রবিবার ৮ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।

রাজা দুষ্মন্ত, পত্নীর স্বাধিকার ও বিবাহপূর্ব শর্তানুযায়ী পুত্রের উত্তরাধিকারের দাবি নিয়ে, সভায় উপস্থিত হলেন। রাজা দুষ্মন্ত, বিস্মরণের ভান করে ঘৃণাভরে আশ্রমকন্যার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। শকুন্তলার পিতা বিশ্বামিত্র ও মাতা মেনকার প্রসঙ্গ উত্থাপন করে, অপমানজনক মন্তব্য করে শকুন্তলাকে হেয় করতে তাঁর কণ্ঠ একটুও কেঁপে উঠল না। শকুন্তলার সমস্ত বক্তব্যের অপব্যাখ্যা করে তাঁকে হেয় করতে, এক মুহূর্তের জন্যেও তাঁর মনে কোন দ্বিধা নেই। এরপরেও দীর্ঘাকৃতি পুত্রের অতিকায় দেহসৌষ্ঠবের সৌন্দর্যসম্বন্ধে বিরূপ মন্তব্য করতেও পিছুপা হলেন না। শেষে শকুন্তলা যেহেতু অপ্সরা মেনকার কন্যা, তাই রাজা তাঁর মাতৃনিন্দায় সোচ্চার হলেন। তাঁর মতে, অপ্সরা মেনকা শকুন্তলার পিতা ব্রহ্মর্ষি বিশ্বামিত্রের তপস্যায় বিঘ্ন ঘটাবার উদ্দেশ্যে পৃথিবীতে এসেছিলেন।

বিশ্বামিত্র ও মেনকার মিলনের ফলে শকুন্তলার জন্ম। তাই শকুন্তলার মা,মেনকা একজন স্বেচ্ছাচারিণী কামার্তা বারবণিতা, তাই বারবণিতার কন্যা মায়ের বেশ্যাবৃত্তি বেছে নিয়েছেন। কারণ তিনি সেই চাতুর্যের পথ অবলম্বন করে, মায়ের কণ্ঠেই যেন কথা বলছেন। সুনিকৃষ্টা চ তে যোনিঃ পুংশ্চলীব প্রভাষসে। যদৃচ্ছয়া কামরাগাজ্জাতা মেনকয়া হ্যসি।। শকুন্তলার ভিত্তিহীন দাবির কোন সাক্ষাৎ প্রমাণ নেই, রাজা তাঁকে চেনেন না, তাঁর চলে যাওয়াই ভালো। এই চরম অপমান সহ্য করতে পারলেন না শকুন্তলা। মহর্ষি কণ্বের আশ্রমবাসিনী পালিতা কন্যার সমস্ত সংযমের বাঁধ ভেঙ্গে গেল। ক্রোধে আত্মহারা হয়ে শকুন্তলা, দুষ্মন্তকে বললেন, আপনি সর্ষের মাপের ছিদ্রগুলি যেমন দেখছেন নিজের বিল্বসদৃশ ছিদ্রগুলি দেখেও যেন দেখছেন না। রাজন্! সর্ষপমাত্রাণি পরচ্ছিদ্রাণি পশ্যসি। আত্মনো বিল্বমাত্রাণি পশ্যন্নপি ন পশ্যসি।।

