কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।

আইসিইউ-র বাইরে সুদীপ্ত অপেক্ষা করছিল। এসপি এবং শাক্য দু’জনেই হাসপাতালের সুপারে ঘরে আছেন। অরণ্যের অবস্থা ক্রিটিক্যাল। তার মাথার খুলির একদিক খুবই মারাত্মকভাবে ফেটে গিয়েছে, কিন্তু সবচেয়ে খারাপ অবস্থা কাঁধের। হাড় ভেঙে টুকরো-টুকরো হয়ে গিয়েছে। বেকায়দায় আর একটু অন্যদিকে, গর্দান আর খুলির সন্ধিস্থলে লাগলে তখনই হয়ে যেত। তাও আইসিইউতে ভর্তি করান গিয়েছে, সেটাই অনেক ভাগ্য। নাহলে রাস্তায় যেখানে আহত হয়ে পড়েছিলেন, সেখানে আর কিছুক্ষণ এইভাবে পড়ে থাকলে হাসপাল অবধি নিয়ে আসতে হত না, প্রাণ বেরিয়ে যেত। গত তিন দিন ধরে অরণ্য সদর হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি। এদিকে তার ল-ইয়্যার এসেছেন কলকাতা থেকে। এসেই মক্কেলের এই অবস্থা দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে কোর্টে কেস ঠুকে দিয়েছেন।

স্থানীয় এক জুনিয়ার উকিল তাঁর সঙ্গে মিলে সওয়াল করেছেন। মালাকারের পেট খারাপ, এই অজুহাতে সুদীপ্তকে পাঠিয়েছেন। তার আড়ালে বলেছেন, “আগেই বলেছিলাম যে, কালাদেওর কাণ্ড। খামোকা অন্য ট্যুরিস্টদের আটকে রেখে ঝামেলা বাড়িও না। কে শোনে কার কথা? আজকালকার ছেলেছোকরারা কোন কাজ জানে না, বিন্দুমাত্র দক্ষতাও নেই, সার্ভিসে এসে ঢুকে পড়ছে। তাদের দিয়ে আর কতটা ভালো কাজ হবে? আর ওই লালবাজারি গণ্ডাগিরি আমাকে দেখিয়ে লাভ নেই। ওইরকম কত গণ্ডমূর্খকে আমি নাকের জলে-চোখের জলে করেছি! কালাদেওর থান অপবিত্র করেছে, এই তো শুরু, এরপর কালাদেও রক্তগঙ্গা বইয়ে দেবেন!”

