বৃহস্পতিবার ১৮ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

কৈলাসচন্দ্র সিংহ।

কৈলাসচন্দ্র সিংহ। কে ছিলেন তিনি? ত্রিপুরার রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটাই বা কী ছিল? ত্রিপুরার ইতিহাসের আকর গ্রন্থ হিসেবে সর্বত্র সমাদৃত ‘রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস’ গ্রন্থের প্রণেতা হিসেবে কৈলাসচন্দ্র সকলের কাছেই পরিচিত। সে যুগে প্রান্তীয় বাংলার এক বিশিষ্ট পণ্ডিত ছিলেন তিনি। ত্রিপুরার রাজমালা ছাড়াও আরও বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি। কৈলাসচন্দ্র ছিলেন সত্যনিষ্ঠ আপসহীন এক ঐতিহাসিক। মহারাজা বীরচন্দ্রের রাজত্বকালীন সময়ে তিনি যে ভাবে রাজার তীব্র সমালোচনা করেছেন তা ভাবলে অবাক হতে হয়!এ জন্য বীরচন্দ্রের রোষানলে পড়েছিলেন তিনি। এমনকি অর্থের বিনিময়ে তদানীন্তন রাজশক্তি তাঁকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তিনি এ ধরণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এমন কথাও জানা গিয়েছে।
কৈলাসচন্দ্রের পিতা গোলকচন্দ্র সিংহরায় মহারাজ ঈশানচন্দ্র মাণিক্যের (১৮৪৯-৬২ খ্রিস্টাব্দ) আমলে ত্রিপুরার রাজস্ব বিভাগের প্রধান সচিব ছিলেন। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কালীগচ্ছ গ্রাম থেকে কৈলাসচন্দ্র যখন আগরতলায় আসেন তখন ত্রিপুরার সিংহাসনে বীরচন্দ্র মাণিক্য (১৮৬২-৯৬)। পিতার মৃত্যুর পর মাত্র ১৫ বছর বয়সেই কৈলাসচন্দ্র ত্রিপুরার রাজকার্যে প্রবেশ করেন। কিন্তু মাত্র চার বছর সেই কাজ করার পর তিনি রাজকার্য পরিত্যাগ করেন। কৈলাসচন্দ্র লিখেছেন, “…পিতৃবিয়োগের অল্পকাল পরেই আমি (১৫ বৎসর বয়ঃক্রমে) ত্রিপুরার রাজকার্যে প্রবেশ করি। প্রায় ৪ বৎসরকাল সেই কার্য্য সম্পাদন করতঃ স্বীয় পদ পরিত্যাগ করিয়াছিলাম।”
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯০: ত্রিপুরার রাজপরিবারকে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পত্র

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৭: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — পাতিশিয়াল

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা/ দ্বিতীয় অধ্যায়, পর্ব-৫৫: আকাশ এখনও মেঘলা

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি পর্ব-৯৫ : রাজনীতির দাবার ছকে ত্যাগের মহাকাব্য: এক অন্য পঞ্চতন্ত্রের খোঁজে

কৈলাসচন্দ্র মাত্র চার বছর পরই কেন রাজ সরকারের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন তা অবশ্য স্পষ্ট ভাবে তিনি কিছু বলেননি। তবে তাঁর রাজমালা গ্রন্হের ভূমিকায় সেই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, “এই সময়ে ত্রিপুর সিংহাসনের অধিকারিত্ব লইয়া মৃত মহারাজ ঈশানচন্দ্র মাণিক্য বাহাদুরের একমাত্র জীবিত পুত্র কুমার নবদ্বীপচন্দ্র বাহাদুরের সহিত বর্তমান মহারাজের কলহ উপস্থিত হয়। আমি কুমার বাহাদুরের পক্ষ অবলম্বন করি,তাঁহার সর্ব প্রকার কার্য্য সম্পাদন ভার আমার হস্তে বিন্যস্ত হইয়াছিল। ত্রিপুরেশ্বর দিগের বিস্তৃত জমিদারি, চাকলা রোশনাবাদে স্বীয় স্বত্ব সংস্হাপনের জন্য কুমার বাহাদুর ব্রিটিশ বিচারালয়ের আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেই মোকদ্দমা আমার দ্বারা পরিচালিত হইয়াছিল।”
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৯: পরবাস প্রস্তুতি (শেষ)

