বুধবার ১১ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি
সারাদিনের মধ্যে আর সাইকেল বা তার দলবল এল না। ওরা হয়তো আবার বেরিয়ে পড়েছে নুনিয়ার খোঁজে। নুনিয়াকে ওরা গরুখোঁজা খুঁজছে কারণ, ওদের মনে ভয় এবং সন্দেহ ঢুকেছে যে, নুনিয়া মুখ খুললে ওদের বড় বিপদ। আর এই বিপদ যাদের-যাদের দিক থেকে আছে, তাদেরকেই ওরা ধরে আনতে চাইছে, কিংবা হয়তো নিকেশ করে দিচ্ছে পৃথিবী থেকে। ভাবতে-ভাবতেই একটা সম্ভাবনার কথা বিদ্যুচ্চমকের মতো মাথায় এল সত্যব্রতর। তাঁর ভ্রূ-যুগল নিবিড় হয়ে পরস্পরকে ছুঁতে চাইল। কিছুক্ষণ গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেলেন তিনি। যা ভাবছেন, তা যদি সত্য হয়, তাহলে যদি এখান থেকে পালাতে পারেন, নিজেকে বাঁচাতে পারেন, তাহলে কালাদেও-কাণ্ডের উপর আলোকপাত করতে পারবেন যথাযথভাবে। তবে বুধন-হত্যারহস্যের সঙ্গে সাইকেল অ্যান্ড কোং যে সয়ারাসরি জড়িত তাতে সন্দেহ নেই। তা-না-হলে নুনিয়ার উপরে এভাবে উঠে-পড়ে লাগত না। নুনিয়া ওদের গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে, বার করতে কিংবা নামাতে না পারলে ওদের শান্তি নেই।

এদের অতিথি-আপ্যায়ণের ব্যাপারটা ভীষণ খারাপ। সকাল থেকে তাঁকে কিছু খাবারদাবার দেওয়া হয়নি। দুপুরে ট্যালটেলে ডাল, আলু-কুদরি ভাজা, একটা ভয়ানকরকম বাজে খেতে কুচু-ঘেঁচু মেশানো তরকারি আর ডিমসেদ্ধ। ভাতগুলি সম্ভবত অনেক সকালে কিংবা গতকাল রাতে করা, কারণ, সেগুলি থেকে একটা টক গন্ধ উঠছিল। একেবারেই মুখে দেওয়া যায়নি। খালি মুখেই আলু-কুদরি ভাজা আর ডিমটা খেয়েছেন। বাকিগুলি সামান্য স্পর্শ করে আর মুখে তোলেননি। খাওয়ার জল চেয়েছিলেন। দুটি দু’লিটার ঠান্ডা পানীয়র বোতলে ভরে জল দিয়ে গিয়েছে তাঁকে। আন্দন্দের এটুকুই যে, জলের বোতলগুলি মান্ধাতার আমলের নয়। বলতে গেলে দুপুরে জল খেয়েই পেট ভরিয়েছেন। কিন্তু তারপর থেকে তার খেসারৎ দিতে হচ্ছে তাঁকে। ব্লাডার ফুলে উঠেছে। ইতিমিধ্যে একবার ছোট বাইরেও করতে হয়েছে। যখন খাবার থালা ফিরিয়ে আনতে এসেছিল লোকটি, তখনই করেছেন। কিন্তু তারপর থেকে অনেক রাত হয়ে গেল, এখনও তারও আর কোনও সাড়াশব্দ নেই।
পালাতে হবে-পালাতে হবে। কিন্তু কখন সেই সুযোগ পাবেন, তা তিনি জানেন না। কিন্তু এটুকু জানেন, যত দেরি করবেন, ততই পালানোর সুযোগ কমে আসবে। কারণ, সাইকেলরা দীর্ঘদিন এখানে তাঁকে এভাবে আটকে রেখে স্বস্তি পাবে না। কারণ, আজ নয়, কাল তাঁর অপহরণ কিংবা অন্তর্ধানের কথা পুলিশ জানবেই এবং জানলে তাঁকে খুঁজতে উঠেপড়ে লাগবে। কথাটা সাইকেল এবং তার দলবল ভালো করেই জানে। অতএব তার আগেই এখান থেকে অন্যত্র তাঁকে সরিয়ে ফেলতে চাইবে তারা। তাঁর জানা নেই, এই জায়গাটি কোথায়। এমনিতেই পিশাচপাহাড় পার্শ্ববর্তী রাজ্যের সীমান্তঘেঁষা, তার উপর এই জায়গাটি যদি প্রায় উভয় রাজ্যের সীমানার উপর হয়, তাহলে অন্য রাজ্যে চালান করে দেওয়া কোন ব্যাপারই নয়। কিন্তু সে সুযোগ ওদের দেওয়া যাবে না। কারণ, ওরা এ-পাশেই থাক কিংবা ও-পাশেই যাক, তাঁকে বাঁচিয়ে রাখলে অদের বিপদ বাড়বে বই কমবে না। ওরা নিশ্চিত নয় যে, নুনিয়া তাঁকে কিছু বলেছে কি-না, কিন্তু এ-টুকু নিশ্চিত যে, সত্যব্রত যেদিনই ছাড়া পাবেন, সেদিনই ওদের বিরুদ্ধে থানায় রিপোর্ট করবেন, আর করলে ওদের এই বিরাট অপরাধচক্রের পর্দা সরে যাবে, চুনোপুঁটি থেকে রাঘববোয়াল ধরা পড়বে। দলের তথা তাদের অন্যায় কাজকারবারের এত বড় ক্ষতি সাইকেল মাহাতোরা হতে দিতে পারে না !

