
দুলাল সেন দাঁড়িয়ে ওঠে অ্যাডভোকেট অবনী চৌধুরীকে প্রণাম করলেন।
—আপনার নাম অনেক শুনেছি চৌধুরী সাহেব আজ চোখে দেখলাম।
—আগে আপনার কথা আমি জানতাম না। কিন্তু আমাকে আপনার অ্যাডভোকেট হিসেবে মেনে নেবার পর আমি এবং আমার জুনিয়র আপনার সম্বন্ধে সমস্ত খোঁজখবর নিয়েছি এবং সবটুকু জেনেছি।
—আমার একটা ভীষণ কৌতূহল হচ্ছে। আপনি বিখ্যাত, অন্তত সফল মানুষ। নিখরচায় এমন একটা কেস আপনি করতেই পারেন। কিন্তু যে কেসে পুলিশ চোখের সামনে খুনটা হতে দেখেছে এবং খুনি নিজে ভরা আদালতে বিচারকের সামনে স্বীকার করেছে যে, সেই খুনটা করেছে। সেখানে সাজা তো হবেই! তবু আপনি কেন আমার কেসটা নিয়ে আপনার মূল্যবান সময় নষ্ট করছেন?
—আপনার নাম অনেক শুনেছি চৌধুরী সাহেব আজ চোখে দেখলাম।
—আগে আপনার কথা আমি জানতাম না। কিন্তু আমাকে আপনার অ্যাডভোকেট হিসেবে মেনে নেবার পর আমি এবং আমার জুনিয়র আপনার সম্বন্ধে সমস্ত খোঁজখবর নিয়েছি এবং সবটুকু জেনেছি।
—আমার একটা ভীষণ কৌতূহল হচ্ছে। আপনি বিখ্যাত, অন্তত সফল মানুষ। নিখরচায় এমন একটা কেস আপনি করতেই পারেন। কিন্তু যে কেসে পুলিশ চোখের সামনে খুনটা হতে দেখেছে এবং খুনি নিজে ভরা আদালতে বিচারকের সামনে স্বীকার করেছে যে, সেই খুনটা করেছে। সেখানে সাজা তো হবেই! তবু আপনি কেন আমার কেসটা নিয়ে আপনার মূল্যবান সময় নষ্ট করছেন?
—দুলালবাবু! দু’ তিনটে কারণ আছে। একে একে বলছি। আইনব্যবসায় যুক্ত থাকার সুবাদে আমাদের দেশের আইনব্যবস্থা সম্বন্ধে এবং আমারই সহকর্মী কয়েকজন খুব সিনিয়র অ্যাডভোকেট-এর সম্বন্ধে আপনার যে ধারণা হয়েছে, সেটা সম্পূর্ণ ভুল আমি এ কথা বলছি না। কিন্তু আপনি যেরকম ভাবছেন সবটুকু সেরকম নয়। যে বা যারা আপনার বিরুদ্ধে ঘুষ দিয়ে যেসব উকিলদের মেরুদণ্ড কিনে নিয়েছে। আইন ব্যবসায়যুক্ত সমস্ত উকিল সেরকম দুর্নীতিগ্রস্ত নয়। এই বিশ্বাসটা একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আপনার মনে ফিরিয়ে দেবার জন্য আমি এই কেসটা নিয়েছি। বহুদিন ধরে অনেক কেস লড়েছি। প্রতিদিন নতুন নতুন জিনিস শিখি। আমাদের আইনপ্রণয়ন এবং তার ব্যবহারে দুর্বলতা আছে। এদেশের বিপুল জনসংখ্যা আর আর্থিক অসংগতি আমাদের শৃঙ্খলাহীন করে তুলেছে। নিয়মভাঙ্গাটাই এখন দস্তুর। সঠিক বিচার ব্যবস্থা পেতে যে সময় ও পদ্ধতির প্রয়োজন সেটা নেই। আর তার জন্যে একজন সৎ সাধারণ খেটেখাওয়া মানুষ অপরাধের অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছেন দেখে আমি তার পাশে দাঁড়াতে চেয়েছি। তার কাছ থেকে তার সেই কেস থেকে আইন ব্যবহারকে আমি আবার নতুন করে শিখতে চেষ্টা করেছি। ভুলটাকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। আর তৃতীয়ত: আপনি ঠান্ডামাথায় প্যারোলে গিয়ে একটি খুন করেছেন। তার মানে আপনি আইনিব্যবস্থার একটা সুবিধাকে বদ উদ্দেশ্যে খারাপভাবে ব্যবহার করেছেন। সুতরাং খুব স্বাভাবিকভাবে আপনার মৃত্যুদণ্ড হবে। কিন্তু আপনার মতো মানুষকে বেঁচে থাকতে হবে, আপনার মতো মানুষকে গরাদের মধ্যে হলেও টিকে থাকতে হবে। আপনি শেষ হয়ে গেলে কালই মানুষ সব ভুলে যাবে। কিন্তু আমি যদি আপনাকে বাঁচিয়ে রাখি তাহলে এটা দৃষ্টান্ত হবে । আইনের ব্যবহারে দৃষ্টান্ত ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ! তাই আমার চ্যালেঞ্জ আপনার ফাঁসি আমি হতে দেবো না। আর প্রকৃত অপরাধী যাতে তার মৃত্যুর পরেও এতটুকু অকারণ সহানুভূতি না পান আমি সেই চেষ্টা করবো। যাতে আর কেউ ভবিষ্যতে এই চেষ্টা না করে। তবে দুর্ভাগ্য স্নিগ্ধা খুন হয়ে পর্দার পিছনে থাকা ষড়যন্ত্রীকে চিরকালের আড়ালে রেখে দিল। সবটুকু বুঝতে পারলেও ওই মেয়েটির স্বীকারোক্তি ছাড়া আসল ষড়যন্ত্র আদালতের সামনে প্রমাণ করা যাবে না!
