কৃষ্ণ ও যুধিষ্ঠিরের বক্তব্যে আছে যে কোন বড় পরিকল্পনা বা কার্যসিদ্ধির রূপরেখা। মহাভারতের অন্তর্লোকের পরতে পরতে আছে অনেক জীবনযুদ্ধেে প্রস্তুতির দিগ্দর্শন। মহাভারতের কথার নির্যাস সমুদ্রমন্থনের পরে অমৃতের মতোই চিরন্তন নয় কী?
কৃষ্ণ ও যুধিষ্ঠিরের বক্তব্যে আছে যে কোন বড় পরিকল্পনা বা কার্যসিদ্ধির রূপরেখা। মহাভারতের অন্তর্লোকের পরতে পরতে আছে অনেক জীবনযুদ্ধেে প্রস্তুতির দিগ্দর্শন। মহাভারতের কথার নির্যাস সমুদ্রমন্থনের পরে অমৃতের মতোই চিরন্তন নয় কী?
পঞ্চবটীবনে অবস্থানকালীন মহাত্মা রামের শরৎকাল অতিবাহিত হল, প্রিয় ঋতু হেমন্ত সমাগত।একদা রাত ভোর হলে রঘুনন্দন রাম, স্নানের জন্যে মনোরম গোদাবরী নদীতে গেলেন। সঙ্গে সীতা ও অনুসরণরত, বিনয়ী, বীর্যবান, লক্ষ্মণ, কলসহাতে চললেন। সুমিত্রানন্দন লক্ষ্মণ প্রিয়ভাষী রামকে জানালেন, রামের প্রিয় এই সেই কাল সমুপস্থিত। মঙ্গলময় সংবৎসরকাল যেন এর দ্বারা অলঙ্কৃত হয়ে সুন্দর হয়। এই কালে কুয়াশায় মানুষের শরীর শুষ্ক হয়, বসুন্ধরা হয় শস্যমালায় সমৃদ্ধা, জল তখন উপভোগ্য নয় আর।
জ্যেষ্ঠপাণ্ডব যুধিষ্ঠির রাজসূয়যজ্ঞ করতে মনস্থ করেছেন। পাণ্ডবদের শুভাকাঙ্ক্ষী কৃষ্ণের পরামর্শ অনুযায়ী, অত্যাচারী ক্ষমতালিপ্সু প্রভাবশালী মগধরাজ জরাসন্ধের প্রতিপত্তির কাছে হার স্বীকার করেছেন যাদবরা, জরাসন্ধের গিরিব্রজ নামের পার্বত্যদুর্গে বন্দি রয়েছেন পরাজিত রাজারা, তাঁদের মুক্ত করা যুধিষ্ঠিরের প্রথম কর্তব্য। এই সব বৃত্তান্ত শুনে, জরাসন্ধের অমিত শক্তি ও ক্ষমতা স্মরণ করে, যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠানে অনীহা প্রকাশ করলেন। অত্যুৎসাহী দ্বিতীয়পাণ্ডব ভীমসেনের অভিমত হল,জরাসন্ধকে পরাজিত করতে যুদ্ধোদ্যম প্রয়োজন। তাঁর...
রাঘব রাম জটায়ুর বন্দনা করে সানন্দে আলিঙ্গন করে বিনত হলেন। শুদ্ধচিত্ত রাম, পিতার সঙ্গে জটায়ুর বন্ধুত্বের কথা তাঁর মুখ হতে বার বার শুনতে লাগলেন। রাম, সীতার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব মহাবলশালী জটায়ুর হাতে ন্যস্ত করলেন। জটায়ুকে সঙ্গে নিয়ে, শত্রুদহনের ইচ্ছায় এবং অরণ্যরক্ষার্থে পঞ্চবটীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন রাম।
রাজসূয় যজ্ঞারম্ভকে কেন্দ্র করে মত বিনিময়ের মধ্যে যে তত্ত্বকথার সূচনা হল তার মধ্যে লুকিয়ে আছে রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার নানা রসদ। একটি মহান বিরাট উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত নানা সাধারণ থেকে অসাধারণ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। এ সবই মহাভারতের মহাকাব্যিক বিস্তার নয় কী?
