
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
যুধিষ্ঠির, নিজের অপ্রতিহত একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও জনকল্যাণসাধনেরর লক্ষ্যে, বিরাট ব্যয়সাধ্য ও সম্রাটদের যোগ্য রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠানে ব্রতী হয়েছেন। তিনি তাঁর পরিমণ্ডলে সকলের অনুমোদন লাভ করেছেন। তবু একান্ত আপন গুরুপ্রতিম কৃষ্ণের পরামর্শপ্রার্থী হয়েছেন। কারণ, প্রাজ্ঞ, বিজ্ঞ যুধিষ্ঠিরের পরম ভরসা কৃষ্ণের অকপট নিরপেক্ষ অনুমোদন। কৃষ্ণের মতে, যুধিষ্ঠিরের রাজসূয়যজ্ঞানুষ্ঠানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারেন মগধরাজ জরাসন্ধ। জরাসন্ধ, প্রভাবশালী অপরাপর রাজারা তাঁর আনুগত্য স্বীকার করেছেন। এমন কি কৃষ্ণ ও তাঁর যাদবকুল পর্যন্ত জরাসন্ধ ও তাঁর সঙ্গীদের ভয়ে ত্রস্ত। কৃষ্ণ, তাঁর স্বরাজ্য মথুরা ত্যাগ করে, প্রতিপত্তিশালী, বীর শৌর্যশালী স্বজনবর্গে সঙ্গে রৈবতকপর্বতে নিজেদের সৃষ্ট, সুরক্ষিত গিরিদুর্গে আশ্রয় নিয়েছেন। মগধরাজ জরাসন্ধ, অত্যাচারী। তিনি অন্যান্য রাজাদের জয় করে গিরিব্রজনামক পার্বত্যদুর্গে বন্দি করে রেখেছেন।
কৃষ্ণ মনে করেন, জরাসন্ধের জীবদ্দশায় যুধিষ্ঠির রাজসূয়যঞ্জ সম্পন্ন করতে পারবেন না। নং তু শক্যং জরাসন্ধে জীবমানে মহাবলে। রাজসূয়ং ত্বয়াবাপ্তুমেষা রাজন্! মতির্মম।। যুধিষ্ঠিরের কাছে কৃষ্ণের প্রস্তাব—রাজসূয়যজ্ঞ সম্পাদনে ইচ্ছুক, যুধিষ্ঠির প্রথম কর্তব্য হল জরাসন্ধের কবল হতে সেই সব বন্দি রাজাদের মুক্ত করা এবং জরাসন্ধবধ। যদি ত্বেবং মহারাজ!যজ্ঞং প্রাপ্তুমভীপ্সসি। যতস্ব তেষাং মোক্ষায় জরাসন্ধবধায় চ।। কৃষ্ণ এই অভিমত প্রকাশ করে, যুধিষ্ঠিরের এ বিষয়ে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত জানতে চাইলেন।
যুধিষ্ঠির কৃষ্ণের মতামতের বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে জানালেন, বুদ্ধিমান কৃষ্ণ যা কিছু বলেছেন, অন্য কেউ তা বলতে পারবেন না। কৃষ্ণ ভিন্ন, তাঁর সমস্ত সংশয়দূরকারী আর কেউ নেই। নানা জায়গায় নিজের প্রিয়সাধনকারী রাজারা আছেন, তাঁরা কিন্তু সাম্রাজ্য লাভ করেননি, সম্রাটপদটি এতটাই কষ্ট করে লাভ করতে হয়। অপরের প্রভাব (জয় করবার ক্ষমথা) যিনি জানেন তিনি আত্মপ্রশংসা করতে পারেন না। যিনি অপরের সঙ্গে যুদ্ধে মিলিত হয়ে, (জয়লাভের কারণে) প্রশংসিত হন, তিনিই সম্মানিত হয়ে থাকেন। যুধিষ্ঠির, বৃষ্ণিকুলোত্তম কৃষ্ণের কাছে, নিজ বক্তব্যর সমর্থনে যুক্তির অবতারণা করলেন—এই বিশাল ভূভাগ বহু অংশে বিভক্ত এবং এখানে বহুরত্ন পরিব্যপ্ত হয়ে আছে। সেই ভূভাগ জয় করে যুধিষ্ঠির, তাঁর পরম শ্রেয় অর্থাৎ পরম মঙ্গল জানতে পারতেন। এই বলে, যুধিষ্ঠির তাঁর সিদ্ধান্ত জানালেন, শান্তি তাঁর পরম অভিপ্সীত। তিনি মনে করেন, কারণ তাতেই নিজের মঙ্গল হতে পারে। তাই (রাজসূয়যজ্ঞ) শুরু করলেও (যজ্ঞ) শেষ করতে পারবেন না বলেই তাঁর মনে হয়। শমমেব পরং মন্যে শমাৎ ক্ষেমং ভবেন্মম। আরম্ভঃ পরমো হ্যেষ ন প্রাপ্য ইতি মে মতিঃ।। যুধিষ্ঠির কৃষ্ণকে আরও জানালেন, সদ্বংশে জাত এই মনস্বীরাও বিশেষভাবে জানেন, এনাদের মধ্যে কখনও যে কেউ শ্রেষ্ঠ হতে পারেন।
ভীমসেন উদ্যমের সপক্ষে বললেন, যে রাজা (কোন কার্যারম্ভে) উদ্যোগী নন এবং যিনি দুর্বল হয়েও সামাদি উপায় অবলম্বন না করে বলশালীর প্রতি ধেয়ে যান, এই দু’জন, উইঢিপির মতো ভেঙে পড়েন। দুর্বল রাজাও আলস্যহীন হয়ে নীতি প্রয়োগ করে, শক্তিশালী শত্রুকে জয় করতে পারেন, এবং প্রায়শ নিজের হিতকর উদ্দেশ্যসমূহ সাধন করে থাকেন। ভীমসেন তাঁর মতো দৃঢ়তার সঙ্গে প্রকাশ করলেন, কৃষ্ণের আছে নীতিবোধ, তাঁর নিজের আছে বল অর্থাৎ দৈহিক সামর্থ্য, অর্জুনের আছে (জয়ের জন্যে) জন্য যুদ্ধশিক্ষাকৌশল। অগ্নিত্রয় (দক্ষিণাগ্নি, গার্হপত্যাগ্নি ও আহবনীয়াগ্নি) যেমন যজ্ঞ সম্পাদন করেন, তেমনই আমরা মগধরাজ জরাসন্ধকে জয় করব। কৃষ্ণে নয়ো ময়ি বলং জয়ঃ পার্থে ধনঞ্জয়।মাগধং সাধয়িষ্যাম ইষ্টিং ত্রয় ইবাগ্নয়ঃ।।
