বৃহস্পতিবার ১৮ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁ দিকে) ছানাপোনা সহ মা কোটরে প্যাঁচা। (ডান দিকে) মঙ্গোলিয়ার মুদ্রায় প্যাঁচা। ছবি: সংগৃহীত।

ছোটবেলা স্কুলে যাওয়ার পথে অনেক দিনের পুরোনো একটা অশ্বত্থ গাছ পড়ত। আর স্কুলের সামনে একটা বড় বট গাছ ছিল। দুটো গাছেই ছিল বেশ বড় একটা করে কোটর। আমরা, স্কুলের ছেলে-মেয়েরা প্রায়শই সেই কোটরের অদূরে ভীড় জমাতাম। কারণ সেই কোটরে ছিল প্যাঁচাদের বাস। দুষ্টু ছেলেরা কেউ কেউ ঢিল ছুঁড়ত সেই কোটর লক্ষ্য করে। ওরা কোটর থেকে মুখ বের করে ব্যাপার-স্যাপার বোঝার চেষ্টা করত। আবার কখনও কখনও দু’একটা প্যাঁচাকে দিনের বেলাতেও ওই গাছের ডালে ঘন পাতার আড়ালে বসে থাকতে দেখতাম।

বেশ নাদুস-নুদুস ছোট সাইজের প্যাঁচা। লম্বায় ২২-২৩ সেমির বেশি হবে না। গায়ের রং বাদামি, আর তার ওপর সাদা ছিট। চোখের চারদিক, গলা আর পেট ফ্যাকাসে সাদা। চঞ্চুর রং সবুজ, আর পা সবুজাভ-হলুদ। ওদের দেখতে পেলেই আমরা একটা মজার খেলা খেলতাম। আমরা মাথা দোলাতাম, আর ওরা তা দেখে পলকহীন ড্যাবা চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আমাদের মতোই মাথা দোলাত। মনে হত আমাদের যেন ভেংচি কাটছে। খুব মজা হত। গাছের কোটরই এদের থাকার ঘরবাড়ি। আর তাই এদের নাম কোটরে প্যাঁচা। কোথাও কোথাও এদের খুরুলে প্যাঁচাও বলা হয়।
ইংরেজিতে এদের নাম ‘Spotted Owlet’। বিজ্ঞানসম্মত নাম Athene brama। এই ‘brama’ শব্দটির উৎস সম্ভবত সংস্কৃত শব্দ ‘ব্রহ্মা’ থেকে। হিন্দু পুরাণমতে ব্রহ্মা হলেন জগতের স্রষ্টা। আর ‘Athena’ শব্দটি এসেছে গ্রিক দেবী এথেনার নাম থেকে। গ্রিক দেবী এথেনার বাহনও প্যাঁচা। জ্ঞানের দেবী এথেনার কাঁধের উপর থাকে একটা ছোট্টো প্যাঁচা (Athena noctua)। এই প্যাঁচা দেবী এথেনার কাছে সমস্ত অপ্রকাশিত সত্যকে প্রকাশ করে। এজন্যই মনে হয় প্রাচীন গল্প-গাথায় প্যাঁচাকে জ্ঞানী পাখির মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। জ্ঞান, শিল্পকলা ও বানিজ্যের রোমান দেবী মিনার্ভার বাহনও এই প্যাঁচা।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৮: লক্ষ্মী প্যাঁচা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৪: সে-যে কেবলই যাতনাময়

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬২: আলাস্কা ঘুরে দেখার জন্য গাড়ি ভাড়া পাওয়া দুষ্কর

ছোটবেলা থেকে সুন্দরবনের মানুষের মুখে শুনে এসেছি এই কোটরে প্যাঁচারা হল অলক্ষুণে। এদের দেখা বা এদের ডাক শোনা অমঙ্গলের প্রতীক। অবশ্য আমাদের বাড়িতে প্যাঁচাদের নিয়ে এমন কুসংস্কার কোনওদিনই ছিল না। কোটরে প্যাঁচার ডাক বেশিরভাগ মানুষের কাছে বিকট শোনালেও পৌরাণিক কাহিনিতে কিন্তু এর গুণগান করা হয়েছে। নারদ মুনিকে নাকি প্যাঁচার কাছে গান শেখার জন্য মানস সরোবরের কাছে পাঠানো হয়। আবার প্যাঁচাকেই জাতীয় প্রতীকের মর্যাদা দিয়েছিল দোর্দন্ডপ্রতাপ মোঙ্গোল সম্রাট চেঙ্গিস খান। এ নিয়ে এক চিত্তাকর্ষক কাহিনি আছে।

