
ছবি : প্রতীকী।
রাক্ষসরাজ রাবণ এসেছে মারীচের কাছে। তার উদ্দেশ্য—মায়াবী মারীচের সাহায্যপ্রার্থনা। অযোধ্যাপতি দশরথের পুত্র রাম, রাবণের ভগিনী শূর্পনখার নাককান কেটে দিয়ে চরম অবমাননা করেছিলেন। রাবণ এর প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর। কামুক রাবণের আরও একটি লক্ষ্য, রামপত্নী সীতাকে অপহরণ করে সীতার সৌন্দর্যভোগ। মারীচ রাবণের প্রস্তাবে অসম্মত হল। কারণ, মারীচ, ইতিমধ্যেই কিশোর রামের বিস্ময়কর বীরত্বপ্রকাশের ফল ভোগ করেছে। মহর্ষি বিশ্বামিত্রের যজ্ঞে বিঘ্নসৃষ্টিকারী মারীচকে উচিত শিক্ষা দিয়েছিলেন রাম। মারীচ রামের হাতে সেই হেনস্থার স্মৃতি ভুলতে পারেনি।
মারীচ আবারও সম্প্রতি রামের আক্রমণের শিকার হয়েছিল। মারীচ, রাবণের কাছে সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করল। প্রথমবারের যুদ্ধে মারীচ,কোন উপায়ে মুক্ত হলেও সম্প্রতি যা ঘটেছে সেটাই সে শোনাবে। রামের কাছে পরাস্ত হয়েও, মৃগরূপী দুই রাক্ষসের সঙ্গে দণ্ডকারণ্যে প্রবেশ করেছিল মারীচ। সে দীপ্তজিহ্বা, বিরাট দাঁত, তীক্ষ্ণ শিঙ্ নিয়ে, বিশাল মাংসভোজী পশুর রূপ ধারণ করে,দণ্ডকারণ্যে বিচরণ করছিল। মারীচ রাবণকে তারপরে কী ঘটেছিল সেই কাহিনি জানাল। মারীচ, অতি ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে, সেখানে তপস্বীদের অত্যাচার করে,অগ্নিহোত্রের যজ্ঞশালা,তীর্থ ও পবিত্র চৈত্যবৃক্ষগুলিতে বিচরণ করছিল। সে দণ্ডকারণ্যের ধার্মিক তাপসদের হত্যা করে এবং তাঁদের রক্ত পান করে, মাংস ভক্ষণ করতে লাগল। ঋষিমাংসভোজী নিষ্ঠুর মারীচ,বনবাসীদের ত্রাস সৃষ্টি করে, রক্তপানের উন্মাদনায় দণ্ডকারণ্যে ঘুরে বেড়াতে লাগল। দণ্ডকারণ্যে বিচরণরত, ধর্মদূষণকারী মারীচ, ধর্মাশ্রয়ী তপস্বী রামের দেখা পেয়েছিল। সে দেখল মহীয়সী বিদেহনন্দিনী সীতাকে। মারীচ, পরিমিত আহারে অভ্যস্ত সমস্ত প্রাণীদের কল্যাণে নিরত তাপসরূপী মহারথ লক্ষ্মণকেও দেখল। মারীচের অকপট স্বীকারোক্তি—রামকে দেখামাত্র অতীতের শত্রুতা স্মরণ করে, বনবাসী মহাবল রামের তাপস পরিচয় জেনে, তাঁকে অসম্মান করতে উদ্যত হলাম। সক্রোধে তীক্ষ্ণ শিঙ্ নিয়ে, পশুরূপী, আমি, হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে, আঘাতের স্মৃতি ভুলে, রামকে হত্যা করতে ছুটে গেলাম। সোঽহং বনগতং রামং পরিভূয় মহাবলম্। তাপসোঽয়মিতি জ্ঞাত্বা পূর্ববৈরমনুস্মরন্।। অভ্যধাবং সুসংক্রুদ্ধস্তীক্ষ্ণশৃঙ্গো মৃগাকৃতিঃ। জিঘাংসুরকৃতপ্রজ্ঞস্তং প্রহারমনুস্মরন্।। তখন রাম, বিরাট ধনুক আকর্ষণ করে গরুড় ও বায়ুতুল্য গতিময় শত্রুঘাতী শাণিত তিনটি তীর