কৃষ্ণ মনে করেন, জরাসন্ধের জীবদ্দশায় যুধিষ্ঠির রাজসূয়যঞ্জ সম্পন্ন করতে পারবেন না। নং তু শক্যং জরাসন্ধে জীবমানে মহাবলে। রাজসূয়ং ত্বয়াবাপ্তুমেষা রাজন্! মতির্মম।। যুধিষ্ঠিরের কাছে কৃষ্ণের প্রস্তাব—রাজসূয়যজ্ঞ সম্পাদনে ইচ্ছুক, যুধিষ্ঠির প্রথম কর্তব্য হল জরাসন্ধের কবল হতে সেই সব বন্দি রাজাদের মুক্ত করা এবং জরাসন্ধবধ। যদি ত্বেবং মহারাজ!যজ্ঞং প্রাপ্তুমভীপ্সসি। যতস্ব তেষাং মোক্ষায় জরাসন্ধবধায় চ।। কৃষ্ণ এই অভিমত প্রকাশ করে, যুধিষ্ঠিরের এ বিষয়ে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত জানতে চাইলেন।
যুধিষ্ঠির কৃষ্ণের মতামতের বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে জানালেন, বুদ্ধিমান কৃষ্ণ যা কিছু বলেছেন, অন্য কেউ তা বলতে পারবেন না। কৃষ্ণ ভিন্ন, তাঁর সমস্ত সংশয়দূরকারী আর কেউ নেই। নানা জায়গায় নিজের প্রিয়সাধনকারী রাজারা আছেন, তাঁরা কিন্তু সাম্রাজ্য লাভ করেননি, সম্রাটপদটি এতটাই কষ্ট করে লাভ করতে হয়। অপরের প্রভাব (জয় করবার ক্ষমথা) যিনি জানেন তিনি আত্মপ্রশংসা করতে পারেন না। যিনি অপরের সঙ্গে যুদ্ধে মিলিত হয়ে, (জয়লাভের কারণে) প্রশংসিত হন, তিনিই সম্মানিত হয়ে থাকেন। যুধিষ্ঠির, বৃষ্ণিকুলোত্তম কৃষ্ণের কাছে, নিজ বক্তব্যর সমর্থনে যুক্তির অবতারণা করলেন—এই বিশাল ভূভাগ বহু অংশে বিভক্ত এবং এখানে বহুরত্ন পরিব্যপ্ত হয়ে আছে। সেই ভূভাগ জয় করে যুধিষ্ঠির, তাঁর পরম শ্রেয় অর্থাৎ পরম মঙ্গল জানতে পারতেন। এই বলে, যুধিষ্ঠির তাঁর সিদ্ধান্ত জানালেন, শান্তি তাঁর পরম অভিপ্সীত। তিনি মনে করেন, কারণ তাতেই নিজের মঙ্গল হতে পারে। তাই (রাজসূয়যজ্ঞ) শুরু করলেও (যজ্ঞ) শেষ করতে পারবেন না বলেই তাঁর মনে হয়। শমমেব পরং মন্যে শমাৎ ক্ষেমং ভবেন্মম। আরম্ভঃ পরমো হ্যেষ ন প্রাপ্য ইতি মে মতিঃ।। যুধিষ্ঠির কৃষ্ণকে আরও জানালেন, সদ্বংশে জাত এই মনস্বীরাও বিশেষভাবে জানেন, এনাদের মধ্যে কখনও যে কেউ শ্রেষ্ঠ হতে পারেন।
ভীমসেন উদ্যমের সপক্ষে বললেন, যে রাজা (কোন কার্যারম্ভে) উদ্যোগী নন এবং যিনি দুর্বল হয়েও সামাদি উপায় অবলম্বন না করে বলশালীর প্রতি ধেয়ে যান, এই দু’জন, উইঢিপির মতো ভেঙে পড়েন। দুর্বল রাজাও আলস্যহীন হয়ে নীতি প্রয়োগ করে, শক্তিশালী শত্রুকে জয় করতে পারেন, এবং প্রায়শ নিজের হিতকর উদ্দেশ্যসমূহ সাধন করে থাকেন। ভীমসেন তাঁর মতো দৃঢ়তার সঙ্গে প্রকাশ করলেন, কৃষ্ণের আছে নীতিবোধ, তাঁর নিজের আছে বল অর্থাৎ দৈহিক সামর্থ্য, অর্জুনের আছে (জয়ের জন্যে) জন্য যুদ্ধশিক্ষাকৌশল। অগ্নিত্রয় (দক্ষিণাগ্নি, গার্হপত্যাগ্নি ও আহবনীয়াগ্নি) যেমন যজ্ঞ সম্পাদন করেন, তেমনই আমরা মগধরাজ জরাসন্ধকে জয় করব। কৃষ্ণে নয়ো ময়ি বলং জয়ঃ পার্থে ধনঞ্জয়।মাগধং সাধয়িষ্যাম ইষ্টিং ত্রয় ইবাগ্নয়ঃ।।
কৃষ্ণ প্রত্যুত্তরে যুক্তি সাজালেন, বালকতুল্য মূর্খ জন পরিণাম না জেনেই কাজ শুরু করেন। সেই কারণে বুদ্ধিমান মানুষ স্বার্থপর অপরিণতবুদ্ধি মূর্খ জনকে তুচ্ছ মনে করেন। যেমন, যুবনাশ্বের পুত্র মান্ধাতা জয়ের যোগ্য শত্রুকে জয় করে, ভগীরথ প্রজাপালনহেতু, কার্ত্তবীর্য্যার্জুন তপস্যা করে, রাজা ভরত বল প্রয়োগ করে এবং মরুত্তরাজা সম্পদের বলে সম্রাট হয়েছিলেন। কৃষ্ণের বক্তব্য, এই পাঁচটি কারণবশত পাঁচ জন সম্রাট হয়েছিলেন। কিন্তু যুধিষ্ঠিরের সাম্রাজ্যকামনায় এই সমস্ত কারণগুলির সবগুলি আছে। যুধিষ্ঠিরের প্রতি কৃষ্ণের পরামর্শ—বৃহদ্রথের পুত্র জরাসন্ধ, ধর্ম (দানাদি ধর্মকার্য), অর্থ (আর্থিক ব্যবহার), নয় (নীতি), লক্ষণ অর্থাৎ লোকাচারের অযথার্থ প্রয়োগ করে চলেছেন তাই তাঁকে দমন করা প্রয়োজন। একশত বংশোদ্ভূত রাজারা তাঁকে (এই সব অযথার্থপ্রয়োগহেতু) অনুসরণ করেন না। তাই তিনি বলপূর্বক সাম্রাজ্য শাসন করছেন।