
কাপাডিয়া বললেন, “তাহলে ভেবে দেখুন, আমার রিসর্টকে কেন্দ্র করে নিশ্চয়ই কোন কন্সপিরেসি চলছে, তা-না-হলে বেছে-বেছে আমার রিসর্টের বোর্ডারদের উপরেই কেন কালাদেও এই আক্রমণগুলি করবে?”
মালাকার চেয়ারে সিধে হয়ে বসেছিলেন। কোনও কারণে তিনি উত্তেজিত, তা বোঝা যাচ্ছিল। মাঝে-মধ্যে আনমনা হয়ে পড়ছেন। কখন সামনে টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের পেপারওয়েটটাকে নিয়ে চরকিপাক দিচ্ছেন। কাপাডিয়ার কথা তাঁর কানে যাচ্ছে বলে মনে হয় না।
কাপাডিয়াও বুঝতে পারছিলেন, কোনও কারণে মালাকার আপসেট আছেন কিংবা আনমনা আছেন। তিনি গলায় সজোরে শব্দ করে মালাকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলেন। মালাকার তাঁর দিকে তাকালেন, এইমাত্র।
কাপাডিয়া বললেন, “আপনি আমার কথা শুনছেন স্যার?”
“অ্যাঁ! কথা? কী কথা? ও আপনার কথা… হ্যাঁ…হ্যাঁ…শুনছি, শুনছি… অবশ্যই শুনছি…” মালাকার নিজস্ব চিন্তার জগত থেকে ঝাঁকুনি দিয়ে বেরুনোর চেষ্টা করলেন যেন।
কাপাডিয়া হাসলেন। ম্লান হাসি। বললেন, “স্যার, আপনি আমার কথায় কর্ণপাত করছেন না? আপনারা যদি এভাবে মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহলে আমরা কোথায় যাই?”
“অ্যাঁ! কেন! কী হয়েছে?”
“এই দেখুন। এইমাত্র বললেন আমার কথা শুনছেন কিন্তু আদতে কিছুই শোনেননি। এদিকে আমি সাতসকালে রিসর্টের কাজকর্ম ফেলে রেখে আপনার কাছে ছুটে এসেছি আর্জি নিয়ে!”
“আরে ডোন্ট মাইন্ড। একটু চাপে আছি কাজকর্ম নিয়ে। সে-জন্য আবসেন্ট মাইন্ডেড হয়ে পড়েছিলাম। শুনব, এবার শুনিওব। চা খাবেন?”
“আজ্ঞে না। আমি সকালে একবারই চা খাই। সেটা খেয়েই এসেছি। আপনি চাইলে খেতে পারেন!”
“হ্যাঁ, আমার আবার ঘণ্টায়-ঘণ্টায় চা না হলে চলেই না! দাঁড়ান, একটু চায়ের ব্যবস্থা করি আগে! বলে বেল বাজিয়ে একজন সিভিক পুলিশকে ডাকলেন। সে আসতে তাকে বললেন, “এক কাপ চা আর একটা ডিম-টোস্ট পাঠিয়ে দাও। ইনি এসেছেন। খেতে-খেতে শুনি এঁর কথা। আপনি তো খাবেন না তাহলে? ডিম-টোস্ট?”
মাথা নেড়ে কাপাডিয়া জানালেন তিনি খাবেন না। সিভিক পুলিশ চলে গেল আদেশ পালন করতে। যদিও এই আদেশ পালন করা তার ডিউটির মধ্যে পড়ে না। কিন্তু আমাদের সিস্টেম এই ব্যাপারগুলিকে এমনভাবে অ্যাডাপ্ট করে নিয়েছে, কেউ আর প্রতিবাদ করে না। এ-সব ব্যাপারকে নরম্যাল বলে মনে করে।
মালাকার চেয়ারে সিধে হয়ে বসেছিলেন। কোনও কারণে তিনি উত্তেজিত, তা বোঝা যাচ্ছিল। মাঝে-মধ্যে আনমনা হয়ে পড়ছেন। কখন সামনে টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের পেপারওয়েটটাকে নিয়ে চরকিপাক দিচ্ছেন। কাপাডিয়ার কথা তাঁর কানে যাচ্ছে বলে মনে হয় না।
কাপাডিয়াও বুঝতে পারছিলেন, কোনও কারণে মালাকার আপসেট আছেন কিংবা আনমনা আছেন। তিনি গলায় সজোরে শব্দ করে মালাকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলেন। মালাকার তাঁর দিকে তাকালেন, এইমাত্র।
কাপাডিয়া বললেন, “আপনি আমার কথা শুনছেন স্যার?”