স্বর্গের অপ্সরা, মেনকা দেবতাদের মতোই সম্মানীয়া। এমন কি দেবগণ পর্যন্ত তাঁর থেকে পিছিয়ে আছেন। তাই তুলনায় রাজার (লৌকিক) জন্ম অপেক্ষা শকুন্তলার জন্ম (দৈবোৎপত্তিহেতু) উত্তম। শকুন্তলার যুক্তি হল, রাজা ও তাঁর নিজের বিচরণক্ষেত্রে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। রাজার চারণভূমি এই পৃথিবী, শকুন্তলার স্থান অন্তরীক্ষেও। উভয়ের মধ্যে, শকুন্তলার স্থান সুমেরুতুল্য এবং রাজার সর্ষেসদৃশ উভয়ের মধ্যে বিরাট ব্যবধান। সুরেন্দ্র, কুবের, যম, বরুণ প্রত্যেক দেবগৃহে শকুন্তলার অবাধ গতি, এতটাই প্রভাব তাঁর। বিদ্বেষবশতঃ নয়, শুধু রাজার অবগতির জন্যে, শকুন্তলা, ক্ষমার যোগ্য একটি সত্য কথা বলতে, ইচ্ছুক। নিদর্শনার্থং ন দ্বেষাচ্ছ্রুত্বা ত্বং ক্ষন্তুমর্হসি।
শকুন্তলা বক্তব্য শুরু করলেন। বিরূপ অর্থাৎ বিকৃতরূপ ব্যক্তি যতক্ষণ না নিজের মুখখানি দর্পণে দেখছেন ততক্ষণ তিনি নিজেকে অপরের থেকে অধিক রূপবান মনে করেন। যখন নিজের বিকৃতমুখটি দর্পণে দেখেন তখন নিজের রূপ এবং অপরের রূপসম্বন্ধে (উভয়ের রূপের বিভেদবিষয়ে) অবগত হন। যাঁরা রূপবান তাঁরা কাউকে অসম্মান করেন না। যিনি কটুভাষী তিনি অতিরিক্ত কথা বলে পরপীড়ক অর্থাৎ অত্যাচারী নিন্দুক প্রতিপন্ন হন। যে পুরুষ শুভ ও অশুভ কথা বলতে থাকেন, মূর্খ ব্যক্তি, তাঁর বচন শুনে, অশুভ কথাই গ্রহণ করে থাকেন, যেমন শূকর শুধু বিষ্ঠাই গ্রহণ করে ঠিক তেমন। ব্যক্তির ভালমন্দ কথা শুনে, হংস যেমন জল হতে (মিশ্রিত থাকলেও) দুধটাই গ্রহণ করে, প্রাজ্ঞ ব্যক্তি তেমনই ভালোটাই গ্রহণ করেন। সজ্জন, অন্যের নিন্দা করে পরিতাপ করেন, দুর্জন কিন্তু অন্যের নিন্দা করে সন্তুষ্ট হন।

সৎপুরুষগণ বৃদ্ধদের সম্মান প্রদর্শন করে সুখী হন, তেমনই মূঢ় ব্যক্তি সজ্জনদের প্রতি আক্রোশ প্রকাশ করে সুখী হন। যাঁরা অপরের দোষ জেনেও পরে সমালোচনা করেন না, তাঁরাই সুখী হন। অপরের (উত্তমের) দ্বারা নিন্দনীয় (দুর্জন) মানুষ, নিন্দিত হয়ে, অপরের (সজ্জনের) নিন্দায় মুখর হয়ে ওঠেন। পৃথিবীতে এর থেকে হাস্যকর কিছু হতে পারে না, যখন স্বয়ং দুর্জন হয়েও দুষ্ট ব্যক্তি সজ্জনকেও দুর্জন মনে করে থাকেন। সত্যধর্মবিচ্যুত ক্রুদ্ধ সর্পতুল্যমানুষবিষয়ে অনাস্তিক পুরুষ পর্যন্ত উদ্বেগ বোধ করেন, আস্তিকের কথা আর কিই বা বলার আছে।নিজের তুল্য পুত্রের জন্মদাতা হয়ে যিনি তাকে অনাদর করেন,দেবতারা তাঁর ধনসম্পদ বিনষ্ট করেন, শুভ লোকে তাঁদের স্থান হয় না।
আরও পড়ুন:

পর্ব-৩৭: বানরেন্দ্র-জাতক: শক্তি না বুদ্ধি?

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৫: পাতি গাঙচিল

পৃথিবীর সর্বোচ্চ একক আর্চ ব্রিজের নির্মাণে বিনয়ী এক অধ্যাপিকা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩০: চুপি-চুপি আসে

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৮: স্ত্রী সীতার ব্যক্তিত্বের প্রভায় রামচন্দ্রের আলোকিত উত্তরণ সম্ভব হয়েছে কি?

