রবিবার ৮ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী।

“শুক বলে ওঠো সারি ঘুমায়োনা আর/ এ জীবন গেলে ফিরে আসে না আবার!”


মানুষের চরিত্র-বৈশিষ্ট্য কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে শাস্ত্রে বহু উপদেশ, আদর্শ মানব চরিত্রের সন্ধানে গল্পসাহিত্য অক্লান্ত, মানুষ ও তার প্রতিবেশ, তার গড়ে তোলা সমাজ, তাকে ঘিরে থাকা রাষ্ট্রীয় আয়োজন সবকিছুর নেপথ্যেই মানব চরিত্রের একটা অনিবার্য ভূমিকা থাকে।

আর ভূমিকা থাকে মনোজগতের। মনের গতিপ্রকৃতি ঠিক করে দেয় মানুষের চিন্তা, ভাবনার হালচাল, তার বিশ্বাস, আদর্শ, কর্মবাসনা ও উদ্যোগের পথরেখা। গল্পসাহিত্য মানুষকে এসব কর্তব্য অকর্তব্যের ধারাপাত বোঝাতে গিয়ে মনুষ্যেতর প্রাণীদের চরিত্রগুলিতে কখনও মানবীয় বোধ-বুদ্ধি আরোপ করেছে, কখনও তাদের মাহাত্ম্য, কখনও তাদের চাতুর্য, কখনও তাদের নীচতার আখ্যানের লক্ষ্য ও প্রতিপাদ্য হল মানুষ, প্রাণীগুলির বাহ্য আচরণ ও তাদেরকে কেন্দ্র করে মানুষের কল্পনা ও ইচ্ছার রূপ-ই ফুটে ওঠে গল্পে গল্পে।
রাষ্ট্র, রাজশক্তি, তার লক্ষ্য ও আদর্শ আচরণবিধি এই গল্পগুলিতে একটি বিশেষ স্থান নেয়। সেখানে “কী করা উচিত” এবং “কী করা হচ্ছে” এই দুটি ক্ষেত্রে তত্ত্ব ও প্রয়োগের সংঘাত ও মিলনের পরিসরটুকু খুঁজে পাওয়ার একটা প্রচেষ্টা থাকে। গল্পগুলিতে রাষ্ট্রজীবনের লক্ষ্য ও মোক্ষের প্রসঙ্গ অনিবার্য হয়ে ওঠে, কারণ, নৈতিকতার পাঠে উন্নততর নাগরিক মানুষ, সামাজিক জীব করে তোলাই এইসব কাহিনির অন্যতম প্রতিপাদ্য।

জাতকমালার আজকের কাহিনিটি সেই রকম-ই। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে রাজা এবং তাঁর অমাত্যাদি সহকারীদের একত্রযাপনের, সংগঠিত কর্মপ্রয়াসের উল্লেখ পাওয়া যায়। এ আসলে আজকের টিমওয়ার্ক, পারস্পরিক নির্ভরতার পরিসর। দেখা যায়, রাজা যদি উচ্ছৃঙ্খল হন, নীতিভ্রষ্ট, কর্মবিমুখ হন তাহলে তাঁকে নানা উপায়ে প্রবুদ্ধ ও উদ্বুদ্ধ করার দায় ও দায়িত্ব কিংবা কর্তব্য থাকে অমাত্যের। শাস্ত্র বলবেন, বসুন্ধরা বীরভোগ্যা, বলবেন উদ্যোগী পুরুষের কাছেই রাজলক্ষ্মী ধরা দেন। রাজা যদি নীতি ও কর্তব্যবিমুখ হন, তাহলে তা প্রকারান্তরে তাঁর অস্তিত্বসঙ্কট ডেকে আনে। আজকের কাহিনীটি একে কেন্দ্র করেই।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-২৯: মাংস জাতক— বার বার দেখি বন্ধুরই মুখ শুধু

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১০৩: মা সারদা নিজের কষ্ট গোপন রাখতেন