“অ্যাঁ! কথা? কী কথা? ও আপনার কথা… হ্যাঁ…হ্যাঁ…শুনছি, শুনছি… অবশ্যই শুনছি…” মালাকার নিজস্ব চিন্তার জগত থেকে ঝাঁকুনি দিয়ে বেরুনোর চেষ্টা করলেন যেন।
কাপাডিয়া হাসলেন। ম্লান হাসি। বললেন, “স্যার, আপনি আমার কথায় কর্ণপাত করছেন না? আপনারা যদি এভাবে মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহলে আমরা কোথায় যাই?”
“অ্যাঁ! কেন! কী হয়েছে?”
“এই দেখুন। এইমাত্র বললেন আমার কথা শুনছেন কিন্তু আদতে কিছুই শোনেননি। এদিকে আমি সাতসকালে রিসর্টের কাজকর্ম ফেলে রেখে আপনার কাছে ছুটে এসেছি আর্জি নিয়ে!”
“আরে ডোন্ট মাইন্ড। একটু চাপে আছি কাজকর্ম নিয়ে। সে-জন্য আবসেন্ট মাইন্ডেড হয়ে পড়েছিলাম। শুনব, এবার শুনিওব। চা খাবেন?”
“আজ্ঞে না। আমি সকালে একবারই চা খাই। সেটা খেয়েই এসেছি। আপনি চাইলে খেতে পারেন!”
“হ্যাঁ, আমার আবার ঘণ্টায়-ঘণ্টায় চা না হলে চলেই না! দাঁড়ান, একটু চায়ের ব্যবস্থা করি আগে! বলে বেল বাজিয়ে একজন সিভিক পুলিশকে ডাকলেন। সে আসতে তাকে বললেন, “এক কাপ চা আর একটা ডিম-টোস্ট পাঠিয়ে দাও। ইনি এসেছেন। খেতে-খেতে শুনি এঁর কথা। আপনি তো খাবেন না তাহলে? ডিম-টোস্ট?”
মাথা নেড়ে কাপাডিয়া জানালেন তিনি খাবেন না। সিভিক পুলিশ চলে গেল আদেশ পালন করতে। যদিও এই আদেশ পালন করা তার ডিউটির মধ্যে পড়ে না। কিন্তু আমাদের সিস্টেম এই ব্যাপারগুলিকে এমনভাবে অ্যাডাপ্ট করে নিয়েছে, কেউ আর প্রতিবাদ করে না। এ-সব ব্যাপারকে নরম্যাল বলে মনে করে।
সিভিক ছেলেটি চলে গেলে মালাকার কাপাডিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, আপনি শুরু করুন। কী যেন বলতে এসেছিলেন!”
“দেখুন, আমি বলতে এসেছিলাম যে, এভাবে বারবার আমাদের রিসর্টকে যে টার্গেট করা হচ্ছে, এতে তো আমাদের ব্যবসা এবার গোটাতে হবে এখানে থেকে!”
“কেন আবার কী হল?”
“নতুন করে আর কী হওয়ার আছে? অরণ্যবাবুর ওপর যে অ্যাটেম্পটটা হল, তার পরেও এ-কথা জিজ্ঞাসা করবেন অফিসার? আমরা এখানে ব্যবসা করতে এসেছি। এখন প্রশাসন থেকে যদি প্রোটেকশন না দেওয়া হয়, তাহলে তো ব্যবসা গোটানো ছাড়া আর কোনও পথ খোলা থাকবে না!”
“তা গুটিয়ে নেবেন…!” মালাকার এমনভাবে কথাটা বললেন যেন শতরঞ্চি বা মাদুর গুটিয়ে নেওয়ার কথা বলছেন।
“কী বললেন?” কাপাডিয়া হতভম্ব্বের মতো মুখ করে জিজ্ঞাসা করলেন।
“বলছি ব্যবসা গোতাতে হয় গুটিয়ে নেবেন। আপনাদেরই তো ভুল। পিশাচপাহাড়ে কেউ এ-সব রিসর্ট খোলে?”
“মানে ?”
“আপনারা না জেনে-শুনে এখানে রিসর্টটা খুলতে গেলেন কেন?”
“বুঝলাম না!”