শকুন্তলার মতে, পিতৃপুরুষগণ বলে থাকেন, কুল ও বংশের প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ আশ্রয়স্থান হল পুত্র। সবধর্মের রক্ষক, পুত্র। সেইহেতু পুত্রকে ত্যাগ করা উচিত নয়। ধর্মশাস্ত্রকার মনু বলেছেন,স্বপত্নীর গর্ভজাত বা অন্য কোনও নারীর গর্ভজাত,সব মিলিয়ে পুত্র পাঁচ প্রকার—নিজের ঔরসে স্বপত্নীর গর্ভজাত, লব্ধ, ক্রীত, পালিত এবং কৃতপুত্র (উপনয়নাদিসংস্কারদ্বারা গৃহীত পুত্রিকাপুত্র)। ধর্ম ও কীর্তির স্রষ্টা, পুত্র। সে, মানুষের মনের আনন্দের উৎস। পুত্র হল, পিতৃপুরুষদের ধর্মের ভেলা, নরক হতে পরিত্রাণের উপায়। হে নরব্যাঘ্র, পৃথিবীর অধীশ্বর, নিজের সত্য ও ধর্মের প্রতিপালকরূপে সেই পুত্রকে, আপনি পরিত্যাগ করতে পারেন না। হে নরশ্রেষ্ঠ,আপনি এই কপটাচারণের ভার বহন করতে অক্ষম স ত্বং নৃপতিশার্দ্দূল! ন পুত্রং ত্যক্তুমর্হসি। আত্মানঃ সত্যধর্ম্মৌ চ পালয়ন্ পৃথিবীপতে!। নরেন্দ্রসিংহ!কপটং ন বোঢ়ুং ত্বমিহার্হসি।।

শতকূপখনন অপেক্ষা (গৌরবলাভ অপেক্ষা) একটি বৃহৎ জলাশয়খনন ভাল, শত বৃহৎ জলাশয় হতে একটি যজ্ঞ শ্রেয়, শত যজ্ঞ অপেক্ষা একটি পুত্রের জন্মদান শ্রেষ্ঠ, শতপুত্রের জন্মদান অপেক্ষা সত্য শ্রেষ্ঠ। পরিমাপ করবার তুলাযন্ত্র যদি একদিকে শত সংখ্যক অশ্বমেধ যজ্ঞ এবং অপরদিকে সত্যকে ধারণ করে। তবে সহস্র অশ্বমেধ যজ্ঞ থেকেও সত্য বিশিষ্ট হয়ে ওঠে অর্থাৎ সত্যের আধিক্য ধার্য্য হয়। কণ্বের পালিতা কন্যা সত্যবচনের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত করবার জন্যে বললেন, (তুল্যমূল্যবিচারে) সর্ববেদবিদ্যাহরণ, সব তীর্থে অবগাহনজনিত পুণ্যফল এবং সত্যবচন এই তিনটি সমান হতে পারে, বা (সত্যের গুরুত্বের আধিক্যহেতু) অসমানও হতে পারে। সত্যতুল্য ধর্ম নেই, সত্য হতে শ্রেষ্ঠ কিছুই নেই। মিথ্যা হতে তীব্রতর অর্থাৎ ভয়ঙ্কর ইহলোকে কিছুই নেই। নাস্তি সত্যসমো ধর্ম্মো ন সত্যাদ্বিদ্যতে পরম্।ন হি তীব্রতরং কিঞ্চিদনৃতাদিহ বিদ্যতে।।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯০: শত্রুকে হারাতে সব সময় অস্ত্র নয়, ছলনারও আশ্রয় নিতে হয়

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৩: রাজা গোবিন্দমাণিক্য চেয়েছিলেন ঘরে ঘরে পুরাণ পুঁথির প্রচার হোক

সত্যই পরম ব্রহ্ম, সত্যই শ্রেষ্ঠ সদাচার হে রাজন, আপনি সদাচার ত্যাগ করতে পারেন না।সত্যের সঙ্গে মিত্রতা আপনাকে মানায়। মা ত্যাক্ষীঃ সময়ং রাজন্! সত্যং সঙ্গতমস্তু তে। রাজা যদি মিথ্যাচরণে আসক্ত হন, (শকুন্তলার কথায়) তাঁর শ্রদ্ধাবোধ না থাকে,তাহলে শকুন্তলা স্বয়ং প্রস্থান করবেন,রাজার মতো মানুষের সঙ্গে তাঁর মিলন সম্ভব নয়। পরিশেষে শকুন্তলা ঘোষণা করলেন, ঋতেঽপি ত্বাঞ্চ দুষ্মন্ত! শৈলরাজাবতংসিকাম্। চতুরন্তামিমামুর্বীং পুত্রো মে পালয়িষ্যতি।। হে দুষ্মন্ত, আপনাকে ছাড়াই হিমালয় শিরোভূষণ বিশিষ্ট চার সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত পৃথিবী পালন করবে আমার পুত্র।

