
ছবি: প্রতীকী।
সেবার গান্ধারদেশের তক্ষশিলায় বোধিসত্ত্ব এক প্রসিদ্ধ আচার্য হয়েছেন। পাঁচশত শিষ্য তাঁর আশ্রয়ে বিদ্যালাভ করতো। একদিন তিনি শিষ্যদের শুষ্ক কাঠ আনতে পাঠালেন অরণ্যে। সেই কাঠে আশ্রমের রন্ধনাদি কাজ হতো। সকলে বনে গিয়ে কাঠ সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তাদের দলে একটি শিষ্য অত্যন্ত অলস ছিল।
এই আলস্য নিয়ে শাস্ত্রে বহু উপদেশ দেওয়া হয়েছে। রাজা থেকে প্রজা, আলস্যে আক্রান্ত হলে তারা নিজেদের ক্ষতিই করে থাকে। তাই বলা হয়, উদ্যোগী মানুষ-ই জয়লাভ করে। অবশ্য, কচ্ছপ আর খরগোশের সেই বিশ্রুত গল্পটিতে কচ্ছপ শেষমেষ জয়ী হয়েছিল। কিন্তু, মন্থরগতি আর অলস উদ্যোগহীনের মধ্যে ভেদ তো আছেই। শাস্ত্র “উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য প্রাপ্য বরান নিবোধত”র মন্ত্রে দীক্ষিত করে এই জগতে “চরৈবেতি”, কেবল এগিয়ে চলার উপদেশ দিয়েছেন। জানিয়েছেন যে, তমোগুণের প্রভাবেই মানুষের এমন বৈকল্য, আলস্যের ভাব জাগে। শিষ্যরা শৈশব থেকেই গুরুকূলে পুরুষার্থলাভের নানা প্রকরণ, ইন্দ্রিয়জয়ের নানা উপায় অভ্যাস করে। নানা বিদ্যা, বিবিধ শিক্ষার অভ্যাস করতে করতে বিভিন্ন চারিত্রিক গুণাবলী অর্জনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যটি পূরণ করা যদি এই বিদ্যাশিক্ষার অন্যতম তাত্পর্য হয় তবে তার পাশেই থাকবে আপন থেকে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়াতে পারার শক্তি ও সামর্থ্য অর্জনের বিষয়টি। অলস মানুষের ব্যক্তিস্বার্থের হানি ঘটে বলাবাহুল্য, কিন্তু আলস্য কখনও কখনও সমষ্টিকেও ক্ষতি ও লাঞ্ছনার সম্মুখীন করে।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৩৫: নলপানজাতক : বুদ্ধিবল

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৭: আঁধারে ছিল আগন্তুক?

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৭: রবীন্দ্রনাথের নামে ভিত্তিহীন অভিযোগ, ‘চোখের বালি’ নাকি চুরি করে লেখা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১১: পাতিকাক
আচার্যের সেই অলস শিষ্যটি বনে প্রবেশ করে একটি বিপুলকায় বরুণবৃক্ষ দেখে ভাবল, “এখন এখানে একটু ঘুমিয়ে নিই, এই গাছটা দেখে তো শুষ্ক-ই মনে হচ্ছে। এর কিছু ডাল কেটে নিয়ে গেলেই হবে’খন।”
নিজের উত্তরীয়টি গাছের নিচে ভালো করে পেতে সেই বৃক্ষতলেই সে তন্দ্রাচ্ছন্ন, ক্রমে গভীর নিদ্রায় বিভোর হল। তার সতীর্থরা শুষ্ক কাঠের বোঝা সংগ্রহ করে ফিরে যাওয়ার সময় তাকে দেখতে পেল। তার পিঠে একটি লাথি কষিয়ে বন্ধুর দল তার নিদ্রা ছুটিয়ে দিল, তারা ফিরে গেল আশ্রমে।
নিজের উত্তরীয়টি গাছের নিচে ভালো করে পেতে সেই বৃক্ষতলেই সে তন্দ্রাচ্ছন্ন, ক্রমে গভীর নিদ্রায় বিভোর হল। তার সতীর্থরা শুষ্ক কাঠের বোঝা সংগ্রহ করে ফিরে যাওয়ার সময় তাকে দেখতে পেল। তার পিঠে একটি লাথি কষিয়ে বন্ধুর দল তার নিদ্রা ছুটিয়ে দিল, তারা ফিরে গেল আশ্রমে।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৭: শুধু মুখে ধর্মের বুলি আওড়ালেই কেউ ধার্মিক হয়ে যায় না

