মঙ্গলবার ১০ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

হেমলতা দেবী।

লিখলেই তো শুধু হয় না, লেখার পর পাঠকের কাছে পৌঁছনোও জরুরি। পৌঁছনোর বড় মাধ্যম অবশ্যই পত্রপত্রিকা। ঠাকুরবাড়ির উদ্যোগেও বিভিন্ন সময় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। পারিবারিক উদ্যোগে প্রকাশিত হলেও কোনওটিই নিতান্ত পারিবারিক পত্রিকা ছিল না। ঠাকুরবাড়ির বাইরের লেখকরাও লিখেছেন। ঠাকুরবাড়ির প্রথম পত্রিকা ‘তত্ত্ববোধিনী’। ‘তত্ত্ববোধিনী’র পর বেরিয়েছে ‘ভারতী’। প্রায় পঞ্চাশ বছর ‘ভারতী’-র আয়ুষ্কাল। ঠাকুরবাড়ি থেকে ক্রমান্বয়ে বেরিয়েছে আরও কয়েকটি পত্রিকা। ‘বালক’, ‘সাধনা’ ও ‘পুণ্য’। পরবর্তীকালে বেরিয়েছে আরও কয়েকটি পত্রিকা। ‘আনন্দ সঙ্গীত’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ পত্রিকাটি ছিল পুরোপুরি সংগীতকেন্দ্রিক। সম্পাদনা করতেন ঠাকুরবাড়ির দুই কন্যা, হেমেন্দ্র-কন্যা প্রতিভা ও সত্যেন্দ্র-কন্যা ইন্দিরা।
এসবই মুদ্রিত-পত্রিকা, হাতে-লেখা পত্রিকাও বেরিয়েছে। অবনীন্দ্র-দৌহিত্র মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায় প্রকাশ করেছিলেন ‘দেয়ালা’। শান্তিনিকেতন-আশ্রম থেকেও হাতে-লেখা পত্রিকা বেরিয়েছে। সে পত্রিকার নাম ‘শ্রেয়সী’। পত্রিকার এই সুন্দর নামটি দিয়েছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ। ‘ভারতী’-র নামকরণও তাঁরই করা। দ্বিজেন্দ্রনাথের সম্পাদনাতেই ‘ভারতী’প্রকাশিত হয়েছিল। সমাজজীবনে নারী তখনও পর্দানশিন, সুখের কথা, পত্রিকার সম্পাদনায় ঠাকুরবাড়িতে ছিল মেয়েদেরই প্রাধান্য। অন্তত বছর তেত্রিশ ওই বাড়ির কন্যারা ‘ভারতী’ সম্পাদনা করেছেন। শান্তিনিকেতন-আশ্রমকে ঘিরে যে মহিলাকুল, তাঁরা প্রায় সকলেই সাহিত্য ভালোবাসতেন, সাহিত্যচর্চা করতেন। তৈরি হয়েছিল এক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। নিয়মিত বসত তাঁদের সাহিত্যসভা, সাহিত্যপাঠ ও আলোচনা। সেইসঙ্গে সংগীত পরিবেশন। এই আশ্রম-কন্যারা ‘শ্রেয়সী’ নামে একটি হাতে-লেখা পত্রিকাও প্রকাশ করতেন। সাহিত্যসভার উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেন সীতা দেবী। তাঁর বড় ভূমিকা ছিল পত্রিকা-প্রকাশের ক্ষেত্রেও।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩৪: বিশাল বপু নিয়ে দিনেন্দ্রনাথ ধপাস করে পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের উপর

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৩৮: আকাশ এখনও মেঘলা

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৮ শচীন দেববর্মণ ও ত্রিপুরার রাজপরিবার

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-৩: শঙ্করের দেশান্তর, আখ্যানের অন্য পথ

‘বন্ধু’ ও ‘প্রবাসী’ পত্রিকার সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা সীতাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন রবীন্দ্রনাথ। শান্তিনিকেতনে, কলকাতায়, যেখানেই দেখা হোক না কেন, দু-কথা বলার পরই পত্রিকার কথা জিজ্ঞেস করতেন। কবির সেই সান্নিধ্য ছিল বড়োই সুখকর। একথা-সেকথার মধ্য দিয়ে সহজেই এক উপভোগ্য মজলিশি-পরিবেশ তৈরি হত। সীতা দেবী ও আশ্রম-কন্যারা উপস্থিত থাকলে প্রায়শই ‘শ্রেয়সী’র কথা উঠত। হাতে-লেখা পত্রিকা, সব লেখা তেমন মানেরও নয়,তবু রবীন্দ্রনাথ সব খুঁটিয়ে পড়তেন। একবার একটি লেখায় বানান ভুল ছিল, রবীন্দ্রনাথের তা চোখ এড়িয়ে যায়নি। এক মজলিশি সভায় সে কথা বলা মাত্র এক আশ্রম-কন্যা ফুঁসে উঠে বলেছিল, ‘আমরা এবার ছেলেদের লেখার সমালোচনা করব।’
কলকাতায় বৃষ্টি

