সোমবার ৯ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

যশোরের ফুলতলি গ্রামের বেণীমাধব রায়চৌধুরীর কন্যা ভবতারিণী সবে তখন বধূ হয়ে এসেছেন জোড়াসাঁকোয়। ঠাকুরবাড়ির সেরেস্তার বারো টাকা মাস-মাইনের কর্মীর কন্যা তিনি। মান-মর্যাদায় অর্থ-কৌলিন্যে অনেক এগিয়ে থাকা পরিবারে বধূ হয়ে এলেও তাঁর মধ্যে তেমন আড়ষ্টতা ছিল না। সহজে, স্বাচ্ছন্দ্যে নতুন পরিবারের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করেছেন। ইন্দিরা দেবীর লেখায় আছে, রবীন্দ্রনাথ বাড়ির অনেককে নিয়ে যশোরে গিয়েছিলেন মেয়ে দেখতে। মৈত্রেয়ী দেবীকে রবীন্দ্রনাথ অবশ্য বলেছিলেন, মেয়ে দেখতে যাননি তিনি। গিয়েছিলেন বৌঠানরা।
মেয়ে তো পছন্দ হয়। কথাবার্তাও এগোয়। শেষে বিবাহ-আয়োজন। বিয়ে করতে রবীন্দ্রনাথ যশোরে যাননি। পাত্রী স্বয়ং এসেছিলেন জোড়াসাঁকোয়। নিঃসন্দেহে তা ছিল অভিনব। বিয়ে তো হল। প্রায় গ্রাম্য-বালিকা। নববধূকে রবীন্দ্রনাথ নিজের মতো করে গড়ে নিতে চাইলেন। সবার আগে নিজের মনের মতো একটি নাম দিলেন। ভবতারিণী হলেন মৃণালিনী।

রবীন্দ্রনাথ মৃণালিনীকে নিজের মতো করে গড়তে চাইছিলেন। মৃণালিনী নিজেও বদলাতে চাইছিলেন। নিজেকে ঠাকুরবাড়ির উপযোগী করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ক্লান্তিহীন চেষ্টা ছিল। এই তৎপরতায় সন্তুষ্ট হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মনে হয়েছিল কবির, ঠিক যেমনটি তিনি চান, তেমনই হয়ে উঠবেন তাঁর পত্নী। সম্পর্কের মধ্যে সহজতা ছিল। তাই পত্নী জোর খাটালে হাসিমুখেই তা মেনে নিতেন তিনি।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৬: কবির টুপি, কবির জোব্বা

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৫১: আকাশ এখনও মেঘলা

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৮: অপারেশন হেলথ সেন্টার

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩৩: খাটাস

রবীন্দ্রনাথের সবে তখন বিয়ে হয়েছে। থাকতেন জোড়াসাঁকোয়, দোতলার এক ঘরে। প্রথম-জীবনে অনেক জায়গা নিয়ে সাজিয়েগুছিয়ে ঘর-সংসার করার সৌভাগ্য হয়নি তাঁর। সীমিত পরিসরে, নানা প্রতিকূলতায়, প্রতিবন্ধকতায় কোনওরকমে দিনযাপন। আর পাঁচজনের থেকে তো তাঁর একটু বেশিই জায়গা প্রয়োজন! সবার সঙ্গে মেলানো যাবে না, তাঁর বাড়তি জিনিসও তো কম নয়। কোথায় বইপত্র রাখবেন, বসবেন, লিখবেন, সেসব নিয়ে রীতিমতো ভাবনায় পড়ে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
কলকাতায় বৃষ্টি

মৃণালিনী দেবী।

জোড়াসাঁকোর দোতলায় রবীন্দ্রনাথ-মৃণালিনীর বসবাসের জন্য নির্দিষ্ট ঘরটির পাশে ছিল আরও একটি ঘর। পরিসরে যথেষ্ট ছোটো। সেই ঘরেই রাখা হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের বইপত্র। ছিল লেখার নিচু ডেক্স, রবীন্দ্রনাথ লিখতেন, পড়তেন মাটিতে বসে। সেই ছোট্ট ঘরে বেশ কষ্ট করেই কবি ও কবি-পত্নীর দিন কাটত। সবে নতুন সংসার পেতেছেন। হাসিতে, খুশিতে সে সংসার তখন ভরে উঠেছিল। এমন সময় ঘটে এক বিপত্তি। এক অচেনা ব্যক্তিকে নিয়ে ঘটে সেই বিপত্তি!