কোনও এক যুদ্ধে শত্রুপক্ষের হাতে চেঙ্গিস খানের ঘোড়ার মৃত্যু হয়। প্রাণভয়ে দৌড়োতে থাকেন চেঙ্গিস। পিছনে তাড়া করে শত্রুরা। সামনে একটা বড় গাছ দেখে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত চেঙ্গিস তার গুঁড়ির আড়ালে লুকোন। ঠিক সেই মুহূর্তে একটা প্যাঁচা এসে বসে সেই গাছে। পরক্ষণেই অকুস্থলে পৌঁছোয় শত্রুরা। তারা বলাবলি করে, এখানে কোনও মানুষ লুকোলে প্যাঁচা এসে বসত না, মানুষ দেখে উড়ে পালাত।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৩: মেথরকে ডেকে এনে বসাতেন নিজের বিছানায়

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২২: রামের পাদুকাগ্রহণের মাহাত্ম্য, ভরত কী রামের ছায়াশ্রিত প্রশাসক?

শত্রুরা চলে গেলে চেঙ্গিস প্যাঁচাকে ধন্যবাদ জানান তার প্রাণ রক্ষার জন্য। এর পর থেকে চেঙ্গিস প্যাঁচাকে জাতীয় প্রতীক হিসেবে নির্বাচিত করেন। পরবর্তীকালে সমস্ত মোঙ্গোল সম্রাট তাদের বাহুতে প্যাঁচা আঁকা সোনার তৈরি বর্ম পরতেন। আজও মঙ্গোলিয়া, কিরগিজস্তান, কাজাকস্তান, তুর্কমেনিস্তান ইত্যাদি মধ্য-এশিয়ার দেশে প্যাঁচাকে সৌভাগ্যের প্রতীক বিবেচনা করে প্যাঁচার পালকের টুপি বা পালক লাগানো পোশাক পরার রীতি রয়েছে। মানুষের বিশ্বাস এতে কোনও বিপদ তাদের কাছে ঘেঁসতে পারবে না। অবশ্য এজন্য কত প্যাঁচাকে যে বেঘোরে প্রাণ হারাতে হচ্ছে তার হিসেব কে রেখেছে! ভাগ্যিস, সুন্দরবন এলাকার মানুষের এই কুবিশ্বাসটা নেই!
কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁ দিকে) কোটরে প্যাঁচার প্রেমপর্ব। (ডান দিকে) কোটর থেকে উঁকি দিচ্ছে কোটরে প্যাঁচা। ছবি: সংগৃহীত।

কোটরে প্যাঁচারা সাধারণত স্ত্রী-পুরুষ জোড়ায় জোড়ায় থাকে। যদিও স্ত্রী ও পুরুষের মধ্যে বহিরাকৃতিগত পার্থক্য বোঝা যায় না। সন্ধেবেলা ও ভোরবেলা এরা সবচেয়ে বেশি কর্মচঞ্চল থাকে। ইঁদুর ও ছুঁচো এদের সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য। এ ছাড়া টিকটিকি, বাদুড়, ছোটো পাখি, উড়ন্ত পোকা ইত্যদিও এদের খাবারের তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে। অনেক দিন পর বৃষ্টি হলে সন্ধ্যেবেলা যখন বাদলা পোকারা উড়ে বেড়ায় তখন সেই পোকা শিকার করে খেতে দেখা যায়। এরা কিন্তু চিল বা বাজের মতো পায়ের নখর ব্যবহার করে শিকার ধরে না। বাঁকা ও সূচালো ঠোঁট দিয়ে শিকার ধরে প্রথমে তার ঘাড় ভেঙে দেয়। তারপর নখর দিয়ে মৃত শিকার ধরে ঠোঁট দিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়। রাতে ওরা কোনও উঁচু গাছের ডালে বসে শিকারের খোঁজ করে। ছোটোবেলায় রাতে দেখেছি আমাদের পুকুর ঘাটের পাশে বড়ো আম গাছের একটা অনুভূমিক লম্বা ডালে দু’চারটে কোটরে প্যাঁচা পাশাপাশি বসে থাকত। রাতে খাওয়ার পর থালাবাসন ধোওয়ার জন্য ঘাটে গেলেই বাঁশবাগানের দিকে সবাই উড়ে পালাত।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৬: জয় বাবা ফেলুনাথ: রুকুর অন্দরমহল

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৫: অধিকার নয়, অবস্থানই বলে দেয় জায়গা কার– মালিকের? না দখলদারের?

নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাস হল এদের প্রজননের সময়। এই সময় প্যাঁচানি মাথা উপর-নিচে দুলিয়ে, লেজ নাচিয়ে পুরুষদের আকৃষ্ট করে। পক্ষী বিশেষজ্ঞদের মতে, কোটরে প্যাঁচানিদের মধ্যে বহুগামিতা দেখা যায়। প্রেমপর্বের সময় প্যাঁচা ও প্যাঁচানিকে পাশাপাশি বসে পরষ্পরের চঞ্চুতে টোকা দিতে বা পরষ্পরের পালকে চঞ্চু দিয়ে আঁচড়ে দিতে দেখা যায়। গাছের কোটরে শুকনো পাতা, পালক ইত্যাদি বিছিয়ে ওরা বাসার তলদেশ নরম করে নেয়। পুরনো বাসা বা অন্য পাখির ব্যবহৃত বাসাকেও এরা প্রজননের জন্য ব্যবহার করতে পারে। স্ত্রী কোটরে প্যাঁচা বাসায় ৩-৪টি ডিম পাড়ে। ডিমগুলোর রঙ সাদা এবং গোলাকার। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোলে মা প্যাঁচা তাদের আরশোলা, অন্যান্য পোকা ও ব্যাঙ খাওয়ায়। তবে সব বাচ্চা সমান ওজনের হয় না, কারণ প্রথম ডিম পাড়ার সময় থেকেই মা প্যাঁচা তা দিতে শুরু করে এবং বাচ্চা আগে-পরে জন্মায়। সাধারণত জন্মানোর ২০-২৮ দিনের মধ্যে একটা বা দুটো বাচ্চা উড়তে সক্ষম হয়।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৬: দীনদুখিনীর জননী সারদা

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-১১: ভাগ্যের ফেরে হাস্যকর ‘লাখ টাকা’

ভারতের প্রায় সর্বত্র কোটরে প্যাঁচার উপস্থিতি দেখা যায়। উপকূলীয় এলাকায় এদের উপস্থিতি অপেক্ষাকৃত বেশি। পাকিস্তান, বাংলাদেশ ইত্যাদি দক্ষিণ এশিয় দেশে এদের পাওয়া গেলেও শ্রীলঙ্কায় কেন একটিও কোটরে প্যাঁচা নেই তা কিন্তু বড় বিস্ময়ের ব্যাপার। ভয় হয়, সুন্দরবন থেকেও ওরা এ ভাবে হারিয়ে যাবে না তো? আমার শৈশবকালের সেইসব বট ও অশ্বত্থ গাছ আজ আর নেই। স্বভাবতই হারিয়ে যেতে বসেছে গাছের কোটর, আর সঙ্গে সেই কোটরে প্যাঁচা। বাস রাস্তার দুপাশে থাকা অনেক পুরানো বড়ো বড়ো গাছগুলো রাস্তা সম্প্রসারণের সময় কেটে ফেলা হচ্ছে। অথচ চেন্নাই শহরের মধ্যে দেখেছি কীভাবে প্রাচীন গাছগুলোকে রাস্তার মাঝে রেখে দিয়ে দু’পাশ দিয়ে রাস্তা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। উন্নয়ন চলবে, কিন্তু তার জন্য পুরনো গাছগুলোকে বলি দেওয়া বন্ধ করতে হবে। এ জন্য আগে দরকার সদিচ্চা, আর তারপর সঠিক পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন।
কলকাতায় বৃষ্টি

(বাঁ দিকে) গ্রিক দেবী এথেনার বাহন প্যাঁচা। (ডান দিকে) কিরগিজস্তানে প্যাঁচার পালক লাগানো টুপি। ছবি: সংগৃহীত।

আজকাল তো মানুষ বট, অশ্বত্থ, শিরীষ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়া, মাদার ইত্যাদি গাছ লাগায় না। আর এই কোটরে প্যাঁচারাও মানুষের বসতি এলাকার কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে। মোটা গুঁড়ি ও কোটরওয়ালা গাছের সংখ্যা খুব কমে যাওয়ায় সুন্দরবনের বসতি এলাকায় কোটরে প্যাঁচাদের সংখ্যা খুব কমে গিয়েছে। আর নিয়মিত শুনতে পাই না সন্ধেবেলা ওদের ‘তুত-তুরুউ তুত-তুরুউ’ ডাক। তবে সন্ধ্যের সময় যখন ছাদে উঠে আকাশপানে তাকিয়ে থাকি তখন রেল স্টেশনের দিক থেকে মুড়িগঙ্গা নদীর দিকে কিছু প্যাঁচাকে এখনও উড়ে যেতে দেখি। স্পষ্ট না দেখতে পেলেও ওদের আকার দেখে বুঝতে পারি ওরা কোটরে প্যাঁচা। —চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content