অর্থশালী রাজারা জরাসন্ধকে পূজা করেন। তা সত্ত্বেও মূর্খতাহেতু দুর্নীতিবাজ তাঁকে তুষ্ট করা যায়নি। আমরা দেখেছি, প্রধান ব্যক্তিত্ব জরাসন্ধ, অভিষিক্ত রাজার (প্রদত্ত) কর স্বীকার না করে, বলপূর্বক কর আদায় করছেন। পৃথাপুত্রকে কৃষ্ণের প্রশ্ন— জরাসন্ধ, এইভাবে সব রাজাদের বশে এনেছেন। কিন্তু দুর্বলতর রাজা কীভাবে সেই জরাসন্ধকে প্রতিহত করবেন? জরাসন্ধ, পশুপতি মহাদেবের ঘরে পশুবলির জন্য রাজাদের স্নান করিয়ে রেখেছেন। রাজাদের কি আর প্রাণের মায়া থাকে? অস্ত্রাঘাতে ক্ষত্রিয়ের যদি মৃত্যু হয় তবে সেটি যথার্থ সম্মানের। কৃষ্ণ বললেন, আমরা সম্মিলিত হয়েও মগধরাজ জরাসন্ধকে হত্যা করতে পারছি না। ন চ স্ম মাগধং সর্ব্বে প্রতিবাধেম সঙ্গতাঃ। জরাসন্ধ, ইতিমধ্যে ছিয়াশি জন রাজাকে এনেছেন, বাকি আছেন চোদ্দ জন। তারপরেই তিনি, নিষ্ঠুর (একশত বলিদান) কাজটি শুরু করবেন। যিনি তাঁকে বাধা দিতে পারবেন তিনি উজ্জ্বল খ্যাতির অধিকারী হতে পারেন। যিনি জরাসন্ধকে জয় করতে সক্ষম, তিনি নিশ্চিতভাবে সম্রাট হতে পারেন।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৩: জরাসন্ধের ঔদ্ধত্য ও কৃষ্ণের ভূমিকা যুধিষ্ঠিরকৃত রাজসূয় যজ্ঞের প্রাসঙ্গিক সূচনা

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৫১: আকাশ এখনও মেঘলা

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৯ : চারুলতা: নাচে মুক্তি? নাচে বন্ধ?

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৪: ছোট নখরযুক্ত ভোঁদড়
সংশয়াতুর যুধিষ্ঠির প্রশ্ন তুললেন, সম্রাটের গুণযোগ্যতা লাভের ইচ্ছায় তিনি নিজে স্বার্থপর হয়ে উঠেছেন। কেবল সাহস সম্বল করে তোমাদের (ভীম, অর্জুনসহ কৃষ্ণকে) কীভাবে (জরাসন্ধের নিমিত্ত) পাঠাব? কথং প্রহিণুয়াং কৃষ্ণ! সোঽহং কেবলসাহসাৎ।। বলতে বলতে যুধিষ্ঠির যেন আবেগাপ্লুত হলেন, বললেন, ভীম ও অর্জুন আমার দুটি চক্ষু, হে জনার্দন, তুমি যে আমার মন। মন ও চক্ষু বিনা কেমন হবে আমার জীবন? ভীমার্জ্জুনাবুভৌ নেত্রে মনস্ত্বং মে জনার্দন!। মনশ্চক্ষুর্বিহীনস্য কীদৃশং জীবিতং ভবেৎ।। যুধিষ্ঠিরের আশঙ্কা— যুদ্ধে, জরাসন্ধের ভয়ানক পরাক্রমশালী অসংখ্য সৈন্যবলের বিরুদ্ধে যম পর্যন্ত বিজয়ী হতে পারেন না। সেখানে কৃষ্ণদের যত প্রচেষ্টা কি ফলপ্রসূ হতে পারে? যুধিষ্ঠিরের সিদ্ধান্ত হল, এই আরব্ধ বিষয়ে (রাজসূয় যজ্ঞে) অভীপ্সিত ফলের বিপরীত ফলের অর্থাৎ বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই, রাজসূয় যজ্ঞারম্ভ সঙ্গত নয় বলেই তিনি মনে করেন। তস্মান্ন প্রতিপত্তিস্ত কার্য্যা যুক্তা মতা মম। যুধিষ্ঠিরের বিবেচনায় এই কাজ সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করাই তাঁর ইচ্ছা। যুধিষ্ঠির মনে করেন, কৃষ্ণেরও সেই ইচ্ছাই হোক, রাজসূয়যজ্ঞ সম্পাদন অতি দুষ্কর কাজ, যা আমার মনটাকে আজ নিবৃত্ত করছে। প্রতিহন্তি মনো মেঽদ্য রাজসূয়ো দুরাহরঃ।
পার্থ অর্জুন ইতিমধ্যে পেয়ে গেছেন সর্বোত্তম ধনু, অক্ষয় অর্থাৎ সর্বদাই বাণপূর্ণ দুটি তূণ, রথ, ধ্বজ ও (ময়দানবনির্মিত) সভা, সেই কারণেই হয়তো অমিতবিক্রমে তিনি যুধিষ্ঠিকে বললেন, ধনুক, অস্ত্র, বাণসমূহ, শৌর্যপ্রকাশরূপ উৎসাহ, সহায় (কৃষ্ণ), ক্ষেত্ররূপ সবল দেহ, যশ ও বল, যা দুষ্প্রাপ্য হলেও, (সর্বদাই) প্রার্থিত, এই সবকিছু তিনি পেয়েছেন। সজ্জনসমাজে, বিদ্বজ্জনেরা সদ্বংশে জন্মলাভবিষয়টির প্রশংসা করে থাকেন। কিন্তু অর্জুনের কাছে সদ্বংশে জন্মলাভ, বলের তুল্য (গৌরবজনক) নয়। তাই অর্জুনের (একান্ত) পছন্দ হল শৌর্যপ্রকাশ। বলেন সদৃশং নাস্তি বীর্য্যন্তু মম রোচতে। অর্জুনের মতে, বলশালীদের প্রতিষ্ঠিত বংশে জন্মলাভ করে বীর্যহীন মানুষ কিই বা করতে পারবেন? পক্ষান্তরে শৌর্যহীনদের কুলে জাত, একজন