নিক্ষেপ করলেন। মারীচ, অব্যর্থলক্ষ্য তিনটি বাণের বর্ণনা করল, বজ্রতুল্য ভয়ঙ্কর, রক্তপিপাসু, আনতপর্ব বাণগুলি ছুটে এসেছিল রাক্ষসদের দিকে। মারীচ আরও জানাল, অতীতে রামের ভয়ে ভীত মারীচ, তাঁর পরাক্রমসম্বন্ধে অবহিত ছিল, তাই চতুর মারীচ পালিয়ে বাঁচল, অন্য দুই রাক্ষস নিহত হল। রামের শর থেকে মুক্ত হয়ে, মারীচ কোনও মতে জীবন ফিরে পেয়েছে এবং প্রব্রজ্যা (সন্ন্যাসবৃত্তি) গ্রহণ করে, সমাহিত মারীচ তপস্যায় নিরত হয়েছে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৭: শিশুপালের একশত অপরাধ ক্ষমার যোগ্য, কেন? এর কোন তাৎপর্য আছে কি?

উপন্যাস, পর্ব-৮৮ : আকাশ এখনও মেঘলা

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৭০ : ঘটজাতক/৫ : সে আসিছে আজ কাল-বৈশাখে
সশঙ্কিত মারীচ তার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করল — সেই থেকে আমি গাছে গাছে চীরকৃষ্ণাজিনপরিহিত ধনুর্বাণধারী রামকে পাশহাতে যমের মতো দেখছি। ভয়ার্ত হয়ে আমি হাজার হাজার রামকে দেখি। এই সমগ্র অরণ্যটাই রামময় বলে মনে হয় আমার। হে রাক্ষসরাজ, শূন্যস্থানেও আমি রামকেই দেখি। এমন কি স্বপ্নেও রামকে দেখে, হতচেতন হয়ে, আমি উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াই। বৃক্ষে বৃক্ষে হি পশ্যামি চীরকৃষ্ণাজিনাম্বরম্। গৃহীতধনুষং রামং পাশহস্তমিবান্তকম্।। অপি রামসহস্রাণি ভীতঃ পশ্যামি রাবণ। রামভূতমিদং সর্ব্বমরণ্যং প্রতিভাতি মে।। রামমেব হি পশ্যামি রহিতে রাক্ষসেশ্বর। দৃষ্ট্বা স্বপ্নগতং রামমুদ্ভ্রমামি বিচেতনঃ।। এমন কি রকারযুক্ত রত্ন, রথ প্রভৃতি শব্দেও মারীচের ত্রাস সৃষ্টি করে। রামের প্রভাব মারীচ জানে, তাই তাঁর সঙ্গে রাবণের যুদ্ধ করা সঙ্গত নয়। মারীচের বিশ্বাস, রাম এমন কি বিখ্যাত বলি ও নমুচি রাক্ষসদ্বয়কেও বধ করতে পারেন। মারীচের অনুরোধ — যুদ্ধে রামের সঙ্গে যুদ্ধই করুন বা ক্ষান্তই হন, যেটাই করুন, মারীচকে যদি জীবিত দেখতে চান তবে রামের কথা রাবণ যেন আর না বলেন। মারীচ বলল,ধর্মানুষ্ঠানে যুক্ত,বহু সাধুপুরুষ,অপরের অপরাধে সবান্ধবে ধ্বংস হয়েছেন। মারীচের গলায় বিষণ্ণতা,হে রাক্ষস অপরের অপরাধে আমিও বিনষ্ট হব। আপনি যা হয় করুন, আমি কিন্তু আপনার অনুগামী হব না। বহবঃ সাধবো লোকে যুক্তা ধর্মমনুষ্ঠিতাঃ। পরেষামপরাধেন বিনষ্টাঃ সপরিচ্ছদাঃ। সোঽহং পরাপরাধেন বিনাশেয়ং নিশাচর। কুরু যত্তে ক্ষমং তত্ত্বমহং ত্বাং নানুযামি বৈ।।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮৫: আইসিইউ কেবিন নং ২০৪

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!