“পিশাচপাহাড়ে এই আপনারা ব্যবসা শুরু করার আগে পর্যন্ত শ্মশানের শান্তি বিরাজ করত। আই মিন, কোন ঝুটঝামেলা ছিল না। খুন, জখম, রাহাজানি কিছুই হত না তখন। আপনারা রিসর্টি-হোটেল-মোটেল খুললেন, কলকাতা থেকে বাবু-বিবিরা এল, বেলেল্লাপনা আর ফূর্তি করতে। পিশাচপাহাড়ের যে পবিত্রতা ছিল, সব নষ্ট করে দিলেন আপনারা। আর এখন বলছেন, রিসর্ট তুলে দিতে হবে? খুলতেই কে বলেছিল আপনাদের?”
“পাহাড়ের আবার পবিত্রতা?”
“কেন? থাকতে নেই? পাহাড় মানে কি অপবিত্র বলে মনে করেন নাকি আপনি? পিশাচপাহাড়ে কার অধিষ্ঠান জানেন না? কী জানেন তো?”
“দেখুন, আমি বলতে এসেছিলাম যে, এভাবে বারবার আমাদের রিসর্টকে যে টার্গেট করা হচ্ছে, এতে তো আমাদের ব্যবসা এবার গোটাতে হবে এখানে থেকে!”
“কেন আবার কী হল?”
“নতুন করে আর কী হওয়ার আছে? অরণ্যবাবুর ওপর যে অ্যাটেম্পটটা হল, তার পরেও এ-কথা জিজ্ঞাসা করবেন অফিসার? আমরা এখানে ব্যবসা করতে এসেছি। এখন প্রশাসন থেকে যদি প্রোটেকশন না দেওয়া হয়, তাহলে তো ব্যবসা গোটানো ছাড়া আর কোনও পথ খোলা থাকবে না!”
“তা গুটিয়ে নেবেন…!” মালাকার এমনভাবে কথাটা বললেন যেন শতরঞ্চি বা মাদুর গুটিয়ে নেওয়ার কথা বলছেন।
“কী বললেন?” কাপাডিয়া হতভম্ব্বের মতো মুখ করে জিজ্ঞাসা করলেন।
“বলছি ব্যবসা গোতাতে হয় গুটিয়ে নেবেন। আপনাদেরই তো ভুল। পিশাচপাহাড়ে কেউ এ-সব রিসর্ট খোলে?”
“মানে ?”
“আপনারা না জেনে-শুনে এখানে রিসর্টটা খুলতে গেলেন কেন?”
“বুঝলাম না!”
“পিশাচপাহাড়ে এই আপনারা ব্যবসা শুরু করার আগে পর্যন্ত শ্মশানের শান্তি বিরাজ করত। আই মিন, কোন ঝুটঝামেলা ছিল না। খুন, জখম, রাহাজানি কিছুই হত না তখন। আপনারা রিসর্টি-হোটেল-মোটেল খুললেন, কলকাতা থেকে বাবু-বিবিরা এল, বেলেল্লাপনা আর ফূর্তি করতে। পিশাচপাহাড়ের যে পবিত্রতা ছিল, সব নষ্ট করে দিলেন আপনারা। আর এখন বলছেন, রিসর্ট তুলে দিতে হবে? খুলতেই কে বলেছিল আপনাদের?”
“পাহাড়ের আবার পবিত্রতা?”
“কেন? থাকতে নেই? পাহাড় মানে কি অপবিত্র বলে মনে করেন নাকি আপনি? পিশাচপাহাড়ে কার অধিষ্ঠান জানেন না? কী জানেন তো?”
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮৫: আইসিইউ কেবিন নং ২০৪

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-১৫৩: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

বিনায়ক : বিশ্বকর্মা
“আপনি কি কালাদেওর কথা বলতে চাইছেন?”
“বলতে চাইছি না, বলছি। কালাদেও প্রচণ্ড জাগ্রত দেবতা। তিনি এমনিতে ভালো, কারুর সাতে-পাঁচে থাকেন না, বছরের একদিন সামান্য একটু খাবার-দাবার নিবেদন করলেই তুষ্ট হয়ে তিনি পাহাড় আর আমাদের সকলকে রক্ষা করেন। কিন্তু কোনও কারণে যদি কূপিত হল, তাহলে আর রক্ষা নেই। আপনারা সেই কাজটিই করেছেন হোটেল-রিসর্টগুলি খুলে। অতএব দেও রেগে গেছেন। একের-পর-এক আক্রণ তাঁর সেই কোপের কারণেই। এখান থেকে ব্যবসা গুটিয়ে চলে যান, দেখবেন আর কোনও সমস্যাই থাকবে না!”
