
আইসিইউতে অরণ্যকে রাখা হয়েছিল কেবিন নম্বর ২০৪-এ। কেবিনের সামনে দু’জন পুলিশ পাহারায় ছিল। শাক্য এসপিকে পইপই করে বলে দিয়েছিল, চব্বিশ ঘণ্টার একটা মুহূর্তও যেন পুলিশিপাহারা শিথিল না করা হয়। যেভাবেই হোক, নির্দিষ্ট ডাক্তার ছাড়া আর কেউ যাতে অরণ্যর কেবিনে ঢুকতে না পারে, তা দেখার দায়িত্বও ছিল পুলিশের। কেবল তাই নয়, নির্দিষ্ট নার্স এবং হাসপাতাল সুপারের উপস্থিতিতেই সেই ডাক্তার অরণ্যকে দেখতে পারবেন, এমনটিও ঠিক করে দিয়েছিল সে। আপাতত একটি প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে তাকে। সদর হাসপাতাল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার রিস্ক নেয়নি তারা। পেশেন্টের অবস্থার উন্নতি হলে তখন সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবা হবে। এই হাসপাতালটি তেমন বড় নয়। মাঝারি মাপের। তবে চিকিৎসা-ব্যবস্থা ভালো। কলকাতা থেকে ডাক্তারেরা নিয়মিত আসেন। এলাকার অবস্থাপন্ন মানুষেরা যাঁরা সরকারি হাসপাতালের উপর তেমন ভরসা রাখেন না, আবার চার্চ হাসপাতালের উপরেও তেমন নির্ভর করেন না, তাঁরা আজকাল কিছুকাল হল তৈরি হওয়া, কিছুটা এক্সপেনসিভ এই হাসপাতালের দিকে পা বাড়ান। জেলার সিএমওইচ নিজে ফোন করে সব ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সাধারণ কেস যে এটা নয়, সেটা মাথায় রেখে ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। সদর হাসপাতাল থেকেও একজন নির্ভরযোগ্য এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে পাঠানো হয়েছে। তিনিই সমস্ত ব্যাপারটি মনিটরিং করবেন। পেশেন্টের অবস্থা ক্রিটিক্যাল। কিন্তু আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে, যাতে পেশেন্ট বেঁচে যায়। তা-না-হলে অনেক কিছুই স্পষ্ট হবে না। সেইভাবেই প্রাইভেট হাসপাতালটি নিজস্ব ডাক্তার এবং সদর থেকে আসা ডাক্তার, নির্দিষ্ট নার্স, অ্যাটেনডেন্ট—এঁদের নিয়ে একতা মেডিকেল টিম তৈরি করে দিয়েছেন।
হাসপাতালের তরফ থেকে ঘণ্টায় ঘণ্টায় চেক করা হচ্ছে সব ঠিক আছে কিনা। মাছিটিও যাতে গলবার সুযোগ না পায়, সেটা সুনিশ্চিত করতে জেলা পুলিশসুপার নিজে ফোন করে বলে দিয়েছেন। অতএব কোন গাফিলতি ম্যানেজমেন্টের তরফ থেকে বরদাস্ত করা হবে না। অনেক কষ্ট করে পেশেন্টকে তড়িঘড়ি করে এখানে আনা হয়েছিল। চার্চ হাসপাতালে যাওয়ায় নিষেধ ছিল। সকালে আনা হয়েছে। দুপুরেই অপারেশন হয়েছে একটা। পাঁচ ঘণ্টা লেগেছে। তারপর আইসিইউওতে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। পেশেন্টের অবস্থা স্থিতিশীল। কী হবে তা বোঝা যাবে আটচল্লিশ ঘন্টা গেলে। তাও ভাগ্যিস তাড়াতাড়ি আনা হয়েছে। নাহলে হয়তো আগেই সব শেষ হয়ে যেত। ইনজুরি সামান্য নয়। বেশ গভীর ক্ষত্মাথার একদিকে। স্কালের একদিক পুরো চুরমার করে দিয়েছে আঘাত। এই অবস্থায় পেশেন্ট অনেকসময়েই সঙ্গে-সঙ্গেই মারা যায়। তবে অরণ্য সম্ভবত শরীরচর্চা করত বলে তার সহ্যশক্তির লেভেল অনেক বেশি। এখনও লড়াই করে যাচ্ছে। দেখা যাক। সকলেই উদ্বিগ্ন মুখে অপেক্ষা করছেন। তাড়াতাড়ি নিয়ে আসা হয়েছে এবং অপারেশন শুরু হয়েছে, এটাই যা আশার কথা। এদিকে রাস্তাঘাটে তেমন জ্যাম থাকে না। সেই জন্য গ্রিন করিডোর করে আনার দরকার পড়েনি। কিন্তু তেমন হলে সেটার ভাবনা মাথায় ছিল শাক্যর।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৮৪: বুনো তেঁতুল, বাঘা ওল

বিনায়ক : বিশ্বকর্মা

এআই যুগেও উপনিষদের আবেদন অমলিন, কেন?

