
আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। মুখের ভাষা নিয়ে প্রতি বছর এই একুশের উদযাপন। ‘একুশে’ কেবল সুকুমারের ভাষায় আইনের দুনিয়া নয় কেবল, মাতৃভাষা তথা বাংলাভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভারি চিন্তা করে কাটানোর দিন। কেউ কেউ দুর্দিন দেখেন, ভাষা নাকি ভাসানযাত্রায় চলেছে। কেউ কেউ অন্ধকারের পরের আলোটা দেখে চমত্কৃত হন, কেউ আবার কিছুই দেখতে পান না। শুধু বাংলা কেন, পৃথিবীর বুকে যে যে ভাষা আছে, যে যে ভাষা ছিল, যে যে ভাষা থাকবে তা নিয়ে ভাবনা বিতরণের দিন একুশে। একুশ তারিখ দুঃখের, সুখের, আনন্দের, উদযাপনের।
মাতৃভাষার সম্মান নিয়ে একদিন পৃথিবীর কোনও এক কোণে কিছু রক্তক্ষয়ী আলোড়ন উঠেছিল, আজকের দুনিয়ায় এই উপলব্ধি করে ওঠার পথে নানা বাধ। তারপরেও যাঁরা একথা বুঝবেন, জানবেন, মানবেন তাঁদের কাছে মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ, তাঁদের কাছেই মাতৃভাষা নিরাপদ। পৃথিবীর সকল জাতির সকল মানুষের আজন্মচর্চিত সকল মুখের ভাষার জন্য একথা সত্য। আজকের সঙ্কটের দিনে দাঁড়িয়ে এর থেকে গুরুতর আর কিছু নেই।
মাতৃভাষার সম্মান নিয়ে একদিন পৃথিবীর কোনও এক কোণে কিছু রক্তক্ষয়ী আলোড়ন উঠেছিল, আজকের দুনিয়ায় এই উপলব্ধি করে ওঠার পথে নানা বাধ। তারপরেও যাঁরা একথা বুঝবেন, জানবেন, মানবেন তাঁদের কাছে মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ, তাঁদের কাছেই মাতৃভাষা নিরাপদ। পৃথিবীর সকল জাতির সকল মানুষের আজন্মচর্চিত সকল মুখের ভাষার জন্য একথা সত্য। আজকের সঙ্কটের দিনে দাঁড়িয়ে এর থেকে গুরুতর আর কিছু নেই।
এই যে ‘মাতৃভাষা’ পদটাই ধরা যাক, সেও তো ব্যাকরণের নিয়মেই এমন হয়েছে, তাতে খানিক এদিক-ওদিক করে দিলে অর্থসঙ্গতিটুকু থাকে না। এমনকী মায়ের ভাষা ও মাতৃভাষার মধ্যেও তো প্রভেদ আছে। তাই ভাষার মধ্যে একটা নিয়মের বেড়া থাকেই, তাতে নিরাপত্তা থাকে, সেই নিরাপদ মাঠেই মুক্তির খোলা হাওয়া বয়ে যায়। এই হাওয়া বয়ে যাওয়া আর মানুষের বয়ে যাওয়া, উন্মার্গগামী হওয়ার মধ্যে খানিক প্রভেদ আছে। সেই দূরত্বটুকুই ভাষার সম্পদ। তাকে অনুধাবন করতে হয়।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২২ : জনঅরণ্য ও পরশপাথর— যে জন থাকে মাঝখানে

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৮: শূন্যতা ও পূর্ণতার প্রতীক, রামের প্রিয় অপরূপ হেমন্ত

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৪ : গরুর পালে বাঘ

এই দেশ এই মাটি, পর্ব-৯৩: কৈলাসচন্দ্রের কাছে রাজবংশের কাহিনি শুনে ত্রিপুরার প্রতি আকৃষ্ট হন রবীন্দ্রনাথ
মাতৃভাষা, কাজের ভাষা, কথার ভাষা, যোগাযোগের ভাষা, আমার ভাষা তোমার ভাষা, ওদের ভাষা তাদের ভাষা, ক্ষমতার ভাষা, ধনীর ভাষা দরিদ্রের ভাষা… পৃথিবীর সকল ভাষাকে ঘিরেই এসব থিওরির চলাচল। এরপাশেও জীবিত ভাষা, মৃত ভাষা ইত্যাদির তর্ক সামলে দেখা যায় এপাড়ায় যে ভাষার দাপট, ওপাড়ায় তাই-ই নাকি বিপন্ন। তাহলে বিপন্নতাতেই এসে থামে সকল কিছু? আসলে তর্কটা ওই বিপন্নতার, ভাষাটি মর্যাদা পাচ্ছে? অন্য ভাষাভাষী মানুষ তাকে আমল দেয়? যার ভাষা সে নিজেই ভাষাটিকে মানে তো? জানে তো? ভাষাকে ঘিরে এই অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব ভাষার যথার্থ বিপদ ডেকে আনে বটে। সত্যিই তো, পৃথিবী থেকে প্রতিদিন মুছে যাচ্ছে কিছু ভাষা, কিছু শব্দ, অনেক তথ্য।
আরও পড়ুন:

হ্যালো বাবু! পর্ব-১২১: অমিতাভ হত্যারহস্য / ২

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২১: বিবাহ সংবাদ, আদিনাথ-গোরা
সমস্যাটা সেখানেই। যেখানে ‘জল’ বললেই কাজ মেটে সেখানে ‘ওয়াটার’ চাওয়ার মধ্যে যে অসঙ্গতি আছে, অসম্মান ও গ্লানি আছে, যে ‘ওপারেই সর্বসুখের’ লালসা আছে তা থেকেই তো দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। বিশেষ করে, উপনিবেশোত্তর দেশে আন্তর্জাতিক, সর্বজনমান্য ভাষা জানার যে প্রয়োজন, সুবিধা ও তাড়না আছে তার সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক তাত্পর্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই। মাতৃভাষায় বিজাতীয় শব্দের অন্তর্ভাব, অন্তর্ভুক্তি, আসা যাওয়ার মধ্যে কোনও বাধা নেই, কোনও কালেই ছিল না বোধহয়। তারপরেও সংস্কৃত, ফার্সি, উর্দু, হিন্দি, ইংরেজির মতো নিকট ও দূর প্রতিবেশী নানা ভাষার নানা শব্দের ভিড় আমাদের মাতৃভাষার শব্দসম্পদকে সমৃদ্ধ করেছে এই নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয়। তার প্রমাণ ভাষার শরীর জুড়ে। তারপরেও একদিকে স্বাতন্ত্র্য-রক্ষার অক্ষম চেষ্টা, অন্যদিকে আত্মহারা হয়ে পথ হারানোর মধ্যে যে একদেশদর্শিতা, পরিমিতিবোধের অভাব প্রকট হয়ে ওঠে তা থেকেই জন্ম নেয় গ্লানি, তারপরেই ক্ষমতার গুরুভার, অক্ষমের পরমুগ্ধ আত্মগ্লানি, “বাংলাটা ঠিক আসে না”র আত্মসুখ।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৯: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — চিতল হরিণ

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৪ : শুন বরনারী
তাতে কী আর এল গেল? তাছাড়া চারপাশে তো মাতৃভাষায় কথা বলছে সকলে… হোক না তাতে “কেন কী”র দাপট, “আদেও”র নিরর্থক উল্লাস, “বিন্দাস” হওয়ার ঔচিত্য; “ইমোশনাল” হয়ে পড়া বা হয়ে ওঠার মধ্যে যে সার্থকতার ভাব, আবেগে সেই বেগ কোথায়? তবুও, নিদেনপক্ষে রাস্তাঘাটে প্রাকৃত গালিগুলোও তো বাংলাতেই পেশ করা হয় না কী! আত্মমর্যাদার পক্ষে তা-ও কম কীসের! এইভাষাই তো ঊনিশ-কুড়ি, বাহান্ন-তিপ্পান্নে তেমন ভেদ দেখে না। এখানেই দুটি অনায়াসে চারটি হয়ে ওঠে। আবার এখানেই নয়ে ছয়ে পরম ভেদ, আদায় কাঁচকলায়, সাপে নেউলের যুদ্ধ লাগে। এখানেই রুটিতে মাখন কিংবা বাটার মাখানো যায়, লাগানো যায়। অনৈতিকভাবে নালিশ ঠুকে দিলেও লাগানো যায়। তেল কেবল কড়াইতে থাকে না, জল-ও অনেক দূর গড়াতে পারে। জল থেকে ফল সব এখানে খাওয়া যায়। আর সব থেকে বড় কথা, আসছি বলেই দিব্যি চলে যাওয়া যায়। বাংলাভাষার এই মধুর সাচ্ছন্দ্যটুকু সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের দৃষ্টি এড়ায়নি। জনপ্রিয় বাংলা গানে বাংলাকে না ভুলে বুকের ভিতরে তার লালনের সুর শোনা যায়, প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের বহুশ্রুত বাংলা গানের পাশের অন্য একটি গানেও সেই আবেগ, আত্মসম্মানের কথাই শোনা যায়—
“বেচোনা বেচোনা বন্ধু তোমার চোখের মণি।”
“বেচোনা বেচোনা বন্ধু তোমার চোখের মণি।”
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯৬ : ‘চণ্ডাল-কূপ’ ও অস্পৃশ্যতা: পঞ্চতন্ত্রের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন ভারতের এক দগদগে ইতিহাস

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
তবে “মাঠে নেমে কাজ করার” মধ্যে বয়ে বেড়ানো সচেতন অপ্রতিষ্ঠার বোধ, আর তাকে এড়াতেই “ফিল্ড ওয়ার্কের” আয়োজন জীবনজুড়ে, সচেতনভাবেই। তবুও, আজও অনেক অনেক কথার জবাবে অনেক অনেক কথার বদলে কেবল “অ্যাঁ!” বললেও কাজ মিটে যায়। মুখের ভাষা, মাতৃভাষা এভাবেই কখন যেন মনের ভাষা হয়ে ওঠে।—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