“এটা আপনার ব্যক্তিগত মত, নাকি প্রশাসনের মত?” কাপাডিয়া শান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করলেন।
“এখন আপাতত আমার ব্যক্তিগত মতামত, কিন্তু কিছুদিন পরে যে প্রশাসনের মতও একইরকম হয়ে দাঁড়াবে না, সে-ব্যাপারে গ্যারান্টী দিতে পারছি না!”
“পিশাচপাহাড়ের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এই হোটেল বা রিসর্টগুলি ঠিক কী ভূমিকা পালন করেছে, তা জানা আছে আপনার?”
মালাকার প্রত্যুত্তরে কাঁধ ঝাঁকিয়ে প্রশ্নটা যেন হেলায় উড়িয়ে দিলেন। কাপাডিয়া অবশ্য দেখেও দেখলেন না। বললেন, “আমি জানি আপনি তা জানেন ভালো করে। এখামে গ্রামগুলিতে মানুষ দু’বেলা পেটভরে খেতে পেত না। এইসমস্ত হোটেল-রিসর্ট খোলার পর তাদের অনেকেই এগুলিতে কাজকর্ম করছে, দু’-পয়সা ঘরে নিয়ে যাচ্ছে, সংসারে স্বচ্ছলতা এসেছে। এ-সবকে আপনি অস্বীকার করতে পারবেন?”
“আপনি দেখছি মনে হচ্ছে, নির্বাচনী জনসভায় বক্তৃতা দিতে এসেছেন? দেখুন, আপনাদের হোটেল-স্পা এ-সমস্ততে কাজ না করেও এখন এই মানূষগুলি খেতে পেত। সরকারি স্কিমগুলি থেকে এরা অনেকেই মাসে-মাসে যথেষ্ট পায়। আগে সে-টুকুও পেত না! অতএব হোটেল রিসর্ট না থাকলে ক্ষতিবৃদ্ধি হত না!” মালাকার বললেন।
“স্কিম তো আছে। এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে সকলের কাছে সমানভাবে তা পৌঁছয় কি? আমাদের এখানে এখনও অনেক বাড়ির মেয়েরা তাদের প্রাপ্য মাসিক ভাতা পায় না। অফিস থেকে বারবার এটা আনো, ওটা আনো করছে। তদন্ত করলে হয়তো দেখবেন, এদের নামে-নামে টাকা আসছে আর তা মাঝপথে লুট করে নিচ্ছে এইসব চুনোপুঁটিরা। তা-না-হলে গ্রামগুলিতে ঘুরে দেখুন, টের পাবেন, সরকারি স্কিম থাকার পরেও এদের এত গরিবি কেন?”
“আপনি তো ভালোই বাংলা বলেন ? তাহলে এতদিন হিন্দি মারাতেন কেন? দিমাগী নকশালের মতো কথা বলছেন মনে হচ্ছে!”
কাপাডিয়া “দিমাগী নকশাল” শব্দবন্ধ শুনে একটু সতর্ক হলেন। বললেন, “কী যে বলেন? তাছাড়া এত বছর বাংলায় আছি, বাংলা বলতে শিখব না? তবে নিজের ভাষায় কথা বলে যে সুখ, তা কি আর…সে জন্যই বিহারী হিন্দি ঠাঁট চলে আসে আর কি…”
“বুঝলাম।”
“কিন্তু স্যার, আমার কথাটা সিরিয়াসলি একবার ভাবুন। আমার মনে হয়, কালাদেও এতটা নিষ্ঠুর হতে পারেন না। কেউ বা কেউ-কেউ আমাদের সংস্থার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে বাজারে আমাদের রিসর্টের বদনাম করতে চাইছে, যাতে আগামীদিনে কোন ট্যুরিস্ট আমাদের রিসর্টে না আসে এবং আমাদের এখান থেকে ব্যবসা গোটাতে হয়!”
“দেখুন, এইটুকু একটা জায়গা, সবাই মিলেমিশেই ব্যবসা করতে চাইবে, কেন কেউ আপনাদের পিছনে লাগতে চাইবে? আপনারা ভুল ভাবছেন…” মালাকার বললেন। তাঁর চোখ ফোনের স্ক্রিনে।
“বলতে চাইছি না, বলছি। কালাদেও প্রচণ্ড জাগ্রত দেবতা। তিনি এমনিতে ভালো, কারুর সাতে-পাঁচে থাকেন না, বছরের একদিন সামান্য একটু খাবার-দাবার নিবেদন করলেই তুষ্ট হয়ে তিনি পাহাড় আর আমাদের সকলকে রক্ষা করেন। কিন্তু কোনও কারণে যদি কূপিত হল, তাহলে আর রক্ষা নেই। আপনারা সেই কাজটিই করেছেন হোটেল-রিসর্টগুলি খুলে। অতএব দেও রেগে গেছেন। একের-পর-এক আক্রণ তাঁর সেই কোপের কারণেই। এখান থেকে ব্যবসা গুটিয়ে চলে যান, দেখবেন আর কোনও সমস্যাই থাকবে না!”