কিছু মানুষ কখনও বদলাবেন না। সারা জীবন কাজ না করে কিছুদিন পরে পেনসন নিয়ে রিটায়ার করবেন। অন্তত যাওয়ার আগে একটা কেসে প্রপার ইনভেস্টিগেশন করে যাবেন, তা নয়, সহকর্মীদের লেগপুলিং করছেন। সুদীপ্ত মনে-মনে খিস্তি মারল একটা। এইসমস্ত লোকের জন্যই সাধারণ পাবলিক পুলিশকে দোষ দেয়। কোর্টে প্রথম দিনই কেসের যা গতিপ্রকৃতি, তাতে পিশাচপাহাড় রিসর্টে আসা বাকিরাও পরের হিয়ারং-এই হয়ত সামান্য শর্তসাপেক্ষে জামিন পেয়ে যাবেন। কোর্টে তাঁরা অনেকেই পার্টি হিসাবে যুক্ত হয়েছেন। এমনকি লালবাজারের একেজি স্যারের ভাগ্নি এবং হবু জামাইও। শাক্যকে যদিও সেই ভাগ্নি থোড়াই কেয়ার করে। কোর্টে এমনভাবে তাকাচ্ছিল যেন, শাক্য কীটস্য কীট। সুদীপ্ত সে-কথা বলতেই শাক্য মৃদু গলায় ঠাট্টা করেছিল, “ভায়া, আজকালকার ছেলেমেয়েরা অন্যভাবে ভাবে। ওদের বোঝা মুশকিল। আর তুমি বিবাহিত। ও-সিকে না তাকানোই ভালো!”
এমনভাবে বলল শাক্য দা, সুদীপ্ত না হেসে পারল না। অবশ্য সঙ্গে-সঙ্গে রুমালে মুখ ঢেকে নিয়েছিল। নাহলে জজসাহেব ভাবতে পারেন, তাঁর কথাতেই সে হাসছিল। তখন আবার আদালত-অবমাননার কেস দিয়ে দেবে। কলকাতা থেকে আসা হাইকোর্টের উকিল শাক্যর নাম শুনেছেন। তবে অরণ্যও হয়তো বলেছিল ওঁকে। তিনি প্রথমদিনের সোয়াল-জবাব শেষে মুখোমুখি হয়ে কেবল বললেন, “কাকে কান নিয়ে গেল শুনে আপনারা কানে হাত না দিয়ে আজকাল বড্ড বেশি কাকের পিছনে ছোটেন। আমার মক্কেল এবং বাকিরাদেরো যেখানে ক্লিয়ার অ্যালিবাই আছে, আপনারা তার পরেও হ্যারাস করছেন এই কারণে যে, কেউ আপনাদের বলেছে, খুনি এই এঁদের বন্ধুদের মধ্যেই কেউ। আরে বাবা, আপনারা তো কোনও কেসেরই কোনও সমাধান করতে পারলেন না। অনিলবাবু আর রিসর্টের স্টাফ দু’জনেই একই দিনে মার্ডার হন। আপনারা অনিলবাবুর কেসটিরও কোন সুরাহা করতে পারেননি, সেই স্টাফটিরও না। এর থেকে কী প্রমাণ হয়?”

শাক্য কিছু বলার আগে সুদীপ্তই বলে বসল, “আপনি কি মনে করেন, পুলিশের হাতে কোন জাদুকাঠি আছে? একাধিক খুনই হোক কিংবা একটি, তদন্ত করতে সময় লাগে এবং সিদ্ধান্তে পৌঁছতেও। আমরা আমাদের অনুমানের উপর ভিত্তি করে কাউকে অ্যারেস্ট করলে এই আপনারাই তার এগেইনস্টে কোর্টে কেস ঠুকে দেবেন। নয় কি?”
উকিলবাবুটি বললেন, “তদন্ত তো অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না! আর সে-কারণে আমার মক্কেলকে দিনের-পর-দিন হ্যারাস করতে পারেন না আপনারা! আজ কলকাতায় থাকলে এই বিপদ ঘটতেই পারত না। এখন ওঁর যদি কিছু হয়ে যায়, কে জবাবদিহি করবে? তখন কিন্তু আমি বুঝে নেব!”
শাক্য বলল, “আমরা তো আবার জানি, আপনারা কোর্টগুলিতে এক-একটি কেস এমনভাবে টেনে নিয়ে যান যে, অভিযোগকারী এবং অভিযুক্ত দু’জনেরই এন্তেকাল হয়ে যায়, আপনারা তখনও আরগুইনেন্ট চালিয়ে যান। তা আপনাদের ক্ষেত্রে যখন মৃত্যুর পরেও কেস চালিয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত আছে, সেখানে পুলিশ বিভাগ তো বলব অনেক বেশি তৎপর! এস সুদীপ্ত। এঁর সঙ্গে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই!” বলে শাক্য সুদীপ্তকে টেনে নিয়ে চলে এসেছিল। আসার আগে সুদীপ্ত দেখেছিল, ভদ্রলোক রাগে মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে আছেন। পাশে লোকাল ল-ইয়্যার এবং আর-একজন জুনিয়ার।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০৫ : ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা /৪