সবকিছুরই বোধহয় ভালো দিক থাকে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে চেনা যায় কবি-পত্নীকে। জানা যায়, কত কোমল মনের অধিকারিণী ছিলেন মৃণালিনী! বোঝা যায়, অন্যের জন্য কতখানি কাতর হতেন তিনি। সে কাতরতায় কোনো খাদ ছিল না। সবার জন্য ছিল তাঁর ভালোবাসা, ছিল সবার প্রতি মায়া।
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৮ : অপরাজিত: অপুর প্রত্যাবর্তন

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৮: অসম-মিজোরাম সীমান্তে ঘাড়মুড়ার নব আবিষ্কৃত ভাস্কর্যও সুপ্রাচীন

যাকে ঘিরে সেই বিপত্তি ঘটেছিল, তার কথা লিখে রেখেছেন অবনীন্দ্রনাথ। কোথা থেকে অচেনা উটকো লোকটা এসে কবি পত্নীকে ধরেছিল, কে জানে! মন-ভোলানিয়া যত কথাবার্তা। ছেঁড়া জামাকাপড় পরা, উস্কোখুস্কো চুল, বিদঘুটে চেহারার লোকটা মৃণালিনী দেবীকে ‘মা’ বলে ডাকতে শুরু করে। এখানেই থামেনি সে। বলে, স্বপ্নে নাকি দেখেছে মৃণালিনী তার পূর্বজন্মের মা। স্বপ্নেই নাকি আদেশ পেয়েছে, রোজ তাঁর চরণামৃত খেতে হবে। এসব বলে মৃণালিনী দেবীকে প্রায় লুটিয়ে পড়ে প্রণাম করে। প্রণামের পর জানায় তার ইচ্ছের কথা, সে আর কোথাও যাবে না, জোড়াসাঁকোতেই থাকবে। লোকটাকে দেখে মৃণালিনী দেবীর বড়ো মায়া হয়। আহা রে, মা বলে ডাকছে! তাকে তাড়ায় কেমন করে! বললেন, ‘ঠিক আছে, এখানেই থাকো।’
কলকাতায় বৃষ্টি

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

পত্নীর ইচ্ছায় কর্ম। রবীন্দ্রনাথের একফোঁটাও ইচ্ছে ছিল না। কী আর করবেন, মৃণালিনী কথাকে মর্যাদা দিতেই রাজি হলেন তিনি। লোকটাও রয়ে গেল জোড়াসাঁকোয়। নিতান্তই মুখের কথা নয়, সত্যিই সে মৃণালিনী দেবীর পা-ধোওয়া জল খেত রোজ। রবীন্দ্রনাথ স্নেহপ্রবণ মানুষ, মৃণালিনী দেবীও স্নেহময়ী। ফলে ক-দিনেই তার প্রতি ভালোবাসা জন্মায়। ব্যবস্থা হয় পরিচর্যার। উসকোখুসকো চুলে তেল পড়ে। কোঁচানো ধুতি আসে। চাদর আসে। সাজসজ্জায় পরিপাটি ‘বাবু’টি হয়ে গেল সে। কত তার আদর-যত্ন! সবকিছু দেখে, জেনে অবনীন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল ‘দিব্যি ঘরের ছেলের মতো।’
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪৩: জরাসন্ধের ঔদ্ধত্য ও কৃষ্ণের ভূমিকা যুধিষ্ঠিরকৃত রাজসূয় যজ্ঞের প্রাসঙ্গিক সূচনা