“এটা আপনার ব্যক্তিগত মত, নাকি প্রশাসনের মত?” কাপাডিয়া শান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করলেন।
“এখন আপাতত আমার ব্যক্তিগত মতামত, কিন্তু কিছুদিন পরে যে প্রশাসনের মতও একইরকম হয়ে দাঁড়াবে না, সে-ব্যাপারে গ্যারান্টী দিতে পারছি না!”
“পিশাচপাহাড়ের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এই হোটেল বা রিসর্টগুলি ঠিক কী ভূমিকা পালন করেছে, তা জানা আছে আপনার?”
মালাকার প্রত্যুত্তরে কাঁধ ঝাঁকিয়ে প্রশ্নটা যেন হেলায় উড়িয়ে দিলেন। কাপাডিয়া অবশ্য দেখেও দেখলেন না। বললেন, “আমি জানি আপনি তা জানেন ভালো করে। এখামে গ্রামগুলিতে মানুষ দু’বেলা পেটভরে খেতে পেত না। এইসমস্ত হোটেল-রিসর্ট খোলার পর তাদের অনেকেই এগুলিতে কাজকর্ম করছে, দু’-পয়সা ঘরে নিয়ে যাচ্ছে, সংসারে স্বচ্ছলতা এসেছে। এ-সবকে আপনি অস্বীকার করতে পারবেন?”
“আপনি দেখছি মনে হচ্ছে, নির্বাচনী জনসভায় বক্তৃতা দিতে এসেছেন? দেখুন, আপনাদের হোটেল-স্পা এ-সমস্ততে কাজ না করেও এখন এই মানূষগুলি খেতে পেত। সরকারি স্কিমগুলি থেকে এরা অনেকেই মাসে-মাসে যথেষ্ট পায়। আগে সে-টুকুও পেত না! অতএব হোটেল রিসর্ট না থাকলে ক্ষতিবৃদ্ধি হত না!” মালাকার বললেন।
“স্কিম তো আছে। এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে সকলের কাছে সমানভাবে তা পৌঁছয় কি? আমাদের এখানে এখনও অনেক বাড়ির মেয়েরা তাদের প্রাপ্য মাসিক ভাতা পায় না। অফিস থেকে বারবার এটা আনো, ওটা আনো করছে। তদন্ত করলে হয়তো দেখবেন, এদের নামে-নামে টাকা আসছে আর তা মাঝপথে লুট করে নিচ্ছে এইসব চুনোপুঁটিরা। তা-না-হলে গ্রামগুলিতে ঘুরে দেখুন, টের পাবেন, সরকারি স্কিম থাকার পরেও এদের এত গরিবি কেন?”
“আপনি তো ভালোই বাংলা বলেন ? তাহলে এতদিন হিন্দি মারাতেন কেন? দিমাগী নকশালের মতো কথা বলছেন মনে হচ্ছে!”
কাপাডিয়া “দিমাগী নকশাল” শব্দবন্ধ শুনে একটু সতর্ক হলেন। বললেন, “কী যে বলেন? তাছাড়া এত বছর বাংলায় আছি, বাংলা বলতে শিখব না? তবে নিজের ভাষায় কথা বলে যে সুখ, তা কি আর…সে জন্যই বিহারী হিন্দি ঠাঁট চলে আসে আর কি…”
“বুঝলাম।”
“কিন্তু স্যার, আমার কথাটা সিরিয়াসলি একবার ভাবুন। আমার মনে হয়, কালাদেও এতটা নিষ্ঠুর হতে পারেন না। কেউ বা কেউ-কেউ আমাদের সংস্থার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে বাজারে আমাদের রিসর্টের বদনাম করতে চাইছে, যাতে আগামীদিনে কোন ট্যুরিস্ট আমাদের রিসর্টে না আসে এবং আমাদের এখান থেকে ব্যবসা গোটাতে হয়!”
“দেখুন, এইটুকু একটা জায়গা, সবাই মিলেমিশেই ব্যবসা করতে চাইবে, কেন কেউ আপনাদের পিছনে লাগতে চাইবে? আপনারা ভুল ভাবছেন…” মালাকার বললেন। তাঁর চোখ ফোনের স্ক্রিনে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৭: শিশুপালের একশত অপরাধ ক্ষমার যোগ্য, কেন? এর কোন তাৎপর্য আছে কি?