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১২১: মহারাজ অফ শান্তিনিকেতন

সেই জন্মে বোধিসত্ত্ব বারাণসীরাজ ব্রহ্মদত্তের এক প্রধান অমাত্য। রাজা ছিলেন অতি অলস, বোধিসত্ত্ব রাজার এই স্বভাব দূর করার নানা প্রচেষ্টা করতেন। দর্শন বলবে, মানুষের দেহে সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ—এই তিন প্রকার গুণ নানা মাত্রায় থাকে। যে গুণটি অধিক থাকে, ব্যক্তি সেই গুণেই গুণান্বিত হয়, কিন্তু অন্য গুণগুলিও কম বেশি চরিত্রবৈশিষ্ট্যে বর্তমান থাকে। তমোগুণ আলস্যের জন্ম দেয়, মনে জেগে ওঠে দুষ্প্রবৃত্তি ও অন্যান্য নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য। যাইহোক, একদিন রাজোদ্যানে রাজা সহচরবেষ্টিত হয়ে সময় কাটাচ্ছেন, এমন সময় একটি অলস গজকুম্ভ তিনি দেখতে পেলেন।

গজকুম্ভ কী জাতীয় প্রাণী তার ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন। জাতকমালার অনুবাদক শ্রী ঈশানচন্দ্র ঘোষ অনুমান করছেন এটি হয়তো বা শামুক বা শামুকজাতীয় অতি মন্দগতির কোনও জীব। কচ্ছপের সম্ভাবনা তিনি খারিজ করেছেন, জানিয়েছেন সিংহলী অনুবাদে একে একজাতীয় কীট বলা হচ্ছে। সে যাই হোক, খরগোশ আর কচ্ছপের গল্প শুনে যে প্রজন্ম বড় হয়েছে, তাদের কাছে বিষয়টি তেমন গুরুতর নয়। ধীরগতি, কাজের আশু সম্পাদনে ব্যাঘাত ঘটলে কখনও কখনও ক্ষতি হয় বৈকী! কচ্ছপের ধীরগতি কাহিনির শেষে মহত্তর হয়ে উঠলেও দীর্ঘসূত্রতা বিনাশের কারণ এও তো অসত্য নয়।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১০৫: গাঙচিল

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১১৯: খাণ্ডবদহনের প্রেক্ষিতে জরিতা,লপিতা ও ঋষি মন্দপালের উপাখ্যানের আজ প্রাসঙ্গিকতা কোথায়?

আজকের দুনিয়া গতিময়, গতি ও অহেতুক তাড়া, অসুস্থ প্রতিযোগিতা হানিকর এ বিষয়ে নিঃসন্দেহ হয়েও বলা যায়, অনর্থক কালক্ষেপ-ও সর্বদাই ক্ষতি করে, স্লো বাট স্টেডি, বেটার লেট দ্যান নেভারের অপর পিঠে এই অনিবার্য সত্যটুকুও থাকে। শাস্ত্র এই আলস্যকে নিদ্রা, জাড্য বলতে চান, যার বিপরীতেই চরৈবেতির মহামন্ত্র জেগে উঠেছে।

তাই এখানে গজকুম্ভের কথা বলা হল, যে দিনে এক কিংবা দুই আঙুলমাত্র যেতে পারে। রাজার প্রশ্নের উত্তরে বয়স্য বোধিসত্ত্ব প্রাণীটির এই প্রকৃতির কথাই তুলে ধরলেন। তিনি ওই গজকুম্ভের কাছে জানতে চাইলেন যে এই গতি নিয়ে দাবানল লাগলে তারা আত্মরক্ষা করে কী করে?
আরও পড়ুন:

পর্দার আড়ালে, সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-৪: রিলেটিভিটি ও বিরিঞ্চিবাবা

রহস্য রোমাঞ্চের আলাস্কা, পর্ব-৬০: পাহাড়ের চূড়ায় বসে দেখলাম হিমবাহের সেই অপরূপ শোভা