রাম, স্থির করলেন, বনবাসের নির্ধারিত সময়ের অবশিষ্টাংশ, সজ্জনকল্যাণে নিয়োজিতপ্রাণ মহর্ষি অগস্ত্যের আশ্রমে বাস করবেন। রামের নির্দেশানুসারে, অনুজ লক্ষ্মণ মহর্ষির আশ্রমের এক শিষ্যকে বললেন, রাজা দশরথো নাম জ্যেষ্ঠস্তস্য সুতো বলী। রামঃ প্রাপ্তো মুনিং দ্রষ্টুং ভার্য্যয়া সহ সীতয়া।। রাজা দশরথের জ্যেষ্ঠ পুত্র বলশালী রাম, মুনির দর্শনের আশায়, স্ত্রী সীতার সঙ্গে উপস্থিত হয়েছেন। লক্ষ্মণ আত্মপরিচয় দিলেন, আশ্রমবাসীগণ শুনে থাকবেন, তিনি রামানুজ লক্ষ্মণ, রামের হিতসাধক, অনুগত ভক্ত। পিতার আদেশানুসারে, তাঁরা এই ভয়াবহ অরণ্যে...
রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজনে উদ্যোগী হলেন রাজা যুধিষ্ঠির। এ বিষয়ে তিনি কৃষ্ণের অনুমোদনপ্রার্থী। কৃষ্ণ, পাণ্ডবদের পরম আত্মীয়। পাণ্ডবজননী কুন্তী কৃষ্ণের পিতার ভগিনী। কৃষ্ণ তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনের প্রিয়সখা। এ ছাড়াও যুধিষ্ঠিরের জানেন, কেউ সম্প্রীতিবশত প্রীতিভাজনের ত্রুটি দেখেন না। স্বার্থহেতু (অর্থলাভেচ্ছায়) কেউ শুধু মনোমত কথা বলেন। কারও আবার নিজের জন্য যেটি হিতকর সেটাই তাঁদের লক্ষ্য হয়ে থাকে। সুপরামর্শদানের বিষয়ে, লোকসমাজের এটাই প্রচলিত বিশ্বাস। কেচিদ্ধি সৌহৃদাদেব ন দোষং পরিচক্ষতে। স্বার্থহেতোস্তথৈবান্যে প্রিয়মেব...
মহর্ষি অগস্ত্যর নামটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। নামমাহাত্ম্যে লুকিয়ে আছে গভীর অর্থ। অগং পর্বতং স্তম্ভয়তি ইতি অগস্ত্যঃ। যিনি পর্বতকে তপস্যার শক্তিতে স্তম্ভিত করেন তিনিই অগস্ত্য। বিন্ধ্যপর্বত তাঁর উচ্চতা দিয়ে সূর্যকে আড়াল করেছিল তখন ঋষি অগস্ত্য তার উন্নত মাথাটি চিরকালের জন্য অবনত করে নিরুদ্দেশযাত্রা করলেন। আমাদের দিলেন চিরবিদায়ের সমার্থক শব্দ ‘অগস্ত্যযাত্রা’।
মহর্ষি নারদ ইন্দ্রপ্রস্থনগরে ময়দানবনির্মিত সভায়, যুধিষ্ঠিরকে, বহুবিঘ্নসঙ্কূল রাজসূয়যজ্ঞানুষ্ঠানের পরামর্শ দিয়ে বিদায় নিলেন। মহর্ষি সেই প্রসঙ্গে এই যজ্ঞানুষ্ঠানের মাহাত্ম্য ব্যাখ্যা করলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, যুধিষ্ঠিরকে রাজসূয় যজ্ঞ সম্পাদনে অনুপ্রেরণাদান। অতঃপর যুধিষ্ঠির রাজসূয়যজ্ঞের মাহাত্ম্য স্মরণ করে, সভাসদদের সঙ্গে রাজসূয় যজ্ঞের অনুষ্ঠান বিষয়ে পরামর্শ শুরু করলেন।
রামের দণ্ডকারণ্য যাত্রায়, স্ত্রী জানকী সীতার ঘোর আপত্তি। অরণ্যবাসী ঋষিদের অনুরোধ রক্ষার্থে বিনা অপরাধে রাক্ষসনিধনের বিপক্ষে সওয়াল করলেন রামের কাছে। তাঁর মতে, বনবাসী রামের ক্ষত্রধর্মপালনের উদ্দেশ্যে শস্ত্রধারণ, অবশ্যই ধর্মসঙ্গত কাজ। অন্যথায় অরণ্যে মুনিজনোচিত ধর্মপালন করাই কর্তব্য। দেবী সীতা, তপোবনে পবিত্রমনে কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে ধর্মাচরণ বিধেয় বলে, মনে করেন। স্বামীর কল্যাণকামনায় নিবেদিতপ্রাণা দেবী সীতার বক্তব্য শুনে ধার্মিক রাম তাঁর নিজের ধ্যানধারণা ব্যক্ত করলেন। রামের মতে, সীতা হলেন ধর্মজ্ঞা জনকনন্দিনী।
মহর্ষি নারদ, ইন্দ্রপ্রস্থে, সদ্য সিংহাসনে অধিষ্ঠিত নবীন রাজা যুধিষ্ঠিরকে প্রশ্ন করলেন, রাজার বেদাধ্যয়নে সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে কী? রাজার ধনার্জন সফল হয়েছে তো? পত্নীসাহচর্যে সাফল্য আছে কী? শাস্ত্রজ্ঞানলাভ সফল হয়েছে কি না? প্রশ্নচ্ছলে প্রত্যুত্তর নয়, রাজা যুধিষ্ঠির মহাজ্ঞানী মহর্ষির কাছে জানতে চাইলেন, বেদাধ্যয়নে সাফল্যলাভ হয় কীভাবে? ধনের সম্পূর্ণ সফলতা কোথায়? পত্নীদের বা সাফল্য কিভাবে সম্ভব? শাস্ত্রজ্ঞানে সাফল্য আসে কেমন করে? মহর্ষি ব্যাখ্যা করলেন, অগ্নিহোত্রযাগ সম্পন্ন করাতেই আছে বেদাধ্যয়নের সাফল্য।...