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!
“স্যার, ছোট জায়গা বলেই তো পিছনে লাগবে। স্থানীয় অনেকেই আমাদের দেখাদেখি এখানে হোটেল বা রিসর্ট কিংবা স্টে-হোমের ব্যবসা চালু করেছে। এইটুকু জায়গায় বছিওরের বিশেষ সিজন ছাড়া তো আর ট্যুরিস্ট হয় না। গরমের দিনে যতই আপনি এসির ব্যবস্থা রাখুন, লোকে যেহেতু বাইরে বেরুতে পারে না, ঘুরে-বেড়াতে পারে না, তারা কেন আসবে? আমাদের ইখানে সামারসিজনে এজন্যই ট্যুরিস্ট হয় না। এই বসন্তকাল চলে গেলে কী অবস্থা হয় হোটেল-বিজনেসের তা আপনার অজানা নয় স্যার। তো কথা হল, এই অবস্থায়, একই জায়গায় প্রফিট বেশি করতে হলে যত আপনার রাইভালদের হটাতে পারবেন, তত সুবিধা হবে না কি? আমরা যেহেতু বাইরে থেকে এখানে এসে এই বিজনেস চালু করেছিলাম, ফলে আমাদের পিছনেই হাত ধুয়ে পড়ে গিয়েছে। অথচ আমরা পথ না-দেখালে এই বিজনেস এখানে শুরু হতে পারত স্যার? বলুন আপনি?”
“দেখুন মিঃ কাপাডিয়া, আমাদের হাত-পা বাঁধা। কালদেওর বিরুদ্ধে কিছু করা মানুষের সাধ্য নয়, আর মানুষের বিরুদ্ধে কিছু করতে গেলে চাই প্রমাণ। আপনার কথা সত্য হতেই পারে, কিন্তু প্রমাণ চাই তো?”
এইসময় একটি লোক “আআসছি স্যার” বলে ঘরে ঢুকে মালাকারের টেবিলে চা আর এগটোস্ট রেখে গেল। মালাকার এগটোস্টের একটা তুলে হালকা কামড় দিলেন, তারপর চিবোতে-চিবোতে বললেন, “দেখুন আপনার যদি কাউকে সন্দেহ হয়, তাহলে আপনি নাম উল্লেখ করে একটা এফআইআর করুন। আপনাদের সঙ্গে থানার কোন শত্রুতা নেই। প্রথম থেকেই আপনারা থানার সঙ্গে সুন্দর বন্দোবস্ত করে চলেছেন। মাসের প্রথমেই থানায় আপনাদের গিফট পৌঁছে যায়। সুতরাং সেই জন্যই আপনাদের দেখভাল করা আমাদের ডিউটির মধ্যে পড়ে। কিন্তু বিনা এফআইআরে কেবল কাকে কান নিয়ে গেছে শুনে কানে হাত না দিয়ে তো আর কাকের পিছনে ছুটতে পারি না ? একটা রিপোর্ট লিখিয়ে দিয়ে যান। তারপর না হয়…”
“দেখুন মিঃ কাপাডিয়া, আমাদের হাত-পা বাঁধা। কালদেওর বিরুদ্ধে কিছু করা মানুষের সাধ্য নয়, আর মানুষের বিরুদ্ধে কিছু করতে গেলে চাই প্রমাণ। আপনার কথা সত্য হতেই পারে, কিন্তু প্রমাণ চাই তো?”
এইসময় একটি লোক “আআসছি স্যার” বলে ঘরে ঢুকে মালাকারের টেবিলে চা আর এগটোস্ট রেখে গেল। মালাকার এগটোস্টের একটা তুলে হালকা কামড় দিলেন, তারপর চিবোতে-চিবোতে বললেন, “দেখুন আপনার যদি কাউকে সন্দেহ হয়, তাহলে আপনি নাম উল্লেখ করে একটা এফআইআর করুন। আপনাদের সঙ্গে থানার কোন শত্রুতা নেই। প্রথম থেকেই আপনারা থানার সঙ্গে সুন্দর বন্দোবস্ত করে চলেছেন। মাসের প্রথমেই থানায় আপনাদের গিফট পৌঁছে যায়। সুতরাং সেই জন্যই আপনাদের দেখভাল করা আমাদের ডিউটির মধ্যে পড়ে। কিন্তু বিনা এফআইআরে কেবল কাকে কান নিয়ে গেছে শুনে কানে হাত না দিয়ে তো আর কাকের পিছনে ছুটতে পারি না ? একটা রিপোর্ট লিখিয়ে দিয়ে যান। তারপর না হয়…”
আরও পড়ুন:

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার : শতফুল বিকশিত হোক

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১১ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ৪
“শক্ তো আছে, কিন্তু কারুর নাম করলে তো আইনের জালে ফেঁসে যাব স্যার! জেনারেল রিপোর্টে যদি কিছু হয় অর্থাৎ আমরা কেবল সমস্যার ইশারা দিলাম, আপনারা তার উপর ভিত্তি করে তদন্ত স্টার্ট করলেন, তাহলে হোবে না?”
