
সেদিনের ঝড়-বৃষ্টি শুধু কলকাতায় নয়, ডায়মন্ড হারবারেও। কলকাতায় ভরদুপুরের মত্ততা ডায়মন্ড হারবারে আছড়ে পড়ল অপরাহ্ন বেলায়। খুকুর তখন সবে স্কুল ছুটি হচ্ছে। হ্যাঁ, খুকু এখন স্কুলে পড়ে। সৌদামিনী বালিকা বিদ্যালয়। শ্যামাপল্লীর সাবেক সামন্ত অঘোরনাথ রায়ের অকাল প্রয়াতা মেয়ের নামে স্কুল। টুলুই উদ্যোগ নিয়ে ক্লাস নাইনে খুকুকে ভর্তি করে দিয়েছে। কলকাতার স্কুলের মতো এই স্কুলেও খুকু শিক্ষিকাদের যথেষ্ট নজর কেড়েছে। প্রথম প্রথম বেশ অস্বস্তিতে থাকত। মুখে কুলুপ এঁটে মাথা নিচু করে ফার্স্ট বেঞ্চে বসত জড়োসড়ো হয়ে। আস্তে আস্তে সংকোচ কেটেছে। ক্লাসে নিজের যোগ্যতার ছাপ রাখা শুরু হয়েছে। অন্যদের তুলনায় ব্যক্তিত্ব খানিকটা বেশি হলেও সকলের সঙ্গে মোটামুটি মানিয়েও নিয়েছে। দু’ তিনজন বান্ধবী হয়েছে। এ পাড়া ও পাড়ার মেয়ে সব। বেশিরভাগ দিন একসঙ্গে যাতায়াত করে।
সুনীতিও একটু নিশ্চিন্ত হন। সত্যি কথা বলতে ইদানিং সুনীতির বুকের ভার যেন খানিকটা লাঘব হয়েছে। তার রাজকন্যা মেয়ে। সেই মেয়ের মুখের রামধনু রংয়ের আসা-যাওয়া সুনীতি ছাড়া আর কেইবা এমন গভীর করে টের পাবে। টুলুর মায়ের সঙ্গে সুনীতির চিঠি আদান-প্রদান হয়েছে। সামনের সপ্তাহে উনি যাবেন বিবাহ নিয়ে প্রাথমিক কথা বলতে।
আরও পড়ুন:

দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৯ : নয়া ভুবনের প্রজাপতি

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৬: প্রাকৃতিক অবস্থার পরিবর্তন ও প্রাণীদের অস্থিরতা : যুদ্ধের দূষণ, মনে, প্রাণে, বাতাবরণে, সর্বত্র

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৮৯ : আনকো আলোয় যায় দেখা ওই ‘সপ্তপদী’-র পথ চলা

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-১০১ : ত্রিপুরাতেও সিপাহি বিদ্রোহের ছোঁয়া লেগেছিল
সমস্যা হল সেদিন স্কুল ছুটির পর। খুকুর সঙ্গিনী তিনজন হঠাৎ করে অনুপস্থিত। স্কুলে গিয়েই খুকু মনমরা। তার ওপর দুপুর থেকে আকাশের গায়ে ছোট ছোট কালো পাহাড়। বেলা যত বেড়েছে পাহাড় তত ঘন আর উঁচু হয়েছে। ক্লাসরুমের জানলা দিয়ে দিগন্ত সীমা ছাড়িয়ে যতদূর চোখ গিয়েছে শুধু কালো। কৃষ্ণ পর্বতমালার আড়ালে ঢেকে গিয়েছে আকাশ। হারিয়ে গিয়েছে আলো।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-২৭ : সোনার কেল্লা: ডিটেকশনের ড্রয়িংরুম

একলা নববর্ষ
এমন থমথমে দিক চক্রবালের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে স্কুল ছুটির পর খুকুর কান্না পায়। স্কুল থেকে বাড়ির পথ যেন অনন্ত। গলা শুকিয়ে কাঠ। চারটেয় ছুটির ঘন্টা পড়বার সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছে গেছে গেটে। সর্বনাশ! উড়ন্ত লাল ধুলোয় চারপাশ আচ্ছন্ন। তাকানো যাচ্ছে না। হুহু করে ঝড় উঠলো। বাতাসে মিশে গেছে সামুদ্রিক বালি। লতিকা বাসন্তী সুমনারা চলে যাচ্ছে উল্টো দিক দিয়ে। ওদের বাড়ি থেকে কেউ না কেউ এসেছে। খুকুর বাড়ির দিকে ওদের বাসা নয়।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪৬: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী— সবুজ কাছিম