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-১৫২: হার্ড ড্রাইভ হত্যারহস্য
২০৪ নম্বর রুমটা দোতলায়। মাঝামাঝি। সিঁড়ি দিয়ে উঠে প্রথমে ২১০ নম্বর কেবিন। তারপর ভিতপ্রের দিকে ৪টি কেবিন ছেড়ে ২০৬ থেকে ২০১ পর্যন্ত কেবিন আইসিইউর অন্তর্গত। ২০৬ নম্বর কেবিনে ঢোকার মুখে বিশাল বড় কাঁচের দরজা। তার ভিতরে অনুমতি ছাড়া যে প্রবেশ নিষেধ, তা কাঁচের দরজার গায়ে ঝোলানো নোটিশবোর্ডে ইংরাজি, বাংলা ও হিন্দিতে স্পষ্ট লেখা আছে। ২০৫ নম্বর রুমের পরে কিছুটা ফাঁকা জায়গা। সেখানে এমার্জেন্সি এক্সিট রয়েছে। লিফট এবং সিঁড়ি। সচরাচর এই সিঁড়ির বর্হিগমনের মুখ বন্ধ থাকে। তার উল্টোদিকেই স্টিলের দু-সারি বসবার জায়গা। আইসিইউতে যাঁরা ভর্তি থাকেন, তাঁদের পেশেন্টরা এখানে অপেক্ষা করেন। যদিও আইসিইউতে কাউকেই বিশেষ কোনও কারণ ছাড়া ভিতরে যেতে দেওয়া হয় না, তবে অনেক নাছোড়বান্দা পেশেন্টপার্টি থাকেন, যাঁরা এ-সব কথা থোড়াই কেয়ার করেন। প্রতিদিন নিয়ম করে এসে ভাগ্যের শিকে ছেঁড়বার প্রতীক্ষা করেন। আজকে সেখানেই বসে অপেক্ষা করছিল তৃধা এবং আর্য। দু’জনেই অস্থির ভঙ্গীতে আইসিইউর দিকে তাকাচ্ছে, অরণ্য চলে গেলে তারা আর পড়ে থাকবে চারজন। অনিল আগেই চলে গিয়েছে। এবার অরণ্য…!
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৭৫: কৃষ্ণবিরোধিতার প্রসঙ্গে ভীষ্মের বিরূপ সমালোচনা সত্ত্বেও কে স্মরণীয়? শিশুপাল? না ভীষ্ম?

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০৮: স্তাবক-পরিবেষ্টিত রাজা কেবল অন্ধই হন না, নিজের দুর্গেই জ্যান্ত সেদ্ধ হন!