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭০: ত্রিপুরায় বারবার দেশের ইংরেজ শাসন বিরোধী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে
এদিকে সেই অলস শিষ্যের নিদ্রা তখনও পুরোপুরি ভাঙেনি। সে উঠে বসে দু’চোখ রগড়ে খানিক ভাবলো, তারপর ঘুম-ঘুম চোখে চড়ে বসলো গাছে। কিন্তু যেই সে একটি বৃক্ষশাখা আকর্ষণ করে টান দিল, তখনই সেই ডালটি ভেঙে ভগ্নপ্রান্ত ছুটে এসে তার চোখে লাগল। আহত চোখটি এক হাতে ঢেকে অন্যহাতে কাঁচা ডালপালা কিছু ভেঙে আঁটি বেঁধে সে আশ্রমে ফিরে এল। আঁটিটি সহপাঠীদের আনা শুকনো কাঠের ওপরেই ফেলে রাখল।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৫: আজও আধুনিক সমাজ রাজা দুষ্মন্তের তঞ্চকতা এবং দ্বিচারিতার দূষণমুক্ত নয়

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৩: অগত্যা আমার গাড়িতে বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আলাস্কা ভ্রমণে
তারপর একদিন কোনও এক গ্রামে আচার্য ভোজনের জন্য নিমন্ত্রিত হলেন। তিনি শিষ্যদের ডেকে জানালেন যে পরদিন প্রত্যুষে তারা যেন সেই গ্রামে চলে যায়। তবে যাত্রার আগে রন্ধন করে খাদ্যগ্রহণ করে যেতে হবে। সেখানে গুরু ও শিষ্যদের জন্য পৃথক পৃথক্ ভোজ্যের ব্যবস্থা থাকবে, তা নিয়ে তারা ফিরে আসবে আশ্রমে। সেই অনুসারে পরদিন শিষ্যরা প্রত্যুষে ঘুম থেকে উঠে পরিচারিকাকে জাগিয়ে দিল। তাকে শীঘ্র পাক সম্পন্ন করার তাড়া দিতে পরিচারিকা সেই কাঁচা কাঠগুলিই তাড়াতাড়ি উনুনে দিল। তারপর বহুবার ফুঁ দিয়ে, নানা কৌশল করেও আর উনুন ধরানো গেল না। এর মধ্যেই সূর্য উঠে গেল। শিষ্যরা ভেবে দেখলো যে, বেলা হয়ে গিয়েছে, আর যাওয়ার সময় নেই।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৯ : মণিহারা: করিডর, সেজবাতি আর…

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান
এরপর তারা আচার্যের কাছে গেল। বিস্মিত আচার্য তাদের দেখে জানতে চাইলেন। শিষ্যরা জানালো যে, সূর্যোদয়ের পূর্বে উনুনে আগুন ধরানোই গেল না, তাই যাওয়ায় ব্যাঘাত ঘটল। কেন এমন হল? ওই অলস শিষ্যের আনা কাঁচা কাঠের ইন্ধনেই অগ্নিসংযোগ ব্যাহত হয়েছে। শুকনো কাঠের ওপরে ফেলে রাখা কাঁচা কাঠকেই পাচিকা শুষ্ক ভেবেছিল যে। তখন আচার্য বললেন, দেখো, এই মূর্খের জন্য তোমাদের কর্মহানি হল। যে কাজ আগে করা উচিত, পরে করলে তা অনুতাপ ও লজ্জা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারে না।
পুঁথির মধ্যে থাকা শিক্ষা নয়, জীবনের শিক্ষাই মানুষকে সমৃদ্ধ ও কুশল করে। ত্রুটিহীন, সার্থক করে। ওই অরণ্যভূমি, ওই নিদ্রালস বিভ্রম, শিষ্যের ওই আলস্য, নিদ্রা, আঘাত ও চক্ষু আবৃত করে কর্মসম্পাদনে যে ব্যঞ্জনা, গূঢ়ার্থ আছে তা অনুসরণ করলে মানুষের আলস্যে আচ্ছন্ন বিমুখতার দোষে সমষ্টির ক্ষতির তত্ত্বটি উপলব্ধি করা যেতে পারে। এই কাহিনি সেই ত্রুটি থেকে উত্তরণের শিক্ষাটিই দিয়ে যায়। —চলবে।
পুঁথির মধ্যে থাকা শিক্ষা নয়, জীবনের শিক্ষাই মানুষকে সমৃদ্ধ ও কুশল করে। ত্রুটিহীন, সার্থক করে। ওই অরণ্যভূমি, ওই নিদ্রালস বিভ্রম, শিষ্যের ওই আলস্য, নিদ্রা, আঘাত ও চক্ষু আবৃত করে কর্মসম্পাদনে যে ব্যঞ্জনা, গূঢ়ার্থ আছে তা অনুসরণ করলে মানুষের আলস্যে আচ্ছন্ন বিমুখতার দোষে সমষ্টির ক্ষতির তত্ত্বটি উপলব্ধি করা যেতে পারে। এই কাহিনি সেই ত্রুটি থেকে উত্তরণের শিক্ষাটিই দিয়ে যায়। —চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