বীর, বিশিষ্টতা অর্জন করতে পারেন। শত্রুজয়েই আছে ক্ষত্রিয়বৃত্তির যথার্থতা। গুণবিহীন হয়েও একজন বীর ক্ষত্রিয় শত্রুদের জয় করতে পারেন। একজন বীর্যহীন মানুষ সমস্ত গুণযুক্ত হয়ে কিই বা করতে পারেন? পরাক্রমের কাছে অন্য সব গুণরাশি গৌণ হয়ে যায়। মনঃসংযোগ, যুদ্ধ করা এবং দৈব, এই তিনটির মিলন, জয়ের হেতু হয়ে থাকে। বলবান হয়েও, প্রমাদবশত কেউ অনবধানতাহেতু বা মনঃসংযোগের অভাবহেতু জয়লাভেরর যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন না। আবার মনোযোগী দুর্বল শত্রুর দ্বারা সবল শত্রু ক্রমশ ক্ষয় প্রাপ্ত হয়। বলবানের অবসাদজনিত দৈন্য এবং তাঁর মোহ বা প্রমাদ হল অনবধানতা বা মনঃসংযোগের অভাব, এই দুটি বলবানের অনর্থের কারণ। জয়প্রার্থী রাজার এই দুটিই বর্জনীয়। অর্জুন তাঁর মূল বক্তব্যে ফিরে এলেন, তাঁরা যদি রাজসূয় যজ্ঞযজ্ঞের জন্যে জরাসন্ধের বিনাশ ও তাঁর দ্বারা আবদ্ধ রাজাদের মুক্ত করতে পারেন, তবে তার থেকে উত্তম আর কি হতে পারে? রাজা যুধিষ্ঠিরের অনুদ্যমের ফলে গুণের অভাব প্রমাণিত হবে। যুধিষ্ঠির সংশয়হীন গুণজনিত উৎকর্ষ হতে অপকর্ষকে শ্রেয় মনে করছেন কেন? শান্তিকামী মুনিদের গৈরিকবসন পরবর্তীকালে (রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠান ও সাম্রাজ্যলাভের পরে) সহজলভ্য হবে। অর্জুন তাঁর সিদ্ধান্ত জানালেন, সাম্রাজ্যলাভের সামর্থ্য যুধিষ্ঠিরের আছে। তাই, আমরা শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। সাম্রাজ্যন্তু ভবেচ্ছক্যং বয়ং যোৎস্যামহে পরান্।
পার্থ অর্জুন ইতিমধ্যে পেয়ে গেছেন সর্বোত্তম ধনু, অক্ষয় অর্থাৎ সর্বদাই বাণপূর্ণ দুটি তূণ, রথ, ধ্বজ ও (ময়দানবনির্মিত) সভা, সেই কারণেই হয়তো অমিতবিক্রমে তিনি যুধিষ্ঠিকে বললেন, ধনুক, অস্ত্র, বাণসমূহ, শৌর্যপ্রকাশরূপ উৎসাহ, সহায় (কৃষ্ণ), ক্ষেত্ররূপ সবল দেহ, যশ ও বল, যা দুষ্প্রাপ্য হলেও, (সর্বদাই) প্রার্থিত, এই সবকিছু তিনি পেয়েছেন। সজ্জনসমাজে, বিদ্বজ্জনেরা সদ্বংশে জন্মলাভবিষয়টির প্রশংসা করে থাকেন। কিন্তু অর্জুনের কাছে সদ্বংশে জন্মলাভ, বলের তুল্য (গৌরবজনক) নয়। তাই অর্জুনের (একান্ত) পছন্দ হল শৌর্যপ্রকাশ। বলেন সদৃশং নাস্তি বীর্য্যন্তু মম রোচতে। অর্জুনের মতে, বলশালীদের প্রতিষ্ঠিত বংশে জন্মলাভ করে বীর্যহীন মানুষ কিই বা করতে পারবেন? পক্ষান্তরে শৌর্যহীনদের কুলে জাত, একজন বীর, বিশিষ্টতা অর্জন করতে পারেন। শত্রুজয়েই আছে ক্ষত্রিয়বৃত্তির যথার্থতা। গুণবিহীন হয়েও একজন বীর ক্ষত্রিয় শত্রুদের জয় করতে পারেন। একজন বীর্যহীন মানুষ সমস্ত গুণযুক্ত হয়ে কিই বা করতে পারেন? পরাক্রমের কাছে অন্য সব গুণরাশি গৌণ হয়ে যায়। মনঃসংযোগ, যুদ্ধ করা এবং দৈব, এই তিনটির মিলন, জয়ের হেতু হয়ে থাকে। বলবান হয়েও, প্রমাদবশত কেউ অনবধানতাহেতু বা মনঃসংযোগের অভাবহেতু জয়লাভেরর যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন না। আবার মনোযোগী দুর্বল শত্রুর দ্বারা সবল শত্রু ক্রমশ ক্ষয় প্রাপ্ত হয়। বলবানের অবসাদজনিত দৈন্য এবং তাঁর মোহ বা প্রমাদ হল অনবধানতা বা মনঃসংযোগের অভাব, এই দুটি বলবানের অনর্থের কারণ। জয়প্রার্থী রাজার এই দুটিই বর্জনীয়। অর্জুন তাঁর মূল বক্তব্যে ফিরে এলেন, তাঁরা যদি রাজসূয় যজ্ঞযজ্ঞের জন্যে জরাসন্ধের বিনাশ ও তাঁর দ্বারা আবদ্ধ রাজাদের মুক্ত করতে পারেন, তবে তার থেকে উত্তম আর কি হতে পারে? রাজা যুধিষ্ঠিরের অনুদ্যমের ফলে গুণের অভাব প্রমাণিত হবে। যুধিষ্ঠির সংশয়হীন গুণজনিত উৎকর্ষ হতে অপকর্ষকে শ্রেয় মনে করছেন কেন? শান্তিকামী মুনিদের গৈরিকবসন পরবর্তীকালে (রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠান ও সাম্রাজ্যলাভের পরে) সহজলভ্য হবে। অর্জুন তাঁর সিদ্ধান্ত জানালেন, সাম্রাজ্যলাভের সামর্থ্য যুধিষ্ঠিরের আছে। তাই, আমরা শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। সাম্রাজ্যন্তু ভবেচ্ছক্যং বয়ং যোৎস্যামহে পরান্।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৮: অসম-মিজোরাম সীমান্তে ঘাড়মুড়ার নব আবিষ্কৃত ভাস্কর্যও সুপ্রাচীন

