
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
জমিদারির কাজে বেশ কিছুকাল তিনি ছিলেন শিলাইদহে। প্রজাদের সঙ্গে তাঁর খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। প্রজাদের কেউ হিন্দু, কেউ মুসলমান। সকলের সঙ্গেই সহজভাবে মিশতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাদের সঙ্গে গল্প করতেন। শুনতেন তাদের দুঃখ-কথা। গরিব চাষিদের কেউ কলাই সিদ্ধ খেয়ে দিন কাটায়, কেউ একজনের ভাত তিনজনে ভাগ করে খায়। এসব তাঁকে কষ্ট দিত। মন খারাপ হয়ে যেত।
শিলাইদহে বসবাসকালে প্রায়ই তিনি পদ্মায় ঘুরে বেড়াতেন বজরায়। একবার খুব বিপদে পড়েছিলেন। বোটে তিনি একা ছিলেন না, ছিল পুত্রকন্যারাও। হঠাৎই তুমুল ঝড় ওঠে, ঝড়ের সঙ্গে আকাশ-ভাঙা বৃষ্টি। এলোমেলো বাতাসে নৌকো কাৎ হয়ে যায়-যায়। বরাত ভালো, শেষ পর্যন্ত ডোবেনি। নৌকোর মাঝিরা ছিল অভিজ্ঞ, কোনোরকমে চরে নিয়ে বেঁধে রাখে তারা।
শিলাইদহে বসবাসকালে প্রায়ই তিনি পদ্মায় ঘুরে বেড়াতেন বজরায়। একবার খুব বিপদে পড়েছিলেন। বোটে তিনি একা ছিলেন না, ছিল পুত্রকন্যারাও। হঠাৎই তুমুল ঝড় ওঠে, ঝড়ের সঙ্গে আকাশ-ভাঙা বৃষ্টি। এলোমেলো বাতাসে নৌকো কাৎ হয়ে যায়-যায়। বরাত ভালো, শেষ পর্যন্ত ডোবেনি। নৌকোর মাঝিরা ছিল অভিজ্ঞ, কোনোরকমে চরে নিয়ে বেঁধে রাখে তারা।
রাত কেটে ভোর হয়। আবহাওয়া আগের দিনের থেকে সামান্য ভালো হলেও দুর্যোগ তখনো কাটেনি। তবু মাঝিমাল্লারা নৌকো বাইতে শুরু করে। কিছুদূর যাওয়ার পরই আকাশের অবস্থা একেবারে বদলে যায়। চারপাশ ঘন অন্ধকার হয়ে আসে। শুরু হয় ঝড়-বৃষ্টি। মাঝিরা নৌকো তীরে নিয়ে আসে, চলে অপেক্ষা। খানিক পরে ঝড়-বৃষ্টি থামে। মাঝিরা খুশি, শুরু করে আবার নৌকোবাওয়া।
বোটের ছাদে উঠে তিনি দেখছিলেন প্রকৃতির রূপ-বদল। খানিক আগেই ঝড় বাদল, এখন কেমন রোদ ঝলমল। হঠাৎ চোখে পড়ে অদূরেই কে যেন মরে পড়ে রয়েছে। একটু পরেই বুঝলেন, লোকটি মরা নয়, হাত পা নাড়বার চেষ্টা করছে। তখুনি মাঝিদের ডাকলেন। বললেন, ওকে নিয়ে এসো।
বোটের ছাদে উঠে তিনি দেখছিলেন প্রকৃতির রূপ-বদল। খানিক আগেই ঝড় বাদল, এখন কেমন রোদ ঝলমল। হঠাৎ চোখে পড়ে অদূরেই কে যেন মরে পড়ে রয়েছে। একটু পরেই বুঝলেন, লোকটি মরা নয়, হাত পা নাড়বার চেষ্টা করছে। তখুনি মাঝিদের ডাকলেন। বললেন, ওকে নিয়ে এসো।
আরও পড়ুন:

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১১৭: রবীন্দ্রনাথ ব্যারিস্টার হতে চেয়েছিলেন

