
ছবি : প্রতীকী। সংগৃহীত।
আজকের গল্পটি সংক্ষিপ্ত, কিন্তু অর্থবহ। এই গল্পে বোধিসত্ত্ব উপস্থিত, কিন্তু মুখ্য কোনও ভূমিকায় তাঁকে দেখা যায় না। সেই জন্মে বোধিসত্ত্ব বারাণসীর এক সম্পন্ন গৃহে জন্ম নিয়েছেন, প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে তিনি ধান বিক্রয় করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
বোধিসত্ত্বের সঙ্গে এক সাপুড়ের পরিচয় হয়েছিল। সেই সাপুড়ে একটি বাঁদরকে বিশেষ শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করেছিল, তাকে বিষপ্রতিষেধক ওষুধ খাইয়ে সাপের সঙ্গে খেলা করাতো সে। এই ছিল তার জীবিকা। একদিন বারাণসীতে এক উত্সব ঘোষিত হল। সাপুড়ে কি বাঁদরটিকে নিয়ে সাপের খেলা দেখাতে উত্সবে গেল এবার?
বোধিসত্ত্বের সঙ্গে এক সাপুড়ের পরিচয় হয়েছিল। সেই সাপুড়ে একটি বাঁদরকে বিশেষ শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করেছিল, তাকে বিষপ্রতিষেধক ওষুধ খাইয়ে সাপের সঙ্গে খেলা করাতো সে। এই ছিল তার জীবিকা। একদিন বারাণসীতে এক উত্সব ঘোষিত হল। সাপুড়ে কি বাঁদরটিকে নিয়ে সাপের খেলা দেখাতে উত্সবে গেল এবার?
না। উত্সবে আমোদ-প্রমোদ করবে বলে বোধিসত্ত্বের কাছে বাঁদরটিকে গচ্ছিত রেখে গেল।
“ভাই! একে একটু দেখে রেখো। এর যত্নে যেন কোনও ত্রুটি না হয়।” এরপর কেটে গেল সাতদিন। আমোদের শেষে সাপুড়ে ফিরে এল। বোধিসত্ত্বের গৃহে গিয়ে খোঁজ নিল বাঁদরের। প্রভুর কণ্ঠস্বর শুনে বাঁদর দৌড়ে এল ধানের দোকান থেকে। এবার সাপুড়ে একটি বাঁশ নিয়ে বাঁদরের পিঠে আঘাত করে তাকে বাগানের এক কোণে বেঁধে রেখে ঘুমিয়ে পড়ল।
“ভাই! একে একটু দেখে রেখো। এর যত্নে যেন কোনও ত্রুটি না হয়।” এরপর কেটে গেল সাতদিন। আমোদের শেষে সাপুড়ে ফিরে এল। বোধিসত্ত্বের গৃহে গিয়ে খোঁজ নিল বাঁদরের। প্রভুর কণ্ঠস্বর শুনে বাঁদর দৌড়ে এল ধানের দোকান থেকে। এবার সাপুড়ে একটি বাঁশ নিয়ে বাঁদরের পিঠে আঘাত করে তাকে বাগানের এক কোণে বেঁধে রেখে ঘুমিয়ে পড়ল।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫৭: বীতেচ্ছ-জাতক — তুই যাহারে দিলি ফাঁকি

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৬৯: আকাশ এখনও মেঘলা

অর্ধ শতাব্দী পর বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৬৭ : হাঙরের পেটে মুক্তো
কেন এমন করল সে? হয়তো স্বভাবসিদ্ধ নিষ্ঠুরতায়।
সাপুড়ে নিদ্রিত হয়েছে এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে বাঁদর বহুকষ্টে বন্ধনমুক্ত করল নিজেকে। উঠে গেল পাশের আমগাছে। সেখানে বসে ইচ্ছেমতো আম খেয়ে তার আঁটি ছুড়ে ফেলে দিল নিচে নিদ্রিত সাপুড়ের গায়ে। সাপুড়ের আকস্মিক নিদ্রাভঙ্গ ঘটল, এদিক ওদিক তাকিয়ে বাঁদরটিকে দেখে পরিস্থিতি উপলব্ধি করল। মনে মনে ভাবল, “একে মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে নিচে নামিয়ে আনতে হবে। তারপর বেঁধে রাখলেই হল।”
সাপুড়ে নিদ্রিত হয়েছে এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে বাঁদর বহুকষ্টে বন্ধনমুক্ত করল নিজেকে। উঠে গেল পাশের আমগাছে। সেখানে বসে ইচ্ছেমতো আম খেয়ে তার আঁটি ছুড়ে ফেলে দিল নিচে নিদ্রিত সাপুড়ের গায়ে। সাপুড়ের আকস্মিক নিদ্রাভঙ্গ ঘটল, এদিক ওদিক তাকিয়ে বাঁদরটিকে দেখে পরিস্থিতি উপলব্ধি করল। মনে মনে ভাবল, “একে মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে নিচে নামিয়ে আনতে হবে। তারপর বেঁধে রাখলেই হল।”
আরও পড়ুন:

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৯ : আনকো আলোয় যায় দেখা ওই ‘সপ্তপদী’-র পথ চলা