তৃধা একসময় দীর্ঘ নিঃস্তব্ধতা ভেঙে ডাকল আররযকে, “আর্য…”
আর্য বাতাসে আঙ্গুল দিয়ে কিছু লিখছিল কিংবা হিসেবনিকেশ করছিল। তৃধার ডাক শুনে সে তাকাল তার দিকে। কিছু বলল না। তৃধা অবশ্য আর্যর দিকে তাকাওল না আর। সে যেন আপনমনে বলল, “অরণ্য বেঁচে যাবে, না… কী মনে হয়?”
আর্য একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। কিছুক্ষণ চুপ করেই থাকল। কোনও উত্তর দিতে ইচ্ছে করছিল না তার।
তৃধা বলেই চলল, “এখানে এসে খুব ভুল করেছিলাম আমরা। এই পিশাচপাহাড়ে এসে। আমাদের মৃত্যুদূত যেন এখানে অপেক্ষা করেছিল। প্রথমে অনিল গেল, এখন অরণ্য, এরপর কে?”
আর্য বিরক্ত হল। যে মানুষটি এখনও বেঁচে, আইসিইউতে মরণ-বাঁচন লড়াই করছে, এখন থেকেই যদি ধরে নেওয়া হয়, সে চলে গিয়েছে, তাহলে কার না রাগ হয়? সে আর চুপ করে থাকতে পারল না, বলল, “তৃধা। বাজে চিন্তা মাথা থেকে তাড়াও। অরণ্য এখনও বেঁচে!”
তৃধা তার দিকে তাকাল। তার মুখ সাদা, রক্তশূন্য। মেকআপ না করে তাকে কেমন একটা সাদামাটা বলে মনে হচ্ছে। এই মুহূর্তে তার মুখে শোক, ভয় এবং হতাশা খেলে বেড়াচ্ছে। সে বলল, “হ্যাঁ, জানি, সে এখনও বেঁচে। কিন্তু কতক্ষণ?”
“যতক্ষণ না ডক্টর কিংবা হাসপাতালের তরফ থেকে ডিক্লেয়ার করবে যে, অরণ্য আর নেই, ততক্ষণ!”
“তারপর?”
“তারপর! তারপর কী?”
“বেঁচে গেল তো গেল। কিন্তু আর কি সুস্থ-স্বাভাবিক হয়ে বাঁচবে? শুনেছি ব্রেনের উপর অ্যাটাক্ খুব ফ্যাটাল হয়!”
“সে তুমি-আমি কেমন করে বলব? ডক্টররা আছেন, সেইরকম সিম্পটমস্ দেখলে তাঁরাই ভালো বলতে পারবেন। তবে সবক্ষেত্রে তো হয় না এমন!”
“শোনো নি, দুপুরে অপারেশনের পর ডক্টর কী বলেছিলেন? সিরিয়াস কন্ডিশন পেশেন্টের!”
“শুনেছি। কিন্তু…”
“আমার ভরসা হচ্ছে না। খুব খারাপ লাগছে জানো…”
“সব্বার লাগছে!”
“সব্বার খারাপ লাগা আর আমার খারাপ লাগার মধ্যে পার্থক্য আছে। কাল রাতে ও চেয়েছিল করতে, আমি রাজি হই নি। আসলে আমার হাজব্যান্ড এখানে চলে আসতে পারে ভেবে আমি এত ডিসটার্বড্ ছিলাম যে কোন ফিলিংসই আসছিল না আমার!”
আর্য বাতাসে আঙ্গুল দিয়ে কিছু লিখছিল কিংবা হিসেবনিকেশ করছিল। তৃধার ডাক শুনে সে তাকাল তার দিকে। কিছু বলল না। তৃধা অবশ্য আর্যর দিকে তাকাওল না আর। সে যেন আপনমনে বলল, “অরণ্য বেঁচে যাবে, না… কী মনে হয়?”
আর্য একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। কিছুক্ষণ চুপ করেই থাকল। কোনও উত্তর দিতে ইচ্ছে করছিল না তার।
তৃধা বলেই চলল, “এখানে এসে খুব ভুল করেছিলাম আমরা। এই পিশাচপাহাড়ে এসে। আমাদের মৃত্যুদূত যেন এখানে অপেক্ষা করেছিল। প্রথমে অনিল গেল, এখন অরণ্য, এরপর কে?”