রাজার বোধোদয়ের উদ্দেশ্যে শকুন্তলা কথাগুলি বলে প্রস্থান করলেন। ঋত্বিক্, পুরোহিত, আচার্য, মন্ত্রিবৃন্দপরিবৃত দুষ্মন্তকে লক্ষ্য করে, একটি অশরীরী বাণী ধ্বনিত হল—মা হলেন চর্মকোশমাত্র (পুত্রকে ধারণ করেন বলে), পুত্র শুধু পিতার। যেহেতু পুত্রের মধ্যে, পিতাই জন্ম নিয়ে থাকেন।তাই রাজা পুত্রটিকে পরিপালন করুন। নরেন্দ্র দুষ্মন্ত যেন,শকুন্তলার অবমাননা না করেন। ভরস্ব পুত্রং দুষ্মন্ত! মাবসংস্থাঃ শকুন্তলাম্। কারণ, সন্তানোৎপাদনের কারণে শুক্রাণু ধারণ করে, পুত্র,যমালয় হতে পিতাকে উদ্ধার করে।সেই অন্তরীক্ষ হতে উচ্চারিত অলৌকিক বাণীতে আরও ঘোষিত হল— ত্বঞ্চাস্য ধাতা গর্ভস্য সত্যমাহ শকুন্তলা। জায়া জনয়তে পুত্রমাত্মনোঽঙ্গং দ্বিধা কৃতম্।।

শকুন্তলা সত্য বলেছেন, তুমিই পুত্রটির জন্মদাতা পিতা। নিজের অঙ্গ দুই ভাগে ভাগ করে,জায়া পুত্রের জন্ম দিয়ে থাকেন। সেই কারণেই শকুন্তলার পুত্রটিকে প্রতিপালন করা কর্তব্য। পুত্রকে পরিত্যাগ করে পিতার বেঁচে থাকা, অকল্যাণকর। হে পৌরব, শকুন্তলার পুত্রটি যে দুষ্মন্তেরও, তাই মহান পুত্রটির ভরণপোষণের দায়িত্ব রাজা দুষ্মন্তের। যেহেতু আমাদের নির্দেশানুসারে তোমার এই পুত্রটির ভরণপোষণের দায়িত্ব ন্যস্ত হল,তাই তোমার এই পুত্রের নাম হোক ভরত। ভর্ত্তব্যোঽয়ং ত্বয়া যস্মাদস্মাকং বচনাদপি। তস্মাদ্ভবত্বয়ং নাম্না ভরতো নাম তে সুতঃ।। দেববচনানুসারে পুরুবংশীয় রাজা দুষ্মন্ত, সন্তুষ্টচিত্তে সমবেত পুরোহিত এবং অমাত্যদের বললেন, শৃণ্বন্ত্বেতদ্ভবন্তো২স্য দেবদূতস্য ভাষিতম্। অহঞ্চাপ্যেবমেবৈনং জানামি স্বয়মাত্মজম্।। আপনারা,দেবদূতের এই বাণী শুনুন। আমিও একে নিজ পুত্র বলেই জানি। যদ্যহং বচনাদস্যা গৃহ্নীয়ামিমমাত্মজম্। ভবেদ্ধি শঙ্কা লোকস্য নৈব শুদ্ধো ভবেদয়ম্। যদি শকুন্তলার অনুরোধে পুত্রটিকে নিজ পুত্র বলে গ্রহণ করতাম তাহলে মানুষের মনে, এর পবিত্রতাবিষয়ে, সন্দেহ সৃষ্টি হোত, এটি রাজার ঔরসজাত পুত্র কি না এই মর্মে প্রশ্ন উঠত।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩০: ঠাকুরবাড়ির জামাই রমণীমোহনকে মন্ত্রী করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-৯৭: গ্রিন টি /৫

