
(বাঁদিকে) নিম গাছে পাতিকাকের বাসা। ছবি: সংগৃহীত। (ডানদিকে) পেয়ারা গাছে বসে খাবারের প্রতীক্ষায় পাতিকাক। ছবি: লেখক।
একটা প্রবাদ শুনে আসছি ছোট থেকে—’কাক কাকের মাংস খায় না’। খায় কিনা স্বচক্ষে অবশ্য দেখিনি কখনও কিন্তু কিছু মানুষ যে খায় তা কিন্তু স্বচক্ষে দেখেছি। তারা হল—কাকমারা। সুন্দরবন অঞ্চলে স্থায়ী বসবাসকারী পঞ্চাশোর্ধ মানুষ ‘কাকমারা’ (উচ্চারণভেদে কাগমারা) কথাটা শোনেনি এমনটা প্রায় অসম্ভব। ছোট থেকে দেখে এসেছি প্রতি বছর শীতকাল হলেই একদল যাযাবর মানুষ আমাদের গ্রামের ফুটবল মাঠের এক প্রান্তে আশ্রয় নিত। অন্যান্য গ্রামেও দেখেছি কোনও মন্দিরের সামনে বা স্কুলের মাঠে কিংবা বাস রাস্তার পাশে আশ্রয় নিতে। ২০-২৫ জনের একটা দলে চার-পাঁচজন পুরুষ আর বাকিরা মহিলা ও বাচ্চা-কাচ্চা। তারা ময়লা, ছেঁড়া জামাকাপড় পরা। গায়ে, মাথায় ময়লা, রুক্ষ শুকনো চুল। কয়েকটা খুঁটি পুঁতে তার ওপরে পলিথিন বা কাপড় চাঁদোয়ার মত টাঙ্গিয়ে বানাত অস্থায়ী আস্তানা। জোরে বৃষ্টি হলে অবশ্য ওই আস্তানা ছেড়ে স্থানীয় কোনও মন্দির বা স্কুলে সাময়িক আশ্রয় নিত।
সকাল হলেই এদের পুরুষেরা বেরিয়ে যেত পাখি শিকারে। প্রত্যেকের হাতে থাকত একটা সোজা ও সরু বাঁশ। সেই বাঁশের আগায় লাগানো থাকত খুব ছুঁচোলো ফলা। ওই সরু বাঁশের সাথে আরো দু-তিনটি বাঁশের টুকরো জুড়ে তারা ওই বর্শার মতো যন্ত্রটিকে আরও লম্বা করে নিত। এরা মূলত শিকার করত পাতিকাক কারণ পাতিকাকদের সংখ্যা বরাবরই গ্রামাঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে ছিল। আবার এক একটা পাতিকাকের আকার যথেষ্ট বড় হওয়ায় একটা পাতিকাক মারতে পারলে তা থেকে অনেকটা মাংস পেয়ে যেত। সম্ভবত এই কারণে পাতিকাক শিকার করা ছিল ওদের প্রধান লক্ষ্য। সেই জন্যেই ওই যাযাবর মানুষদের সুন্দরবন অঞ্চলের স্থানীয় মানুষ বলত কাকমারা। যদিও পাতিকাক ছাড়া এরা অন্যান্য পাখিও শিকার করত।
সকাল হলেই এদের পুরুষেরা বেরিয়ে যেত পাখি শিকারে। প্রত্যেকের হাতে থাকত একটা সোজা ও সরু বাঁশ। সেই বাঁশের আগায় লাগানো থাকত খুব ছুঁচোলো ফলা। ওই সরু বাঁশের সাথে আরো দু-তিনটি বাঁশের টুকরো জুড়ে তারা ওই বর্শার মতো যন্ত্রটিকে আরও লম্বা করে নিত। এরা মূলত শিকার করত পাতিকাক কারণ পাতিকাকদের সংখ্যা বরাবরই গ্রামাঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে ছিল। আবার এক একটা পাতিকাকের আকার যথেষ্ট বড় হওয়ায় একটা পাতিকাক মারতে পারলে তা থেকে অনেকটা মাংস পেয়ে যেত। সম্ভবত এই কারণে পাতিকাক শিকার করা ছিল ওদের প্রধান লক্ষ্য। সেই জন্যেই ওই যাযাবর মানুষদের সুন্দরবন অঞ্চলের স্থানীয় মানুষ বলত কাকমারা। যদিও পাতিকাক ছাড়া এরা অন্যান্য পাখিও শিকার করত।
