
বোধিসত্ত্ব সেবার ব্রাহ্মণকুলে জন্মগ্রহণ করেছেন, তক্ষশিলায় সর্বশিল্পে পারদর্শী হয়ে ফিরে এলেন, অবলম্বন করলেন গার্হস্থ্যধর্ম। কিন্তু তাঁর পত্নীবিয়োগ ঘটল। তিনি পুত্রকে নিয়ে চলে গেলেন হিমালয়ে, প্রব্রজ্যা গ্রহণ করলেন। আশ্রমে পুত্রকে রেখে অরণ্যে ফলমূলাদি সংগ্রহে যেতেন। এমনই এক দিনের কথা।
সে দিন দস্যুরা কোনও এক প্রত্যন্ত গ্রাম আক্রমণ করে কিছু নারী-পুরুষ বন্দী করে নিয়ে যাচ্ছিল। তাদের মধ্য থেকে এক কুমারী পালিয়ে যেতে সক্ষম হল। সে পালিয়ে এল বোধিসত্ত্বের আশ্রমে। তাঁর পুত্রটি সেই কন্যার হাবেভাবে প্রলুব্ধ হল। বলাবাহুল্য, যৌবন-জলতরঙ্গ রোধিবে কে?
সে দিন দস্যুরা কোনও এক প্রত্যন্ত গ্রাম আক্রমণ করে কিছু নারী-পুরুষ বন্দী করে নিয়ে যাচ্ছিল। তাদের মধ্য থেকে এক কুমারী পালিয়ে যেতে সক্ষম হল। সে পালিয়ে এল বোধিসত্ত্বের আশ্রমে। তাঁর পুত্রটি সেই কন্যার হাবেভাবে প্রলুব্ধ হল। বলাবাহুল্য, যৌবন-জলতরঙ্গ রোধিবে কে?
কন্যা যুবকটিকে বলল, “চল, এখান থেকে চলে যাই।”
মানে, পালিয়ে যাই। যুবকটি অনিচ্ছুক হয়তো ছিল না, তার মনে কী ছিল কে জানে? সে তাও কি জানতো? খানিক দ্বিধাগ্রস্ত হল সে। বলল, “বাবা আসুক। তাঁকে না দেখে যাব না।” মাতৃহীন যুবকের এই দুর্বলতা স্বাভাবিক বটে।
তো, মেয়েটিও অমত করল না। “ঠিক আছে, তাঁকে দেখেই যেও” বলে সে আশ্রমের বাইরে পথের মাঝে অপেক্ষা করতে থাকল। বোধিসত্ত্ব যথাকালে ফিরলেন।
মানে, পালিয়ে যাই। যুবকটি অনিচ্ছুক হয়তো ছিল না, তার মনে কী ছিল কে জানে? সে তাও কি জানতো? খানিক দ্বিধাগ্রস্ত হল সে। বলল, “বাবা আসুক। তাঁকে না দেখে যাব না।” মাতৃহীন যুবকের এই দুর্বলতা স্বাভাবিক বটে।
তো, মেয়েটিও অমত করল না। “ঠিক আছে, তাঁকে দেখেই যেও” বলে সে আশ্রমের বাইরে পথের মাঝে অপেক্ষা করতে থাকল। বোধিসত্ত্ব যথাকালে ফিরলেন।
আরও পড়ুন:

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৪৬: কুণ্টণি জাতক : ক্ষতির খতিয়ান

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি পর্ব-৯২: অবিবেচনা যত দ্রুত সিদ্ধান্ত আনে, তত দ্রুত ধ্বংসও আনে

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৫: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — বাঘরোল

