শনিবার ৬ জুন, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ধোদর আলি রাস্তা।

বিশ্বজুড়ে নানা জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে হরেক রকমের ঐতিহাসিক ঘটনাবলি। সেই ইতিহাসকে ঘিরে থাকে অনেক কৌতূহল, জিজ্ঞাসু মন খুঁজে বেড়ায় সেই ইতিহাসের গল্প। আর সেই সঙ্গে ঐতিহাসিক ইমারত কিংবা রাস্তা ভ্রমণপিপাসুদেরও আগ্রহ জন্মায়। হ্যাঁ রাস্তা, পৃথিবীর আর কোথায় কোথায় এমন ইতিহাস বিজড়িত রাস্তা দেখতে পাওয়া যায় তা বলা মুশকিল। তবে অসমে রয়েছে তেমনই একটি রাস্তা রয়েছে, যা ধোদর আলি নামে বিখ্যাত। আহোম শাসনকালের এক মজাদার নিদর্শন এই ধোদর আলি। আর একথাও মেনে নিতে হয় যে, জনসাধারণের যাতায়াতে অনেক সুবিধা হয়েছিল এই ধোদর আলি পরিকল্পনায়। ধোদর আলি কুড়েদের পথ বলেও জানা যায়।
আহোম রাজারা অসমে সুশাসন করেছিল ইবং তাঁদের রাজত্বকালে অসমের অনেক উন্নতি হয়েছিল। আহোম রাজারা বিশ্বাস করতেন, কর্ম প্রাধান্যের মধ্য দিয়েই উন্নতি সম্ভব। এই ধোদর আলি পরিকল্পনাটি মূলত করম উদ্যোগী প্রজাদের মনে ফূর্তি আনয়ন করার এক বিশেষ পদক্ষেপ ছিল। ধোহার অলি অসমের একটি ঐতিহাসিক মজাদার ঘটনার গল্প শোনায়। এই পথটি নির্মাণ করা হয়েছিল গোলাঘাট জেলার কোমরগাঁও থেকে জয়পুর নামক অঞ্চল পর্যন্ত। প্রায় ২১২ কিলমিটার দীর্ঘ এই পথটি গোলাঘাট, শিবসাগর, যোরহাট, ডিব্রুগড় এই চারটি জেলার মধ্য দিয়ে গিয়েছে।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৭: আঁধারে ছিল আগন্তুক?

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৭: রবীন্দ্রনাথের নামে ভিত্তিহীন অভিযোগ, ‘চোখের বালি’ নাকি চুরি করে লেখা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১১: পাতিকাক

এবার আসা যাক এই রাস্তার ঐতিহাসিক কাহিনিতে। শোনা যায়, আহোমরাজা গদাধর সিংহ রাজ্যে রাস্তা তৈরি করার জন্য কিছু শ্রমিকদের নিযুক্ত করেন। কিন্তু তারা প্রজা দরদি রাজার ভালো মানুষের সুবিধা নিতে লাগলো। তাদের অলসতার জন্য রাস্তাটির কাজ আর শেষ হচ্ছিল না। রাজা কর্মোদ্যোগী ছিলেন এবং তাঁর রাজ্যের উন্নতি সাধনে বিশেষ উৎসাহী ছিলেন বরাবরই। তিনি ভাবলেন, এমন অলস শ্রমিকরা নিশ্চয়ই আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিযুক্ত রয়েছে, যাদের কুঁড়েমির জন্য রাজ্যের প্রগতি বাধা পাচ্ছে। তাই তাদের চিহ্নিত করা দরকার। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। রাজা ঘোষণা করলেন, যারা অলস লোক বা যাদের কাজ করতে ভালো লাগে না, তারা যেন রাজ দরবারে এসে দেখা করেন, রাজা তাদের বসিয়ে খাওয়াবেন। এ কোথা শুনে প্রথমে এক জন দু’জন তার পর দলে দলে লোক আসতে লাগল। রাজা তাদের সবাইকে একটি ঘরে রাখার ব্যবস্থা করলেন।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৭: শুধু মুখে ধর্মের বুলি আওড়ালেই কেউ ধার্মিক হয়ে যায় না