দেখেছি, এরা মুখে এক অদ্ভুত শব্দ করে কাঠবিড়ালিদের বিভ্রান্ত করে কাছে ডেকে আনত আর তারপর সেই দেশীয় অস্ত্রে মেরে ফেলত। তবে কাক শিকার করার পদ্ধতিটা ছিল ওদের ভারি অদ্ভুত। অত্যন্ত সন্তর্পণে ওরা পৌঁছে যেত গাছের নিচে যে গাছে কাকেদের বাসা কিংবা কাকরা বেশি সময় বসে থাকে। ঠিক নিচে পৌঁছে প্রচন্ড জোরে ওরা তাদের সহস্তে নির্মিত বর্শার ফলা দিয়ে কাক বা অন্য পাখির পেট ফাঁসিয়ে দিত। অবাক হতাম এটা দেখে—ওরা যে গাছের তলায় পৌঁছে গেছে এবং সোজা বর্শাটাকে ছুঁড়ছে পাতিকাকরা কেন দেখতে পেত না? চালাক পাখি হিসেবে যাদের এত সুনাম তারা কেন কাকমারাদের হাতে বেঘোরে প্রাণ হারাত? পরে বুঝেছি পাখিরা সামনে থেকে বা পাশে থেকে বিপদ আসছে কিনা লক্ষ্য রাখে কিন্তু নিজের শরীরের নিচে কোনও বিপদ আসছে কিনা দেখতে পায় না। আর এই দুর্বলতাটাকেই কাজে লাগায় কাকমারারা। পাতিকাক বা অন্যান্য পাখি মেরে সেগুলোকে ওই বর্শার বাঁশে বেঁধে বর্শাটাকে কাঁধে ঝুলিয়ে দুপুরের মধ্যে ফিরে আসত। তারপর কাকমারা দলের মহিলারা মাটির অস্থায়ী উনুনে সেই পাখিদের মাংস রান্না করত। তাই কাকদের নিয়ে, বিশেষ করে পাতিকাকদের নিয়ে আলোচনা করতে গেলেই সবার আগে মনে পড়ে সুন্দরবনের যাযাবর কাকমারাদের কথা।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১০: ভুতুম প্যাঁচা

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২৬: ঠাকুরবাড়ির কন্যা ঘোড়ার পিঠে চড়ে বন্দুক উঁচিয়ে জমিদারি-কাজে বের হতেন

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৬৯: চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের অন্যতম কারিগর ছিলেন অম্বিকা চক্রবর্তী
পাতিকাক হল এমন এক পাখি যা গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র উপস্থিত। শৈশব থেকে যৌবন যখন সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামে কাটিয়েছি তখন যেমন অসংখ্য পাতিকাক বাড়ির আশেপাশে দেখেছি ঠিক তেমনই পড়াশুনোর জন্য যখন শহরবাস করেছি এবং বর্তমানে আধা শহরের বাসিন্দা সেখানেও বিপুল পরিমাণে পাতিকাকদের উপস্থিতি লক্ষ্য করেছি। শহর হোক বা গ্রাম কোথাও এদের অন্তত খাদ্যাভাব হয়েছে বলে মনে হয় না কারণ যে কোনও জৈববস্তুই মনে হয় এদের খাদ্য। তাছাড়া পাতিকাকদের মতো বুদ্ধিমান পাখি অন্যের খাবার কেড়ে বা চুরি করে খেতে ওস্তাদ। বুদ্ধির কথা যখন উঠল তখন ওদের বুদ্ধির দু-একটা নমুনা তুলে ধরতে খুব ইচ্ছে করছে। আমরা ছোটবেলায় পড়া বা শোনা ঈশপের গল্পে একটা তৃষ্ণার্ত কাকের কলসির মধ্যে নুড়ি ফেলে জল খাওয়ার গল্প সবাই জানি। কিন্তু আমি নিজে ছোটবেলায় বহুবার পাতিকাকদের বুদ্ধির প্রয়োগ করতে দেখেছি।
গ্রামের বাড়িতে পুকুর ঘাটেই সাধারণত মাছ কাটা হত। মা কিংবা ঠাকুমা কিংবা বাড়ির পরিচারিকা হয়তো এক মনে বসে মাছ কাটছে। কয়েকটা পাতিকাক সামনে আম বা সজনে গাছে বসে কা-কা করে ডাকাডাকি শুরু করত। ফলে যে মাছ কাটছে তার নজর থাকত সামনের গাছে বসা পাতিকাকদের দিকে। মাঝে মাঝে ফ্যাট ফ্যাট করে ওদের তাড়ানোর চেষ্টাও করত। কিন্তু ওদেরই মধ্যে কোনও একটি পাতিকাক পেছনদিকে ঘরের চালে এসে বসত। আর তারপর পাশ থেকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে চলে যেত মাছের টুকরো বা গোটা মাছটাই। পুরো দলবদ্ধভাবে পাতিকাকদের এইভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে দেখেছি। একবার পুকুর ঘাটে মাছ কেটে আমাদের বাড়ির পরিচারিকা ছোট চুবড়িতে (আমরা বলতাম ঠাকা) মাছের টুকরোগুলো রেখে তার ওপরে একটা থালা ঢাকা দিয়ে কোনও প্রয়োজনে ঘরের মধ্যে উঠে গিয়েছিল। হঠাৎ নজরে পড়ল গাছ থেকে নেমে এসে একটা পাতিকাক তার ঠোঁট দিয়ে থালাটাকে তুলে ধরেছে আর আর দুটো পাতিকাক টপাটপ একটা করে মাছের টুকরো বার করে নিচ্ছে। ভাগ্যিস নজরে পড়েছিল। নইলে গাছ থেকে নেমে এসে বাকি পাতিকাকরাও সমস্ত মাছের টুকরো সাবাড় করে দিত।
গ্রামের বাড়িতে পুকুর ঘাটেই সাধারণত মাছ কাটা হত। মা কিংবা ঠাকুমা কিংবা বাড়ির পরিচারিকা হয়তো এক মনে বসে মাছ কাটছে। কয়েকটা পাতিকাক সামনে আম বা সজনে গাছে বসে কা-কা করে ডাকাডাকি শুরু করত। ফলে যে মাছ কাটছে তার নজর থাকত সামনের গাছে বসা পাতিকাকদের দিকে। মাঝে মাঝে ফ্যাট ফ্যাট করে ওদের তাড়ানোর চেষ্টাও করত। কিন্তু ওদেরই মধ্যে কোনও একটি পাতিকাক পেছনদিকে ঘরের চালে এসে বসত। আর তারপর পাশ থেকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে চলে যেত মাছের টুকরো বা গোটা মাছটাই। পুরো দলবদ্ধভাবে পাতিকাকদের এইভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে দেখেছি। একবার পুকুর ঘাটে মাছ কেটে আমাদের বাড়ির পরিচারিকা ছোট চুবড়িতে (আমরা বলতাম ঠাকা) মাছের টুকরোগুলো রেখে তার ওপরে একটা থালা ঢাকা দিয়ে কোনও প্রয়োজনে ঘরের মধ্যে উঠে গিয়েছিল। হঠাৎ নজরে পড়ল গাছ থেকে নেমে এসে একটা পাতিকাক তার ঠোঁট দিয়ে থালাটাকে তুলে ধরেছে আর আর দুটো পাতিকাক টপাটপ একটা করে মাছের টুকরো বার করে নিচ্ছে। ভাগ্যিস নজরে পড়েছিল। নইলে গাছ থেকে নেমে এসে বাকি পাতিকাকরাও সমস্ত মাছের টুকরো সাবাড় করে দিত।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮৭: শুধু মুখে ধর্মের বুলি আওড়ালেই কেউ ধার্মিক হয়ে যায় না

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৯: মা সারদার কাছের সেবিকাবৃন্দ
পক্ষীবিদ অজয় হোম-এর লেখা “বাংলার পাখি” বইতেও প্রায় একই রকম কায়দায় মাছওয়ালার মাছের ঝাঁকা থেকে পাতিকাকদের মাছ চুরির কাহিনি পড়েছি। তবে তাঁর বইতে পাতিকাকদের আরেকটি কাহিনি আমার মনে ভীষণ দাগ কেটে রয়েছে। অজয়বাবু একবার গিরিডিতে বন্ধুর বাড়ি গিয়েছিলেন। উশ্রী নদীর তীরে বন্ধুর বাড়িতে যখন রয়েছেন তখন উঠেছিল প্রবল ঝড় ও বৃষ্টি। একসময় বৃষ্টি থামলেও ঝড়ের বেগ ক্রমশ বাড়ছিল। এদিকে সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসছে। অজয়বাবু দেখলেন উশ্রী নদীর এপারে একটি মহুয়া গাছে চেঁচামেচি করতে থাকা অনেকগুলি কাক নদী পার হয়ে ওপারে যেতে চাইছে। তিনি বুঝলেন নদীর ওপারেই কাকদের বাসা। কাকগুলো বারবার চেষ্টা করছিল উড়ে ওপারে যেতে কিন্তু ঝড়ের এতই দাপট যে এগোতে পারছিল না। ফের ফিরে এসে মহুয়া গাছেই বসতে হচ্ছিল।
