
ছবিটার মূলধন বলতে যে সত্তাটি, মানুষের মননের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে তা হল, উত্তম কুমার নামক ক্ষণজন্মা একজন অভিনেতার সেলুলয়েডি ধ্রুপদিয়ানা। তিনিই মহানায়ক, নারী মনোহরণের ব্রান্ড অ্যাম্বাস্যাডার উত্তমকুমার!
“তুমি অধম, তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন?” কথাটি বঙ্কিমচন্দ্রের। অধম নয়, সবাই আসলে উত্তমই হতে চায়! আর আপামর বাঙালি? উত্তমকুমার! সেই ধুতি পাঞ্জাবি, এলোমেলো চুল, পায়ে স্যান্ডেল আর হাতে সিগারেট। এ তো নস্টালজিয়া! তিনি মহানায়ক, কেবল তিনিই মহানায়ক।
তিনি তো বাঙালির আজীবন লালিত স্বপ্নের নায়ক। আজকের ভাষায় বাঙালি নারীর ‘হার্ট থ্রব’। তিনি পুরুষ মহিলা নির্বিশেষে সকলের ‘ক্রাশ’। মুখের শুভ্র হাসি, সঙ্গে নির্ভেজাল ব্যক্তিত্বের মিশেল উত্তমকুমার। তিনি উত্তম, আমাদের মতো অধমের কাছে তিনি তো স্বপ্নের রাজকুমার।
উত্তমকুমার মানেই তো বাঙালির ব্র্যান্ড। তাঁর কথাবলা, আড়চোখে তাকানো, কিংবা কুণ্ডলীকৃত ধোঁয়ায় সিগারেট চুম্বন—সবেতেই তিনি ক্লাসিক। সবেতেই তাঁর অনায়াস যাতায়াত। বাঙালির অতৃপ্ত বাসনা, কিংবা যৌবনের রসাভাষ সেখানেও উত্তমকুমার। নারী মনোহরণের ব্রান্ড অ্যাম্বাস্যাডার তিনি।
উত্তমকুমার মানেই তো বাঙালির ব্র্যান্ড। তাঁর কথাবলা, আড়চোখে তাকানো, কিংবা কুণ্ডলীকৃত ধোঁয়ায় সিগারেট চুম্বন—সবেতেই তিনি ক্লাসিক। সবেতেই তাঁর অনায়াস যাতায়াত। বাঙালির অতৃপ্ত বাসনা, কিংবা যৌবনের রসাভাষ সেখানেও উত্তমকুমার। নারী মনোহরণের ব্রান্ড অ্যাম্বাস্যাডার তিনি।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-২৪: তিন্দুক-জাতক: সঙ্কোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান

বিখ্যাতদের বিবাহ-বিচিত্রা, পর্ব-১৭: একাকিত্বের অন্ধকূপ/২: অন্ধকারের উৎস হতে
উপরের কথাগুলো “পুষ্পধনু” ছবির জন্য যথাযথ না উত্তম কুমারের জন্য যথাযথ তার বিচার কালের গর্ভে লীন হয়ে আছে। মানুষ স্মৃতির পূজারী হয়ে মুহূর্তের খেলাওয়ালা কোনও জাদুকরকে দেখে খুঁজে পেতে চাইতেন সর্বশক্তিমানের সেই অকৃত্রিম সত্তাকে।
ছবির জগতে পরপর দুটি ছবিতে একই নায়িকার আগমন বা প্রকাশ সাধারণ দর্শককে ভাবিয়ে তুলেছিল। কারণ উত্তম কুমারের পাশে কাউকে বেশিদিন দেখলেই সংবাদপত্র থেকে চলচ্চিত্র-সমালোচক সবাই ধরে নিতে চাইতেন যে দুজনের মধ্যে কোন রসায়ন নতুন করে দানা বেঁধেছে। যার ফসল চিত্রমোদী দর্শকরা সময় অনুযায়ী তারিয়ে তারিয়ে ডিভিডেন্ড-সহ উপভোগ করতে পারবেন।
ছবির জগতে পরপর দুটি ছবিতে একই নায়িকার আগমন বা প্রকাশ সাধারণ দর্শককে ভাবিয়ে তুলেছিল। কারণ উত্তম কুমারের পাশে কাউকে বেশিদিন দেখলেই সংবাদপত্র থেকে চলচ্চিত্র-সমালোচক সবাই ধরে নিতে চাইতেন যে দুজনের মধ্যে কোন রসায়ন নতুন করে দানা বেঁধেছে। যার ফসল চিত্রমোদী দর্শকরা সময় অনুযায়ী তারিয়ে তারিয়ে ডিভিডেন্ড-সহ উপভোগ করতে পারবেন।

কিন্তু মাত্র তিন মাস আগের বিচারক নামক একটি কাল্ট ছবির মুক্তি বাংলা ছবির জগতে বেশ কিছু চিন্তাশীল ব্যক্তিদের মাথায় সমস্যার রেখা ফুটিয়ে তুলেছিল। কারণ এ ধরনের বলিষ্ঠ অভিনয় এ যাবৎ উত্তম কুমার করে ওঠেননি। আর কিছুদিনের মধ্যেই “পুষ্পধনু” নামক একটি অন্য মাত্রার ছবি যখন ওই একই নায়িকাকে জুটি করে বাজারে এলো, তখন সবাই ভেবে নিয়েছিলেন বাঙালির পরিচিত উত্তম কুমার এবার বোধ হয় অন্য পথে হাঁটা শুরু করেছেন।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৪: বন্দি, জেগে আছো?

