
একঝলকে
ছবি : খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন
ছবির নায়িকা : সুচরিতা সান্যাল
উত্তম কুমার অভিনীত চরিত্রের নাম : রাইচরণ
পরিচালনা : অগ্রদূত
প্রেক্ষাগৃহ : উত্তরা, পূরবী ও উজ্জ্বলা
মুক্তির তারিখ : ২৮.০৪.১৯৬০
উত্তম কুমারের বিরুদ্ধে যে সব জোরালো অভিযোগগুলি ছিল একই ধাঁচের চিত্রনাট্যের ছবি, উচ্চবর্ণ প্রতিষ্ঠিত বাবু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। তীব্র ম্যানারিজমের ঘূর্ণিতে বিপুল সম্ভাবনাময় নায়কের নিজের ছায়ায় লীন হয়ে যাওয়া। কিন্তু জীবনযাপনে বিতর্কিত রঙিন মহানায়ক প্রেম দাম্পত্য গ্ল্যামার সবকিছু নিয়ে সেটে ডায়লগ দিতে দিতে চলে গেলেন।
আমাদের আলোচ্য ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ ছবিটি সেরকমই একটি পথ চলতি জনতার পান্থশালা যেখানে, তাঁর সাধারন হজমযোগ্য ইমেজ থেকে তিনি বেরিয়ে এসেছেন। আমরা এর আগেও দেখেছি কিন্তু ভাবতে অভ্যস্ত হইনি উত্তম সুচিত্রা জুটি যতই বক্স অফিস হিট হোক না কেন সুচিত্রা সেনের সঙ্গে ৩০টি ছবির প্রত্যেকটিতে উনি নিজেকে ভেঙেচুরে নতুন করে উপস্থাপন করেছেন। সেটা চরিত্রাভিনয় বলা হবে না গ্ল্যামারসর্বস্ব নায়কোচিত অভিনয় বলা হবে এর সীমারেখাটা খুব সূক্ষ্ম যা নিয়ে শুধু তর্ক করা চলে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায় না।
আমাদের আলোচ্য ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ ছবিটি সেরকমই একটি পথ চলতি জনতার পান্থশালা যেখানে, তাঁর সাধারন হজমযোগ্য ইমেজ থেকে তিনি বেরিয়ে এসেছেন। আমরা এর আগেও দেখেছি কিন্তু ভাবতে অভ্যস্ত হইনি উত্তম সুচিত্রা জুটি যতই বক্স অফিস হিট হোক না কেন সুচিত্রা সেনের সঙ্গে ৩০টি ছবির প্রত্যেকটিতে উনি নিজেকে ভেঙেচুরে নতুন করে উপস্থাপন করেছেন। সেটা চরিত্রাভিনয় বলা হবে না গ্ল্যামারসর্বস্ব নায়কোচিত অভিনয় বলা হবে এর সীমারেখাটা খুব সূক্ষ্ম যা নিয়ে শুধু তর্ক করা চলে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায় না।
কারণ যে ধরনের ছবিতে যে ধরনের নায়িকা নির্বাচিত হতেন উত্তমবাবু নিজেকে সেই নায়িকা উপযোগী করে অভিনয় করার চেষ্টা করতেন। ডাইমেনশন ধরে চরিত্রের গভীরে গিয়ে এই যে গড়পড়তা ক্যামেরসর্বস্ব না হওয়ার একটা চেষ্টা সেটাই ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’-এ তাঁকে রাইচরণ নির্মাণে এগিয়ে দিলে।
আমরা ছবিটির ফ্রেম টু ফ্রেম আলোচনা করলে দেখব পরিচালক অপরিচিত নন বরং উত্তম-সুচিত্রা জুটির প্রতিষ্ঠাতা। এবং আগামী দিনে সুচিত্রা সেন যখন নিজেকে ফিল্ম নামক মাধ্যম থেকে আস্তে আস্তে গুটিয়ে নিচ্ছেন অগ্রদূত গোষ্ঠী তাঁর হাতও ছেড়ে উত্তমের পাশে কখনও সাবিত্রী কখনও সুপ্রিয়া শেষের দিকে কখনও অপর্ণা সেন বা নিদেনপক্ষে সন্ধ্যা রায়কে নায়িকা নির্বাচন করে নায়িকা নির্বাচন করে এগিয়েছেন।
আমরা ছবিটির ফ্রেম টু ফ্রেম আলোচনা করলে দেখব পরিচালক অপরিচিত নন বরং উত্তম-সুচিত্রা জুটির প্রতিষ্ঠাতা। এবং আগামী দিনে সুচিত্রা সেন যখন নিজেকে ফিল্ম নামক মাধ্যম থেকে আস্তে আস্তে গুটিয়ে নিচ্ছেন অগ্রদূত গোষ্ঠী তাঁর হাতও ছেড়ে উত্তমের পাশে কখনও সাবিত্রী কখনও সুপ্রিয়া শেষের দিকে কখনও অপর্ণা সেন বা নিদেনপক্ষে সন্ধ্যা রায়কে নায়িকা নির্বাচন করে নায়িকা নির্বাচন করে এগিয়েছেন।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮০ : হাত বাড়ালেই বন্ধু

