
এবার সেক্টর ফাইভ-এর সেই ছোট্ট সাজানো অফিসে আবার ফিরতে হবে। লিফটওয়ালা মোজাইক করিডোর মোটা ঘষা কাচের দরজাওলা অফিস নয়। সিঁড়ি ভেঙে ওঠা চারতলা বাড়ির একটা ফ্লোরের ছোটখাট ফ্ল্যাট থেকে অফিস। তবে সিঁড়ির পাশে লিফটের জায়গা রাখা আছে। এখন প্লাই লাগানো। পুরনো আমলের দর্জির করা শার্ট-প্যান্ট বা ফ্রকে যেমন বাড়তি কাপড় মুড়ে রাখা হতো। প্লাইয়ের ওপর আইএসআই। চৌকো ছাপ মারা। কোম্পানির নাম এন্ডিয়োর।
এন্ডিয়োর মানে কষ্ট সহ্য করা। শব্দটা ভার্ব। স্কুলে পড়েছে। ছুটির সময় ফাদার স্যামুয়েল খেলার ছলে ইংরেজি গ্রামার শেখাতেন। ফাদার বলেছিলেন এন্ডিয়োর শব্দটা ট্রানজেটিভ আর ইনট্রানজেটিভ দু’ভাবে ব্যবহার হতে পারে। অকর্মক আর সকর্মক ক্রিয়াপদ। এন্ডিয়োর হার্ডশিপ। সাবেকি ব্যবহার কষ্ট সহ্য করা। আর ইনট্রানজেটিভ হল ফ্রেন্ডশিপস এন্ডিয়োর। বন্ধুত্ব স্থায়ী হয়। টিকে থাকে। অতনুর জীবনে এন্ডিয়োর-এর একটাই মানে। এন্ডিয়োর হার্ডশিপ। প্রতিদিন অফিসে আসার সময় সিঁড়ি দিয়ে ওঠার মুখে লিফটের সামনে লাগানো প্লাইউডের নামে চোখ পড়ে। রোজ থমকে দাঁড়ায়। তারপর সিঁড়ি দিয়ে ওঠে। পায়ে পায়ে। প্রত্যয়ী পদক্ষেপে ভাবে তার জীবনের তাকে তাকে থাকে থাকে সাজানো যন্ত্রণার কথা।
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৫২: আকাশ এখনও মেঘলা

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২০ : চারুলতা-মহানগর — বীক্ষণযন্ত্র

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৫: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী — বাঘরোল

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫০: মধ্যরাতের বিপদ-আপদ
দেওয়ালে লাগানো সাধারণ ব্যাকেলাইট সিট-এর উপর লেখা ‘টেক সলিউশন কলকাতা’। বছর ৩৪-এর সুঠাম ঝকঝকে যুবক অতনু সেন এই স্টার্ট আপের মালিক। চুঁচুড়ার দোতলা বাড়ির ছাদে অন্ধকার আকাশের সামনে সেদিন মায়ের সঙ্গে কথা বলার সেই রাত থেকে আজ সল্টলেকের এই স্টার্ট আপ কোম্পানি পর্যন্ত পৌঁছতে কতটা যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে? এই সমাজে একেবারে নীচের থেকে মাথা ঝাড়া দিয়ে দাঁড়ানোর জন্য কতটা অপমান সহ্য করতে হয়? মোটামুটি এই অফিসটির রিসেপশনে যে মহিলার বদলে একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষ বসেন সেটা আমরা জানি। তবু একবার শুরুর কাহিনির গোড়াপত্তনে যাই।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৫: রাজসূয় যজ্ঞের সূচনায় মতবিনিময়ে নিহিত বৈচিত্র্যময় মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯০: ত্রিপুরার রাজপরিবারকে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পত্র
অবাক করে সেখানে দাঁড়িয়ে এক তরুণী। রিসেপশনের মাঝবয়সী লোকটি উঠে না দাঁড়ালেও সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে অতনুকে দেখছেন। সেটা লক্ষ্য করে মেয়েটি ঘুরে তাকালো। দিয়া সাহা বুদ্ধিমতী। চলন দৃষ্টি পুরুষালী পারফিউমের হালকা সুবাস। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই বুঝে ফেলেছে ইনিই সেই মানুষ।
—স্যার আমি আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই?
—আপনি কে?
—আমি মানে দিয়া! দিয়া সাহা!
—স্যার আমি আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই?
—আপনি কে?
—আমি মানে দিয়া! দিয়া সাহা!
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, অসমের আলো অন্ধকার, পর্ব-৬৩: বরাকের ভট্ট সঙ্গীত এবং বারমোসী গান