প্রতিমা দেবী।

শুনে রবীন্দ্রনাথ শুধুই হেসেছিলেন, হাসতে হাসতে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে যা বলেছিলেন, সে কথায় যথেষ্ট খোঁচা ছিল। বলেছিলেন,’বেশি কিছু লিখতে যেয়ো না, তাতেও বানান ভুল হবে।’ কবির কথায় একটুআধটু খোঁচা হয়তো কখনোসখনো থাকত, অবশ্যই তা প্রয়োজনভিত্তিক। তবে প্রায়শই বিচ্ছুরিত হত নির্মল আনন্দ। নিজেকে নিয়ে কৌতুক করা সহজ কাজ নয়। এ কাজটিও রবীন্দ্রনাথ ভালো পারতেন। করতেনও।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১২১: সুন্দরবনের পাখি: ছোট গুলিন্দা

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১১ : অরিন্দম কহিলা বিষাদে

দ্বিজেন্দ্রনাথ সপরিবারে শান্তিনিকেতনে থাকতেন। পুত্র দ্বিপেন্দ্রনাথের স্ত্রী হেমলতা দেবী ছিলেন অতীব দায়িত্ব-পরায়ণ। পরিবারের দায়-দায়িত্ব পালনের পর যেটুকু সময় পেতেন, তা অকাতরে দিতেন আশ্রমের জন্য। আশ্রমের অনেক দায়দায়িত্বই স্বেচ্ছায় পালন করতেন। এরই ফাঁকে চলত তাঁর সাহিত্যচর্চা। রবীন্দ্রনাথ হেমলতার বইয়ের ভূমিকাও লিখে দিয়েছিলেন।
কলকাতায় বৃষ্টি

সীতা দেবী।

আশ্রমের সকলের সঙ্গে ছিল হেমলতার সুসম্পর্ক। তাঁর স্নেহময় আন্তরিক ব্যবহারের জন্য ছোটোরাও তাঁর সঙ্গে খুব মিশত, দেখা হলেই চলত রকমারি গল্প। হেমলতা উপস্থিত থাকতেন আশ্রম-কন্যাদের মজলিশি আসরেও। হেমলতা দেবীর কাছে ‘শ্রেয়সী’ জন্য লেখা চেয়ে সীতা দেবীদের কখনো বিমুখ হতে হয়নি। অসুস্থ শরীরেও একবার অনেকগুলি কবিতা লিখে দিয়েছিলেন। আনন্দ-উচ্ছ্বাসে সীতা রবীন্দ্রনাথকে জানিয়েছিলেন, হেমলতা দেবীর কাছ থেকে একসঙ্গে অনেকগুলো কবিতা পাওয়ার কথা। শোনা মাত্র এমন মজা করেছিলেন, যা রবীন্দ্রনাথই করতে পারতেন। কথায় কথায় কৌতুক করতেন তিনি। ঘরোয়া আসরে, প্রিয়জনের উপস্থিতিতে কৌতুকময় কথা বলতেন। বাইরের সভা-সমিতিতে, অচেনা পরিবেশে তিনি ছিলেন অন্য মানুষ। গাম্ভীর্যের প্রতিমূর্তি। অসুস্থ, বিছানায় শুয়ে থাকা হেমলতার থেকে অনেকগুলো কবিতা একসঙ্গে পাওয়ার কথা শুনে বলেছিলেন, ‘অসুখের সময়ই তো মানুষ কবিতা লেখে, আমার শরীর যদি চিরকাল ভালো থাকত তা হলে কি ভেবেছ আমি অত কবিতা লিখতুম? অমন কাণ্ড মানুষ সুস্থ শরীরে করে না।’
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩৬: মত্ত হস্তির দাপাদাপি

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৩৩: যুধিষ্ঠিরের সভায় উপস্থিত মহর্ষি নারদের প্রশ্নগুলি যেন রাজনীতির সার্বিক দিগদর্শন

ভ্রাতুষ্পুত্র দিনেন্দ্রনাথকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন রবীন্দ্রনাথ। স্নেহ করতেন দিনেন্দ্র পত্নী-কমলাকেও। আশ্রমের সকলেই কমলাকে ভালোবাসতেন। বলতেন, ‘কমলবোঠান’। কমলাও সেই মজলিশি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। ‘শ্রেয়সী’তে দেওয়ার জন্য তিনি গল্প লিখছেন শুনে রবীন্দ্রনাথ খুবই উৎসাহ প্রকাশ করেছিলেন। কী নিয়ে গল্প জানতে চেয়েছিলেন। কমলা সংক্ষেপে বলেওছিলেন। প্লটে কোনো বিয়ের কথা নেই, বিয়ে ভাঙার কথাও নেই, শুনে মজা করে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বলেছিলেন, ‘তুমি কোন কর্মের নয়, বিয়ে একটা দিয়ে দিতে পারলে না?’ পুত্রবধূ প্রতিমাকেও কবি অত্যন্ত স্নেহ করতেন। ‘বাবামশায়’ তাঁকে বলতেন ‘মামনি’। কথার মাঝে ফোড়ন দিয়েছিলেন প্রতিমা। মজা করই বলেছিলেন গল্পের নায়ক একজন কবি। সে কথা শুনে রবীন্দ্রনাথ বেজায় রকমের রাগ করেছিলেন। রাগ না করলেও অন্তত রাগ করার ভান করেছিলেন। সে মুহূর্তে স্থানত্যাগও করেছিলেন। যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিলেন, ‘এ নিশ্চয়ই আমাকে লক্ষ্য করে লেখা, যাও তোমার সঙ্গে আর কথা নয়।’
কলকাতায় বৃষ্টি