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৫১: আকাশ এখনও মেঘলা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৩: জরাসন্ধের ঔদ্ধত্য ও কৃষ্ণের ভূমিকা যুধিষ্ঠিরকৃত রাজসূয় যজ্ঞের প্রাসঙ্গিক সূচনা

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৯ : চারুলতা: নাচে মুক্তি? নাচে বন্ধ?

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৪: ছোট নখরযুক্ত ভোঁদড়
অ্যাডভোকেট অবনী চৌধুরী কথা রেখেছিলেন। দুলাল সেনের ফাঁসি হয়নি। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল। বাবা জেলে, মা মৃতা। ফাদার স্যামুয়েল দ্বায়িত্বে বড় হতে লাগল নিঃসহায় অতনু সেন। কিন্তু ফাদার স্যামুয়েল কখনোই অতনুকে খ্রিস্টান ধর্মান্তরিত করবার কথা ভাবেননি। জীবনে মাত্র একটি দিন। মায়ের দাহকার্য্যের দিন ছাড়া আর কোনদিন চার্চের ভেতরে গিয়ে যিশুর সামনে দাঁড়ায়নি সে। আজ এতটা বড় হয়েও কোনওদিন কোনও মন্দিরে যায়নি অতনু। কোনও দেবতার সামনে দাঁড়ায়নি। কোনও আচার অনুষ্ঠানে বিশ্বাস করে না। ফাদারকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করা ছাড়া মাথা ঝুঁকিয়েও কোনদিন কাউকে প্রণাম করেনি। ফাদার ছাড়া স্কুলকলেজ অফিসে কোনও বন্ধু নেই। অফিসের কাজের সূত্রে যেটুকু কথা বলতে হয়। তার বাইরে কোন যোগাযোগ রাখে না আর জীবনে কোনও মহিলাকে তার ত্রিসীমানায় আসতে দেয়নি সে। পারতপক্ষে কথা বলে না। তাকায় না পর্যন্ত। কোনও নারী বা মহিলাকে সে বিশ্বাস করে না।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৮: অসম-মিজোরাম সীমান্তে ঘাড়মুড়ার নব আবিষ্কৃত ভাস্কর্যও সুপ্রাচীন

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৬: পরবাস প্রস্তুতি (দুই)
বাবা যেদিন জেল থেকে প্যারোলে ছাড়া পেয়ে অতনুর মায়ের শবদাহ করেছিল সেই ভোরবেলায় মিশনারী স্কুলের থেকে ফাদার স্যামুয়েল অতনুকে চার্চে নিয়ে এসেছিলেন। সারাদিন ধরে একটু একটু করে সবটুকু বলেছিলেন। কেন তার বাবা জেলে? কোনও বিচার ব্যবস্থায় তার বাবা অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছেন? কেন তার মা আত্মহত্যা করেছেন? কেন তার বাবা চাননি অতনু তার মায়ের মৃতদেহ দেখুক। সব। সারাদিন ফাদার অতনুর সঙ্গে ছিলেন বিকেলবেলায় স্নিগ্ধাকে গুলি করে খুন করার ঘটনাটা কানে এসে পৌঁছল। ফাদার বুঝতে পারলেন কেন বারবার দুলাল সেন ফাদার বা অতনুকে শ্মশানে যেতে মানা করেছিলেন। সন্ধেবেলায় আবার চার্চে গিয়ে যিশু খ্রিস্টের মূর্তির সামনে সেই ছেলেকে দাঁড় করিয়ে তাকে শোনালেন তার বাবা ঠিক কী করেছেন কেন করেছেন আর তাঁর শাস্তি কী হতে পারে! ক্লাস এইটে পড়া সেই কিশোর হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলেছিল। ফাদার তাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরেছিলেন। সেই দিন থেকে ফাদার অতনুকে বুঝতে দেন নি যে সে মাতৃপিতৃ-আত্মীয়বন্ধুহীন।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, অসমের আলো অন্ধকার, পর্ব-৬৩: বরাকের ভট্ট সঙ্গীত এবং বারমোসী গান