একসময় কাকগুলো সবাই জটলা পাকিয়ে যেন একটা মিটিং করল। তারপর একটা কাক লাফাতে লাফাতে গাছ থেকে নেমে এল নদীর ধারে। তারপর সেই কাকটি নদীর জলের ঠিক উপর দিয়ে দিব্যি উড়তে উড়তে নদী পার হয়ে ওপারে চলে গেল। তার দেখাদেখি বাকি কাকরাও দল বেঁধে একই কায়দায় উড়তে উড়তে পৌঁছে গেল ওপারে। ঝড়ের বেগ ওপরের দিকে থাকে বেশি কিন্তু নদীর জলের ঠিক ওপরে বাতাসের বেগ অনেক কম হওয়ায় জলের তল বরাবর উড়ে যাওয়া অনেক সহজ ব্যাপার। এই বৈজ্ঞানিক সত্যটা পাতিকাকগুলো তাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে কী অসাধারণভাবে বুঝেছিল এবং তার প্রয়োগ ঘটিয়েছিল তা অজয়বাবু ও তাঁর বন্ধুকে যেমন সেদিন বিস্মিত করেছিল, পাঠক হিসেবে পড়ে আমিও ভীষণ বিস্মিত হয়েছি, আর পাতিকাকদের প্রতি আমার শ্রদ্ধাও বেড়ে গিয়েছে বহুগুণ।
একসময় কাকগুলো সবাই জটলা পাকিয়ে যেন একটা মিটিং করল। তারপর একটা কাক লাফাতে লাফাতে গাছ থেকে নেমে এল নদীর ধারে। তারপর সেই কাকটি নদীর জলের ঠিক উপর দিয়ে দিব্যি উড়তে উড়তে নদী পার হয়ে ওপারে চলে গেল। তার দেখাদেখি বাকি কাকরাও দল বেঁধে একই কায়দায় উড়তে উড়তে পৌঁছে গেল ওপারে। ঝড়ের বেগ ওপরের দিকে থাকে বেশি কিন্তু নদীর জলের ঠিক ওপরে বাতাসের বেগ অনেক কম হওয়ায় জলের তল বরাবর উড়ে যাওয়া অনেক সহজ ব্যাপার। এই বৈজ্ঞানিক সত্যটা পাতিকাকগুলো তাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে কী অসাধারণভাবে বুঝেছিল এবং তার প্রয়োগ ঘটিয়েছিল তা অজয়বাবু ও তাঁর বন্ধুকে যেমন সেদিন বিস্মিত করেছিল, পাঠক হিসেবে পড়ে আমিও ভীষণ বিস্মিত হয়েছি, আর পাতিকাকদের প্রতি আমার শ্রদ্ধাও বেড়ে গিয়েছে বহুগুণ।

(বাঁদিকে) খাবারের খোঁজে পাতিকাক। (ডানদিকে) পেয়ারা গাছে বসে খাবারের প্রতীক্ষায় পাতিকাক। ছবি: সংগৃহীত।
পাতিকাকদের হিন্দিতে বলে কাউয়া আর ইংরেজিতে ‘Common House Crow’। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Corvus splendens’। এরা লম্বায় হয় প্রায় ১৬ ইঞ্চি। এদের দুটো ডানা, গলা, চোখসহ মাথার চাঁদি ও লেজের রঙ কালো তবে কুচকুচে নয়, সামান্য ধূসর আভাযুক্ত। আর ঘাড়, মাথার চাঁদির পিছনদিক, গলার নিচের দিকসহ পেটের রং ধূসর। এদের গলার কালো পালকগুলো খোঁচা খোঁচা। চোখ একেবারে কুচকুচে কালো। চঞ্চুর রঙও চকচকে কালো। এদের পায়ের রঙও কালো তবে ঊরুর পালকের রং কালচে ধূসর। পায়ের চারটি আঙ্গুলের মধ্যে সামনের দিকে থাকা তিনটি আঙুলের মাঝেরটি বেশি লম্বা। যেহেতু পাতিকাক সমতলের পাখি তাই সুন্দরবনসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমস্ত দেশের সমতল এলাকায় বিপুল পরিমাণে এদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। পক্ষীবিদ অজয় হোমের লেখা থেকে জানতে পারি দার্জিলিঙে নাকি আগে পাতিকাক ছিল না। বর্ধমানের মহারাজা নাকি কয়েকটি পাতিকাক নিয়ে গিয়ে দার্জিলিঙে ছেড়ে দিয়েছিলেন। সেই থেকে দার্জিলিং-এও পাতিকাক পাওয়া যায়। শুনেছি কখনও কখনও নাকি অ্যালবিনো পাতিকাক দেখা যায়। অর্থাৎ এদের গায়ের রঙ হয় সাদা। চিড়িয়াখানাতে এমন কাক আমি দেখেছি তবে কোন চিড়িয়াখানায় মনে করতে পারছি না। সুন্দরবনের প্রকৃতিতে অবশ্য অ্যালবিনো পাতিকাক এখনও পর্যন্ত আমার নজরে পড়েনি।