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৬: পরবাস প্রস্তুতি (দুই)
যুধিষ্ঠির রাজসূয়যজ্ঞানুষ্ঠানের যোগ্য অধিকারী কি না, এই বিষয়ে সংশয়াতুর যুধিষ্ঠিরের দ্বিধা দূর করে কৃষ্ণ অভয় দান করলেন রাজসূয়ং ত্বমর্হসি। আপনি রাজসূয় যজ্ঞ সম্পাদনের যোগ্য অধিকারী। কিন্তু বিপুল ব্যয়সাধ্য ও বিঘ্নসঙ্কুল এই বৃহৎ যজ্ঞ সম্পাদনের উদ্দেশ্য নিজের একচ্ছত্র আধিপত্যপ্রতিষ্ঠা ছাড়াও এই লক্ষ্যপূরণের আরও অনেক সদর্থক দিক আছে। পাণ্ডবদের শুভানুধ্যায়ী ও পরম শ্রদ্ধেয় কৃষ্ণের অভিমত—অত্যাচারী ও স্বৈরাচারী মগধরাজ জরাসন্ধের কবল থেকে গিরিব্রজে পুরুষমেধযজ্ঞে উৎসর্গের জন্যে অবরুদ্ধ রাজাদের মুক্তি ও জরাসন্ধবধ, এই দুই লক্ষ্যপূরণের উদ্দেশ্যে রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠান প্রয়োজন।
যুধিষ্ঠির কৃষ্ণের প্রতি পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করলেন, সংশয়ানাং সমুচ্ছেত্তা ত্বদন্যো বিদ্যতে ন মে। তুমি ছাড়া, সংশয়দূরকারী আর কেউ নেই। তবু রাজসূয়যাগ যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে পারবেন কি না, এই বিষয়ে যুধিষ্ঠির দ্বিধান্বিত। এমন নিজের প্রিয়সাধনকারী অনেক রাজা আছেন কিন্তু তাঁরা সাম্রাজ্য লাভ করেননি কারণ সম্রাটপদটি কষ্ট করে লাভ করা সম্ভব।অর্থাৎ একচ্ছত্র আধিপত্যবিস্তারের মাধ্যমে সাম্রাজ্যলাভ কষ্টকর। ছোট গণ্ডি হতে যে কোন বৃহতে উত্তরণ কষ্টসাধ্যই বটে। সাম্রাজ্যশব্দের যে অনেক বৃহৎ ব্যাপ্তি রয়েছে। যুধিষ্ঠিরের পরবর্তী যুক্তি হল, অপরের প্রভাব সম্পর্কে অবহিত হলে কোন মানুষ কখনও নিজের প্রশংসা করতে পারেন না। অপরকে ছোট না করে তাঁর প্রভাবপ্রতিপত্তিসম্বন্ধে ধারণা থাকলে মানুষ কখনও আত্মপ্রশংসা করতে পারেন না। আত্মপ্রশংসা একটি তৃপ্তিবোধের জন্ম দেয়।অপরের প্রভাবসম্বন্ধে সম্যক ধারণা সেই মানুষটিকে আত্মতৃপ্তির নিষ্ক্রিয়তা হতে মুক্ত করে।অপরের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে প্রশংসিত হওয়াতে আছে যথার্থ সম্মান। যুদ্ধের প্রেক্ষিতে নয় জীবনযুদ্ধেও অপরের প্রভাব জেনে, তাঁদের যোগ্যতা সম্বন্ধে যথাযথ অবহিত হওয়া প্রয়োজন। সম্মিলিত জয়লাভেই আছে প্রশংসনীয় সম্মানলাভ। সমবেত-ঐক্য প্রশংসিত হয় সবক্ষেত্রে সর্বত্র, এ যে চরম সত্য। যুধিষ্ঠিরের মতে, শান্তির পথ আশ্রয়যোগ্য,এই মহান পথ অবলম্বনের সমর্থনে আছে আধুনিকতা, বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক বাতাবরণে আছ এর প্রাসঙ্গিকতা।
যুধিষ্ঠির কৃষ্ণের প্রতি পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করলেন, সংশয়ানাং সমুচ্ছেত্তা ত্বদন্যো বিদ্যতে ন মে। তুমি ছাড়া, সংশয়দূরকারী আর কেউ নেই। তবু রাজসূয়যাগ যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে পারবেন কি না, এই বিষয়ে যুধিষ্ঠির দ্বিধান্বিত। এমন নিজের প্রিয়সাধনকারী অনেক রাজা আছেন কিন্তু তাঁরা সাম্রাজ্য লাভ করেননি কারণ সম্রাটপদটি কষ্ট করে লাভ করা সম্ভব।অর্থাৎ একচ্ছত্র আধিপত্যবিস্তারের মাধ্যমে সাম্রাজ্যলাভ কষ্টকর। ছোট গণ্ডি হতে যে কোন বৃহতে উত্তরণ কষ্টসাধ্যই বটে। সাম্রাজ্যশব্দের যে অনেক বৃহৎ ব্যাপ্তি রয়েছে। যুধিষ্ঠিরের পরবর্তী যুক্তি হল, অপরের প্রভাব সম্পর্কে অবহিত হলে কোন মানুষ কখনও নিজের প্রশংসা করতে পারেন না। অপরকে ছোট না করে তাঁর প্রভাবপ্রতিপত্তিসম্বন্ধে ধারণা থাকলে মানুষ কখনও আত্মপ্রশংসা করতে পারেন না। আত্মপ্রশংসা একটি তৃপ্তিবোধের জন্ম দেয়।অপরের প্রভাবসম্বন্ধে সম্যক ধারণা সেই মানুষটিকে আত্মতৃপ্তির নিষ্ক্রিয়তা হতে মুক্ত করে।