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫০: মধ্যরাতের বিপদ-আপদ
এ পর্যন্ত পড়ে মনে হতে পারে, এ যেন শকুন্তলা-দুষ্যন্তের কাহিনি, কেবল দুটি চরিত্র পরস্পর স্থানপরিবর্তন করেছে। কী হবে শেষে? ছেলেটি চলে যাবে, অথবা যাবে না। সেদিন কী হয়েছিল?
ছেলেটি পিতার কাছে জানতে চাইল, “যদি বন ছেড়ে গ্রামে চলে যেতে চাই তবে মানুষ চিনব কেমন করে? কেমন চরিত্রবৈশিষ্ট্য, কেমন আকার দেখে কোনও মানুষকে বন্ধু বলে ভাবতে পারি?”
ছেলেটি বোকা ছিল না। তার মনে কিছু সংশয় এসেছিল, বোঝা যায়। কেন এল সংশয়? আরও অনেক সম্ভাবনার পাশেই যেটি স্বাভাবিক সেটি হল এই যে, আবাল্য অরণ্যে পালিত মানুষ সমাজধর্ম ও জীবনের জটিলতায় অনভিজ্ঞ হতেই পারে। পিঞ্জরের দ্বার খুলে দিলেও খাঁচার পাখি বাইরের আকাশ দেখেও থমকায়। এখানেও যেন শকুন্তলার কাহিনির ছায়া। কপালকুণ্ডলাকে মনে পড়ে?
ছেলেটি পিতার কাছে জানতে চাইল, “যদি বন ছেড়ে গ্রামে চলে যেতে চাই তবে মানুষ চিনব কেমন করে? কেমন চরিত্রবৈশিষ্ট্য, কেমন আকার দেখে কোনও মানুষকে বন্ধু বলে ভাবতে পারি?”
ছেলেটি বোকা ছিল না। তার মনে কিছু সংশয় এসেছিল, বোঝা যায়। কেন এল সংশয়? আরও অনেক সম্ভাবনার পাশেই যেটি স্বাভাবিক সেটি হল এই যে, আবাল্য অরণ্যে পালিত মানুষ সমাজধর্ম ও জীবনের জটিলতায় অনভিজ্ঞ হতেই পারে। পিঞ্জরের দ্বার খুলে দিলেও খাঁচার পাখি বাইরের আকাশ দেখেও থমকায়। এখানেও যেন শকুন্তলার কাহিনির ছায়া। কপালকুণ্ডলাকে মনে পড়ে?
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৫: রাজসূয় যজ্ঞের সূচনায় মতবিনিময়ে নিহিত বৈচিত্র্যময় মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯০: ত্রিপুরার রাজপরিবারকে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পত্র
সে যাই হোক, বোধিসত্ত্ব প্রাজ্ঞ মানুষ ছিলেন। তিনি ক’টি উপদেশ দিলেন।
“যে তোমার বিশ্বাসভাজন হতে চায়, তার বিশ্বাসভাজন-ও হতে হবে তো তোমাকে। যে তোমার কথা শুনবে, যে তোমার অপরাধে ক্রুদ্ধ হবে না সে-ই… বোধিসত্ত্ব কী বুঝেছিলেন বলা কঠিন, তবে যুবকটি সেই মৈত্রীর কথা জানতে চাইছে, যা দাম্পত্যসম্পর্কে নারী-পুরুষের অবলম্বনীয়।”
বোধিসত্ত্ব আরও বললেন, “যে ভুলেও কায়মনোবাক্যে তোমার অনিষ্টকামনা করে না, তাকে নির্ভয়ে হৃদয় অর্পণ কোরো, যখন বন ছেড়ে যাবে।”
তবে কি বোধিসত্ত্ব উপলব্ধি করেছিলেন পুত্রের প্রশ্নের মর্মার্থ?
“যে তোমার বিশ্বাসভাজন হতে চায়, তার বিশ্বাসভাজন-ও হতে হবে তো তোমাকে। যে তোমার কথা শুনবে, যে তোমার অপরাধে ক্রুদ্ধ হবে না সে-ই… বোধিসত্ত্ব কী বুঝেছিলেন বলা কঠিন, তবে যুবকটি সেই মৈত্রীর কথা জানতে চাইছে, যা দাম্পত্যসম্পর্কে নারী-পুরুষের অবলম্বনীয়।”
বোধিসত্ত্ব আরও বললেন, “যে ভুলেও কায়মনোবাক্যে তোমার অনিষ্টকামনা করে না, তাকে নির্ভয়ে হৃদয় অর্পণ কোরো, যখন বন ছেড়ে যাবে।”
তবে কি বোধিসত্ত্ব উপলব্ধি করেছিলেন পুত্রের প্রশ্নের মর্মার্থ?
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৫২: আকাশ এখনও মেঘলা

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৭: পরবাস প্রস্তুতি (তিন)
তিনি আরও জানালেন, “ক্ষণস্থায়ী হরিদ্বর্ণে যেমন ফিকে হয়ে আসে রঙ, প্রকৃতিতেই তো দেখা যায়, মিত্রের মৈত্রীসঞ্জাত অনুরাগ যদি তেমন-ই এই আছে, এই নেই হয়, তবে বুঝো সে তোমার মৈত্রীর উপযুক্ত নয়। অর্থাৎ কাজ ফুরোলেই যে সম্পর্কবন্ধন দুর্বল হয় তা যথার্থ নয়। পাঠক দাম্পত্যসহ পরিবার থেকে রাষ্ট্র, সকল মৈত্রীর সঙ্গেই মিলিয়ে দেখতে পারেন। যে মৈত্রীবন্ধনে অনুরাগ স্বার্থসংশ্লিষ্ট, সেখানে হৃদয়চাঞ্চল্য ঘটে। চঞ্চলচিত্ত মর্কটের মতোই শাখা থেকে শাখান্তরে, বৃক্ষ থেকে বৃক্ষান্তরে নানা দিকে ধাবিত হয়। এমন অস্থিরবন্ধনে ক্ষণতুষ্টি, ক্ষণিকেই অসন্তুষ্টি ঘটে। বাবা! এমন লোকের সংসর্গে এলে মানুষের বিপদ হয়। যদি বিজন বনেও থাকতে হয়, তাহলেও এমন বন্ধু ত্যাগ কোরো।”
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮০ : হাত বাড়ালেই বন্ধু