উত্তেজনায় হাত কামড়ালেন সত্যব্রত। ইস্, আর-একটু সতর্ক যদি হতেন। এত সহজে ওদের বিশ্বাস করে বেরিয়ে আসা উচিত হয়নি, গোবিন্দ আসবে বলেছিল সাথে, সে-যদি আসত, তাহলে ওরা হয়তো অন্য প্ল্যান ভাঁজতো। একবার মনে হচ্ছে, তাকে না-নিয়ে আসা ভুল হয়েছে, আর-একবার ভাবছেন সে যে আসেনি, তাতে শাপে বর হয়েছে, কারণ, সত্যব্রত না-ফিরলে গোবিন্দ নিশ্চয়ই থানায় যাবে এবং তাঁকে উদ্ধারের ব্যাপারে আদা-জল খেয়ে লাগবে। গোবিন্দ লোকটি আর-যাই-হোক ভীষণ সৎ ও সাচ্চা দিল ইনশান। আচ্ছা, সে-কি ইতিমধ্যেই থানায় গিয়েছে? সত্যব্রত নিজেকেই প্রশ্ন করলেন। কিন্তু নিজে তো আর এর উত্তর দিতে পারবেন না, কারণ উত্তরতা তাঁর জানা নেই, ফলে নিজের ভিতর থেকে কোন জবাব এল না। মনে-মনে ভাবলেন তিনি, যদি লালবাজারের ওই অফিসার ভদ্রলোক এবং সুদীপ্ত নামের লোকাল থানার সেকেন্ড-অফিসারটি তাঁর অপহরণের বিষয়টা শোনে তাহলে তারা বিলম্ব করবে না। দ্রুত উঠে-পড়ে লাগবে তাঁকে খোঁজার ব্যাপারে।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৭: আঁধারে ছিল আগন্তুক?

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৩৬: বরুণজাতক: অলস মস্তিষ্কের গল্প

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৭: রবীন্দ্রনাথের নামে ভিত্তিহীন অভিযোগ, ‘চোখের বালি’ নাকি চুরি করে লেখা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১১: পাতিকাক

বিষয়টা একদিক দিয়ে যেমন আশ্বাসের, অন্যদিক থেকে ভয়ের। কারণ, সাইকেল মাহাতোরা ভয় পেয়ে কিংবা বেকায়দায় পড়ে তখন হয়ত সত্যব্রতকে একেবারে প্রাণে মেরে ফেলতে পারে! সাইকেলকে যেটুকু বুঝেছেন তিনি, তাতে লোকটির খুন করতে হাত কাঁপবে না। ঠান্ডা মাথায় লোকটি একসঙ্গে একাধিক মার্ডার করতে পারে, উইদাউট এনি অনুশোচনা!

কিন্তু কখন পালাবেন তিনি। কীভাবেই বা পালাবেন। যদি রাতে পালানোর চেষ্টা করেন, তাহলে হয়ত এই লোকটিকে কাবু করে পালালেন। কিন্তু যাবেন কোথায়? এই জঙ্গল-মধ্যবর্তী অঞ্চলগুলি রাতের অন্ধকারে মারাত্মক হয়ে ওঠে। ভালুক, শিয়াল, বুনো কুকুর, হায়না, আর বুনো হাতি—কখন কার মুখোমুখি পড়বেন তার ঠিকঠিকানা নেই। তার উপর শীত চলে গিয়ে এখন বসন্তকাল, সাপেরা তাদের বিবর ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে শুরু করেছে, দীর্ঘকালীন শীতঘুমে থেকে তাদের ভেনাম উপচে পড়ছে। ঢালতে পারলেই তারা বাঁচে। এসবের সঙ্গে যুঝতে পারার মতো ক্ষমতা তাঁর নেই। তাছাড়া যদি সেফ এসকেপের রুট তাঁর জানা থাকত, তাহলে তিনি অ্যাটেম্পট্ নিতেন রাতের বেলায় পালিয়ে যাওয়ার। কিন্তু তিনি তো জানেনই না যে, কোথায় কোন দিক দিয়ে পালাতে হবে।