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪৭: অরণ্যজাতক : বন্ধু তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও

আগরতলায় আসার পরই কৈলাসচন্দ্রের জানা হয়ে গিয়েছিল রাজপরিবারে অন্তর্দ্বন্দ্ব আর ষড়যন্ত্রের কথা। তিনি বিশ্বাস করতেন ঈশানচন্দ্র মাণিক্যের পুত্র নবদ্বীপচন্দ্র (শচীন দেববর্মণের পিতা) সিংহাসনের প্রকৃত উত্তরাধিকারী। কিন্তু সিংহাসনে অধিষ্ঠিত আছেন ঈশানচন্দ্রের ভাই বীরচন্দ্র। সমবয়স্ক বলে নবদ্বীপচন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল কৈলাসচন্দ্রের। তিনি তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। কৈলাসচন্দ্রের বিশ্বাস ছিল অন্যায় ভাবে সিংহাসন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে নবদ্বীপচন্দ্রকে। তিনি নবদ্বীপচন্দ্রকে নিয়ে কলকাতা চলে যান এবং রাজার বিরুদ্ধে মামলায় উমেদারী করেন। এই মামলার জন্য কৈলাসচন্দ্রকে বহু কষ্টে অর্থ সংগ্রহ করতে হয়েছিল।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫২: শিকার এবং শিকারী

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৬: পঞ্চবটীর যাত্রাপথে প্রাপ্তি, পিতৃবন্ধু জটায়ু ও বনবাসজীবনে লক্ষ্মণের ভূমিকা

ত্রিপুরার রাজপরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সম্পর্কে কৈলাসচন্দ্র তাঁর সুবিখ্যাত গ্রন্থ ‘রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস’-এর ভূমিকায় লিখেছেন তাঁর খুল্ল পিতামহ রায় রামপ্রসাদ সিংহ অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে প্রথম ত্রিপুরার রাজকার্যে প্রবেশ করেন। তিনি আজীবন মহারাজ রাজধর মাণিক্যের প্রতিনিধি হিসেবে জাহাঙ্গীরনগরে (ঢাকা) কর্মরত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর দীর্ঘকাল পরে কৈলাসচন্দ্রের পিতা রায় গোলকচন্দ্র সিংহ ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরার রাজকার্যে যোগ দেন। যদিও তিনি রাজস্ব বিভাগের প্রধান কর্মচারী ছিলেন, তবু অন্যান্য বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও তিনি সময়ে সময়ে পালন করতেন। এমন কি, ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সময় মহারাজ ঈশানচন্দ্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব দিয়েছিলেন তাঁকে।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮২ : সখের চোর

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি

ইতিহাস রচনায় কৈলাসচন্দ্রের আপসহীন ভূমিকা ছিল। তিনি তাঁর গ্রন্হে ত্রিপুরার কয়েকজন রাজার কাজকর্মের তীব্র সমালোচনা করেছেন। বিশেষত মহারাজ বীরচন্দ্রের রাজত্বকালে তিনি যে গ্রন্থ রচনা করেছেন তাতে ছিল বীরচন্দ্রের কঠোর সমালোচনা। সেই আমলে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত রাজার সমালোচনা করে গ্রন্থ রচনা নিঃসন্দেহে এক প্রচণ্ড দুঃসাহসিক কাজ ছিল বৈকি! কিন্তু কৈলাসচন্দ্র অবলীলায় তা করেছেন। পরবর্তী সময়ে জানা গিয়েছে যে, গ্রন্থটিতে রাজার সমালোচনার অংশটুকু পরিবর্তনের জন্য নাকি ইতিহাস লেখককে উৎকোচের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কৈলাসচন্দ্র তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। কৈলাসচন্দ্রের ভাই প্রকাশচন্দ্র সিংহের লেখা সূত্রে এই কথা জানা যায়। —চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content