মানবিকতার দীপ্তিতে উজ্জ্বল ভারতীয় নারীর আদর্শ ভাবমূর্তি সীতা। স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় পূর্ণ কণ্ঠে নিজের সুঠাম বক্তব্য উপস্থাপনের আদর্শ ক’জনের আছে? প্রীতি ও সংবেদনশীলতা, পারিবারিক গণ্ডী ছাপিয়ে যখন সকলের মঙ্গলকামনায় উৎসারিত হয় তখন তার আবেদন বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে। রামায়ণের বিনম্র সীতার এই বক্তব্য উপস্থাপনা, কী সন্ত্রাসকবলিত আধুনিক ভারতীয় জনজীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করতে পারে?
মহর্ষির প্রশ্নে রাজকীয়পরিমণ্ডলে রাজকর্মচারীদের সততাবিষয়টির গুরুত্ব যে অপরিসীম,সেটি পরিস্ফুট হয়েছে। তাঁদের পরিচ্ছন্ন নির্লোভ ভাবমূর্তি আবশ্যক। অর্থ দিয়ে যেন রাজকর্মচারীদের কোনভাবেই প্রভাবিত করা না যায়।
রাজার চোদ্দটি দোষ পরিহার করেন কি না, সেই দোষগুলি বোধ হয় সব যুগেই প্রশাসকদের বর্জনীয় দোষ বলে চিহ্নিত। আধুনিক যুগে প্রশাসকগণ সেগুলি বর্জনে, উদ্যোগী হবেন কবে? এই প্রশ্নে হয়তো সকল সুধী পাঠকবৃন্দ, নৈরাশ্যজনক দীর্ঘশ্বাস বুকে চেপে নীরব হবেন।
মহর্ষিদের আশীর্বাদধন্য রামের বনবাসজীবন। এমন ক্লেদমুক্ত হয় না কেন জীবন? যেখানে সজ্জনের সংসর্গ মানুষকে নতুন কোন পথনির্দেশ দেয়, যে পথচলায় রয়েছে সদুদ্দেশ্যসাধনের বার্তা। প্রাত্যহিকতার গ্লানি, দৈনন্দিন নৈরাশ্যের অন্ধকারাচ্ছন্ন গুহাপথের শেষ সীমায় নতুন কোনও আলোর দিশা?
মহর্ষি নারদ রাজার যুধিষ্ঠিরের উত্তরের অপেক্ষা করেননি, একের পর এক, রাজার স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা, যুদ্ধাভিযান, রাজনীতির উপায়গুলি, চারিত্রিক গুণাবলীর উন্নতিবিষয়ে যে প্রশ্নগুলি উত্থাপন করেছেন, সেগুলি প্রশ্ন নয়, রাজনীতির বৃহত্তর মার্গদর্শন। একজন সফল পথপ্রদর্শক রাজার, রাজপদে ক্রমোত্তরণের লক্ষ্যে কোন কোন বিষয়ে সদাসতর্ক থাকা প্রয়োজন তার পথনির্দেশ দিয়েছেন মহর্ষি নারদ। যুধিষ্ঠিরের প্রতি তাঁর প্রশ্নচ্ছলে উপদেশাত্মক এই রাজনীতির পাঠ, চিরন্তন ও শাশ্বত এবং নিঃসন্দেহে আধুনিক গণতান্ত্রিক প্রশাসনিক পরিকাঠামোয় অনেকক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়।