শান্তা দেবী।

সীতা দেবী জানিয়েছেন, ‘শ্রেয়সী’ নিয়ে কবির ‘রঙ্গ-রহস্যের’ অন্ত ছিল না। সে সময় সীতার অগ্রজা শান্তা ‘শ্রেয়সী’ সম্পাদনা করতেন। সেদিন শান্তা বেরিয়েছিলেন কথা দেওয়া কারও কারও লেখা সংগ্রহে। নিচের রাস্তা দিয়ে হনহনিয়ে শান্তা চলেছেন দেখে কবি তাঁকে ডেকেছিলেন। কোথায় গিয়েছিলেন জানার পর বলেছিলেন,‘শান্তা, এই দারুণ রোদে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছ লেখার জন্যে, আর আমাকে একেবারে অবজ্ঞা করে চলে যাচ্ছ? আমি কি তেমন খারাপ লিখি?’
আরও পড়ুন:

আমার দুর্গা: বিজ্ঞানী রাজেশ্বরী চট্টোপাধ্যায়

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬৪: অ্যাঙ্করেজের সঙ্গে সিউয়ার্ডকে জুড়েছে পৃথিবীখ্যাত সিউয়ার্ড হাইওয়ে

বলা বাহুল্য, এসব মজা করেই বলতেন কবি। শান্তিনিকেতনের মহিলারা পিছিয়ে নেই, একত্রিত হয়ে পত্রিকা প্রকাশ করছেন, রবীন্দ্রনাথকে তা আনন্দ দিত। ‘শ্রেয়সী’ প্রকাশিত হলেই পৌঁছে দেওয়া হত কবির কাছে। তিনি খুঁটিয়ে পড়তেন, ভালো-মন্দ আলোচনা করতেন। সেবারও সবার আগে তাঁর কাছে ‘শ্রেয়সী’ পৌঁছে গিয়েছিল। পাওয়া মাত্র পত্রিকাটি আগাগোড়া পড়ে ফেলেছিলেন কবি। হেমলতা দেবী পত্রিকা কেমন হয়েছে জানতে চাওয়ায় বলেছিলেন, ‘সীতার লেখাটি সব থেকে ভালোলেগেছে।’ ওই সংখ্যায় আমেরিকান ও ইংরেজি কাগজ থেকে নানা উদাহরণ সংগ্রহ করে সীতা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন, বৃদ্ধ বয়সেও মানুষ যথেষ্ট কর্মক্ষম থাকে। রবীন্দ্রনাথের তখন অনেক বয়স হয়েছে। ‘শ্রেয়সী’তে প্রকাশিত সীতার লেখা কতখানি উজ্জীবিত করেছিল তাঁকে, সে কথা নিজের মুখেই বলেছেন, ‘ওতে কিরকম যে উৎসাহ পেয়েছি তার কি বলব। ভরসা হচ্ছে যে এখনও অনেক দিন কাজ করতে পারব।’ দেখা হলেই কবি নব্বই বছর অবধি ভালো থাকার প্রসঙ্গ তুলে মজা করতেন। সীতার দিদি শান্তার সামনে এ কথা বলায় শান্তাও মজা করতে ছাড়েননি। বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশের লোকেদের সঠিক বয়সই তো জানা যায় না।’ রবীন্দ্রনাথ আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেছিলেন ‘আমি মোটেই বয়স লুকোচ্ছি না, সাল তারিখ সব বলে দিচ্ছি, ঠিক করে হিসাব করে নাও।’
কলকাতায় বৃষ্টি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

সরসসতায় ভরপুর। কথায় কথায় এমন মজা ক’জন আর করতে পারে। রবীন্দ্রনাথের গাম্ভীর্যের ছদ্ম-মুখোশ ছিল না। মানুষের সঙ্গে মিশতেন, মানুষকে ভালোবাসতেন। কোনও বানানো দূরত্ব ছিল না। খুব সহজেই মিশে যেতেন। হাসিতে খুশিতে, আনন্দে মজায় ভরিয়ে তুলতেন। কবির সরস-সান্নিধ্যে চারপাশের মানুষজনও ভালো থাকতেন।

* গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি (Tagore Stories – Rabindranath Tagore) : পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Parthajit Gangopadhyay) অবনীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট। বাংলা ছড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণা, ডি-লিট অর্জন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে চলেছেন। বাংলা সাহিত্যের বহু হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছেন। ছোটদের জন্য পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন। সম্পাদিত বই একশোরও বেশি।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content