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৭: পরবাস প্রস্তুতি (তিন)
দিয়া চাকরিটা পায়নি এটাও আমরা জানি। কিন্তু ঠিক কী হয়েছিল?
দিয়া অতনু সেনের ক্যাবিনে ঢোকার পর সে একটাও কথা বলেনি। চেয়ারে বসতে বলেছে ফাইল চেয়েছে।
—অ্যাকাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড তো ভালো ছিল!
অতনু জানিয়েছিলেন দিয়া ম্যানেজমেন্ট ডিপ্লোমা না করে ভালো ইন্সটিটিউট থেকে ডিগ্রি করতে পারতো!
—আর আমার ইন্সটিটিউট খুব একটা খারাপ নয়।
—খারাপ তো বলিনি।
দিয়া অতনু সেনের ক্যাবিনে ঢোকার পর সে একটাও কথা বলেনি। চেয়ারে বসতে বলেছে ফাইল চেয়েছে।
—অ্যাকাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড তো ভালো ছিল!
অতনু জানিয়েছিলেন দিয়া ম্যানেজমেন্ট ডিপ্লোমা না করে ভালো ইন্সটিটিউট থেকে ডিগ্রি করতে পারতো!
—আর আমার ইন্সটিটিউট খুব একটা খারাপ নয়।
—খারাপ তো বলিনি।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৯ : উত্তরমেঘ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৭: এক উটকো লোকের কথায় ভুলে রবীন্দ্রনাথ-মৃণালিনীকে দিতে হয়েছিল খেসারত
খুব কম কথায় অতনু জানিয়েছিল ডিস্টেন্স লার্নিং কোর্সে এক বছরের ডিপ্লোমা করে চাকরিতে উন্নতি সুযোগ বা লোভনীয় প্যাকেজ কোনওটাই পাবে না দিয়া। দিয়া অতনুকে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করেছিল। গত দু’দিন ধরে টেক্স সলিউশন কলকাতা নিয়ে রীতিমতো রিসার্চ করেছিল দিয়া। সে জানতো নর্থ আমেরিকা এবং ইউরোপের স্মল টু মিডিয়াম সাইজ বিজনেস অতনুর কোম্পানির টার্গেট ক্লায়েন্ট।
—আপনারা রিমোট আইটি সাপোর্ট আর হেল্প ডেস্ক সার্ভিসেস অফার করেন। তার মানে ২৪X৭ হেল্পডেস্ক সাপোর্ট দিতে হয় দিয়া জানতো এখানে অড আওয়ার্স ডিউটি থাকে । সে জানতো এদের সফটওয়্যার ডেভেলপার, ইউআই/ওইএক্স (UI/UX) ডিজাইনার, কিউএ (QA) ইঞ্জিনিয়ার বা মোদ্দা কথায় টেস্টার লাগে। ফাইন্যান্সের ডেডিকেটেড লোকও লাগে।
—স্যার আমি জানি স্টার্ট আপের ইনিসিয়াল স্টেজে জব সেগ্রিকেশন হয় না, সবরকম কাজ করতে হয়। রেস্পন্সিবিলিটি ওভারল্যাপ হয় সে জানিয়েছিল তার জন্যেই বিটেক করার পর সে এইচআর (HR) ম্যানেজমেন্টে এক বছরের ডিপ্লোমাটা করেছে। দিয়া বেসিক্যালি সফটওয়্যারই কাজ করেও এইচআর (HR) সামলাতে পারবে।
অতনু থামতে বলেনি। টেবিলের উপর একটা সোনালি কলম আলতো ভাবে আঙুল দিয়ে ঘোরাচ্ছিল। পৃথিবী যেভাবে সব দাবি অভাব অভিযোগ শুনতে শুনতেও একভাবে সূর্যের চারপাশে ঘুরে যায় ঠিক তেমন।—চলবে।
—আপনারা রিমোট আইটি সাপোর্ট আর হেল্প ডেস্ক সার্ভিসেস অফার করেন। তার মানে ২৪X৭ হেল্পডেস্ক সাপোর্ট দিতে হয় দিয়া জানতো এখানে অড আওয়ার্স ডিউটি থাকে । সে জানতো এদের সফটওয়্যার ডেভেলপার, ইউআই/ওইএক্স (UI/UX) ডিজাইনার, কিউএ (QA) ইঞ্জিনিয়ার বা মোদ্দা কথায় টেস্টার লাগে। ফাইন্যান্সের ডেডিকেটেড লোকও লাগে।
—স্যার আমি জানি স্টার্ট আপের ইনিসিয়াল স্টেজে জব সেগ্রিকেশন হয় না, সবরকম কাজ করতে হয়। রেস্পন্সিবিলিটি ওভারল্যাপ হয় সে জানিয়েছিল তার জন্যেই বিটেক করার পর সে এইচআর (HR) ম্যানেজমেন্টে এক বছরের ডিপ্লোমাটা করেছে। দিয়া বেসিক্যালি সফটওয়্যারই কাজ করেও এইচআর (HR) সামলাতে পারবে।
অতনু থামতে বলেনি। টেবিলের উপর একটা সোনালি কলম আলতো ভাবে আঙুল দিয়ে ঘোরাচ্ছিল। পৃথিবী যেভাবে সব দাবি অভাব অভিযোগ শুনতে শুনতেও একভাবে সূর্যের চারপাশে ঘুরে যায় ঠিক তেমন।—চলবে।
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকের রচয়িতা, ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১/২/৩ খণ্ড)’ ও নাটক ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’। এখন লিখছেন ‘হ্যালো বাবু’এবং ‘আকাশ এখনও মেঘলা’।

