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৬ : উত্তরায়ণ

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৯: মেঠো ইঁদুর

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৫ : শেষের খুব কাছে

তবে কোর্টে একটা বড় অ্যাডভান্টেজ পেয়েছে পুলিশ। যে-বিপুল পরিমাণে অস্ত্রভান্ডার উদ্ধার হয়েছে কালাদেওর গুহা থেকে, তা কেবল জেলা বা রাজ্য নয়, সারা দেশেই আলোড়ন তুলেছে। পুলিশের স্থানীয় দেওতার থানে প্রবেশ নিয়ে যে ক্ষোভ তলে তলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ছিল, তা আর দানা বাঁধতে পারেনি। প্রায় সকলেই একযোগে এখন দুষছে মঙ্গল ওঝাকে। লোকটি মরে গিয়ে বেঁচে গিয়েছে, নাহলে স্থানীয় বাসিন্দাদের হাতেই হয়ত তার শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করত। সকলেই এখন বলতে শুরু করেছে, “এতদিনে ভাবা গিয়েছিল, স্থানীয় মানুষদের কোনও কোনও আচার-আচরণে ক্ষুব্ধ হয়েই কালাদেও নিজের গুহাবাস ছেড়ে বেরিয়ে এসে এইরকম নজিরবিহীনভাবে আক্রমণ করছেন। কিন্তু এখন তাদের দৃঢ় বিশ্বাস, নিজের গুহাবাসের পথ মঙ্গল ওঝা কলঙ্কিত হচ্ছে জেনেও চুপ করে ছিল, কিংবা নিজেই জড়িত ছিল এই ঘটনায়, যে-কারণে কালাদেও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন এবং একে-ওকে মেরে যখন মঙ্গলের কীর্তিকলাপ বন্ধ করতে পারেননি, তখন মঙ্গলকেই সাবাড় করে তবে শান্ত হয়েছেন। অবশ্য অরণ্যের উপর প্রাণঘাতী আক্রমণ তাদের সেই বিশ্বাসে চিড় ধরিয়েছে। কেউ-কেউ বলছে, এবার দেওতা এতটাই রেগে গিয়েছেন যে, আরও কিছু প্রাণ না নিয়ে শান্ত হবেন না। নতুন একটা তত্ত্বও শোনা গিয়েছে। পুলিশ নাকি যে গুহায় ঢুকেছিল, সেটা কালাদেওর গুহা নয়। কারণ, কারলাদেওর গুহামুখ নাকি তিনি সবসময় আড়াল করে রাখেন, বন্ধ করে রাখেন। বছরে একবার সেই গুহামুখ তিনি নিজেই খোলেন, ভক্তদের দেওয়া নৈবেদ্য গ্রহণ করে আবার সেখানেই সেঁধিয়ে যান। ইদানীং অবশ্য রেগে গিয়ে মাঝেমধ্যেই বেরিয়ে পড়ছিলেন, কিন্তু তিনি নিজে না খুললে কারুর সাধ্য নেই সেই গুহাপথ খুঁজে পায়। লোকবিশ্বাসে আঘাত দেওয়া উচিত নয়, ফলে শাক্য বা পুলিশবিভাগ তাদের বিশ্বাসে হাত দেননি। এসপি একবার গাঁইগুঁই করছিলেন যে, এদের সত্যটা জানানোই ভালো। কালাদেও নামে কেউ নেই, কিংবা তিনি থাকলেও যে এখন আর এখানে থাকেন না, এ-সত্যকে তিনি জনগণের সামনে তুলে ধরার পক্ষপাতী।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা পর্ব-১৬৮: রামায়ণে পরস্ত্রীহরণের সিদ্ধান্তে বীরত্বের প্রকাশ নেই, আছে অনেক মৃত্যুর আবাহনবার্তা

হ্যালো বাবু! পর্ব-১৪৩: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য / ২৩