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১১৭: আপাতত পরিত্রাণ
তারা দৌড়ে গেল, নিয়ে এল বজরায়। পরীক্ষা করে দেখলেন, যা ভেবেছিলেন ঠিক তাই। তখনও লোকটির প্রাণ আছে। শখ করে হোমিওপ্যাথির চর্চা করতেন। অসুস্থ লোকটির চিকিৎসা শুরু করলেন। ওষধু খাওয়ালেন, গরম দুধ খাওয়ালেন। কিছুক্ষণ পরই উঠে বসল সে। জানা গেল, লোকটি একটা নৌকোতে কাজ করত। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। বাবুরা ভাবে কলেরা হয়েছে। অবস্থা সঙ্গীন দেখে তারাই তাকে ফেলে রেখে গিয়েছে।

সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
লোকটির মুখে একথা শুনে তিনি আবার পরীক্ষা করলেন। ভালো করে পরীক্ষা করে আশ্বস্ত করলেন তাকে, ‘বাপু, তুমি তো কলেরার রোগী নও। আগে হয়ে থাকলেও এখন সম্পূর্ণ সুস্থ, রোগ-মুক্ত।’
লোকটিও মনে বল পেল। উঠে বসল। তার নানা বিষয়ে খোঁজখবর নিলেন। কোথায় থাকে, বাড়িতে কে আছে, এরপর কী করবে?
জানা গেল, তার কেউ নেই। একেবারে অসহায়। সব শুনে তিনি বললেন, তুমি আমার কাছে থাকবে?
সে যেন হাতে আকাশ পেল, তার কালো মুখ আলোয় ভরে গেল।
ত্রিবেণী মাঝিকে যিনি সেবায় যত্নে সুস্থ করে তুলেছিলেন, তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। মানুষ হিসাবেও তিনি ছিলেন অনেক বড়ো, মানুষ রবীন্দ্রনাথের পরিচয় এমন নানান ছোটোখাটো ঘটনার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ঘটনা হয়তো সামান্য, ওই সামান্য ঘটনার মধ্য দিয়েই বোঝা যায়, রবীন্দ্রনাথ মানুষ হিসাবেও ছিলেন অসামান্য। ত্রিবেণী মাঝি রবীন্দ্রনাথকে ভীষণ শ্রদ্ধা করত। একটি কথা প্রায়ই বলত, ‘বাবামশাই আমার জান, হামি তাঁর পায়েই মরব।’
লোকটিও মনে বল পেল। উঠে বসল। তার নানা বিষয়ে খোঁজখবর নিলেন। কোথায় থাকে, বাড়িতে কে আছে, এরপর কী করবে?
জানা গেল, তার কেউ নেই। একেবারে অসহায়। সব শুনে তিনি বললেন, তুমি আমার কাছে থাকবে?
সে যেন হাতে আকাশ পেল, তার কালো মুখ আলোয় ভরে গেল।
ত্রিবেণী মাঝিকে যিনি সেবায় যত্নে সুস্থ করে তুলেছিলেন, তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। মানুষ হিসাবেও তিনি ছিলেন অনেক বড়ো, মানুষ রবীন্দ্রনাথের পরিচয় এমন নানান ছোটোখাটো ঘটনার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ঘটনা হয়তো সামান্য, ওই সামান্য ঘটনার মধ্য দিয়েই বোঝা যায়, রবীন্দ্রনাথ মানুষ হিসাবেও ছিলেন অসামান্য। ত্রিবেণী মাঝি রবীন্দ্রনাথকে ভীষণ শ্রদ্ধা করত। একটি কথা প্রায়ই বলত, ‘বাবামশাই আমার জান, হামি তাঁর পায়েই মরব।’
আরও পড়ুন:

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-১৯: আকাশ এখনও মেঘলা

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০০: অসুস্থ শরীরেও ভক্তদের দীক্ষাদান শ্রীমার
রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহবাস তাঁর সাহিত্যজীবনকে সমৃদ্ধ করেছিল। গরিবগুরবো মানুষ কত কষ্টে আছে. কত দুঃখ আছে, তা নিকট থেকে দেখেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে আলোকিত হয়েছে তাঁর সাহিত্য, বিশেষত গল্পসম্ভার। কবিতায় সেভাবে আসেনি মানুষের কথা, এসেছে গল্পে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এই পর্বের বেশ কিছু গল্পে সেই অভিজ্ঞতা ভিন্নতর মাত্রা পেয়েছে।