আর্য বিরক্ত হল। যে মানুষটি এখনও বেঁচে, আইসিইউতে মরণ-বাঁচন লড়াই করছে, এখন থেকেই যদি ধরে নেওয়া হয়, সে চলে গিয়েছে, তাহলে কার না রাগ হয়? সে আর চুপ করে থাকতে পারল না, বলল, “তৃধা। বাজে চিন্তা মাথা থেকে তাড়াও। অরণ্য এখনও বেঁচে!”
তৃধা তার দিকে তাকাল। তার মুখ সাদা, রক্তশূন্য। মেকআপ না করে তাকে কেমন একটা সাদামাটা বলে মনে হচ্ছে। এই মুহূর্তে তার মুখে শোক, ভয় এবং হতাশা খেলে বেড়াচ্ছে। সে বলল, “হ্যাঁ, জানি, সে এখনও বেঁচে। কিন্তু কতক্ষণ?”
“যতক্ষণ না ডক্টর কিংবা হাসপাতালের তরফ থেকে ডিক্লেয়ার করবে যে, অরণ্য আর নেই, ততক্ষণ!”
“তারপর?”
“তারপর! তারপর কী?”
“বেঁচে গেল তো গেল। কিন্তু আর কি সুস্থ-স্বাভাবিক হয়ে বাঁচবে? শুনেছি ব্রেনের উপর অ্যাটাক্ খুব ফ্যাটাল হয়!”
“সে তুমি-আমি কেমন করে বলব? ডক্টররা আছেন, সেইরকম সিম্পটমস্ দেখলে তাঁরাই ভালো বলতে পারবেন। তবে সবক্ষেত্রে তো হয় না এমন!”
“শোনো নি, দুপুরে অপারেশনের পর ডক্টর কী বলেছিলেন? সিরিয়াস কন্ডিশন পেশেন্টের!”
“শুনেছি। কিন্তু…”
“আমার ভরসা হচ্ছে না। খুব খারাপ লাগছে জানো…”
“সব্বার লাগছে!”
“সব্বার খারাপ লাগা আর আমার খারাপ লাগার মধ্যে পার্থক্য আছে। কাল রাতে ও চেয়েছিল করতে, আমি রাজি হই নি। আসলে আমার হাজব্যান্ড এখানে চলে আসতে পারে ভেবে আমি এত ডিসটার্বড্ ছিলাম যে কোন ফিলিংসই আসছিল না আমার!”
আরও পড়ুন:

জন্মশতবর্ষে উত্তমকুমার : শতফুল বিকশিত হোক

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১১১ : কবি রাজার বিবসনা রমণীর চিত্রাঙ্কন / ৪
“এ-সব কথা থাক তৃধা!”
“কেন থাকবে? তুমি তো সবই জানো। তোমার কাছে আর লজ্জার কী আছে?”
“জানি। আফটার অল, উই আর ফ্রেন্ডস্ ওয়ান্স আপন আ টাইম। এই বন্ধুত্বগুলি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয়ে যাওয়া উচিৎ ছিল। সেটাই হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। কিন্তু আমাদের কয়েকজনের মধ্যে তা কেমন করে টিকে গিয়েছিল। কিন্তু আস্তে-আস্তে মৃত্যু এসে সব বন্ধন হয়তো এভাবেই আলগা করে দিয়ে যাবে!”
“দেখ, একটু আগে আমি যখন বলছিলাম, তখন তুমি আপত্তি করছিলে। কিন্তু তুমিও মনে-মনে বিশ্বাস কর যে, অরণ্য আর বাঁচবে না!”
“না তৃধা, আমি ও-কথা ভেবে বলিনি। মৃত্যু কি কেবল দেহের হয়? মনের হয় না? এভাবে চলতে থাকলে আমাদের পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস-ভালবাসা-টান সব মরে যাবে। তখন এই দেহ আর বাইরের হাই-হ্যালো নিয়ে চলে-ফিরে বেড়াব কেবল!”