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৪ : যেখানে স্বর্ণমুদ্রার ঝনঝনানি, সেখানে সন্তানের চিতার আগুনও ম্লান

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫১: সাইকেল মাহাতো অ্যান্ড কোং

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৫: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — বাঘরোল
অগ্রদূতের লক্ষ্য ছিল না যে সুচিত্রা উত্তমের জনপ্রিয় চোখাচোখির মানচিত্রকে মূলধন করে ছবির জগত সমৃদ্ধ করা বরং একটি ছবির প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে যে ধরনের নায়ক বা নায়িকা দরকার তাঁরা সেই ধরনের প্লেয়ার কাস্টিং-ই করতেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ‘বাদশা’ সে যুগের একটি স্মরণীয় বাংলা ছবি।
রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প অবলম্বনে ছবিটির চিত্রায়ণ সত্যিই খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। বিশেষত সেই সময়ের উত্তম কুমার মানেই উচ্চকোটির একজন নায়ক যিনি ধীরোদাত্ত এবং ব্রিটিশ ভারতের স্বাধীনতার পর এলিট ক্লাস তাঁকে সাহেবসুবো সাজেই দেখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।
এ হেন অবস্থান থেকে নেমে এসে রাইচরণের মতো মাটির মানুষের চরিত্রে নিজেকে সমর্পণ করা যা কিছুদিন আগে ‘মায়ামৃগ’ ছবিতে উনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন তা খুবই অপরিচিত এবং মনোজ্ঞ হয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প অবলম্বনে ছবিটির চিত্রায়ণ সত্যিই খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। বিশেষত সেই সময়ের উত্তম কুমার মানেই উচ্চকোটির একজন নায়ক যিনি ধীরোদাত্ত এবং ব্রিটিশ ভারতের স্বাধীনতার পর এলিট ক্লাস তাঁকে সাহেবসুবো সাজেই দেখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।
এ হেন অবস্থান থেকে নেমে এসে রাইচরণের মতো মাটির মানুষের চরিত্রে নিজেকে সমর্পণ করা যা কিছুদিন আগে ‘মায়ামৃগ’ ছবিতে উনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন তা খুবই অপরিচিত এবং মনোজ্ঞ হয়েছিল।
আরও পড়ুন:

৭৭তম সাধারণতন্ত্র দিবস : জনগণপথপরিচায়ক

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯০: ত্রিপুরার রাজপরিবারকে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পত্র
কিন্তু ক্যামেরার সামনে যিনি নিজেকে সর্বাঙ্গসুন্দর করে তোলার চেষ্টা করতেন তাঁর কাছে এ ধরনের চরিত্রের রূপায়ণ আবার অগ্রদূত-র মতো পরিচালকের হাতে সত্যি খুব আকর্ষণীয় ছিল। আসলে সে বছর বিশ্বকবির শতবর্ষ-উদযাপনের একটি ধারাবাহিক কর্মসূচি বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্প মাধ্যম নিয়েছিল। চলচ্চিত্র সেখানে পিছিয়ে থাকলো না। এবং সে সময়ে অগ্রদূত গোষ্ঠীর প্রাণপুরুষরা কবিগুরুকে এরকম একটি চিত্রায়ন-র মাধ্যমে স্মরণীয় করে রাখতে চেয়েছিলেন।
ছবির কাহিনি অত্যন্ত সাদামাটা। একজন মুন্সেফের অন্দরমহলে নানা উঠানামা, সামন্ততান্ত্রিক সমাজ গঠনের বিভিন্ন অলিন্দের খোঁজখবর এই ছবির পরতে পরতে। সঙ্গে সঙ্গে প্রভু ভৃত্যের সম্পর্ক কতটা উচ্চমানের হতে পারে তার যেন নিখাদ উদাহরণ এই ছবির তথা এই গল্পের চাবিকাঠি।
ছবির কাহিনি অত্যন্ত সাদামাটা। একজন মুন্সেফের অন্দরমহলে নানা উঠানামা, সামন্ততান্ত্রিক সমাজ গঠনের বিভিন্ন অলিন্দের খোঁজখবর এই ছবির পরতে পরতে। সঙ্গে সঙ্গে প্রভু ভৃত্যের সম্পর্ক কতটা উচ্চমানের হতে পারে তার যেন নিখাদ উদাহরণ এই ছবির তথা এই গল্পের চাবিকাঠি।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৮: পরবাস প্রস্তুতি (চার)