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২৬: মিটিং

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৪: আনন্দমূর্তি রামের অভাবে অযোধ্যায় নৈরাশ্যের ছায়া, বাস্তব জীবনেও কি আনন্দহীনতা অবসাদ ডেকে আনে?
ছোটবেলায় সবাই পড়েছে পাতিকাক হল পাখি রাজ্যের মেথর। কারণ এরা মরা পচা প্রাণী ও জীবজন্তু, বাসি পচা খাবার ইত্যাদি খেয়ে পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখে। তবে এসবের বাইরে অন্য পাখির বাসা থেকে ডিম বা বাচ্চা চুরি করে খেয়ে নেওয়া, দোকানদারের অসতর্কতায় দোকান থেকে রুটি বিস্কুট তেলেভাজা মিষ্টি ইত্যাদি খাবার নিয়ে পালায়। আবার গৃহস্থের অসতর্কতায় মাছ বা মাংসের টুকরো নিয়ে পালাতে প্রায়শই দেখা যায়। গাছের পাকা ফলও রয়েছে এদের খাবারের তালিকায়। বাড়ির পোষা কুকুর বা হাঁস মুরগির খাবার এরা প্রায়শই চুরি করে খায়। আবার কখনও কখনও গোরুর গা থেকে এঁটুলি খেয়ে গোরুর উপকারও করে।
একা একা থাকা এদের স্বভাবে নেই। যেখানে থাকবে দল বেঁধে থাকবে আর সকাল দুপুর সন্ধ্যা কা-কা করে কর্কশ চিৎকারে কান ঝালাপালা করে দেবে। নিজের দলের সদস্যদের প্রতি ওদের দরদ প্রখর। খাবার চুরি করে খাওয়ার সময় একে অন্যকে সাহায্য করে। বিদ্যুতের তারে তড়িতাহত হয়ে যখন কোন কাক মারা যায় তখন তাকে ঘিরে তার দলের সমস্ত কাকের সমবেত চিৎকার ও লাফালাফি হৃদয়কে ব্যথাতুর করে তোলে। আবার কোনও অগভীর পুকুরে বা মাঠে জমা জলে কিংবা ছাদ ঢালাইয়ের পর ছাদে জমিয়ে রাখা জলে পাতিকাকদের দলবদ্ধ স্নানের দৃশ্য খুব মনোরম।
একা একা থাকা এদের স্বভাবে নেই। যেখানে থাকবে দল বেঁধে থাকবে আর সকাল দুপুর সন্ধ্যা কা-কা করে কর্কশ চিৎকারে কান ঝালাপালা করে দেবে। নিজের দলের সদস্যদের প্রতি ওদের দরদ প্রখর। খাবার চুরি করে খাওয়ার সময় একে অন্যকে সাহায্য করে। বিদ্যুতের তারে তড়িতাহত হয়ে যখন কোন কাক মারা যায় তখন তাকে ঘিরে তার দলের সমস্ত কাকের সমবেত চিৎকার ও লাফালাফি হৃদয়কে ব্যথাতুর করে তোলে। আবার কোনও অগভীর পুকুরে বা মাঠে জমা জলে কিংবা ছাদ ঢালাইয়ের পর ছাদে জমিয়ে রাখা জলে পাতিকাকদের দলবদ্ধ স্নানের দৃশ্য খুব মনোরম।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৮ : গরুর চোখে জল

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৬৫: ইন্দ্রধনু আর ‘ইন্দ্রাণী’