“তুমি কবিতা লেখ তো। তোমার কথাগুলি সেই কবিতার মতো শোনাচ্ছে। আর তুমি তো জানো আমি আধুনিক কবিতা বুঝি না, পড়িও না। আর এ-অবস্থায় তো বুঝতে চাইছিই না। কেবল মনে হচ্ছে, পিশাচপাহাড়ে কেন এলাম?”
“ভবিতব্য। মান আর না-ই মানো, কেউ আমাদের ঘাড় ধরে টেনে এনেছিল। আমি তো ভেবেছিলাম মন্দারমণি কিংবা তালসারি ট্রিপে এক-দু দিন মজা করব। চলে আসব। কে যে পিশাচপাহাড়ের কথা মাথায় ঢোকাল…!”
“অনিল! সে-ই তো জোর করল। না না, প্রথমে ইউটিউবের কোন ট্র্যাভেল-ব্লগ দেখে উন্মেষা বলেছিল অনিলকে। অনিল নামটা দেখে লাফিয়ে উথেছিল। তখন আমরা ভেবেছিলাম, এই পাহাড়ে একটি পিশাচ থাকে…”
“থাকেই তো! কালাদেও কি কোন পিশাচের চেয়ে কম?”
“কিন্তু কালাদেও পিশাচ নয়। দেও। অন্তত স্থানীয় মানুষ তেমনই বলে!”
“আমার বিশ্বাস হয় না। নাহলে দেখ না, শাক্য সিংহ কলকাতার লালবাজার থেকে এসে পিশাচপাহাড়ে এক্সপিডিশন করে সন্ত্রাসবাদীদের কাজকর্মের প্রমাণ পেল। বিপুল অস্ত্রশস্ত্রও উদ্ধার করল। কিন্তু তারপর? সাময়িকভাবে আমরা সকলেই ভেবে নিয়েছিলাম, কালাদেও বলে তাহলে কিছু হয় না, সবটাই ওই সন্তাসবাদীদের উর্বর মস্তিষ্কের অপপ্রচার। কিন্তু তার পরেই অরণ্যের উপর এই আক্রমণ, একেবারে কালাদেওর কায়দায়। এতে কী প্রমাণ হয়?”
“কী?”
“কালাদেওর গুহায় যতই শাক্য সিংহরা ঢুকুন না কেন, কালাদেওকে তাঁরা পাকরাও করতে পারেননি। পিশাচকে কি ওইভাবে পাকড়াও করা যায়?”
“পিশাচ নয়, দেও, দেও…” বেশ জোর দিয়ে বলল তৃধা।
“কেন থাকবে? তুমি তো সবই জানো। তোমার কাছে আর লজ্জার কী আছে?”
“জানি। আফটার অল, উই আর ফ্রেন্ডস্ ওয়ান্স আপন আ টাইম। এই বন্ধুত্বগুলি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয়ে যাওয়া উচিৎ ছিল। সেটাই হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। কিন্তু আমাদের কয়েকজনের মধ্যে তা কেমন করে টিকে গিয়েছিল। কিন্তু আস্তে-আস্তে মৃত্যু এসে সব বন্ধন হয়তো এভাবেই আলগা করে দিয়ে যাবে!”
“দেখ, একটু আগে আমি যখন বলছিলাম, তখন তুমি আপত্তি করছিলে। কিন্তু তুমিও মনে-মনে বিশ্বাস কর যে, অরণ্য আর বাঁচবে না!”
“না তৃধা, আমি ও-কথা ভেবে বলিনি। মৃত্যু কি কেবল দেহের হয়? মনের হয় না? এভাবে চলতে থাকলে আমাদের পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস-ভালবাসা-টান সব মরে যাবে। তখন এই দেহ আর বাইরের হাই-হ্যালো নিয়ে চলে-ফিরে বেড়াব কেবল!”