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৮: অপারেশন হেলথ সেন্টার
নিজের শৈশব সময়ের এই ভয়ংকর ধাক্কা অতনুকে অনেক ছোট বয়সেই বড় করে দিয়েছিল। সে বুঝেছিল একমাত্র পড়াশোনার মাধ্যমে সে এই অবিচারের প্রতিশোধ নিতে পারবে। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং-এ দুর্ধর্ষ রেজাল্ট। বিরাট সংস্থার ইন্টারভিউ ক্র্যাক করে মোটা মাইনের চাকরি। জয়েন করে অতনু ফাদার স্যামুয়েলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। ফাদার বলেছিলেন এরকম একটা খবর পাওয়ার পর আমার সেলিব্রেট করা উচিত। খ্রিস্টান মতে কেককাটা উচিত। হিন্দুমতে সন্দেশ খাইয়ে তোমার মুখ মিষ্টি করা উচিত। কিন্তু আজ আমি আবার তোমাকে ছোটবেলার সেই ভয়ংকর কঠিন ইতিহাসটা মনে করিয়ে দেবো! আজকে তোমার জীবনের সবথেকে আনন্দের দিনে আমি তোমার মনের মধ্যে সব থেকে কঠিন বিষটা আবার ভরে দেবো। যাতে সেই বিষের জ্বালায় ছটফট করতে করতে তুমি প্রতিশোধ নিতে পারো, ভয়ংকর সামাজিক অন্যায়ের প্রতিশোধ!
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৯ : উত্তরমেঘ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৭: এক উটকো লোকের কথায় ভুলে রবীন্দ্রনাথ-মৃণালিনীকে দিতে হয়েছিল খেসারত
আজ সেক্টর ফাইভে নিজস্ব অফিস। সফল আইটি ব্যবসায়ী অতনু সেন সেই বিষের জ্বালায় ছটফট করতে করতে প্রতিটি দিন প্রতিমুহূর্তে অপেক্ষা করছে! তার বাবার অপমান অন্যায় অপবাদ, তার মায়ের মৃত্যু , তার শৈশবটা ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া এই সমাজের নরকের কীটগুলোর বিরুদ্ধে ভয়ংকর প্রতিশোধ নেবার জন্যে অপেক্ষা করছে। আর দু’হাত ভরে রোজগার করা টাকার একটা বিরাট অংশ, দূর্ভাগ্যে শৈশব নষ্ট হয়ে যাওয়া সেই সব অনাথ শিশুকিশোরদের জীবন গড়ে দেওয়ার জন্য ফাদারের মাধ্যমে তাদের মধ্যে দিয়ে সে ফিরিয়ে দিচ্ছে।
১ম অধ্যায়ের সমাপ্তি।
অতনুর অসম্ভব লড়াইয়ের সাক্ষ্য হয়ে আসছে আকাশ এখনও মেঘলা উপন্যাসের পরবর্তী অধ্যায়।
* জিৎ সত্রাগ্নি (Jeet Satragni) বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি জগতে এক পরিচিত নাম। দূরদর্শন সংবাদপাঠক, ভাষ্যকার, কাহিনিকার, টেলিভিশন ধারাবাহিক, টেলিছবি ও ফিচার ফিল্মের চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার। জিৎ রেডিয়ো নাটক এবং মঞ্চনাটক লিখেছেন। ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ নাটকের রচয়িতা, ‘বুমেরাং’ চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। প্রকাশিত হয়েছে ‘জিৎ সত্রাগ্নি’র নাট্য সংকলন’, উপন্যাস ‘পূর্বা আসছে’ ও ‘বসুন্ধরা এবং…(১/২/৩ খণ্ড)’ ও নাটক ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’। এখন লিখছেন ‘হ্যালো বাবু’এবং ‘আকাশ এখনও মেঘলা’।


