অপরের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে প্রশংসিত হওয়াতে আছে যথার্থ সম্মান। যুদ্ধের প্রেক্ষিতে নয় জীবনযুদ্ধেও অপরের প্রভাব জেনে, তাঁদের যোগ্যতা সম্বন্ধে যথাযথ অবহিত হওয়া প্রয়োজন। সম্মিলিত জয়লাভেই আছে প্রশংসনীয় সম্মানলাভ। সমবেত-ঐক্য প্রশংসিত হয় সবক্ষেত্রে সর্বত্র, এ যে চরম সত্য। যুধিষ্ঠিরের মতে, শান্তির পথ আশ্রয়যোগ্য,এই মহান পথ অবলম্বনের সমর্থনে আছে আধুনিকতা, বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক বাতাবরণে আছ এর প্রাসঙ্গিকতা।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, অসমের আলো অন্ধকার, পর্ব-৬৩: বরাকের ভট্ট সঙ্গীত এবং বারমোসী গান

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৮: অপারেশন হেলথ সেন্টার
যে কেউ শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে পারেন, যুধিষ্ঠিরকথিত মনস্বীগণের এই মতটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। অযোগ্যদের শ্রেষ্ঠত্বলাভ হয়তো ভাগ্যনির্ভর। সেই সৌভাগ্যবান পাণ্ডবরা নন।ভাগ্য এ পর্যন্ত তাঁদের সহায় হয়নি কোনদিন। যুধিষ্ঠিরের অভিমত হয়তো, সম্রাটপদ লাভ করবার জন্যে শ্রেষ্ঠত্বলাভ না করলেও বিষাদের কিছু নেই।
ভীমসেন যুধিষ্ঠিরের এই নিরুৎসাহের পরিপন্থী। তাঁর মতে, অনুদ্যম ও সাম, দান, দণ্ড, ভেদ এই চারটি উপায়বিহীন রাজার শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা নিষ্ফল। যুধিষ্ঠিরের উদ্যমহীনতায় হয়তো তাঁর সমর্থন ছিলনা। প্রবল প্রতাপান্বিত জরাসন্ধের বিরুদ্ধে যুধিষ্ঠিরের এই উদ্যমহীনতা হয়তো তাঁর অভিপ্সীত নয়। সুষ্ঠু নীতিপ্রয়োগের মাধ্যমে দুর্বল প্রবলকে জয় করতে সমর্থ হন। জীবনের সবক্ষেত্রেই হয়তো ভীমসেনের এই বক্তব্যের যৌক্তিকতা আছে। তিনি হয়তো প্রকারান্তরে সামাদি-উপায় অবলম্বনের সপক্ষে বলতে চেয়েছেন। তিনি সদর্থক বার্তা দিয়েছেন। কৃষ্ণের আছে সার্বিকভাবে সামাদিনীতিপ্রয়োগের কৌশল, ভীমসেন দৈহিকশক্তির প্রয়োগহেতু এবং অর্জুন যুদ্ধকৌশলের দরুণ দণ্ডের প্রতিভূ। নীতিপ্রয়োগের কৌশলে অনেক যুদ্ধ জয় করা সম্ভব। যুধিষ্ঠির সাম অর্থাৎ সামনীতিতে তাঁর আস্থা প্রকাশিত হয়েছে। ভীমসেনের বক্তব্যে সাম, দণ্ড এবং সার্বিকভাবে সাম, দান, দণ্ড, ভেদ এই উপায়চতুষ্টয় অবলম্বনের ছায়া দেখা যায়। আরম্ভঃ পরমো হ্যেষ ন প্রাপ্য ইতি মে মতিঃ।
রাজসূয় যজ্ঞারম্ভ করলেও আমি শেষ করতে পারব না, এটাই আমার মত—যুধিষ্ঠিরের এই নতিস্বীকারমূলক বার্তার বিপক্ষে যুক্তির অবতারণা করেছেন ভীম। আত্মপ্রত্যয়ী ভীম, যুদ্ধজয়ের সপক্ষে দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেছেন, মাগধং সাধয়িষ্যামঃ আমরা মগধরাজকে জয় করবই। তাঁর বক্তব্যে প্রচ্ছন্ন রয়েছে এই বার্তা, পরিকল্পিত যে কোনও যুদ্ধ জয় করা সম্ভব।
ভীমসেন যুধিষ্ঠিরের এই নিরুৎসাহের পরিপন্থী। তাঁর মতে, অনুদ্যম ও সাম, দান, দণ্ড, ভেদ এই চারটি উপায়বিহীন রাজার শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা নিষ্ফল। যুধিষ্ঠিরের উদ্যমহীনতায় হয়তো তাঁর সমর্থন ছিলনা। প্রবল প্রতাপান্বিত জরাসন্ধের বিরুদ্ধে যুধিষ্ঠিরের এই উদ্যমহীনতা হয়তো তাঁর অভিপ্সীত নয়। সুষ্ঠু নীতিপ্রয়োগের মাধ্যমে দুর্বল প্রবলকে জয় করতে সমর্থ হন। জীবনের সবক্ষেত্রেই হয়তো ভীমসেনের এই বক্তব্যের যৌক্তিকতা আছে। তিনি হয়তো প্রকারান্তরে সামাদি-উপায় অবলম্বনের সপক্ষে বলতে চেয়েছেন। তিনি সদর্থক বার্তা দিয়েছেন। কৃষ্ণের আছে সার্বিকভাবে সামাদিনীতিপ্রয়োগের কৌশল, ভীমসেন দৈহিকশক্তির প্রয়োগহেতু এবং অর্জুন যুদ্ধকৌশলের দরুণ দণ্ডের প্রতিভূ। নীতিপ্রয়োগের কৌশলে অনেক যুদ্ধ জয় করা সম্ভব। যুধিষ্ঠির সাম অর্থাৎ সামনীতিতে তাঁর আস্থা প্রকাশিত হয়েছে। ভীমসেনের বক্তব্যে সাম, দণ্ড এবং সার্বিকভাবে সাম, দান, দণ্ড, ভেদ এই উপায়চতুষ্টয় অবলম্বনের ছায়া দেখা যায়। আরম্ভঃ পরমো হ্যেষ ন প্রাপ্য ইতি মে মতিঃ।