দশভুজা, অন্য লড়াই: এই স্বাধীনতার জন্য আমরা লড়াই করিনি

সত্যিই তো তাই, কত খাতির! মৃণালিনী দেবীর কাছের সে হয়ে উঠেছিল নিজের ছেলের মতো। আগে থাকতো নিচে, একতলায়। অচিরেই পদোন্নতি, পায় দোতলায় থাকার ছাড়পত্র। অচেনা-উটকো লোক, তাকে এভাবে স্বীকৃতি দেওয়া ঠিক হচ্ছে না, এ কথা বলতে থাকেন বাড়ির অনেকেই। রবীন্দ্রনাথের ভাগ্নে সত্যপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন বন্ধুর মতো। খুবই মধুর সম্পর্ক ছিল তাঁর সঙ্গে। কবির নানা কাজে সত্যপ্রসাদ ছিলেন নিত্যসঙ্গী। এমনকি রবীন্দ্রনাথের গ্রন্থ-প্রকাশেও বড়ো ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি। ‘ভাগ্নে’ সত্যপ্রসাদ ‘মামা’ রবীন্দ্রনাথকে সব কথা বলতে পারতেন মুখের ওপর। রবিমামাকে সাবধান করে বলেছিলেন, লোকটিকে তার সুবিধার মনে হচ্ছে না।
কলকাতায় বৃষ্টি

সত্যপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়।

সত্যপ্রসাদের অনেক কথাই বিনা প্রতিবাদে মেনে নিলেও একথা মানেননি রবীন্দ্রনাথ। ‘বাজে কথা’ বলে নস্যাৎ করেছিলেন। গরিবের ছেলে, তাই সবাই বিরোধিতা করছে, আবেগের ঘোরে এমনও মনে হয়েছিল তাঁর। রবীন্দ্রনাথের উপার্জন তখন যৎসামান্য। মহর্ষিদেব মাসে মাসে কিছু টাকা দিতেন। আর বই লিখে যেটুকু উপার্জন। সে টাকা থেকেই মৃণালিনীকে ‘মা’ বলা লোকটার জন্য খরচা করতেন। দৈনন্দিন খরচের সঙ্গে যুক্ত হওয়া এই নতুন খরচ কোনোরকমে সামাল দিতেন কবি। লোকটা এমনভাবে প্রভাবিত করে ফেলেছিল যে, কারও কথায় কবি ও কবি-পত্নী ভুলেও কান দিতেন না, বিশ্বাস করতেন না।

এভাবে কিছুদিন কাটার পর ধূর্ত লোকটার মুখোশ খসে যায়। মুখোশের আড়ালে থাকা আসল মুখটা বেরিয়ে পড়ে। বাড়ির কেউ কেউ লক্ষ করেছিলেন, হঠাৎই তার সাজসজ্জা বেড়ে গিয়েছে। কোথা থেকে এমন ঝলমলে জুতো কিনছে, চেকনাই জামা-কাপড় পরছে, কে জানে! ব্যাপারটা প্রথমদিকে রহস্যময় মনে হলেও ক-দিন যেতে না যেতেই বোঝা গেল, কোথায় পায় সে টাকা।
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৯ : উত্তরমেঘ

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১৫: পরবাস প্রস্তুতি (এক)

বাড়ির কেউ কেউ আঁচ করতে পারলেও রবীন্দ্রনাথ অবশ্য মেনে নিতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথের বই চুরি যায়,জামা-কাপড়, এটা-সেটা কত কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না, তবু লোকটাকে অবিশ্বাস করতে মন চায়নি। চুরিটুরি যাওয়ার পরও তাকে সন্দেহ করতেন না কবি ও কবিপত্নী। এদিকে চুরির বহর দিনে দিনে বাড়তে থাকে। একদিন রবীন্দ্রনাথের একটা খুব দামি বই চুরি যায়। কবি ভিতরে ভিতরে উত্তেজিত হলেও সে উত্তেজনা গোপন করে একদিন ডাকলেন লোকটাকে। বললেন, বই না-পাওয়ার কথা।