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৬: পঞ্চবটীর যাত্রাপথে প্রাপ্তি, পিতৃবন্ধু জটায়ু ও বনবাসজীবনে লক্ষ্মণের ভূমিকা
আজকের দিনে যেখানে আজ্ঞাকারী আর আজ্ঞাবহ দুজনের সম্পর্কের অবনতি এবং দায়িত্ব-সচেতনতা অপেক্ষা অধিকার-সচেতনতা বেশি করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে সেখানে রাইচরণ নির্মাণ বেশ কঠিন কাজ। সমাজে সাম্যবাদীর ইশতেহার অনেক দিনই ডানা মেলতে চাইছে। তবুও সামন্ততান্ত্রিক সমাজের একটা নিরাপদ একটা মানচিত্র এই গল্প থেকে সেলুলয়েডে স্বাস্থ্যকরভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, দ্বিতীয় অধ্যায়, পর্ব-৫৩: আকাশ এখনও মেঘলা

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
পরবর্তীকালে উত্তম কুমার অভিনীত অনেক ছবিতেই এ ধরনের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে। বাবু কালচারের সঙ্গে কর্মচারী শ্রেণির সুন্দর বিনিময় সে ‘সাহেব বিবি গোলাম’ হোক বা ‘স্ত্রী’ হোক কিন্তু ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’-এ একটি গৃহস্থ সামাজিক আবেদন কি কিভাবে অন্তর ছুঁয়ে যায় তা যেন উত্তম কৌশলে নির্মাণ করা হয়েছিল।
বিশেষত ছবির দ্বিতীয় অর্ধে উত্তম বাবুর যে অভিব্যক্তি তা, যেন গল্পের রাইচরণকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা এবং সকলকে কাঁদিয়ে একেবারে শেষ দৃশ্যে যেখানে রাইচরণ নিজের দেশ ত্যাগ করছেন ভালবাসাহীন এই কদর্য বিনিময় প্রথাকে নির্মমভাবে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন তা ওঁর চোখমুখ থেকে ক্যামেরা শুষে নিয়েছিল।
বিশেষত ছবির দ্বিতীয় অর্ধে উত্তম বাবুর যে অভিব্যক্তি তা, যেন গল্পের রাইচরণকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা এবং সকলকে কাঁদিয়ে একেবারে শেষ দৃশ্যে যেখানে রাইচরণ নিজের দেশ ত্যাগ করছেন ভালবাসাহীন এই কদর্য বিনিময় প্রথাকে নির্মমভাবে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন তা ওঁর চোখমুখ থেকে ক্যামেরা শুষে নিয়েছিল।

যে দৃশ্য যে কোন দেশের সারস্বত সমাজের একটা গর্ব হিসেবে বিবেচিত হতে পারে ছবির অন্যান্য কলাকুশলীদের মধ্যে অসিতবরণ, জহর গঙ্গোপাধ্যায়, তুলসী চক্রবর্তী শোভা সেন, দীপ্তি রায় প্রমুখদের অভিনয়ও নজর কাড়া ছিল। বিশেষত নবাগতা সুচরিতা পরবর্তীকালে যদি সুমিতা সান্যাল হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাবেন। রবীন্দ্রনাথের গীত রচনায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে বিভূতি লাহার ক্যামেরা কৌশলে প্রতিটি দৃশ্য যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। —চলবে।
* উত্তম কথাচিত্র (Uttam Kumar–Mahanayak–Actor) : ড. সুশান্তকুমার বাগ (Sushanta Kumar Bag), অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, মহারানি কাশীশ্বরী কলেজ, কলকাতা।


