রাজসূয় যজ্ঞারম্ভ করলেও আমি শেষ করতে পারব না, এটাই আমার মত—যুধিষ্ঠিরের এই নতিস্বীকারমূলক বার্তার বিপক্ষে যুক্তির অবতারণা করেছেন ভীম। আত্মপ্রত্যয়ী ভীম, যুদ্ধজয়ের সপক্ষে দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেছেন, মাগধং সাধয়িষ্যামঃ আমরা মগধরাজকে জয় করবই। তাঁর বক্তব্যে প্রচ্ছন্ন রয়েছে এই বার্তা, পরিকল্পিত যে কোনও যুদ্ধ জয় করা সম্ভব।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৯ : উত্তরমেঘ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৭: এক উটকো লোকের কথায় ভুলে রবীন্দ্রনাথ-মৃণালিনীকে দিতে হয়েছিল খেসারত
কৃষ্ণের ভাষণে রয়েছে রাজনৈতিক চিন্তার প্রতিফলন। স্বার্থান্বেষী বুদ্ধিমান মানুষ, দুর্বলদের অপরিণামদর্শিতার সুযোগ নেয়। তাঁরা দুর্বলদের গ্রাহ্য করে না। কৃষ্ণ হয়তো নিরুচ্চারে দুর্বল বিরোধীদের হেয়প্রতিপন্নকারী জরাসন্ধের ধ্বংসাত্মক পরিণামসম্বন্ধে অবহিত করতে চেয়েছেন। এই অসমযুদ্ধজয় হয়তো সম্ভব। এই রাজনীতির পাঠ,বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক আবহে, মনে হয় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
দুর্দমনীয় শত্রুকে জয়ের গুণাবলির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেন কৃষ্ণ। শত্রুজয়হেতু, প্রজাপালনের জন্য, তপস্যার ফলে আত্মশক্তি-উদ্বোধনের কারণে, বলপ্রয়োগ করে, সম্পদের মাধ্যমে প্রখ্যাত রাজারা সম্রাট হয়েছিলেন। সম্রাটপদাভিলাষী যুধিষ্ঠিরের এই পাঁচটিই অধিগত আছে। তাই দুর্বিনীত জরাসন্ধ যিনি অর্থের দ্বারা তুষ্ট নন,করগ্রহণ করেও করদাতার প্রতি নির্মম হয়ে অন্যান্য সদ্বংসজাত রাজাদের কাছে অনুকরণীয় কোনও দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেননি, এই নিষ্ঠুর রাজাকে দুর্বল রাজাদের আক্রমণ দুঃসাধ্য মনে হয়। জরাসন্ধের কাছে হার স্বীকার করেছে কৃষ্ণের বংশের সম্মিলিত শক্তির। জরাসন্ধের অনুগত রাজারাও তাঁর হাত থেকে রেহাই পাননি, তাঁরা ভয়ঙ্কর মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। বস্তুত মানবতাবিরোধী যে কোন ঘৃণ্য পদক্ষেপের প্রতিরোধে যিনি সক্ষম তিনিই মহান কীর্তির অধিকারী হন। সর্বাধিনায়কত্ব তাঁর, রাজচ্ছত্র তাঁর অধিগত হয়, অক্ষয়কীর্তির গৌরবলাভ যে সম্রাট শিরোপালাভের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে আছে। ইতিহাসে এই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বিরল নয়।
দুর্দমনীয় শত্রুকে জয়ের গুণাবলির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেন কৃষ্ণ। শত্রুজয়হেতু, প্রজাপালনের জন্য, তপস্যার ফলে আত্মশক্তি-উদ্বোধনের কারণে, বলপ্রয়োগ করে, সম্পদের মাধ্যমে প্রখ্যাত রাজারা সম্রাট হয়েছিলেন। সম্রাটপদাভিলাষী যুধিষ্ঠিরের এই পাঁচটিই অধিগত আছে। তাই দুর্বিনীত জরাসন্ধ যিনি অর্থের দ্বারা তুষ্ট নন,করগ্রহণ করেও করদাতার প্রতি নির্মম হয়ে অন্যান্য সদ্বংসজাত রাজাদের কাছে অনুকরণীয় কোনও দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেননি, এই নিষ্ঠুর রাজাকে দুর্বল রাজাদের আক্রমণ দুঃসাধ্য মনে হয়। জরাসন্ধের কাছে হার স্বীকার করেছে কৃষ্ণের বংশের সম্মিলিত শক্তির। জরাসন্ধের অনুগত রাজারাও তাঁর হাত থেকে রেহাই পাননি, তাঁরা ভয়ঙ্কর মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। বস্তুত মানবতাবিরোধী যে কোন ঘৃণ্য পদক্ষেপের প্রতিরোধে যিনি সক্ষম তিনিই মহান কীর্তির অধিকারী হন। সর্বাধিনায়কত্ব তাঁর, রাজচ্ছত্র তাঁর অধিগত হয়, অক্ষয়কীর্তির গৌরবলাভ যে সম্রাট শিরোপালাভের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে আছে। ইতিহাসে এই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বিরল নয়।

ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
উদারমনা মহান ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির সাম্রাজ্যলিপ্সার বশবর্তী হয়ে স্বার্থপরের মতো, তাঁর নয়নমণি দুই ভাই ও প্রাণপ্রিয় কৃষ্ণকে জরাসন্ধের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানে পাঠাতে নারাজ। জরাসন্ধের সৈন্যবল, যমের সঙ্গে সংঘাতেও তিনি অপ্রতিরোধ্য। তাই যুধিষ্ঠির আরব্ধ রাজসূয়যজ্ঞের আয়োজন করতে ইচ্ছুক নন। কৃষ্ণ ঘোষণা করলেন, তিনিও যুধিষ্ঠিরের সহমতাবলম্বী। বিরোধিতা করলেন তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন। শ্রেষ্ঠ অস্ত্রসম্ভারের অধিকারী, তাঁর আছে উৎসাহসূচক শৌর্য, সহায় আছেন কৃষ্ণ, দৈহিক সামর্থ্য, যশ ও বলের অধিকারী অর্জুনের আত্মবিশ্বাস যেন আকাশছোঁয়া। যুদ্ধবিদ্যাবিদ অর্জুনের কাছে সদ্বংশে জন্মের তুলনায় শারীরিক শক্তির গরিমা অনেক বেশি। তাই তাঁর নীতি হল বলপ্রয়োগের নীতি। ক্ষত্রিয়ের জীবনের একটিমাত্র লক্ষ্য হল শত্রুজয়। তাঁর মতে অন্য সব অধিগত গুণ তুচ্ছ। অর্জুন বলেছেন, তিনটি শর্ত জয় নির্ধারণ করে তাদের মধ্যে অন্যতম হল মনঃসংযোগ। যিনি প্রথম লক্ষ্যভেদের পরীক্ষায় গুরুর কাছে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছিলেন মনোযোগের কারণে, যিনি স্বয়ংবর সভায় একাগ্রচিত্তে লক্ষ্য ভেদ করে দ্রৌপদীকে লাভ করেছিলেন তাঁর মুখে এ কথাই শোভা পায় বৈকি।
জীবনের সাফল্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে মনঃসংযোগের অতলস্পর্শী গভীরতায়, এ সত্য বার বার প্রমাণিত হয়। অর্জুনের পরবর্তী যুক্তিটিও তাকেই মানায়। অবসাদজনিতদীনতা এবং মোহ বা প্রমাদ অর্থাৎ উদ্দিষ্ট বিষয়সম্বন্ধে অনবধানতাজনিত ভ্রান্তি, এই দুটি জয়লাভের প্রতিবন্ধক। তাই এগুলি পরিত্যাজ্য। যুদ্ধজয়ের ক্ষেত্রে শুধু নয়, আধুনিক প্রতিযোগিতামূলক জীবনযুদ্ধে, মানসিক-অবসাদ ও প্রমাদ বা একাগ্রতার অভাবে অনবধানতাবশত লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া, যে কোনও সাফল্যের অন্তরায়, এ কথা হয়তো অবশ্যস্বীকার্য।
রাজসূয় যজ্ঞারম্ভকে কেন্দ্র করে মত বিনিময়ের মধ্যে যে তত্ত্বকথার সূচনা হল তার মধ্যে লুকিয়ে আছে রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার নানা রসদ। একটি মহান বিরাট উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত নানা সাধারণ থেকে অসাধারণ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। এ সবই মহাভারতের মহাকাব্যিক বিস্তার নয় কী?—চলবে।
জীবনের সাফল্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে মনঃসংযোগের অতলস্পর্শী গভীরতায়, এ সত্য বার বার প্রমাণিত হয়। অর্জুনের পরবর্তী যুক্তিটিও তাকেই মানায়। অবসাদজনিতদীনতা এবং মোহ বা প্রমাদ অর্থাৎ উদ্দিষ্ট বিষয়সম্বন্ধে অনবধানতাজনিত ভ্রান্তি, এই দুটি জয়লাভের প্রতিবন্ধক। তাই এগুলি পরিত্যাজ্য। যুদ্ধজয়ের ক্ষেত্রে শুধু নয়, আধুনিক প্রতিযোগিতামূলক জীবনযুদ্ধে, মানসিক-অবসাদ ও প্রমাদ বা একাগ্রতার অভাবে অনবধানতাবশত লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া, যে কোনও সাফল্যের অন্তরায়, এ কথা হয়তো অবশ্যস্বীকার্য।
রাজসূয় যজ্ঞারম্ভকে কেন্দ্র করে মত বিনিময়ের মধ্যে যে তত্ত্বকথার সূচনা হল তার মধ্যে লুকিয়ে আছে রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার নানা রসদ। একটি মহান বিরাট উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত নানা সাধারণ থেকে অসাধারণ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। এ সবই মহাভারতের মহাকাব্যিক বিস্তার নয় কী?—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।


