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
ছেলেটি বলল, “এমন মানুষ আমি কোথায় পাব? আমি কোথাও যাব না। আপনার কাছেই থাকব।”
কাহিনিতে অরণ্যের প্রেক্ষাপট ব্যঞ্জনাবহ। সম্পর্কবন্ধনে সম্ভাবনা ও বিপন্নতা উভয়-ই প্রাসঙ্গিক। অরণ্যেও শান্তি-সৌন্দর্যের পাশেই থাকে বিজনবেদনা, শ্বাপদভয়।
মেয়েটির কী হল তা নিয়ে জাতকমালা কিছু বলেন না। তবে পাঠক নিজের মতো কল্পনা করতেই পারেন। কারণ, এ হল ধর্মকথা। আর চোরা ধর্মের কথা শোনে না। তাই একালের অভিজ্ঞতা দিয়ে বিচার করতে গেলে হাতে শেষে পেন্সিলটাই অবশিষ্ট থাকবে। তবে কেউ কেউ বলতে পারেন, ছেলেটি মূঢ় অপরিণত। কেউ বলবেন, ছেলেটি ঠিক করেছে। আহা, সোনার টুকরো গো। কেউ বলবেন, বোকাটার জ্ঞানগম্যি নেই, তবু শখ কতো। মেয়েটির পক্ষপাতীরাও রে রে করে ছুটে আসবেন। কেউ বলবে, ভাই সাবধানে থাকিস, দাদারা দেখতে পেলে ঠ্যাং ভেঙে দেবে বলেছে।
জাতকমালা এসব কিছুই বলেননি, কারণ উপস্থাপ্যমান কাহিনিটি মূল নয়, মুখ্য হল মানুষ চেনার পাঠটি। যেখানে ভ্রমাকুল সংসার বিদেশ থেকে মনুষ্যবতী ভূমির বুকে সঞ্চরমান বিজীগিষু মানুষের অনন্ত মহাসম্মেলনে প্রাণের মানুষের ঠিকানা, বিপদসঙ্কুল মহারণ্যে নির্ভরতার আশ্রয়টি, অগণ্য নক্ষত্রদলে ধ্রুবতারকার সন্ধানটুকুই দিতে চেয়েছে জাতকমালার কাহিনি। —চলবে।
কাহিনিতে অরণ্যের প্রেক্ষাপট ব্যঞ্জনাবহ। সম্পর্কবন্ধনে সম্ভাবনা ও বিপন্নতা উভয়-ই প্রাসঙ্গিক। অরণ্যেও শান্তি-সৌন্দর্যের পাশেই থাকে বিজনবেদনা, শ্বাপদভয়।
মেয়েটির কী হল তা নিয়ে জাতকমালা কিছু বলেন না। তবে পাঠক নিজের মতো কল্পনা করতেই পারেন। কারণ, এ হল ধর্মকথা। আর চোরা ধর্মের কথা শোনে না। তাই একালের অভিজ্ঞতা দিয়ে বিচার করতে গেলে হাতে শেষে পেন্সিলটাই অবশিষ্ট থাকবে। তবে কেউ কেউ বলতে পারেন, ছেলেটি মূঢ় অপরিণত। কেউ বলবেন, ছেলেটি ঠিক করেছে। আহা, সোনার টুকরো গো। কেউ বলবেন, বোকাটার জ্ঞানগম্যি নেই, তবু শখ কতো। মেয়েটির পক্ষপাতীরাও রে রে করে ছুটে আসবেন। কেউ বলবে, ভাই সাবধানে থাকিস, দাদারা দেখতে পেলে ঠ্যাং ভেঙে দেবে বলেছে।
জাতকমালা এসব কিছুই বলেননি, কারণ উপস্থাপ্যমান কাহিনিটি মূল নয়, মুখ্য হল মানুষ চেনার পাঠটি। যেখানে ভ্রমাকুল সংসার বিদেশ থেকে মনুষ্যবতী ভূমির বুকে সঞ্চরমান বিজীগিষু মানুষের অনন্ত মহাসম্মেলনে প্রাণের মানুষের ঠিকানা, বিপদসঙ্কুল মহারণ্যে নির্ভরতার আশ্রয়টি, অগণ্য নক্ষত্রদলে ধ্রুবতারকার সন্ধানটুকুই দিতে চেয়েছে জাতকমালার কাহিনি। —চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