অতএব এখান থেকে যদিও বা পালালেন, জঙ্গলেই মারা পড়বেন। অতএব মূর্খের মতো এমন পালানর চেষ্টা না-করাই শ্রেয়। তাহলে?
অনেকক্ষণ চিন্তা করতে-করতে অবশেষে সত্যব্রতর মাথায় একটা প্ল্যান এল। প্ল্যানটা এক্সিকিউট করতে পারবেন কি-না তা তিনি জানেন না, তবে চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি নেই। এই প্ল্যানটা সফল হলে, হয়ত তিনি বেঁচে গেলেও যেতে পারেন। নাহলে কী হবে জানেন না।
রাত অনেক হয়েছে মনে হয়। এ-ঘরে স্বাভাবিকভাবেই কোন ঘড়ি নেই। মোবাইলটাও সঙ্গে নেই যে সময় দেখা যাবে। এইসব জঙ্গল-দেশে অবশ্য সন্ধ্যা নামলেই মনে হয় অনেক রাত হয়ে গিয়েছে। গ্রামের অধিকাংশ বাড়িগুলিই তো সাতটা-আটটা বাজতে না বাজতেই নিঝুম হয়ে যায়। এমনিতেই এসব জায়গায় সন্ধ্যের পর এত লোডশেডিং-এর দাপট যে আদৌ কারেন্ট আছে, সেটাই বোঝা যায় না। তার উপর এই একটেরে পরিত্যক্ত কিংবা বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলবাড়ির দিকে কোন জনবসতি তেমন না-থাকায় আরও ঘন হয়ে এসেছে রাত। ঝিঁঝির আওয়াজ এবং দু’-একটি অসতর্ক রাতচরা পাখির আওয়াজ ছাড়া কিছুই কানে ভেসে আসছে না। এরা রাতে কি কোন খাবার-দাবার দেবে না ? না-কি যার দেওয়ার কথা সেই লোকটি মহুয়া খেয়ে পড়ে আছে? একরাত না খেলে যে সত্যব্রতর কিছু যায় আসবে, তা নয়, আসলে লোকটি আসুক, এটাই তিনি চাইছেন। খালি হাতে এলেও ক্ষতি নেই। না এলে যে তাঁর প্ল্যানটা এক্সিকিউট করা মুশকিল হয়ে পড়বে।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৭: শুধু মুখে ধর্মের বুলি আওড়ালেই কেউ ধার্মিক হয়ে যায় না

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭০: ত্রিপুরায় বারবার দেশের ইংরেজ শাসন বিরোধী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে

আজ দুপুরে টয়লেটে গিয়ে নিজের প্যান্টের হিডন্-পকেটে হাত দিয়ে সত্যব্রত চমকে উঠেছিলেন। এখানে যখন সত্যব্রত পৌঁছন, তখন তাঁর জ্ঞান ছিল না। ওরা এখানে নিয়ে এসে তাঁর সঙ্গে থাকা ডাক্তারির বক্স, মোবাইল, হিপ-পকেটে থাকা কিছু খুচরো টাকাকড়িসহ পার্স, ঘড়ি ইত্যাদি খুলে নিলেও, প্যান্টের হিডন-পকেটে যে পাঁচশো টাকার চারখানি নোট আছে, তা টের পায়নি। পেলে নির্ঘাৎ তা তারা সরিয়ে ফেলত। কিন্তু এটাই এখন তুরুপের তাস সত্যব্রতর। একেই বলে রাখে হরি, মারে কে? এই টাকাটা, সত্যব্রতর যতদূর মনে পড়ছে, ড্যানিয়েল হরিপদ মাহাতোর শোধ দেওয়া টাকা।

