কলকাতায় বৃষ্টি
দুলালের সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে একজন বন্দুকধারী পুলিশ কনস্টেবল আর একজন রিভলবার-সহ পুলিশ ইন্সপেক্টর। থানা-পুলিশ সকলেই প্রায় দুলাল সেনের বিচারের প্রহসনটা জানে। জানে যে আইনের মারপ্যাঁচে মিথ্যা সাক্ষ্যের ভিত্তিতে মিথ্যা অভিযোগ সত্যি বলে প্রমাণ হয়েছে। তাই দুলালকে কখনওই একজন দাগি আসামি হিসেবে গণ্য করেনি পুলিশের একটা বড়অংশ।
মুখাগ্নি করার আগে দুলাল দেখতে পেল, একটা কালো চাদর ঢাকা দিয়ে স্নিগ্ধা এসেছে মজা দেখতে। দাউদাউ করে জ্বলছে তৃপ্তি! মনে পড়ে যাচ্ছে বিয়ের দিনে খই পোড়ানোর সময় হোমের আগুন লাফিয়ে উঠেছিল তৃপ্তির শাড়ির আঁচলে। ভয়ে শিউরে উঠেছিল তৃপ্তি। আগুনে খুব ভয় তার। একবার মাকে নিয়ে সবাই মিলে মণির শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছিল। চুঁচুড়া স্টেশনে অতনু আর মাকে বসিয়ে তৃপ্তির ভয় মেটাতে রিকশো নিয়ে বাড়ি ফেরত আসতে হয়েছিল দুলালকে।

স্টেশনে পা দিয়েই তৃপ্তির মনে হয়েছিল সে রান্নাঘরে গ্যাস বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছে। গ্যাস বেরিয়ে সাংঘাতিক পরিণতি হবে। বাড়ি ফিরে দেখা গেল, গ্যাস বন্ধ আছে। এত আতঙ্কে থাকা তৃপ্তি আজ আগুনের করাল গ্রাসে নিজেকে সঁপে দিয়েছে। সমস্ত কুৎসা অপবাদ কলঙ্ক পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। আর শুধু তীব্র হিংসা থেকে যে এই ঘটনাটা ঘটাল সে এসেছে মজা দেখতে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৪৯

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৮: অসম-মিজোরাম সীমান্তে ঘাড়মুড়ার নব আবিষ্কৃত ভাস্কর্যও সুপ্রাচীন

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩২: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী— গন্ধগোকুল

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৮ : কুহক

কারও প্রতি কারও আকাঙ্ক্ষা থাকতেই পারে। কিন্তু একপক্ষের আকাঙ্ক্ষা কামনায় অন্যপক্ষের সায় নাও থাকতে পারে। কাউকে মনে মনে ভালোবাসা অপরাধ নয়, কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষাপূরণ করতে অন্যায় দাবি বা অনৈতিক চাহিদা, চরম অন্যায়ের। অনেকের নিঃশব্দ অনুচ্চারিত প্রেম অপূর্ণ থাকে, কিন্তু ভালোবাসা বা প্রেম অসম্পূর্ণ থাকলে তা কখনও অধিকার দেয় না। অসৎ গুন্ডা বদমাইশরা একইভাবে বহুমেয়ের সর্বনাশ করে। একটা মেয়ে হয়ে স্নিগ্ধা এভাবেই দুলাল তৃপ্তি এমনকি তাদের সন্তানের আজীবনের জন্য সর্বনাশ করে গেল।

দুলাল আগুনের শিখার ফাঁক দিয়ে স্নিগ্ধার মুখের চাপাহাসি দেখতে পাচ্ছে। তার চোখের উজ্জ্বলতা দেখতে পাচ্ছে। দুলাল এমনভাবে চলতে শুরু করল। সে এবার ফিরে যেতে চায়। পাশের ইন্সপেক্টর জিজ্ঞেস করল ‘ফিরে যাবেন ?’ দুলাল মাথা নিচু করে হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘হ্যাঁ!—সব তো শেষ’!
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৪: রাঙা মেঘের বেলাভূমি