ত্রিপুরা: বছর সন্ধির পার্বণ ও নববর্ষ
খুকু হাঁটছে প্রাণপণে। শাড়ি সামলে, ব্যাগ সামলে, গতি বাড়াচ্ছে যতদূর সম্ভব। কিন্তু যত জোরে চাইছে পারছে না। অদূরে শিরিষ গাছের নিচটা একদম ফাঁকা। কেমন গুমোট আঁধার যেন রাক্ষসী থাবার মত ওঁত পেতে আছে। এতদিন দরকার হয়নি তাই তাকায়নি। আজ প্রকান্ড গাছের তলা দিয়ে ছুটতে গিয়ে ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। দৌড়াতে পারে না খুকু। তাই ছোটার ভঙ্গিতে হাঁটছে। আকাশের এপিঠ ওপিঠ চিরে বিদ্যুৎ চমকালো। বজ্র পাত হল কাছেই। শ্রবণে তালা ধরল।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক পর্ব-১৬২ : আঁধারে আলো

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা / ৬৫
অন্ধকার চরাচর ভেঙে এবড়ো খেবড়ো আল পথ ডিঙিয়ে ছুটছে খুকু। কোথাও দাঁড়ানোর নেই। ঝড়ের প্রবল ধাক্কায় দাঁড়ানোর উপায়ও নেই। তুমুল বর্ষণ আর অনর্গল বাজ। হঠাৎই নির্জন রাস্তায় পিছনে পদশব্দ। কাঁটা দিয়ে উঠল শরীর। কী হবে এখন! খুকু দৌড়লো। জীবনে প্রথম। হে গুরুদেব, হা ঈশ্বর, সারা জীবন মায়ের হাতে হাতে কাজ না করে গৌরীর মতো একটু দৌড়ঝাঁপ তো শিখতে পারত! ভিজে স্নান সর্বাঙ্গ। পায়ের ফাঁকে জড়িয়ে যাচ্ছে শাড়ি। একটু দূরেই চণ্ডীমণ্ডপের চাতাল। নিবিড় বট গাছের ঝুড়ি নামা নিস্তব্ধ তমসা। সজোরে হোঁচট খেল খুকু। আর তখনই ঝাঁপুষ অন্ধকারে কোন একটা শক্তিশালী হাত ওকে প্লাবনভূমি থেকে সন্তর্পনে টেনে তুলল।
শরীরের সমস্ত শক্তি একজোট করে চিৎকার করে উঠেছে খুকু—
— কেডা, আন্ধারে মুখ দেখা যায় না!
— আইজ্ঞা আমি, নবীনচন্দ্র।
— তুই! এহানে কিয়ের লিগা
লজ্জায় সংকোচে জর্জরিত নবীন, কোন রকমে বলে—
—ঝড় বৃষ্টি দেইখ্যা আগায় আইছি দিদি, রাগ করেন না জানি!
নিকষ অন্ধকার ভেদ করে একটু দূরে আবারও আছড়ে পড়লো বাজ।—চলবে।
শরীরের সমস্ত শক্তি একজোট করে চিৎকার করে উঠেছে খুকু—
— কেডা, আন্ধারে মুখ দেখা যায় না!
— আইজ্ঞা আমি, নবীনচন্দ্র।
— তুই! এহানে কিয়ের লিগা
লজ্জায় সংকোচে জর্জরিত নবীন, কোন রকমে বলে—
—ঝড় বৃষ্টি দেইখ্যা আগায় আইছি দিদি, রাগ করেন না জানি!
নিকষ অন্ধকার ভেদ করে একটু দূরে আবারও আছড়ে পড়লো বাজ।—চলবে।
* ধারাবাহিক উপন্যাস (novel): দেওয়াল পারের দেশ (Dewal Parer Desh)। লিখছেন জয়িতা দত্ত (Dr. Jayita Dutta), বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, হুগলি মহসিন কলেজ।


