পাঁচ মাস আগে বিশেষ প্রয়োজনে সে দশ হাজার টাকা ধার নিয়েছিল সত্যব্রতর কাছে, তার প্রথম কিস্তি হিসেবে সে দু’-হাজার টাকা কাল বিকেলেই দেয়। সেই টাকাটা সেই মুহূর্তে প্যান্টের হিডন-পকেটে রেখে দিয়েছিলেন যে, পরে আলমারিতে তুলে রাখবেন। কিন্তু নানা কারণে সেটি রাখতে ভুলেই গিয়েছিলেন তিনি। তারপর নুনিয়ার আগমন থেকে এক রাতের মধ্যে যা-যা ঘটল! কিন্তু এরা বোধহয় পার্সতা হস্তগত করায় ভেবেছিল, তাঁর কাছে যা টাকা-কড়ি আছে, তা ওই পার্সেই আছে। অন্যসময় হলে তেমনটাই হত, কিন্তু আকস্মিকতা বহমান জীবনের অঙ্গ। হঠাৎ-হঠাৎ করে এমন সব ঘটনা ঘটে যায় এ-জীবনে, যাকে সাধারণ যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে বিচার করা চলে না। আবার এমন ঘটনাও আছে, যাকে সাধারণ যুক্তি দিয়ে বিচার করা গেলেও, তা যে আমাদের জীবনে ঘটতে পারে সেটাই কেমন অসম্ভব বলে মনে হয়। এখানে অবশ্য সত্যব্রতর অন্যমনস্কতার জন্য টাকাটা থেকে গিয়েছিল আর সাইকেলদের অতিবুদ্ধির জন্য তারা সেটার সন্ধান পায়নি। পেলে আর এই জিনিসটি দিয়ে উদ্ধারের স্বপ্ন দেখতেন না সত্যব্রত। কিন্তু সমস্তই ব্যর্থ হবে যদি লোকটি না আসে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৫: আজও আধুনিক সমাজ রাজা দুষ্মন্তের তঞ্চকতা এবং দ্বিচারিতার দূষণমুক্ত নয়

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৩: অগত্যা আমার গাড়িতে বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আলাস্কা ভ্রমণে

নাহ্, এই দু’হাজার টাকাটা লোকটিকে দিলে, সে নিজের প্রাণের মায়া জলাঞ্জলি দিয়ে সত্যব্রতকে নিরাপদে পালিয়ে যেতে সাহায্য করবে, এমন ভাবছেন না তিনি। এ-আশা দুরাশা। কারণ, লোকটি জানে, তিনি পালিয়ে গেলে তার কপালে দুঃখ নাচছে। তার উপর দু’হাজার টাকার জন্য সে যদি তাঁকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে, তাহলে সে সাধ করে নিজের মরণকেই ডেকে আনবে। কারণ, সাইকেল নৃশংস হয়ে উঠে লোকটির পেট থেকে ঠিক বার করে ফেলবে আসল সত্যটা। তারপর সাইকেলের উপরেও ‘আসল’ যে প্রভু আছে, যার ইঙ্গিত দিয়েছিল লোকটি, সেই প্রভু কি-আর চাইবেন এমন বিশ্বাসঘাতককে দলে রেখে দিতে? মনে হয় না। এদের যে-টুকু কর্মপদ্ধতির নমুনা পেয়েছেন তিনি, তাতে এরা এত উদার, মানবিক এবং ক্ষমাশীল নয়। তা-হলে আর এই জাতীয় কাজকর্মে জড়িয়ে পড়ত না। নাহ্, সেইজন্যই লোকটিকে দু’হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে পালানোর মতো হাস্যকর প্ল্যান তিনি করেননি। তাঁর প্ল্যান অনেক নিরীহ, কিন্তু আঁটোসাঁটো।

দরজায় খুট্ করে আওয়াজ হতেই সত্যব্রত সতর্ক হলেন। কেউ তালা খুলছে। সাইকেল? না-কি লোকটি? তাকিয়ে রইলেন তিনি দরজার দিকে। দরজা খুলে সেই লোকটিই ঢুকল। হাতে একখানা থালায় খাবার। খাবারের গন্ধ নাকে এল তাঁর। সকালবেলার খাবারে এই গন্ধ ছিল না।
তাঁর সামনে খাবারের থালা নামিয়ে লোকটি কিছুটা ঝাঁঝ মিশিয়ে বলল, “কই হে লবাবপুত্তুর, খেয়ে নাও। দেখ, তোমার মুখে ওঠে কি-না! দুপুরে তো লবাবি করে কিছুই খাওনি? ক্যানে, আমি কি খুব খারাপ রেঁধেছিলাম?”
সত্যব্রত অভিনয় করলেন। “না না ভাই, রান্না ভালো হয়েছিল, আসলে আমার কেমন গা গুলাচ্ছিলো। ওরা কাল ধরে আনার সময় মাথায় এমন জোরে আঘাত করেছিল যে, মাথাটা এখনও ভার-ভার লাগছে। ওষুধ-বিসুধও নেই যে খাবো। নিজে ডাক্তার হয়ে যে নিজের চিকিচ্ছে করাবো, সে-উপায়ও নেই। সেইজন্যই খাইনি। রাগ করো কেন ভাই? বসো। তুমি খেয়েছো?”
লোকটি কী ভাবল কে জানে, উবু হয়ে বসল তার সামনে, বলল, “আমি খাবো এখন। তুই খেয়ে নে। আমি থালা নিয়ে যাবো একেবারে!”
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৯ : মণিহারা: করিডর, সেজবাতি আর…