দেবদূতের বাক্যানুসারে, রাজা দুষ্মন্ত, পুত্রটি নিজের ঔরসজাত পুত্র, এই মর্মে তাঁর নির্দোষত্ব প্রমাণ করে, সন্তুষ্ট ও আনন্দিতচিত্তে তাকে নিজের পুত্র বলে গ্রহণ করলেন। তিনি পুত্রের প্রতি স্নেহশীল পিতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে পুত্রের উপনয়নাদি পিতৃকার্য সম্পন্ন করালেন। ব্রাহ্মণগণের প্রশংসাধ্বনিতে, বন্দিদের স্তবে, মুখরিত হয়ে,রাজা সস্নেহে পুত্রের মস্তক আঘ্রাণ করে, তাকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করলেন। পুত্রের স্পর্শে রাজা পরম আনন্দ লাভ করলেন। রাজা, ভার্যা শকুন্তলাকে ধর্মানুসারে পত্নীর সম্মান প্রদান করলেন। রাজা দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে সান্ত্বনাদান করে বললেন,লোকচক্ষুর আড়ালে, তোমার সঙ্গে আমার দাম্পত্যের (গন্ধর্ব বিবাহবিধি অনুসারে) সম্পর্ক স্থাপন করেছিলাম। সেই বিবাহের শুদ্ধতা প্রমাণের জন্যে, এই সব (বিস্মরণজনিত অস্বীকারাদি প্রভৃতি) আচরণ, বিশেষ বিবেচনাপূর্বক করেছিলাম। সাধারণ মানুষ হয়তো মনে করত, স্ত্রীলোকের স্বভাবগত চাঞ্চল্যের (কামের বশবর্তিতা, প্রভৃতি লঘুস্বভাবের) দরুণ, আমার সঙ্গে তোমার সঙ্গম হয়েছিল। রাজা জানালেন, এই পুত্রটিকেই যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করবেন বলে তিনি মনস্থ করেছিলেন। প্রিয়া শকুন্তলা, ক্রোধান্বিতা হয়ে রাজার উদ্দেশে, যে অপ্রিয় কথাগুলি বলেছিলেন, প্রণয়িনী বিশালনয়না শকুন্তলার সেই সব উক্তি রাজা ক্ষমা করেছেন। যচ্চ কোপিতয়াত্যর্থং ত্বয়োক্তোঽস্ম্যপ্রিয়ং প্রিয়ে!। প্রণয়িন্যা বিশালাক্ষি! তৎ ক্ষান্তং তে ময়া শুভে!।। এমন স্তুতিবাদের শেষে ভরতবংশীয়, রাজর্ষি দুষ্মন্ত প্রিয়পত্নী শকুন্তলাকে বসন, অন্ন, পানীয় ইত্যাদির দ্বারা সম্মানিত করলেন।

অতঃপর রাজা শকুন্তলার পুত্রটির নামকরণ করলেন ভরত। ভরতকে রাজা যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করলেন। দুষ্মন্তর রাজ্যশাসনের শতবর্ষ পূর্ণ হলে, নরশ্রেষ্ঠ দুষ্মন্ত বনে গমন করে, সুরলোকে বাস করতে লাগলেন। রাজসভায় রাজা দুষ্মন্তের দাম্পত্যপ্রেম প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি শকুন্তলা, দুর্বল মুহূর্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, সন্তানস্নেহহীনা নিষ্ঠুরস্বভাবা অপ্সরা মেনকা প্রসবান্তে দুধের শিশু কন্যাটিকে পরিত্যাগ করে চলে যান। তখন থেকেই পরিত্যক্ত হওয়াই যেন তাঁর নিয়তিনির্দিষ্ট ভাগ্যলিপি হয়ে উঠেছে। রাজা, শকুন্তলার মাতৃনিন্দায় সোচ্চার হয়ে,শকুন্তলাকে মায়ের মতোই স্বেচ্ছাচারিণী বারবণিতা আখ্যা দিয়েছিলেন।

ব্রহ্মর্ষি বিশ্বামিত্রের তপোভঙ্গ করবার উদ্দেশ্য নিয়েই তাঁর মর্ত্যলোকে আগমন। মহর্ষির সঙ্গে মিলনের ফলে শকুন্তলার জন্ম। মায়ের সম্পর্কে রাজার এই অবমাননাসূচক উক্তি সহ্য করতে পারেননি শকুন্তলা। কোনও মেয়েই মায়ের চরিত্রের প্রতি কর্দমাক্ত ইঙ্গিত সহ্য করতে পারে না।

