
নতুন সব সময়েই একলা, তার জুড়ি মেলা ভার। যা নতুন সে ছাড়া তো বাকি সকল কিছুই পুরনো। নববর্ষের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। আসলে, বছরটা নতুন মনে হলেও তার প্রথম দিনটুকুই যা কিছু নতুন, দ্বিতীয় দিনে পা রাখলেই বছর পুরনো। তাই, পয়লার দিন একলা, বড্ড একলাই।
যে ভাষার গানের সুরে একলা চলো রে উন্মাদনা বয়ে চলেছে, সেই ভাষার ভিত্তিভূমিকে ঘিরে বহমান জাতিসত্তার অভিজ্ঞান আর কতটুকুই তার মতো করে রয়ে গিয়েছে? তবুও, হিসেবের খাতায় কিংবা পঞ্জিকার দিন-মাস-বছরে নববর্ষ আসে যায়। তার আসা যাওয়ার কানা কড়ি-ষোলো আনার মাঝে একান্ত যাপনের কথাটুকু পড়ে থাকে।
আরও পড়ুন:

চৈত্রশেষে

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৫: নৈতিকতার নিরিখে, মল্লযুদ্ধে জরাসন্ধবধ, আজও প্রাসঙ্গিক কেন?

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৯ : আনকো আলোয় যায় দেখা ওই ‘সপ্তপদী’-র পথ চলা

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি
বৈশাখের এমন একলা একলা পথ চলা নিদাঘের দারুণ পথে। তার গায়ের নতুন গন্ধ ক্রমে ক্রমে মুছে আসে। বসন্তের সমাগম শেষ চৈত্রের বাতাসে উড়ে যায় কোথাও! বৈশাখ আরও আরও একলা হয়। কোনও মহাকবি হয়তো পুড়তে পুড়তে, পুড়তে পুড়তে শুদ্ধ-শুদ্ধতর হয়ে ওঠার ভরসা-মাখা হিরণ্ময় শক্তিটুকু সঞ্চারিত করে দিয়েছেন তাঁর অমোঘ শোকোত্তর মন্ত্রে, শ্লোকে। একলা বৈশাখ তাই দগ্ধ করে, দগ্ধ হয়।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০০ : স্থানীয়রা দিনে কৃষি কাজ করতেন, আর রাতে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিতেন বিপ্লবীরা

বিচিত্রের বৈচিত্র, গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫৪: বিড়াল জাতক : অতি চালাকের?
একলা মানে প্রথম, একলা মানে একাকী, একলা মানে অদ্বিতীয়। তারপর সেই একলা চলার, একান্ত যাপনের দারুণ বৈশাখের দহনবেলার উপান্তে এসে মেশে মেদুর মধ্যাহ্ন, বিধুর অপরাহ্ন। একলা বৈশাখী-দিনের দেহে-মনে সন্নিধানে পুঞ্জীভূত সকল অনিবার্য অথচ অনাবশ্যক যা কিছু, শুকনো ধুলোর রাশি হয়ে উড়ে যায়। লোকে ভাবে, এ ঝঞ্ঝাবাত বুঝি তার নিষ্ফল ক্রোধের উদ্গার, কিংবা চোখের জলে সবটুকু ভিজিয়ে দেওয়ার আকস্মিক আয়োজন। কিন্তু একলা বৈশাখ জানে, এ তার ঐশ্বর্য, তার একাকীত্বের উদযাপন, তার অসঙ্গ পান্থবিথীকার একলা যাপনের পথে পূর্ণ হয়ে ওঠার সমারোহ, তার মরুবিজয়ের মহাকেতন।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪৬: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী— সবুজ কাছিম

ত্রিপুরা: বছর সন্ধির পার্বণ ও নববর্ষ
এভাবেই একলা বৈশাখ কালবৈশাখ হয়। তোমরা যাকে রুদ্রের উষ্ণ-শ্বাস ভাবো, মহাকালের অনন্ত আনন্দনৃত্য হয়ে ওঠে তা-ই। সেই মহানৃত্যের মঞ্চে নববর্ষ, বৈশাখ আর কালবৈশাখীর ত্রিবেণীসঙ্গম।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক পর্ব-১৬২ : আঁধারে আলো

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
পয়লা আসে, যায়। বৈশাখের প্রথম, দ্বিতীয়ের হাত ধরে তৃতীয়ের সূত্রপাত করে। তার পাশেই প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্ত স্বতন্ত্র সুন্দর, প্রতিটি প্রত্যুষ পার হওয়া প্রভাত-ই অদ্বিতীয়, একলা, পয়লা। ওই “এক-লা”র মাঝেই অনন্তের সম্ভাবনা, সেই ‘পয়লা’র আনন্দচঞ্চল নৃত্যের পায়ে পায়েই চিরসুন্দরের অভিবন্দনা। আজ নববর্ষের রসগর্ভ বৈশাখ প্রতিটি নিঘাদতপ্ত প্রাণে আনন্দ-আবেশ বয়ে নিয়ে আসুক।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।


