শাক্য তাঁকে বোঝাল, “দেখুন এতে হিতে-বিপরীত হবে। আপনি যেই বলবেন, এই গুহাতে কালাদেও নেই, ওরা কিন্তু সেই বক্তব্যকে ওদের দেওতার অপমান বলে ধরে নেবে এবং তারপর যে অ্যাজিটেশন হবে, তা সামলাতে পুলিশ-প্রশাসনকে ল্যাজেগোবরে হতে হবে। যে বিশ্বাস কারুর ক্ষতি করছে না, যে-বিশ্বাসের ফলে এই প্রান্তিক-মানুষগুলি এত অভাব, উপেক্ষা, বেঁচে থাকার লড়াই করেও সাথে-সাথে আছে, সে-বিশ্বাসকে ভঙ্গ করাকেই ক্রাইম বলে মনে করি আমি। বরং যারা ওদের বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে নানা দিক থেকে এক্সপ্লয়েট করছে, তাদেরকে বেছে-বেছে তুলে আনতে পারলে ওদের জীবনের অন্ধকার কিছুটা হলেও কাটে!”

ডিএম সায় দিলেন তার কথায়। এসপিকে বললেন, “ভার্গব, আপনি ফোর্সকে বলুন অ্যাক্টিভ হতে। দেখতেই পাচ্ছেন, কত জঞ্জাল এই কিছুদিনের মধ্যে জমে গিয়েছে; সেসব পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করুন। আসলে কী জানেন, ক্রিমিনালরা হল সমাজের জঞ্জাল। এমনি জঞ্জাল যেমন জমতে দিলেই পচবে, নানাপ্রকার রোগ-অসুখ ছড়াবে, সেজন্য নিয়মিত তা পরিষ্কার করা হয়, ক্রিমিনালদেরকেও তেমনই মাঝেমধ্যেই পরিষ্কার করতে হয়। নাহলে পিলিটিক্যাল পার্টিগুলি কীরকম জঞ্জালপ্রিয়, তা তো আপনার অজানা নয়! আর ভারতবর্ষে বসে ধর্ম যতদিন না মাস পিপলের ক্ষতিসাধন করছে, ততদিন সেদিকে হাত বাড়াতে যাবেন না। তাতে নিজের হাতই পুড়বে আর সমস্যা জটিলতর হবে!”
এসপি নিজের বলা কথাটার সাফাই দিলেন, “না মানে আমি ওভাবে বলতে চাইনি। আমি আসলে তাদের প্রপার এডুকেশনের ব্যবস্থা করার কথা বলছিলাম, কারণ, আমার তো মনে হয় প্রপার এডুকেটেড পিপল্‌ নিজের থেকেই ধম্মের খপ্পরে পড়বে না!”
শাক্য এত সিরিয়াস পরিস্থিতির মধ্যে বসেও মৃদু হেসেছিল। বলেছিল, “এসপি সাহেব, আপনি নিজে তো উচ্চশিক্ষিত, তাই না?”
আরও পড়ুন:

রথযাত্রা

দশভুজা : আমি আর কখনওই ফিরে আসার প্রত্যাশা করি না…

এসপি বেশ গর্বের সঙ্গে বললেন, “আমি জেএনইউ থেকে পলিটিক্যাল সায়েন্সে মাস্টার্স করেছি। পরে পিএইচডি!”
শাক্য বলল, “তা সত্ত্বেও দেখুন আপনার দশ আঙুলে পাঁচটি ভিন্ন-ভিন্ন রত্ন-বসান আংটি।…”
শাক্যর কথায় ডিএম হেসে উঠলেন, “ব্রেভো! বাইস অবজারভেশন আপনার মিঃ সিংহ!”
শাক্য বলল, “থ্যাঙ্কস স্যার। তবে উনি টেবিলের উপর মাঝেমধ্যেই হাত রাখছিলেন বলে যে-কেউ চাইলেই এটা দেখতে পেত। খুব একটা কৃতিত্বের কিছু নেই এতে।” তারপর এসপিকে বলল, “ডোন্ট মাইন্ড মিঃ ভার্গব। আসলে আমি বলতে চেয়েছি, প্রপার এডুকেশন কথাটা খুব ফিসি। কতটা হলে প্রপার হবে সেটা কিন্তু দেশের নানা প্রান্তে নানারকম হতে পারে। কিন্তু একই কাঠামোর মধ্যে ফেলে এই সত্যটিকে গুলিয়ে দেওয়া হয়। যাক…কাজের কথায় আসি। আমাদের কিন্তু আগামী দিন দশেক অনেকজায়গায় রেইড করতে হবে, তা-না-হলে কালাদেও কাণ্ডের জড় আপাতত উপড়ে ফেলতে পারব না আমরা!”
“আপাতত বলছেন কেন মিঃ সিংহ? কেন চিরকালের জন্য নয়?” ডিএম প্রশ্ন করলেন।
শাক্য বলল, “দেখুন আমি আপনি বা এসপি সাহেব কিংবা আর কেউ চাইলেই কি অন্ধবিশ্বাসের জড়, শয়তানির জড় মুছে ফেলতে পারব? ক’দিনের জন্য আমরা তাকে রুখতে পারি, কিন্তু দেখবেন আবার সময়-সুযোগ নিয়ে তারা জেগে উঠেছে। আজকে আমরা কালাদেওর ঘটনার উপর ইতি টানছি বলে যদি ভাবি, তাহলে সেটা হবে আমাদেরই মূর্খামি!”
“কেন? আপনিই তো বললেন কালাদেওর জড় উপড়ে ফেলব আমরা!”
“হ্যাঁ, কিন্তু সেটা তো সময়সাপেক্ষ। আর তাছাড়া অস্ত্রউদ্ধার করে দু’-চারজনকে পাকড়াও করলেই কালাদেও পি সি সরকারের ম্যাজিকের মতো ভ্যানিশ হয়ে যাবে না। কালাদেওর নামে অনেক লিমিটেড কোম্পানি আছে, তাদের সবক’টিকেই পাকড়াও করতে হবে। যারা কালাদেওকাণ্ডকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে সাহায্য করেছিল, সাইকেল ইতিমধ্যেই তাদের নাম বলেছে, প্ল্যানটিও অজানা নয় আমাদের, অতএব তাদের গ্রেফতার করতে হবে। এরপর আসছে ডক্টর সত্যব্রতর হেলথ-সেন্টারের ঘটা সেই নকল বুধনের বডি-ডাবলের কেস। এই কাজের জন্য বেদের দলের যে-ছেলেটিকে তারা ব্যবহার করেছিল, সে পালিয়ে-পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। শেষ প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, তাদের হাজারিবাগের দিকে দেখে গিয়েছে। সেখানে তাকে নিয়ে আসার জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে। আপাতত ছেলেটি পুলিশের কড়া নিজরদারির মধ্যেই আছে। এই ছেলেটিকে হাতে পেলে জেরা করলেই জানা যাবে, আসলে কে, কেন এই প্ল্যানটি করেছিল। সাইকেলকে জিজ্ঞাসা করা হলেও সে চুপ করে আছে এই বিষয়ে। এর থেকে বোঝা যাচ্ছে, মুখে না বললেও আড়ালে আছে যে কালীচরণ, সে বেশ প্রভাবপ্রতিপত্তিশালী। দরকার হলে প্রহারেণ ধনঞ্জয় কাকে বলে দেখিয়ে দেবে সাইকেলকে। ওই কেসটিও এই পিশাচপাহাড় গ্যাং-এর (শাক্য