শকুন্তলা তাঁর পিতামাতার গৌরবময় ঐতিহ্যপূর্ণ অবস্থান তুলে ধরলেন। বস্তুত একজন অসম্মানিতা স্ত্রী তাঁর বংশমর্যাদায় আঘাত, সহ্য করতে পারেন না। মরিয়া হয়ে আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে, প্রতিপক্ষকে তুলনায় ছোট প্রমাণ করাতেই তাঁর সাফল্য বলে মনে করেন। এই শকুন্তলা, বরদানে ইচ্ছুক ঋষি কণ্বের কাছে, স্বামীর মঙ্গলকামনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পুরুবংশের ধার্মিকতা ও স্থায়িত্ব প্রার্থনা করেছিলেন। তখন ছিল সুখের সময়। স্বামীর মঙ্গলকামনায় একাগ্রচিত্ত ভারতীয় নারী স্বামী ও সন্তানসহ পরিবারের সুখী গৃহকোণের প্রত্যাশীমাত্র। তাঁকে প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রতিকূলতা সহ্য করতে হয়। বস্তুত ঝড় ঝঞ্ঝা সহ্য করেও কল্যাণময়ীর আত্মদীপালোকে তাঁর গভীর তিমিরাচ্ছন্ন পথচলা।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১০ : নায়ক ও মহাপুরুষ

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান

মহাভারতকার মহর্ষি বেদব্যাসের মহাকাব্যের নারীরা যথার্থ বীরাঙ্গনার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তাঁরা চোখের জল সংবরণ করে রুখে দাঁড়াতে জানেন।রাজা দুষ্মন্তের সমালোচনায়, শকুন্তলা, রাজাকে বিকৃতরুচি, কটুভাষী, পরপীড়ক, নিন্দুক, মূর্খ, সম্পূর্ণ নেতিবাচকতায় ভরা, সত্যধর্মচ্যুত, একটি মানুষ বলে প্রতিপন্ন করেছেন।তবে তাঁর প্রাসঙ্গিক উদাহরণগুলি যুক্তিগ্রাহ্য ও সবসময়েই মানবধর্মের আলোচিত বিষয়। আত্মশ্লাঘা নয়,কারও প্রতি কটূক্তি নয়, পরপীড়ন নয়, নয় নিন্দা বিদ্বেষের বিষোদ্গার, বিরূপ সমালোচনা নয়, নয় মনের গভীরে আক্রোশ পুষে রাখা ইত্যাদি।পুত্রের শ্রেষ্ঠত্ব সম্বন্ধে তাঁর অভিমত যুগধর্মের অনুসারী।পুত্রের গুণগান, সেই সময়ের সর্বজনগ্রাহ্য রীতি। শকুন্তলা তার ব্যতিক্রম নন।তবে পুত্রের গুরুত্ব অপেক্ষা সত্যনিষ্ঠতার গুরুত্ব প্রতিপন্ন করবার প্রচেষ্টায় শকুন্তলার আশ্রমলালিতশিক্ষার আদর্শনিষ্ঠতার ছায়া উদ্ভাসিত হয়েছে। সত্যনিষ্ঠতার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করবার লক্ষ্যে, শকুন্তলা যে কথাগুলি বলেছেন, সেগুলি সব যুগেই প্রাসঙ্গিক মানবধর্ম বলেই বিবেচিত হয়ে থাকে।