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭০: ত্রিপুরায় বারবার দেশের ইংরেজ শাসন বিরোধী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে

অনেক অলস একসঙ্গে একত্রিত হওয়ার পর রাজার নির্দেশে ঘরটিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। আগুন লাগায় সবাই দৌড়ে পালল। কিন্তু তিনজন লোক কেউ না কেউ ঠিক এসে আগুন নিভিয়ে দেবে এই আশায় ঘরটিতেই ছিল। অগত্যা তাদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য রাজার নির্দেশে আগুন নেভানো হয়। তাদেরকে কুঁড়েমি ঘোষিত করে কারারুদ্ধ করা হয়। বাকিদেরকে নিজের কাজে মনোনিবেশ করতে আদেশ দেওয়া হয়। এই ঘটনা ঘটার পর রাজ্যের কুঁড়েদের দিয়ে এই রাস্তাটি নির্মিত করে তার নাম দেন ‘ধোদর আলি’। অসমীয়া ভাষায় ‘ধোদর আলি’ শব্দের অর্থ অলস। অলসদের চিহ্নিত করে আর কোথাও এমন কোনও রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে কি না তা বলা শক্ত।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৫: আজও আধুনিক সমাজ রাজা দুষ্মন্তের তঞ্চকতা এবং দ্বিচারিতার দূষণমুক্ত নয়

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৩: অগত্যা আমার গাড়িতে বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আলাস্কা ভ্রমণে

স্বাধীনতার আগে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল মূলত স্থল এবং জলপথ কেন্দ্রিক। আর রাস্তা ঘাট যে খুব একটা উন্নতছিল না, কিংবা যানবাহনও আজকের দিনের মতো ছিল না। সংখ্যায় অনেক কম ছিল। এর মধ্যেই সাধারণ মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জীবনযাপন করেছে। ব্রহ্মপুত্র নদ এবং বরাক নদীর উপর স্টিমারের মাধমে ছোট ছোট জাহাজের মাধ্যমে মানুষ বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত করত। ব্রিটিশরা অসমে তাদের সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করার জন্য এবং শাসনকার্যের সুবিধার জন্যও নদী পথের ব্যবহার করত।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৯ : মণিহারা: করিডর, সেজবাতি আর…

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

মূলত চা নিয়ে বিশেষ উদ্যোগই অসমের প্রকৃত চেহারাকে বদলে দেয়। চা পরিবহণের জন্য একাধিক রাস্তা নির্মাণ করা হয়। এই রাস্তাগুলি অসমের চা বাগানের সঙ্গে বন্দরকে সংযুক্ত করেছিল, যাতে চা রফতানি করতে সুবিধে হয়। এর ফলে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে চা শ্রমিকদের যাতায়াত করতেও সুবিধে হয়। এই সব রাস্তা আজো রয়েছে। কত ইতিহাসের স্বাক্ষী এই সব রাস্তা। কত পথিকের নীরব সাথী। কিন্তু এই পুরনো রাস্তাগুলির মধ্যে ‘ধোদর আলি’ কিন্তু নিজের মতো করে আজও সেই মজাদার গল্প শুনিয়ে চলেছে। একেই সঙ্গে অলস লোকজনদের নিজের কাজের প্রতি যত্নবান হতেও বলে এই রাস্তা। আজ এই ‘ধোদর আলি’ আগের মতো সুন্দর নয়। রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় খানাখন্দে ভরা। ইতিহাসের স্বাক্ষী এই রাস্তা সংরক্ষণের জন্য সরকার এবং সাধারারণ মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।—চলবে।
* ড. শ্রাবণী দেবরায় গঙ্গোপাধ্যায় লেখক ও গবেষক, অসম।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content