রামের প্রশংসায় পঞ্চমুখ মারীচের ভাষায় — রাম,মহাতেজস্বী, মহানুভব এবং মহাবীর। তিনি নিশ্চিত রাক্ষসকুলের উচ্ছেদকারী হবেন। শূর্পনখার কারণে জনস্থানবাসী খর, অক্লান্তকর্মা রামের হাতে নিহত হয়েছে। মারীচ রাবণের মতামত জানতে চাইল, অত্র ব্রূহি যথাতত্বং কো রামস্য ব্যতিক্রমঃ। যথাযথ বিবেচনা করে সঠিকভাবে বলুন, এতে রামের অপরাধ কি? পরিশেষে মারীচ যুদ্ধের পরিণাম ঘোষণা করল, ইদং বচো বন্ধুহিতার্থিনা ময়া যথোচ্যমানং যদি নাভিপৎস্যসে। সবান্ধবস্তক্ষ্যসি জীবিতং রণে হতোঽদ্য রামেণ শরৈরজিক্ষগৈঃ।। আমি হিতাকাঙ্খী বন্ধুরূপে যা বললাম সেটি যদি না মানেন তবে আজ যুদ্ধে রামের অব্যর্থ বাণের লক্ষ্য হয়ে আপনি সবান্ধবে প্রাণ হারাবেন।
আরও পড়ুন:

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার : শতফুল বিকশিত হোক

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১১ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ৪
মারীচ মায়াবী রাক্ষস। সে যে কোন রূপ ধারণ করতে অভ্যস্ত। একদা নিজ রাক্ষসরূপ ধারণকারী আক্রমণাত্মক মারীচকে শায়েস্তা করছিলেন কিশোর রাম। সেই স্মৃতি এখনও মারীচকে তাড়িয়ে বেড়ায়। ছদ্ম আবরণ,আত্মপরিচয় গোপন করতে প্রয়োজন হয়। এই ছদ্মবেশধারণ সদুদ্দেশ্যপূরণের লক্ষ্যে হতে পারে আবার ছদ্মবেশধারণ অসদুদ্দেশ্যপ্রণোদিতও হতে পারে। বলাবাহুল্য, রাবণ, মারীচকে সোনার হরিণরূপ ধারণ করতে অনুরোধ জানিয়েছেন যেটি নিঃসন্দেহে অসদুদ্দেশ্যপ্রাণিত অনুরোধ। রাক্ষসরূপে মারীচ, রামের শক্তিমত্তা অবগত হয়েছে,প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতালব্ধ সেই স্মৃতি তাকে প্রতিমুহূর্তে উদ্বেগাক্রান্ত করে এখনও। মতিভ্রম তাকে স্বস্তিতে থাকতে দেয় না। গহনারণ্যে মারীচকে ঘিরে ধরেন হাজার হাজার রাম। স্বপ্নে, জাগরণে, হানা দেন রাম। রাম শব্দের র-কার, রজ্জুতে সর্পভ্রমে রূপান্তরিত হয়ে নিরন্তর বিভ্রান্ত করে মারীচকে। রাম মায়ার আশ্রয় নিয়ে মারীচের ত্রাস সৃষ্টি করেননি। অপরাধ এমন একটি অসুখ যার ওষুধ বোধ হয় এমনই ভীতি-উৎপাদন। তবু বলা যায়, প্রথমসাক্ষাতে রাম মারীচকে উচিত শিক্ষা দিতে পারেননি। তাই দণ্ডকারণ্যের গভীর বনে সস্ত্রীক রামকে দেখে মারীচের প্রতিশোধস্পৃহা জেগে উঠেছিল। মারীচ, পশুরূপ ধারণ করে রামকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছে। রামের বিধ্বংসী শরাঘাতের সামনে মারীচ দাঁড়াতে পর্যন্ত পারেনি। পালিয়ে গিয়ে আত্মরক্ষা করেছে। তার সঙ্গী দুজন মৃত্যু বরণ করেছে।