
‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’ । ছবি : সংগৃহীত।
ছবি: আজও অর্ধাঙ্গিনী
পরিচালনা: কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়
অভিনয়: চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়, জয়া আহসান, কৌশিক সেন, অম্বরিশ ভট্টাচার্য, ইন্দ্রাশীষ রায়, লিলি চক্রবর্তী, আভেরি সিংহ রায়
রেটিং: ৪/৫
সমসাময়িক বাংলা চলচ্চিত্রে যখন একদিকে বাণিজ্যিক বিনোদনের জোয়ার, অন্যদিকে বিষয়নির্ভর চলচ্চিত্রের পরিসরও ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’ নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। এটি এমন এক ছবি, যা কেবল গল্প বলে না; বরং মানুষের সম্পর্ক, বিচ্ছেদ, স্মৃতি, অপরাধবোধ এবং ক্ষমার জটিল মনস্তত্ত্বকে গভীর সংবেদনশীলতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করে। ছবির শেষ হওয়ার পরও তার অনুরণন দীর্ঘক্ষণ দর্শকের মনে থেকে যায়।
‘অর্ধাঙ্গিনী’ বলতে স্ত্রীকে বোঝায়, যিনি স্বামীর জীবনের পরিপূরক, সহধর্মিণী এবং জীবনসঙ্গিনী। ভারতীয় শাস্ত্র ও সংস্কৃত সাহিত্যে এই শব্দটি কেবল পারিবারিক সম্পর্কের পরিচায়ক নয়, এটি দাম্পত্যের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক ঐক্যেরও প্রতীক। ভারতীয় সংস্কৃতিতে বিবাহ শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের পরিচয় বহন করে না, বরং দুই আত্মার পারস্পরিক পরিপূরকতার প্রতীক। কিন্তু বাস্তব জীবনে সেই পূর্ণতা কতখানি সম্ভব? সম্পর্কের সমাপ্তি কি সত্যিই শেষ, নাকি তার অদৃশ্য রেশ মানুষের জীবন জুড়ে বহমান থাকে? এই প্রশ্নগুলিকেই ছবির কেন্দ্রে এনে কৌশিক নির্মাণ করেছেন এক অসাধারণ সিনেমা।
আরও পড়ুন:

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০৪ : ত্রিপুরার রাজপরিবারে সতীদাহ প্রথা /৩

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৯৬ : উত্তরায়ণ

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫৯: মেঠো ইঁদুর

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৭৬ : আলোচনার টেবিলে
চিত্রনাট্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য তার সংযম ও পরিণত বয়ান। এখানে নাটকীয়তার বাহুল্য তো একেবারই নেই, বরং আবেগকে জোর করে উস্কে দেওয়ার প্রচেষ্টাও একেবারে অনুপস্থিত। বরং ছোট ছোট মুহূর্ত, নীরবতা, চোখের ভাষা, থেমে যাওয়া সংলাপ এবং দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ ঘটনাগুলিই ধীরে ধীরে চরিত্রগুলির মানসিক জগৎকে উন্মোচিত করে তুলেছে দর্শকের কাছে। ফলে দর্শকের বারবার মনে হয়েছে তিনি যেন কাহিনির বাইরের একজন দর্শক নন, বরং চরিত্রগুলির সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে ফেলছেন অনায়াসেই।

‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’ ছবিতে চূর্ণী-কৌশিক-জয়া। ছবি : সংগৃহীত।
ছবির প্রধান চরিত্রগুলি যেমন শুভ্রা, মেঘনা, সুমন, রঞ্জন এবং সুকান্ত। এঁরা কোনও বাঁধা ধরা আদর্শের প্রতীক নন; প্রত্যেকেই আপেক্ষিক ভাবে অসম্পূর্ণ, দ্বিধাগ্রস্ত এবং অত্যন্ত মানবিক। তাদের ভালোবাসার সঙ্গে যেমন জড়িয়ে আছে আকর্ষণ, তেমনি রয়েছে ভুল, অভিমান, আত্মসম্মান, অনুশোচনা। পরিচালক কাউকেই সম্পূর্ণ সঠিক বা সম্পূর্ণ ভুল হিসেবে চিহ্নিত করেনি। আর এই নিরপেক্ষ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই ছবিটিকে বাস্তবতার একদম কাছাকাছি এনে দিয়েছে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা পর্ব-১৬৮: রামায়ণে পরস্ত্রীহরণের সিদ্ধান্তে বীরত্বের প্রকাশ নেই, আছে অনেক মৃত্যুর আবাহনবার্তা

হ্যালো বাবু! পর্ব-১৪৩: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য / ২৩
অভিনয়ের দিক থেকে ছবিটি নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ। প্রথমেই আসি জয়া আহসান চরিত্রটিকে নিয়ে। পরিচালক তাঁর চরিত্রকে এমন সংযত অথচ গভীর অভিনয়ে জীবন্ত করে তুলেছেন, যা সাম্প্রতিক বাংলা চলচ্চিত্রে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর চোখের ভাষা, মুখাবয়বের সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি এবং নীরব উপস্থিতি চরিত্রকে মানুষের কাছে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।

‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’ ছবির একটি দৃশ্যে। ছবি : সংগৃহীত।
চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায় বরাবরের মতোই পরিণত অভিনয়ের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর চরিত্রে আত্মমর্যাদা, যন্ত্রণা এবং সংযম এক অনন্য ভারসাম্যে ধরা পড়েছে। কৌশিক সেনও অত্যন্ত মিতব্যয়ী অভিনয়ের মাধ্যমে এক জটিল মানসিক অবস্থাকে দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। সহ-অভিনেতাদের উপস্থিতিও ছবির সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করেছে। পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের নির্মাণশৈলীর সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। তিনি তার পরিচালিত ছবিতে কখনওই দর্শকের আবেগকে পরিচালিত করেন না; বরং এমন পরিস্থিতি নির্মাণ করেন, যেখানে দর্শক নিজেই নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে চরিত্রগুলিকে খুঁজে পান। এই স্বাধীনতা ছবির শিল্পগুণকে আরও অনেক বেশি সমৃদ্ধ করেছে।
আরও পড়ুন:

রথযাত্রা

দশভুজা : আমি আর কখনওই ফিরে আসার প্রত্যাশা করি না…
চিত্রগ্রহণ ছবির অন্যতম আকর্ষণ। ক্যামেরা কখনও চরিত্রের খুব কাছাকাছি এসে তাদের নিঃশ্বাসের শব্দকেও অনুভব করায়, আবার কখনও দূর থেকে সম্পর্কের নীরব ভাঙনকে পর্যবেক্ষণ করে। আলো-ছায়ার ব্যবহার, ফ্রেমের বিন্যাস এবং কলকাতা শহরের সংবেদনশীল উপস্থাপনা ছবিকে এক কাব্যিক আবহ প্রদান করেছে।
আবহসংগীতও উল্লেখযোগ্যভাবে সংযত। কোথাও অতিরিক্ত আবেগ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়নি। বরং নীরবতার ব্যবহারই বহু দৃশ্যে গভীরতম অনুভূতির জন্ম দিয়েছে। সংগীত গল্পের অনুগামী হয়েছে, গল্পকে কখনও ছাপিয়ে যায়নি। আজকালকার দ্রুত বিনোদনের প্রত্যাশী দর্শকের কাছে এই ছবির গতি কিছুটা মন্থর বলে মনে হতে পারে। তবে যে দর্শক চরিত্রের মনস্তত্ত্ব এবং সম্পর্কের সূক্ষ্ম পরিবর্তন উপলব্ধি করতে চান, তাঁদের কাছে এই ধীর ছন্দই ছবির প্রধান শক্তি।
আবহসংগীতও উল্লেখযোগ্যভাবে সংযত। কোথাও অতিরিক্ত আবেগ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়নি। বরং নীরবতার ব্যবহারই বহু দৃশ্যে গভীরতম অনুভূতির জন্ম দিয়েছে। সংগীত গল্পের অনুগামী হয়েছে, গল্পকে কখনও ছাপিয়ে যায়নি। আজকালকার দ্রুত বিনোদনের প্রত্যাশী দর্শকের কাছে এই ছবির গতি কিছুটা মন্থর বলে মনে হতে পারে। তবে যে দর্শক চরিত্রের মনস্তত্ত্ব এবং সম্পর্কের সূক্ষ্ম পরিবর্তন উপলব্ধি করতে চান, তাঁদের কাছে এই ধীর ছন্দই ছবির প্রধান শক্তি।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৫: পদ বা ক্ষমতা পেলেই কি ভিতরের স্বভাব বদলে যায়? পঞ্চতন্ত্রের অমোঘ শিক্ষা
‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’র সবচেয়ে বড় সাফল্য তার দার্শনিক পরিসর। ছবিটি কোনও সহজ উত্তর দেয় না; বরং একের পর এক প্রশ্ন উত্থাপন করে—বিচ্ছেদের পরও কি ভালোবাসা বেঁচে থাকে? ক্ষমা কি অতীতকে বদলে দিতে পারে? স্মৃতি কি মুক্তি দেয়, না আরও গভীর বন্ধনে আবদ্ধ করে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর পরিচালক দর্শকের উপরেই ছেড়ে দিয়েছেন।
সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতেও ছবিটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বর্তমান সময়ে আমরা প্রায়শই সম্পর্ককে প্রায়ই সাফল্য ও ব্যর্থতার মাপকাঠিতে বিচার করে ফেলি। কিন্তু এই চলচ্চিত্র দেখায়, একটি সম্পর্কের মূল্য তার স্থায়িত্বে নয়; বরং মানুষের জীবনে তার প্রভাব, শিক্ষা এবং মানসিক অভিঘাতে। তবে ছবির কিছু সীমাবদ্ধতাও উল্লেখযোগ্য। কয়েকটি দৃশ্য তুলনামূলক দীর্ঘ হওয়ায় কাহিনির গতি কোথাও কোথাও শ্লথ হয়েছে।
সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতেও ছবিটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বর্তমান সময়ে আমরা প্রায়শই সম্পর্ককে প্রায়ই সাফল্য ও ব্যর্থতার মাপকাঠিতে বিচার করে ফেলি। কিন্তু এই চলচ্চিত্র দেখায়, একটি সম্পর্কের মূল্য তার স্থায়িত্বে নয়; বরং মানুষের জীবনে তার প্রভাব, শিক্ষা এবং মানসিক অভিঘাতে। তবে ছবির কিছু সীমাবদ্ধতাও উল্লেখযোগ্য। কয়েকটি দৃশ্য তুলনামূলক দীর্ঘ হওয়ায় কাহিনির গতি কোথাও কোথাও শ্লথ হয়েছে।

‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’ ছবিতে চূর্ণী-জয়ার সমীকরণ। ছবি : সংগৃহীত।
সব মিলিয়ে ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’ বাংলা চলচ্চিত্রে সম্পর্কনির্ভর গল্প বলার এক পরিণত ও মননশীল উদাহরণ। এটি এমন একটি ছবি, যা প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে আসার পরও দর্শকের ভিতরে নীরবে বেঁচে থাকে। ভালোবাসার অর্থ, বিচ্ছেদের অভিঘাত এবং মানুষের অন্তর্লোক নিয়ে যারা ভাবতে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য এই চলচ্চিত্র এক অনিবার্য অভিজ্ঞতা।
লেখক: ড. সঞ্চিতা কুণ্ডু (Sanchita Kundu) সংস্কৃতের অধ্যাপিকা, হুগলি মহসিন কলেজ।


