খেয়াল রাখতে হবে, গজকুম্ভের এই গতি তার জন্য হানিকর কী হানিকর নয় তা এই কাহিনির প্রতিপাদ্য নয়। এই কাহিনির লক্ষ্য মনুষ্য-প্রকৃতি। কাজে কর্মে, চলনে, কর্মপ্রয়াসে কিংবা বাস্তবায়নে এই “করছি করবো দেখা যাক” ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি নিয়েই তো কথাটা! তো গজকুম্ভ জানায় যে, দাবানল হলে যদি গাছের কোটর অথবা মাটির গর্ত না জোটে তাহলে নিশ্চিত মরণ-ই একমাত্র ভবিতব্য।

কথাটি প্রণিধানযোগ্য। গুটিয়ে থাকা, কর্মবিমুখ মানুষ তার আলস্য ও নিশ্চলতাকে যুক্তিনিষ্ঠ উপায়ে প্রতিষ্ঠা দিতে চায়। বিবিধ উপায়ে তথাকথিত নিরপেক্ষতা কিংবা বিবিধ “কারেক্টনেসের”র অন্তরালে তারা শান্তিতে শয়ান থাকে। অন্যের বিপদে নিশ্চল থাকা তাদের “কারেক্টনেস”, নিজের বিপদে আত্মরক্ষা তাদের জীবনের দায়, কিন্তু কখনো কখনো তারা সেটুকুও পারে না, আলস্যজনিত কর্মবিমুখতা এবং তাকে প্রতিষ্ঠা দিতে দিতেই আত্মবিলোপের আশঙ্কা এসে পড়ে। তখনও তাদের আশ্রয় নিরালোক গোপন আশ্রয়, ভাগ্যক্রমে যদি সেই সুযোগ এসে পড়ে। অযুক্তি, অপযুক্তি ও নিজেকে অভ্রান্ত ও উচ্চতর রাখার যথাসাধ্য প্রচেষ্টা কখন যে এই বিপুলা বিচিত্র পৃথিবীতে বিপরীত আঘাত হানে!
আরও পড়ুন:

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৮২: যে রাজাকে দেখলে প্রজারা ভয় পান, সেই রাজা ভালো প্রশাসক হতে পারেন না

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১২০: একেজি কলিং

এই কাহিনি শেষে এই কথাই বলতে চাইবে যে, যেখানে ধীরে চলাই বিধেয় সেখানে যে তাড়া করে আর যেখানে আশু কর্মসম্পাদন বিধেয় সেখানে যে কালক্ষেপ করে স্বার্থনাশ অবশ্যম্ভাবী। যে বিলম্বের কাজ বিলম্বে করে, আশুকর্তব্য তন্দ্রা ও সুপ্তি ত্যাগ করে দ্রুত সম্পন্ন করে তার বৃদ্ধি ঘটে শুক্লপক্ষের চন্দ্রকলার মতোই, ক্রমে ক্রমে। বলাবাহুল্য, বোধিসত্ত্বের এই উপদেশে রাজার আলস্য ঘুচে গিয়েছিল।

শেষে একটা ছড়া হয়ে যাক? ছড়া পড়ুন, ছড়াবেন না প্লিজ।
‘তােলপাড়িয়ে উঠল পাড়া
তবু কর্তা দেন না সাড়া।
জাগুন শিগগির জাগুন।’


‘এলারামের ঘড়িটা যে
চুপ রয়েছে, কই সে বাজে?’


‘ঘড়ি পরে বাজবে, এখন
ঘরে লাগল আগুন।’


‘অসময়ে জাগলে পরে
ভীষণ আমার মাথা ধরে।’


‘জানলাটা ওই উঠল জ্ব’লে—
উর্ধ্বশ্বাসে ভাগুন।’


‘বড় জ্বালায় তিনকড়িটা।’


‘জ্ব’লে যে ছাই হ’ল ভিটা—
ফুটপাথে ওই বাকি ঘুমটা
শেষ করতে লাগুন।’ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content