এর অভিঘাত, মারীচের মনে এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিল যে, সে রাম আতঙ্কতে (Ram-phobia) আক্রান্ত হয়েছে। দিনের আলোয় সহস্র রাম ঘুরে বেড়াচ্ছেন তার চোখের সামনে জাগরণের দুঃস্বপ্নের মতো। রাতে সে স্বপ্নেও রামকে দেখছে। তার মানসদৃষ্টি দিনরাত রামময়, অরণ্য রামময়। শূন্যস্থান পূর্ণ করছেন রাম অথচ রাম মারীচের সম্মুখে নেই। মারীচের সামনে রামের কোনও ছদ্মবেশী রাম নেই। রামভীতিতে আচ্ছন্ন আতঙ্কিত মারীচ সর্বত্র রামকে প্রত্যক্ষ করছে। আতঙ্কপ্রতিরোধের লক্ষ্যে, অপরাধীর মনে দ্বিগুণ ত্রাসসৃষ্টিতে আছে অপরাধমনস্কতার প্রতিরোধ। ছদ্মবেশের কোনও প্রয়োজন আছে কি?
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৬: শাঁখামুটি
ছদ্মবেশ, বোধ হয়, অপরাধপ্রবণতার একটি শক্ত হাতিয়ার যেটি রাবণ মারীচের মাধ্যমে ব্যবহার করতে উদ্যোগী হয়েছেন। ছল, বল, কৌশল— এই তিনটির সাহায্যে যুদ্ধজয় সম্ভব। রাবণ ছলনার আশ্রয় নিয়ে রামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয় করতে চাইছেন। মারীচের অপরাধপ্রবণতা, রামের বলের কাছে নতিস্বীকার করেছে। কৌশলে যুদ্ধজয়ের অবকাশ এখনও বাকি রয়েছে।আত্মশক্তিবলে অনেক অসমযুদ্ধ জয় করা সম্ভব। রামের জীবন তার প্রমাণ। মারীচ নিজের এবং রামের, উভয়ের বলপ্রয়োগের ফল ভোগ করেছেন। রাম মুনিদের,আর্তদের, উদ্ধারে নিবেদিতপ্রাণ, বিপরীতে মারীচের বলপ্রয়োগের লক্ষ্য নিরীহ ঋষিদের প্রাণহরণ, তাঁদের রক্তমাংসভক্ষণ। ছলনার আশ্রয়ে যুদ্ধজয় না আত্মশক্তিবলে বিজয়ীর সম্মান, দুইটির মধ্যে কোনটি প্রশংসনীয় সেটা রামায়ণের উপসংহার প্রমাণ করবে। আধুনিকপ্রযুক্তিনির্ভর কৌশল, ছল ও বলকে ছাপিয়ে উঠেছে।কৌশল অতীতে ছিল ক্ষুরধার মস্তিষ্কপ্রসূত। বর্তমানে মস্তিষ্কপ্রসূত যুদ্ধাস্ত্রের প্রয়োগকৌশল,যুদ্ধজয়ের অন্যতম অবলম্বন হয়েছে। তবে ছদ্মবেশধারী মারীচ এখনও আছে, পারিবারিক জীবনে, সামাজিক পরিমণ্ডলে বৃহত্তম রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নাম ও রূপের আড়ালে।—চলবে।
* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।


