“দেখুন, জানেন তো। অনেক কিছুই হতে পারত কিন্তু এখন হবে না। কেন তা আপনি-আমি সকলেই জানি। দিব্যি আমরা কেসটা হ্যাণদেল করছিলাম, হঠাৎ করে রাজ্য পুলিশের মনে হল, কলকাতা থেকে গোয়েন্দা-বিভাগ থেকে জোকার না আনলে সার্কাস জমবে না। অতএব শাক্য সিংহ হাজির। এসে এমন হাবভাব দেখাল যে, দু’দিনেই কেস ফিনিশ করে দেবে। কিন্তু পারলো কি? আরে বাবা, কত জায়গায় যেতে হত, কত কী করার ছিল, তা না করে কখন ওই একটা বদচলন মেয়ে নুনিয়া, কখন হেলথসেন্টারের ডাক্তার—এসবের পিছনেই পড়ে থাকল। আর একের পর এক রেইড করে আমাদের অকাজ বাড়িয়ে দিচ্ছে। হেলথসেন্টারে কিছু আনওয়ান্টেড এলিমেন্ট রাতের অন্ধকারে এসেছিল, সম্ভবত শরীর-টরির খারাপ হয়ে থাকবে, শাক্য সিংহ এখানে একটা খোঁচড় জুটিয়ে নিয়েছে, সেকেন্ড অফিসার সুদীপ্ত, সে-ও তেল মারছে ওই গোয়েন্দা মালটাকে, ভাবছে, চিরকাল এখানে মালটা থেকে যাবে আর ওকে প্রোটেকশন দেবে! যাই হোক, শাক্য সিংহ সুদীপ্তকে বলে ওই স্ক্রাউন্ডেলগুলিকে থানায় এনে লকআপে রেখেছে। তার মানে কোর্টে তোলো, কেসফাইল রেডি কর, হাজার ঝামেলা। তার উপর একজন পুলিশের গুলিতে উন্ডেড, ভাবতে পারছেন তো, এর জবাবদিহি আমাকেই করতে হবে। তাহলে কথা হল কি, আমি যদি একটু ফ্রি হতাম, তাহলে আপনাদের কেস নিয়ে ভাবতে পারতাম। কিন্তু কাজের উপর কাজ চাপিয়ে দিয়ে আমাকে জেরবার করে তোলা হচ্ছে। কেন হচ্ছে আমি জানি, ওই সুদীপ্ত চায় আমি এখান থেকে চলে যাই আর ও আমার জায়গায় এখানকার দন্ডমুডের কর্তা হয়ে বসে ! এদিকে মুখে সতীপনা, আপনাদের পাঠানো গিফট থেকে ভাগ নেয় না। আসলে কিন্তু পুরোটাই চায়, তাই নেয় না। ওই যে একটা বিজ্ঞাপন আছে না, আরে ওই যে, কী বলে, এ-স্বাদের ভাগ হবে না, সেইরকম!” উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন মালাকার বলতে-বলতে।
“দেখুন, জানেন তো। অনেক কিছুই হতে পারত কিন্তু এখন হবে না। কেন তা আপনি-আমি সকলেই জানি। দিব্যি আমরা কেসটা হ্যাণদেল করছিলাম, হঠাৎ করে রাজ্য পুলিশের মনে হল, কলকাতা থেকে গোয়েন্দা-বিভাগ থেকে জোকার না আনলে সার্কাস জমবে না। অতএব শাক্য সিংহ হাজির। এসে এমন হাবভাব দেখাল যে, দু’দিনেই কেস ফিনিশ করে দেবে। কিন্তু পারলো কি? আরে বাবা, কত জায়গায় যেতে হত, কত কী করার ছিল, তা না করে কখন ওই একটা বদচলন মেয়ে নুনিয়া, কখন হেলথসেন্টারের ডাক্তার—এসবের পিছনেই পড়ে থাকল। আর একের পর এক রেইড করে আমাদের অকাজ বাড়িয়ে দিচ্ছে। হেলথসেন্টারে কিছু আনওয়ান্টেড এলিমেন্ট রাতের অন্ধকারে এসেছিল, সম্ভবত শরীর-টরির খারাপ হয়ে থাকবে, শাক্য সিংহ এখানে একটা খোঁচড় জুটিয়ে নিয়েছে, সেকেন্ড অফিসার সুদীপ্ত, সে-ও তেল মারছে ওই গোয়েন্দা