কবিগুরু।
রবীন্দ্রনাথ সাধারণ মানুষজনের সঙ্গে মিশতেন। ছিল গভীর ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা গোপন থাকেনি। নানা ঘটনার মধ্য দিয়েই ফুটে উঠেছে। প্রথমদিকে প্রজারা তাঁকে ভুল বুঝলেও পরে উপলব্ধি করেছিল তাদের প্রতি কবি কতখানি আন্তরিক। প্রজাদের নিয়ে ভাবনার অন্ত ছিল না রবীন্দ্রনাথের। তাদের জন্য রাস্তাঘাট নির্মাণ করিয়েছেন। পানীয় জলের ব্যবস্থা করিয়েছেন। তাদের জীবনে একটু সচ্ছলতা আনার জন্য কুটিরশিল্পের প্রসারে রকমারি উদ্যোগ নিয়েছিলেন। শুধু তো তৈরি করলেই হয় না, তা রক্ষা করাও জরুরি। তৈরি করা রাস্তা রক্ষা করবে কে, সে দায়িত্ব তিনি দিয়েছিলেন গ্রামবাসীদের। কৃষিক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্যও তৎপর হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আমেরিকা থেকে কৃষিবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করে আসা পুত্র রথীন্দ্রনাথকে কাজে লাগিয়েছেন। ট্রাক্টর, পাম্পসেট ব্যবহার করে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। প্রথমদিকে ট্রাক্টর চালাতেন কবিপুত্র নিজে। প্রথম যেদিন পতিসরে ট্রাক্টর চলেছিল, সেদিন সমস্ত গ্রামের মানুষ পথে নেমেছিল। অবাক বিস্ময়ে দেখেছিল ট্রাক্টরের কেরামতি।
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮০: রাজনীতিতে সবাই চায় সবলের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখতে, দুর্বলরা সব সময়ই একা

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৬: রাম যৌথ পরিবারের আদর্শনিষ্ঠ জ্যেষ্ঠ, তাঁর যেন এক ঘরোয়া ভাবমূর্তি
পতিসরে যে উন্নয়নের সূচনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, সেই উন্নয়নের ধারা বিঘ্নিত হয়নি, বরং দিনে দিনে ত্বরান্বিত হয়েছে। উন্নতি হয়েছিল অভূতপূর্ব। রবীন্দ্রনাথের লেখায় আছে, ‘সেবার পতিসরে পৌঁছে গ্রামবাসীদের অবস্থার উন্নতি দেখে মন পুলকিত হয়ে উঠল। পতিসরের হাইস্কুলে ছাত্র আর ধরছে না দেখলুম—নৌকার পর নৌকা নাবিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। ছেলের দল আসছে তো আসছেই ইস্কুলের ঘাটে। এমনকি, আট-দশ মাইল দূরের গ্রাম থেকেও ছাত্র আসছে। পড়াশোনার ব্যবস্থা প্রথম শ্রেণির কোনো ইস্কুলের চেয়ে নিকৃষ্ট নয়। পাঠশালা, মাইনর স্কুল সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে। তিনটি হাসপাতাল ও ডিসপেন্সারির কাজ ভালো চলছে। মামলা-মকদ্দমা খুবই কম, যে অল্পস্বল্প বিবাদ উপস্থিত হয় তখনই প্রধানরা মিটিয়ে দেন।’ এক কথায় বলা যায়, আদর্শ গ্রাম। রবীন্দ্রনাথের ভাবনার বাস্তবায়নের ফলেই তা সম্ভব হয়েছিল।