“তুমি কবিতা লেখ তো। তোমার কথাগুলি সেই কবিতার মতো শোনাচ্ছে। আর তুমি তো জানো আমি আধুনিক কবিতা বুঝি না, পড়িও না। আর এ-অবস্থায় তো বুঝতে চাইছিই না। কেবল মনে হচ্ছে, পিশাচপাহাড়ে কেন এলাম?”
“ভবিতব্য। মান আর না-ই মানো, কেউ আমাদের ঘাড় ধরে টেনে এনেছিল। আমি তো ভেবেছিলাম মন্দারমণি কিংবা তালসারি ট্রিপে এক-দু দিন মজা করব। চলে আসব। কে যে পিশাচপাহাড়ের কথা মাথায় ঢোকাল…!”
“অনিল! সে-ই তো জোর করল। না না, প্রথমে ইউটিউবের কোন ট্র্যাভেল-ব্লগ দেখে উন্মেষা বলেছিল অনিলকে। অনিল নামটা দেখে লাফিয়ে উথেছিল। তখন আমরা ভেবেছিলাম, এই পাহাড়ে একটি পিশাচ থাকে…”
“থাকেই তো! কালাদেও কি কোন পিশাচের চেয়ে কম?”
“কিন্তু কালাদেও পিশাচ নয়। দেও। অন্তত স্থানীয় মানুষ তেমনই বলে!”
“আমার বিশ্বাস হয় না। নাহলে দেখ না, শাক্য সিংহ কলকাতার লালবাজার থেকে এসে পিশাচপাহাড়ে এক্সপিডিশন করে সন্ত্রাসবাদীদের কাজকর্মের প্রমাণ পেল। বিপুল অস্ত্রশস্ত্রও উদ্ধার করল। কিন্তু তারপর? সাময়িকভাবে আমরা সকলেই ভেবে নিয়েছিলাম, কালাদেও বলে তাহলে কিছু হয় না, সবটাই ওই সন্তাসবাদীদের উর্বর মস্তিষ্কের অপপ্রচার। কিন্তু তার পরেই অরণ্যের উপর এই আক্রমণ, একেবারে কালাদেওর কায়দায়। এতে কী প্রমাণ হয়?”
“কী?”
“কালাদেওর গুহায় যতই শাক্য সিংহরা ঢুকুন না কেন, কালাদেওকে তাঁরা পাকরাও করতে পারেননি। পিশাচকে কি ওইভাবে পাকড়াও করা যায়?”
“পিশাচ নয়, দেও, দেও…” বেশ জোর দিয়ে বলল তৃধা।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৬৬: শাঁখামুটি
“অপদেবতা! অরণ্যকে যে আক্রমণ করেছে, সে কোন মানুষ নয়…। অপদেবতা!”
“কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার কি জানো, আমরা তখন অরণ্যর মুখোমুখিই ছিলাম বলতে গেলে। কিন্তু আমরা কালাদেওকে দেখতে পেলাম না! কেন?”
“আরে সে কি মানুষ যে দেখতে পাবে? উবে গিয়েছে হয়তো। কিংবা আশেপাশে জঙ্গল ছিল, সেখানেও সেঁধিয়ে যেতে পারে। ওরা পারে না এমন কিছু নেই!”
“আমার যেন কেমন-কেমন লাগছে আর্য! মনে হচ্ছে এই আক্রমণগুলির সঙ্গে কোন লিঙ্ক আছে। নাহলে বেছে-বেছে কেন আমাদেরই শুধু আক্রমণ করবে? আমরা কী অপরাধ করেছি? এই প্রথম এসেছি পিশাচপাহাড়ে বেড়াতে। দু’দিন আগে এই জায়গার নামও জান অতাম না কেউই। তাহলে?”