লোকটা বোধহয় অনুমান করতে পেরেছিল, বিপদ আসন্ন। ধরা পড়ে যেতে পারে। সেই ভয়ে সঙ্গে সঙ্গে সত্যপ্রসাদের কথা বলে। যে ঘরে বইটি ছিল, সে ঘরে নাকি সত্যপ্রসাদকে দেখেছিল সে। মিথ্যে গল্প ফেঁদে নিজের পিঠ বাঁচাতে চাইছে, ব্যাপারটা বুঝতে রবীন্দ্রনাথের অসুবিধা হয় না। কত বড়ো ফেরেববাজের পাল্লায় পড়েছেন, দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পুষেছেন, বুঝতে পারেন কবি। পুরো ব্যাপারটা তখনই বলেন সত্যপ্রসাদকে। সত্যপ্রসাদ শুনে খুবই উত্তেজিত হয়ে পড়েন। রেগে বলে ওঠেন, ‘কী আস্পর্ধা!’

শুধু সত্যপ্রসাদ নয়, বাড়ির সকলেই কমবেশি বিরক্ত লোকটার ওপর। বাড়ির চাকরবাকরদের সে খুব হম্বিতম্বি করত, বিরক্ত তারাও। লোকটাকে চোখে চোখে রাখার কথা শেষে সবাইকে বলে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ও সত্যপ্রসাদ। শেষে রবীন্দ্রনাথের ঘরেই তাকে ঢুকতে দেওয়া হত না। সবার মতিগতি, হাবভাব দেখে লোকটা বুঝে গেল, এবার তাকে পালাতে হবে। পালাতে না পারলে কপালে দুঃখ আছে।
কলকাতায় বৃষ্টি

রবীন্দ্রনাথ ও মৃণালিনী।

এসব ভেবে রবীন্দ্রনাথের ঘরে সবার চোখে ধুলো দিয়ে ঢুকে পড়ে লোকটা। উদ্দেশ্য একটাই, সবাইকে বোকা বানিয়ে পালানো। রবীন্দ্রনাথের ঘরে ঢুকে কলম, ঘড়ি আর দামি দামি বই নিয়ে আললায় রাখা ধুতি-চাদর পরে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে। লোকটা যে পালিয়ে যাচ্ছে, তা সেভাবে বাড়ির লোকজন দেখতে পাননি! অবনীন্দ্রনাথ তখন কিশোর। বয়সে রবিকাকার থেকে দশ বছরের ছোটো তিনি। কিশোর অবনীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন, লোকটাকে চলে যেতে। এই দৃশ্য দেখে সমবয়সীদের বলেও ছিলেন, ‘রবিকাকার পুষ্যিপুত্তুর চলেছেন দেখো সেজেগুজে।’

লোকটা যে এত বড়ো ঠক, প্রবঞ্চক, প্রতারক, তা বুঝতে পারেননি কবি। প্রথমদিকে ভুলেও তাকে সন্দেহের চোখে দেখেননি রবীন্দ্রনাথ। মৃণালিনীও সবকিছু ভেবেছেন আবেগ দিয়ে, ফলে তিনি আর সন্দেহ করবেন কেন! এই ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ। সবকিছু স্বচক্ষে দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, ‘সত্যিই আশ্চর্য মানুষ রবিকাকা, এমন সরল বিশ্বাস সবার উপরে। কাউকে কোনো দিন সন্দেহের চোখে দেখতে দেখিনি।’
* গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি (Tagore Stories – Rabindranath Tagore) : পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Parthajit Gangopadhyay) অবনীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট। বাংলা ছড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণা, ডি-লিট অর্জন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে চলেছেন। বাংলা সাহিত্যের বহু হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছেন। ছোটদের জন্য পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন। সম্পাদিত বই একশোরও বেশি।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content