েচে। দেখ, মা, ছেলেরা কখন এসে পড়বে বলা যায় না। আমার পাটা একটু টিপে দাও তো, কেমন ব্যথা হয়েছে’। মা সারদার অসীম কৃপা পেয়ে বিনয়বালা সেদিন অভিভূত হয়ে গিয়েছিল। মাখনলাল বলছেন, ‘তারপর যখনই তাকে দেখেছি, তার মুখে শুধু ঠাকুর আর মার কথা, যেন আনন্দে বিভোর হয়ে আছে’।—চলবে।
* আলোকের ঝর্ণাধারায় (sarada-devi): ড. মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় (Dr. Mousumi Chattopadhyay), অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, বেথুন কলেজ।।


