“সে-কথা আমিও ভাবছি। দার্শনিকরা একটা শব্দ ব্যবহার করেন—প্রারব্ধ, অর্থাৎ পূর্বজন্মের করা অপরাধ বা পাপের প্রতিফল এ-জন্মে ভোগ। হয়ত এরাও পূর্বজন্মে কোন পাপ করেছিল, তার ফল ভোগ করছে…!”
“আর আমরা বাকিরা সবাই ধোওয়া তুলসীপাতা? এ-জন্মের কোন পাপের ফল ভোগ করতেও তো পারি আমরা!”
“এ-জন্মের পাপ?”
“হুম। তবে আমার কী মনে হয় জানো, শাক্য সিংহ লোকটি যতই বলুন না কেন, আমাদের বন্ধুদের মধ্যে কেউ নয়, হয় কালাদেও, নয়তো বন্ধুদের মধ্যে নয়, কিন্তু আমাদের দলে থাকা কেউ…”
“তুমি কি অঞ্জন সাকসেনার দিকে ইঙ্গিত করতে চাইছো?”
“বুঝে নাও। আমাদের মধ্যে তাকেই এত ফুরফুরে, চাপমুক্ত লাগে কেন?”
“হয়তো…” বলে কী-একটা বলতে যাচ্ছিল আর্য। কিন্তু তার আগেই সে উঠে দাঁড়াল। বলল, “আরে তোমরা…আই মিন আপনারা…”—চলবে।
“কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার কি জানো, আমরা তখন অরণ্যর মুখোমুখিই ছিলাম বলতে গেলে। কিন্তু আমরা কালাদেওকে দেখতে পেলাম না! কেন?”
“আরে সে কি মানুষ যে দেখতে পাবে? উবে গিয়েছে হয়তো। কিংবা আশেপাশে জঙ্গল ছিল, সেখানেও সেঁধিয়ে যেতে পারে। ওরা পারে না এমন কিছু নেই!”
“আমার যেন কেমন-কেমন লাগছে আর্য! মনে হচ্ছে এই আক্রমণগুলির সঙ্গে কোন লিঙ্ক আছে। নাহলে বেছে-বেছে কেন আমাদেরই শুধু আক্রমণ করবে? আমরা কী অপরাধ করেছি? এই প্রথম এসেছি পিশাচপাহাড়ে বেড়াতে। দু’দিন আগে এই জায়গার নামও জান অতাম না কেউই। তাহলে?”
“সে-কথা আমিও ভাবছি। দার্শনিকরা একটা শব্দ ব্যবহার করেন—প্রারব্ধ, অর্থাৎ পূর্বজন্মের করা অপরাধ বা পাপের প্রতিফল এ-জন্মে ভোগ। হয়ত এরাও পূর্বজন্মে কোন পাপ করেছিল, তার ফল ভোগ করছে…!”
“আর আমরা বাকিরা সবাই ধোওয়া তুলসীপাতা? এ-জন্মের কোন পাপের ফল ভোগ করতেও তো পারি আমরা!”
“এ-জন্মের পাপ?”
“হুম। তবে আমার কী মনে হয় জানো, শাক্য সিংহ লোকটি যতই বলুন না কেন, আমাদের বন্ধুদের মধ্যে কেউ নয়, হয় কালাদেও, নয়তো বন্ধুদের মধ্যে নয়, কিন্তু আমাদের দলে থাকা কেউ…”
“তুমি কি অঞ্জন সাকসেনার দিকে ইঙ্গিত করতে চাইছো?”
“বুঝে নাও। আমাদের মধ্যে তাকেই এত ফুরফুরে, চাপমুক্ত লাগে কেন?”
“হয়তো…” বলে কী-একটা বলতে যাচ্ছিল আর্য। কিন্তু তার আগেই সে উঠে দাঁড়াল। বলল, “আরে তোমরা…আই মিন আপনারা…”—চলবে।
* ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (novel): পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক (Pishach paharer Aatanka) : কিশলয় জানা (Kisalaya Jana) বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজ।


