পথপ্রদর্শক ব্যক্তিত্বের কপটাচরণ করা সাজে না।রাজা আদর্শ স্বরূপ। যে কোনও বিশিষ্ট ব্যক্তির, দ্বিচারিতা, কপটাচরণ, প্রতারণা সাধারণ মানুষকে দিকভ্রান্ত করে তোলে। সব যুগের মানুষই সত্যনিষ্ঠতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, রামায়ণ মহাভারত এই দুই মহাকিব্যেই সেটি প্রতিফলিত হয়েছে। নৈতিক অবক্ষয়ের নিরিখে সত্যের অনির্বাণ শিখা চিরজাগরুক হয়ে আছে। এখনও এটি খুবই প্রাসঙ্গিক আলোচিত বিষয়। এর অনুরণন আধুনিক ভারতেও শোনা যায়, “সত্যের জন্যে সব কিছু ত্যাগ করা যায়, কিন্তু কোনও কিছুর জন্য সত্যকে ত্যাগ করা যায় না।” আচার্য বেদব্যাসের কলমে মেয়েরা দৃঢ়, যুক্তিপূর্ণ, আদর্শনিষ্ঠ নারীর কণ্ঠে কথা বলেছেন। তাঁরা আত্মমর্যাদা সম্বন্ধে পূর্ণ সচেতন।রাজার কুযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, নিজের বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা করতে জানেন।আধুনিক ভরতবংশীয়া নারীকুল এখন শকুন্তলার স্বরে কথা বলতে শিখছেন, নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তাঁদের হার না মানার অঙ্গীকার সমাজের অনেকক্ষেত্রেই একটু একটু করে প্রকাশিত হচ্ছে। তবে অবমানিতার অগৌরবে নয়, নয় স্বামীর সংসারের এক কোণে পড়ে থাকায়,বিজয়িনীর সগর্বিত প্রস্থানেই তাঁর আত্মতৃপ্তি। তবে মহর্ষি কণ্বের আশ্রমে শকুন্তলার একটি সুরক্ষিত স্নেহছায়াময় আশ্রয় ছিল, সকলের সেটি থাকে না।
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।

তবে দুষ্মন্ত ও শকুন্তলার মিলনে, দৈব সমাধানের হয়তো প্রয়োজন ছিল। ভণ্ডরা অলৌকিক দৈববাণী ইত্যাদির ভক্ত হয়ে থাকেন। আত্মবিশ্বাসের অভাব অপরাধমনস্ক, মিথ্যাচারীর একটি দুর্বলতম দিক। তাই অগত্যা হয়তো দুষ্মন্তের বোধোদয় হয়েছে বা বিবেকচেতনা জাগ্রত হয়েছে। তারপরে আবার অমূল্যধন পুত্রের পিতৃত্বস্বীকারে আছে,নরকযন্ত্রণার নিবৃত্তি। এই সব প্রলোভন যদি দৈবাদেশে থাকে তবে অমঙ্গলের ভয়ে সতর্ক অন্যায়কারীর হৃদয় হয়তো কেঁপে উঠবে। দুষ্মন্ত এই অলৌকিকতার চাপটি সহ্য করতে পারেননি। পুরোহিত, মন্ত্রীদের সাক্ষ্য রেখে শকুন্তলার পুত্রটিকে ঔরসজাত আত্মজরূপে স্বীকার করেছেন। এ যেন আধুনিক বিচারালয়ের অন্তিম নির্দেশ, যাকে কেউ অস্বীকার করতে পারেন না। একই কথা শকুন্তলার পত্নীত্বের স্বীকৃতিবিষয়েও প্রযোজ্য।তবে দুরাত্মার ছলের অভাব হয় না।

তাই দুষ্মন্ত যখন নিজের বিস্মরণের অজুহাত দেখিয়ে বলেন, শকুন্তলা চপলমতি অর্থাৎ অসংযমী নারীদের একজন। সকলের অগোচরে তাঁর সঙ্গে সঙ্গমের দোষহীনতা প্রমাণ করাই রাজার উদ্দেশ্য ছিল।তখন তার বিশ্বাসযোগ্যতা হয়তো সন্দেহের ঊর্দ্ধে নয়। রাজার বিস্মরণ বা ভুলে যাওয়া নিয়ে অনুতাপবোধ নেই। কারণ তিনি জেনে, বুঝেই এই বিস্মরণের ভান করে এক নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরী করেছিলেন। এমন নাটকীয়তায় ভরা ভারতীয় জনজীবনের আধুনিক দাম্পত্য,যেখানে আছে, প্রতারণা, প্রত্যাখ্যান, ছদ্ম মুখোশের অন্তরালে ভণ্ডামি। তবে আচার্য বেদব্যাসের প্রতিবাদিনী নারীরা জেগে উঠেছেন, এখন দৈববাণী নয়, তাঁদের সপক্ষে বিচারের বাণী সঠিকভাবেই হয়তো উচ্চারিত হয়।—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content