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৫১: ইরাবতী ডলফিন
কিন্তু মুক্ত জীব খাঁচায় ফেরে না যে!
সাপুড়ে লোভ দেখিয়ে বাঁদরকে বলল, এস শ্যাল! আয় শালা! গাছ থেকে নেমে আয়। আমার একমাত্র ছেলের মতো মহাযত্নে বিবিধ ভোগের বস্তু দিয়ে তোমাকে পালন করবো। যেমন খুশি ভোগসুখ করো, একা অবাধ অকাতরে।”
সাপুড়ে লোভ দেখিয়ে বাঁদরকে বলল, এস শ্যাল! আয় শালা! গাছ থেকে নেমে আয়। আমার একমাত্র ছেলের মতো মহাযত্নে বিবিধ ভোগের বস্তু দিয়ে তোমাকে পালন করবো। যেমন খুশি ভোগসুখ করো, একা অবাধ অকাতরে।”
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৮: রাক্ষস খর ও রামের সংঘাতে, যুদ্ধের বিবিধবার্তা

রবীন্দ্র জয়ন্তী: তথ্যচিত্র— রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট
এই ফাঁদ যে পাখি চিনেছে সে কি আর নেমে আসে?
তাই বাঁদর প্রত্যুত্তর দেয় “আমায় তুমি কেমন ভালোবাসো তা তো দেখাই গেল! বাঁশ দিয়ে আমাকে আঘাত করলে কেন? এখানে পাকা আম আছে, তা-ই যেমন খুশি ভোগ করবো। তোমার ভোগসুখ তোমার থাক, তুমি ভাই সুখে গৃহে ফিরে যাও।”
বাঁদর লাফ দিয়ে গভীর বনে প্রবেশ করল। সাপুড়ে ফিরে গেল ক্ষুণ্ণমনে।
এই গল্পের নাম শ্যালকজাতক। বাঁদরকে সাপুড়ে শ্যালরূপে আহ্বান করেছে, এই আহ্বান সেই কালে প্রীতিসম্ভাষণ ছিল। মিষ্টি কথায় ভোলানোর চেষ্টা করা হল, কিন্তু বাঁদরের মন তাতে ভিজল কি? কেন সে ফিরল না আর?
তাই বাঁদর প্রত্যুত্তর দেয় “আমায় তুমি কেমন ভালোবাসো তা তো দেখাই গেল! বাঁশ দিয়ে আমাকে আঘাত করলে কেন? এখানে পাকা আম আছে, তা-ই যেমন খুশি ভোগ করবো। তোমার ভোগসুখ তোমার থাক, তুমি ভাই সুখে গৃহে ফিরে যাও।”
বাঁদর লাফ দিয়ে গভীর বনে প্রবেশ করল। সাপুড়ে ফিরে গেল ক্ষুণ্ণমনে।
এই গল্পের নাম শ্যালকজাতক। বাঁদরকে সাপুড়ে শ্যালরূপে আহ্বান করেছে, এই আহ্বান সেই কালে প্রীতিসম্ভাষণ ছিল। মিষ্টি কথায় ভোলানোর চেষ্টা করা হল, কিন্তু বাঁদরের মন তাতে ভিজল কি? কেন সে ফিরল না আর?
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০১ : সত্য সামনে দাঁড়িয়ে হাসে, আর মূর্খ অন্যের ব্যাখ্যায় তাকে খোঁজে!
অনুমান করা হয়তো অসঙ্গত নয় যে, বোধিসত্ত্বের সংস্পর্শে বাঁদরের হৃদয়ে পরিবর্তন এসেছিল। তাও সে তার প্রভুকে ভোলেনি। সংসারী জীব মায়ার বশীভূত। সাপুড়ে স্বভাবক্রুর। আত্মসুখের উদযাপনে সে তার সন্তানতুল্য বাঁদরটিকে অন্যত্র রেখে যেতে পারে। বোঝা যায়, তাদের একাত্মতা অঙ্গাঙ্গী নয়। সে যে পদ্ধতিতে জীবিকানির্বাহ করে তা-ও ভয়াবহ। বাঁদর সর্পদংশনে আহত হয়ে তার অন্নসংস্থান করে দেয়। তমোগুণসম্পন্ন মানুষের সান্নিধ্য থেকে মুক্ত হলে, সত্সঙ্গ লাভ করলে নিজেকে চেনা যায়। সেই ক্ষেত্র মনে হয় প্রস্তুত হচ্ছিল। বন্ধনমুক্তির জন্য একটি অনুঘটক দরকার ছিল কেবল। তমোগুণসম্পন্ন সাপুড়ের একটি আঘাত বাঁদরের চৈতন্যোদয় ঘটালো। তার গাছে উঠে যাওয়া হল উত্তরণের প্রতীক। বাঁদর ভোগসুখের প্রলোভনে পা দিল না। চঞ্চল বাঁদর এবার মন দিয়েছে সুমিষ্ট আম্রভক্ষণে। এ হল প্রজ্ঞাদীপ্ত হৃদয়ের সাধনসুখ, যে উচ্চমার্গে তার উত্তরণ ঘটে গেছে অনিত্য সংসারের আঘাতে, তা থেকে সে আর ফিরে আসবে না। নেমে আসবে না। কর্মচাঞ্চল্য ও আসক্তিনির্ভর রজোগুণ অতিক্রম করে সে এখন সাত্ত্বিক। তার হৃদয় নির্মল, জ্ঞানাকাঙ্ক্ষাই এখন তার জীবনের লক্ষ্য, সেই রহস্যঘন ক্ষেত্রের মহারণ্যে মুক্তিকামী প্রবেশ করে এবার। —চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