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৭: মধ্যরাতের অভিযান

কনস্টেবল দুলালের আগে আগে হাঁটছে। পাশে হাঁটছে ইন্সপেক্টর। দুলাল হঠাৎ থমকে গিয়ে উপস্থিত উৎসুক জনতাকে দুহাত জড়ো করে প্রণাম করলো। তার কোমরে একটা নিয়মমাফিক বেড়ি পরানো আছে। পারলৌকিক কাজের জন্য হাতের হ্যান্ডকাফ খুলে দেওয়া হয়েছে। তখনও হ্যান্ডকাফ-পরানোতে আজকের বাধা ছি না। পুরোহিত পারলৌকিক কাজ করেছিলেন তিনি দাঁড়াতে বললেন।
—দাঁড়ান! আপনার কাজ এখনো শেষ হয়নি।
—জানি!
—দাহ সম্পন্ন হোক! চিতাকে জল ঢেলে শান্ত করতে হবে। তবে কাজ শেষ হবে।
—বেশ।
দুলাল দাঁড়িয়ে যায়, একটু দূরে দাঁড়িয়ে স্নিগ্ধা! হঠাৎ দুলালের ভাবলো “তৃপ্তির আত্মা অতৃপ্তি নিয়ে চলে যাবে?!”
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৫: পোষা হরিণকে সাঁওতালপাড়ায় মারা হয়েছিল তির ছুঁড়ে

দশভুজা, অন্য লড়াই: এই স্বাধীনতার জন্য আমরা লড়াই করিনি

ইন্সপেক্টরের রিভলবারটা বেল্টের সঙ্গে লাগানো। চামড়ার খাপের মধ্যে আঁটা। পাশে কনস্টেবলের কাঁধের বন্দুকটায় কোনও চেন নেই । ধীরভাবে চোখ ঘুরিয়ে দুলাল কাছাকাছি দাঁড়ানো স্নিগ্ধার দূরত্বটা মেপে নিল। স্নিগ্ধা দুলালকে দেখছে না, সে একদৃষ্টে জ্বলন্ত চিতার দিকে তাকিয়ে আছে। কী ভাবছে স্নিগ্ধা? দুলালের ওসব ভাবার সময় নেই!

চোখের পলক ফেলতে না দিয়ে কনস্টেবলের কাছ থেকে বন্দুকটা ছিনিয়ে তাকে ঠেলে দিল ইন্সপেক্টরের ওপর। প্রথমে বন্দুকের ভারী বাঁট দিয়ে ভয়ংকর আঘাত করল স্নিগ্ধার মাথার ঠিক মাঝখানে, থ্যাপ করে একটা থ্যাঁতলানো শব্দ! রক্তাক্ত শরীরটা সামনে লুটিয়ে পড়লো।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৭ : কাঞ্চনজঙ্ঘা: দেখা হবে চন্দনের বনে

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪২: রামায়ণে মহর্ষি অগস্ত্যের তপস্যালব্ধ শুভশক্তির আবেদন চিরন্তন

ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব ইন্সপেকর ভিড়ের হুড়োহুড়ির মধ্যে রিভলবার খাপ থেকে বের করে দুলালকে তাক করার আগেই স্নিগ্ধার মুখে আর বুকে দ্রাম দ্রাম করে দুটো গুলি চালিয়ে দুলাল বন্দুক ফেলে হাত তুলে দাঁড়িয়ে পড়লো। সে স্নিগ্ধাকে বা আমাদের নির্দয় নিষ্ঠুর আইনব্যবস্থাকে আর কোন সুযোগ দেবে না !

সঙ্গে সঙ্গে কনস্টেবল আর ইন্সপেক্টর চেপে দুলালকে মাটিতে ফেলে দিল। দুলাল বাধা দেয়নি। তার হাতে হাতকড়া লাগিয়ে হাত পিছনে বেঁধে দেওয়া হলো, মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে তাকে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে তোলা হলো। পুরোহিত এসে বললেন,—স্যার চিতা নিভে এসেছে জলটুকু ওর হাত দিয়ে ঢালতে দিন তারপর ডোমেরা বাকিটুকু করে দেবে। —চলবে।

* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকের রচয়িতা, ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১/২/৩ খণ্ড)’ ও নাটক ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’। এখন লিখছেন ‘হ্যালো বাবু’এবং ‘আকাশ এখনও মেঘলা’।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content