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭০: বিচারক
মাথার উপরে ঝাঁ ঝাঁ রোদে গানের নেশায় দৌড় দিতে গিয়ে উত্তরায়ন অভিমুখে উত্তম কুমারের মুখে পরিচালক একটি অনন্য সংলাপ বসান। যেখানে অরুন্ধতীর নাচের সঙ্গে তাঁকে বাঁশি বাজানোর অনুরোধ করলে তিনি বলছেন নেশাকে পেশা করার বাসনা আপাতত তার নেই।
আরও পড়ুন:

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-৯৭: শ্রীমার কথায় ‘ঠাকুরের দয়া পেয়েচ বলেই এখানে এসেচ’

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৫: সর্বত্র বরফ, কোত্থাও কেউ নেই, একেবারে গা ছমছম করা পরিবেশ
আসলে অরুন্ধতী মুখোপাধ্যায়ের উপস্থিতি মানেই শান্তিনিকেতনী একটা কেতাবিয়ানা। যেখানে রবীন্দ্রনাথ পরতে পরতে জড়িয়ে থাকবেন। তাঁর চাহনি তাঁর কথা বলা সব কিছুর মধ্যেই একটা রাজেন্দ্রনন্দিনী-ঘরানার পাখোয়াজি মেজাজ লক্ষ্য করা যেত। দর্শকদের লক্ষ্যের আগে অভিনয়কুশল উত্তম কুমার সবার আগে তাঁকে মেপে নিয়েছিলেন। সে কারণেই তাঁর চলনে বলনেও এমন একটা পরিবর্তন আনতেন যেটা সাধারণত সুচিত্রা সাবিত্রী বেলায় খুঁজে পাওয়া যেত না।

ছবির কাহিনির চাহিদাকে অতিক্রম করে এই যে প্রতিটা পরতের জরিপ উত্তমকে অন্যের চেয়ে আলাদা করে দিয়েছিল। ছবির ব্যবসায়িক সাফল্যকে দশ গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। সর্বোপরি ছবিতে শিল্পগুণ নামক যে অদৃশ্য একটা মায়াবী আকর্ষণ দর্শক শ্রোতাকে নৈসর্গিক বন্ধনে আটকে রাখে সে অংশটাও অত্যন্ত মূল্যবান হয়ে উঠেছিল এ ছবিতে।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৭৮: রক্তে ভেজা মাটিতে গড়ে ওঠে সত্যিকার প্রাপ্তি

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৩: একটি হিংসা অনেক প্রতিহিংসা, জিঘাংসা, হত্যা এবং মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে সর্বত্র
প্রবোধ সান্যাল এর কাহিনি অবলম্বনে চিত্রনাট্য রূপায়ণ করেছিলেন মনোজ ভট্টাচার্য। সুর সংযোজনার দায়িত্বে ছিলেন রাজেন সরকার। গীত রচনায় আবশ্যিকভাবে রবীন্দ্রনাথ এবং তৎকালীন নাগরিক সত্তার প্রাণপুরুষ প্রণব রায়। যাঁর লেখার প্রসাদ গুণ একটা ছবির শিল্প-সহ অনেক অংশকে মূল্যবান করে তুলবে।

ছবির নির্মাতারা নায়িকা অরুন্ধতীর পাশে, জয়শ্রী সেন নিভানানী দেবী, বাণী বন্দ্যোপাধ্যায় রাজলক্ষী দেবী, সুব্রতা সেন, তপতী ঘোষ প্রভৃতি বাঘা বাঘা শিল্পীদের স্ক্রিন শেয়ার করার সুযোগ করেছিলেন। আর নায়ক উত্তম কুমারের সাথে ভানু বন্দোপাধ্যায়, বীরেন চট্টোপাধ্যায়, অমর মল্লিক প্রভৃতিরা ছিলই।।
ছবির কাহিনি, মূল সত্তাকে রতি থেকে আরতিতে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব পালন। ছবি পরিচালনায় সুশীল মজুমদার মহাশয় যে ক্লাসিক টাচ দিয়েছেন। সেটা সে যুগে খুব বিরল ছিল বলে মনে হয়। এদিক দিয়ে ছবিটির মান উন্নয়ন কালোত্তীর্ণ।—চলবে।
ছবির কাহিনি, মূল সত্তাকে রতি থেকে আরতিতে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব পালন। ছবি পরিচালনায় সুশীল মজুমদার মহাশয় যে ক্লাসিক টাচ দিয়েছেন। সেটা সে যুগে খুব বিরল ছিল বলে মনে হয়। এদিক দিয়ে ছবিটির মান উন্নয়ন কালোত্তীর্ণ।—চলবে।
* উত্তম কথাচিত্র (Uttam Kumar–Mahanayak–Actor) : ড. সুশান্তকুমার বাগ (Sushanta Kumar Bag), অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, মহারানি কাশীশ্বরী কলেজ, কলকাতা।


