এই নামটি নিজেই দিয়েছে। সংবাদপত্রগুলি নামটি লুফে নিয়েছে) কীর্তি কিনা, সে-ব্যাপারে ফুলপ্রুফ এভিডেন্স ছাড়া এগোন বৃথা। সবার আগে দরকার ওই ছেলেটিকে। এরপর আসছে পিশাচপাহাড় রিসর্টে দু’টি মৃত্যু, একটি প্রায় মৃত্যুর কাছাকাছি ঘটনা, যদি এক্ষেত্রেও খুব খারাপটি ধরলে, ইনিও মৃতের তালিকায় যুক্ত হবেন, সেইসঙ্গে ম্যানেজারের উপর আক্রমণ। এই ঘটনাগুলিকে কিন্তু আমি কোনওভাবেই অস্ত্রভাণ্ডার পাওয়া-না-পাওয়ার সঙ্গে যুক্ত করতে পারছি না, বুধনের ঘটনার সঙ্গেও না। আমি আগেও বলেছি, কেউ ইচ্ছে করেই নিজের অপরাধ ঢাকতে এই খুনগুলির সঙ্গে কালাদেওর নাম কিংবা মিথ জুড়ে দিয়েছে। এই ‘কেউ’দেরও খুঁজে বের করতে হবে। তার আগে সাইকেল মাহাতোর বক্তব্য অনুযায়ী আমাদের ফোর্স নিয়ে এই লিস্টে যেখানে যেখানে যেতে বলা হবে, সেখানে গিয়ে জাস্ট তুলে আনতে হবে!”
“কাকে?”
“লিস্টে নাম দেওয়া থাকবে!”
“কিন্তু আমরা যখন কালাদেওর থানে অভিযানে মগ্ন, তখন এখানে কার এত সাহস যে অরণ্যবাবুর উপরে অত্যাচার চালায়?”
“এটাই তো আততায়ীর একটা বড় ভুল। আততায়ী প্রমাণ করতে চাইছে যে, কালাদেও আছে; কিংবা কালাদেও মিথ আর কার্যকর হবে না ভেবে সময় থাকতে-থাকতে আর-একটা জরুরি অপরাধ করে নিচ্ছে!”
“কীসের সময়? অপরাধী কি তবে পালাতে চাইছে?” ডিএম জিজ্ঞাসা করলেন।
“পালাতে তাকে হবেই। কারণ, সে বুঝতে পেরেছে, কালাদেওর থানে অভিযানের পরে আর কেউ বুঝুক-না-বুঝুক, পুলিশ যা বোঝার বুঝে গিয়েছে। এবার তারা কালাদেওর তদন্তকে অন্যভাবে দেখবে। তাতে তার কালাদেওর আড়ালে এই ক্যামাফ্লেজ করে থাকাও আর চলবে না। অতএব সময় থাকতে থাকতেই সে বা তারা পালাতে চাইবেই। হিউম্যান সাইকোলজি তো তেমনটিই বলে!”
এসপি বললেন, “ডিএম সাহেব যদি বলেন এবং স্বরাষ্ট্র দপ্তর যদি চান, আমরা চারপাশ সিল করে দেবো ! তারপর পালাতে গেলেই পুলিশের জালে মছ্‌লি ধরা পড়বে!”
“ফেলুদার মছ্‌লিবাবার মতো বলছেন?” শাক্য হাসল।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৫: পদ বা ক্ষমতা পেলেই কি ভিতরের স্বভাব বদলে যায়? পঞ্চতন্ত্রের অমোঘ শিক্ষা

ভার্গব অবশ্য প্রতিক্রিয়া জানালেন না দেখে শাক্য বুঝল, ভদ্রলোক সত্যজিৎ রায়ের নাম শুনলেও শুনতে পারেন, কিন্তু ওঁর কোনও ফিল্ম দেখেননি। নাহলে মছলিবাবার নাম শুনলেই জটায়ুর মতো চিৎকার করে জয়বাবা ফেলুনাথের নাম বলতেন। সে আর কিছু বলল না। মনে-মনে ভাবতে লাগল, পিশাচপাহাড়ের হত্যারহস্যের জড় কি তবে অন্য কোথাও লুকিয়ে। ইরাবতী ম্যাম লালবাজার থেকে সকলের হোয়্যার অ্যাবাউটস্‌ পাঠিয়েছেন মেইল করে। দেখা হয়নি ক’দিনের দৌড়াদৌড়ির চাপে। দেখতেই হবে আজ। —চলবে।
* ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (novel): পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক (Pishach paharer Aatanka) : কিশলয় জানা (Kisalaya Jana) বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content