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

সত্যব্রত দেখলেন থালায় ধোঁয়া ওঠা তড়কা, বড় এক টুকরো পেঁয়াজ, কাঁচালংকা, আচার, ডিমসেদ্ধ আর চার-পাঁচখানা রুটি রাখা। বাবা! এ-তো দেখছি রাজভোগ! মনে-মনে বললেন সত্যব্রত। তারপর লোকটিকে বললেন, “ভাই, এ-সব খাবার তুমি রান্না করেছো?”
“নাহ্, কিনে আনছি ! এখানে এ-সব করব, তার ব্যবস্থা কোথায়?”
“তোমাদের এখানে এত রাতে এ-সব পাওয়া যায়?”
“এত রাত কোথায় ? সবে তো আটটা বাজে। আর এখানে সারারাত ভাঁটিখানা আর এই তড়কা-রোটির দোকান খোলা থাকে। হাইওয়ে না! সারারাত ট্রাক-লরি চলে। তারা গাড়ি থামিয়ে রাতের খাবার খায়। ওস-ব ব্যবস্থাও আছে!” বলে চোখ দিয়ে ইঙ্গিত করে লোকটি। বুঝতে অসুবিধা হল না যে, সে দেহ-ব্যবসার কথা বলছে।
সত্যব্রত চমকে উঠলেন। তাহলে জায়গাটি হাইওয়ের কাছেই? কিন্তু স্কুলবাড়িটা সম্ভবত একটু ভিতরের দিকে, একেবারে হাইওয়ের কাছে নয়, তা-না-হলে গাড়ি যাতায়াতের আওয়াজ পেতেন। অন্তত এই রাতের বেলা।

সত্যব্রত খাবার খাওয়ার দিকে মন দিলেন। হ্যাঁ, খাবারের স্বাদ বেশ ভালো। কিন্তু এখন মৌজ করে খাবার খাওয়ার সময় নয়। প্ল্যান পাল্টে ফেলেছেন তিনি। আজ রাতেই পালাতে চেষ্টা করবেন। কাল ভোরের অপেক্ষায় থাকবেন না। তিনি লোকটির দিকে তাকালেন। লোকটি সম্ভবত নেশা করে এসেছে। যদিও তেমন কোন গন্ধ নাকে আসছে না। কিন্তু লোকটি ঝিমুচ্ছে। মাঝে-মধ্যে চোখ খুলে দেখছে সত্যব্রতর খাওয়া শেষ হল কি-না। সত্যব্রত প্যান্টের পকেট থেকে আস্তে করে একটা পাঁচশো টাকার নোট ছুঁড়ে দিলেন ঘরে যে চৌকি রাখা ছিল, সেদিকে। তারপর যেন হঠাৎ চোখে পড়েছে, এমনভাবে বললেন, “আরে ওটা কি?”
শুনেই লোকটি সচকিত হয়ে উঠল। বলল, “কী বলছিস?”
“আরে দেখো, চৌকির নিচে কী পড়ে আছে। মনে হচ্ছে যেন টাকা!”
“কই? দেখি!” বলে লোকটি সেদিকে তাকিয়ে বলল, “আরে তাই তো মনে হচ্ছে রে। কার টাকা? তুর?”
“আরে না, আমার টাকাকড়ি তো আমার পার্সে ছিল, সেটা তো তোমাদের সাইকেল নিয়ে নিয়েছে। ওটা ওদের কারুর টাকা হবে!”
লোকটি আস্তে-আস্তে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে নিচু হয়ে টাকাটা কুড়াতে যায়। সে ভাবতেও পারেনি সেই অবসরে সত্যব্রত এঁটো হাতেই তার ঘাড়ের নির্দিষ্ট জায়গা লক্ষ্য করে আঘাত করবেন। কিন্তু যা সে ভাবেনি, তাই ঘটল, আর…!—চলবে।
* ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (novel): পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক (Pishach paharer Aatanka) : কিশলয় জানা (Kisalaya Jana) বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজ।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content