যেহেতু বাইরে থেকে দেখে পুরুষ ও স্ত্রী পাতিকাক চেনা যায় না তাই বিশেষজ্ঞদের কথাই শিরোধার্য। এরা নাকি সাধারণত একগামী (Monogamous)। অর্থাৎ একটি স্ত্রী ও একটি পুরুষের জোড় দীর্ঘস্থায়ী। তবে কখনও কখনও স্ত্রী ও পুরুষ বহুগামী হতে পারে। স্ত্রী পাতিকাকরা ডিম পাড়ে এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে। অবশ্য কোথাও কোথাও মার্চ মাসেও ডিম পাড়তে দেখা যায়। এরা সাধারণত কোনো বড় গাছে দলবদ্ধ হয়ে বাসা বানায় অবশ্য একটা গাছে একটা কাকের বাসা ও লক্ষ্য করেছি। বাসা বানানোর উপকরণ হলো মূলত গাছের শুকনো সরু ডাল কাঠি ঘাস ছেঁড়া ন্যাকড়া উল সরু তার নারকেল ছোবড়া তুলো ইত্যাদি। এরা যেখান থেকে বাসার উপকরণ জোগাড় করে সেখানে অন্য দলের কাক বা অন্য পাখিদের উপস্থিতি সহ্য করে না। দেখতে পেলে তাড়ায়।

(বাঁদিকে) পাতিকাকের ডিম। (ডানদিকে) পাতিকাকের বাসায় ছানারা। ছবি: সংগৃহীত।
এদের বাসার তেমন কোন ছিরি ছাঁদ নেই। কোনওরকমে দায়সারা ভাবে বাসা বানায়। মাটির ৩ থেকে ৮ মিটার উচ্চতার মধ্যেই বাসা বাঁধে। বাসা বাঁধার জন্য ‘V’ আকৃতির দুটি শাখার বা তিনটি শাখার সংযোগস্থলের খাঁজ ওরা নির্বাচন করে। অবশ্য কখনও কখনও ইলেকট্রিক পোস্টের ওপরেও বাসা বাঁধতে দেখা যায়। তবে বাসা বাঁধার ক্ষেত্রে সব কৃতিত্ব স্ত্রী পাতিকাকের। স্ত্রী পাতিকাক বাসায় ৪-৫টি নীলচে সবুজ রঙের ডিম পাড়ে। তার উপরে হালকা বাদামি রঙের দাগ ও ছিট থাকে। ডিমের খোলা বেশ শক্ত ও চকচকে হয়। পাতিকাকের ডিমের সাথে কোকিলের ডিমের যথেষ্ট সাদৃশ্য থাকায় সুযোগ বুঝে স্ত্রী কোকিল কাকের বাসায় ডিম পেড়ে যায়। স্ত্রী ও পুরুষ মিলে ডিমে তা দিলেও রাতে মূলতঃ স্ত্রী তা দেয়। ১৫-১৭ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরিয়ে এলে বাবা-মা মিলে তার পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করে। ২১-২৮ দিন পর বাচ্চারা বাসা ছেড়ে উড়তে শেখে। তবে অনেক সময় বাচ্চারা আরও বেশ কিছুদিন বাসায় থেকে যায়।
যখন সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামে থাকতাম তখন, আর এখন যখন সুন্দরবনের এক আধাশহরে থাকি তখনও আমার ভোর হয় পাতিকাকদের সমবেত চিৎকারে। আর তখনই মনের মাঝে বেজে ওঠে জীবনানন্দের লেখা বিখ্যাত ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতার লাইনগুলো –
“আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে—এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয় হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে…” —চলবে।
যখন সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামে থাকতাম তখন, আর এখন যখন সুন্দরবনের এক আধাশহরে থাকি তখনও আমার ভোর হয় পাতিকাকদের সমবেত চিৎকারে। আর তখনই মনের মাঝে বেজে ওঠে জীবনানন্দের লেখা বিখ্যাত ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতার লাইনগুলো –
হয়তো মানুষ নয় হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে…”
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।


