ইন্দিরা দেবী চৌধুরানি।
রবীন্দ্রনাথ নিজের কাজের জায়গায় কত বড়ো, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। সব ব্যস্ততা দূরে সরিয়ে তিনি ধুলোমাটি মাখা ওই গ্রামীণ মানুষজনের জন্য ভেবেছেন, সময় দিয়েছেন।
মানুষের জন্য কাতর হয়েছেন, যেমন মানুষকে ভালবেসেছেন, তেমনই মানুষও রবীন্দ্রনাথকে ভালোবেসেছে। ওই সব সাধারণ মানুষ সাহিত্যক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের অবস্থান জানত না, জানার কথাও নয়, তারা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিল মরমি মানুষটিকে। তারাও ভালোবাসা ফিরিয়ে দিয়েছিল। সে ভালোবাসা গভীর ও বিস্তৃত। ভিতর থেকে উঠে আসা ভালোবাসা বোধ হয় এইরকমই হয়।
মানুষের জন্য কাতর হয়েছেন, যেমন মানুষকে ভালবেসেছেন, তেমনই মানুষও রবীন্দ্রনাথকে ভালোবেসেছে। ওই সব সাধারণ মানুষ সাহিত্যক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের অবস্থান জানত না, জানার কথাও নয়, তারা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিল মরমি মানুষটিকে। তারাও ভালোবাসা ফিরিয়ে দিয়েছিল। সে ভালোবাসা গভীর ও বিস্তৃত। ভিতর থেকে উঠে আসা ভালোবাসা বোধ হয় এইরকমই হয়।
আরও পড়ুন:

সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০১: ছিট ঘুঘু

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৫৮: হেলিকপ্টারে সওয়ার হয়ে চূড়ার কাছাকাছি গিয়ে পাহাড় দেখার রোমাঞ্চটাই আলাদা
শেষবার শিলাইদহযাত্রায় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গী ছিলেন অ্যানড্রুজ ও সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর। অ্যানন্ডুজ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত অনুরাগী, আশ্রমের রকমারি কর্মকাণ্ডের সহায়ক, এমনকি রবীন্দ্রনাথের অনুপস্থিতিতে আশ্রমের ভার এই বিশ্বস্ত সহায়ক পালন করতেন। সুরেন্দ্রনাথ ছিলেন কবির ভ্রাতুষ্পুত্র, সত্যেন্দ্রনাথ ও জ্ঞানদানন্দিনীর সন্তান। এই দুই সঙ্গীকে সঙ্গে নিয়ে শিলাইদহে এসে রবীন্দ্রনাথের যে সুখকর অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তা অপ্রত্যাশিত নয়, সেটাই ছিল স্বাভাবিক। রবীন্দ্রনাথ তাঁর এই গরিব প্রজাদের সম্পর্কে ভ্রাতুস্পুত্রী ইন্দিরাকে লিখেছিলেন, ‘এই দরিদ্র চাষী প্রজাগুলোকে দেখলে আমার ভারি মায়া হয়।’

অ্যানড্রুজ।
পরস্পরের এই ভালোবাসায় সত্যিই কোনও খামতি ছিল না। গ্রামীণ মানুষ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষবার আগমন উপলক্ষে কবিকে সংবর্ধনা জানিয়েছিল। চোদ্দো-পনেরো মাইল দূর থেকেও সেদিন এসেছিল কত মানুষ। ‘বাবামশায়ে’র জন্য তারা নজরানা এনেছিল। স্থানীয় মুসলমান মহিলারা রবীন্দ্রনাথকে নিজের হাতে তৈরি করে উপহার দিয়েছিল একটি কাঁথা। আরও কত উপহার। সেসব উপহারে মিশেছিল ভালোবাসা। কবির প্রতি শ্রদ্ধামিশ্রিত ভালোবাসা। মানুষকে ভালোবেসে জীবনভর এমনভাবেই মানুষের পাশে ছিলেন, মানুষের ভালোবাসা পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
* গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি (Tagore Stories – Rabindranath Tagore) : পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Parthajit Gangopadhyay) অবনীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট। বাংলা ছড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণা, ডি-লিট অর্জন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে চলেছেন। বাংলা সাহিত্যের বহু হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছেন। ছোটদের জন্য পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন। সম্পাদিত বই একশোরও বেশি।


