মালটাকে, ভাবছে, চিরকাল এখানে মালটা থেকে যাবে আর ওকে প্রোটেকশন দেবে! যাই হোক, শাক্য সিংহ সুদীপ্তকে বলে ওই স্ক্রাউন্ডেলগুলিকে থানায় এনে লকআপে রেখেছে। তার মানে কোর্টে তোলো, কেসফাইল রেডি কর, হাজার ঝামেলা। তার উপর একজন পুলিশের গুলিতে উন্ডেড, ভাবতে পারছেন তো, এর জবাবদিহি আমাকেই করতে হবে। তাহলে কথা হল কি, আমি যদি একটু ফ্রি হতাম, তাহলে আপনাদের কেস নিয়ে ভাবতে পারতাম। কিন্তু কাজের উপর কাজ চাপিয়ে দিয়ে আমাকে জেরবার করে তোলা হচ্ছে। কেন হচ্ছে আমি জানি, ওই সুদীপ্ত চায় আমি এখান থেকে চলে যাই আর ও আমার জায়গায় এখানকার দন্ডমুডের কর্তা হয়ে বসে ! এদিকে মুখে সতীপনা, আপনাদের পাঠানো গিফট থেকে ভাগ নেয় না। আসলে কিন্তু পুরোটাই চায়, তাই নেয় না। ওই যে একটা বিজ্ঞাপন আছে না, আরে ওই যে, কী বলে, এ-স্বাদের ভাগ হবে না, সেইরকম!” উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন মালাকার বলতে-বলতে।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৬: শাঁখামুটি
কাপাডিয়া বিব্রত বোধ করছিলেন। বিভাগের অভ্যন্তরীণ ঝুটঝামেলা বা অসূয়ার কথা জেনে তাঁর কী লাভ? তবে ব্যক্তিগতভাবে যতটা তিনি দেখেছেন, তাতে সুদীপ্তকে অনেক স্টেডি এবং ঝকঝকে অফিসার বলে তাঁর মনে হয়েছে। তিনি গলায় আওয়াজ করে বললেন, “এসব কথা, আমাকে…মানে…”
মালাকার মুখভর্তি খাবার নিয়ে খেতে-খেতে কথা বলার চেষ্টা করলেন, হাত নেড়ে বললেন, “আরে আপনি বন্ধু মানুষ, সঙ্কোচের কোন কারণ নেই। এস-ব কথা বাইরে যাবে না। ভয় পাচ্ছেন কেন?”
“তাহলে আমার কেসটা…”
“দেখছি কি করা যায়…” বনলতে-বলতে একটা ফোন এল মালাকারের ফোনে।
মালাকার চাপা গলায় ‘হাঁ-হুঁ’ করছিলেন। তাঁর মুখের রং দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। এমন ফ্যাকাশে মুখ এর আগে কাপাডিয়া কখন দেখেছেন বলে মনে পড়ল না। —চলবে।
মালাকার মুখভর্তি খাবার নিয়ে খেতে-খেতে কথা বলার চেষ্টা করলেন, হাত নেড়ে বললেন, “আরে আপনি বন্ধু মানুষ, সঙ্কোচের কোন কারণ নেই। এস-ব কথা বাইরে যাবে না। ভয় পাচ্ছেন কেন?”
“তাহলে আমার কেসটা…”
“দেখছি কি করা যায়…” বনলতে-বলতে একটা ফোন এল মালাকারের ফোনে।
মালাকার চাপা গলায় ‘হাঁ-হুঁ’ করছিলেন। তাঁর মুখের রং দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। এমন ফ্যাকাশে মুখ এর আগে কাপাডিয়া কখন দেখেছেন বলে মনে পড়ল না। —চলবে।
* ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (novel): পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক (Pishach paharer Aatanka) : কিশলয় জানা (Kisalaya Jana) বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজ।


















