
কৈলাসহরের চা বাগান। ছবি : সংগৃহীত।
যাইহোক, ত্রিপুরায় ব্রিটিশ বিরোধী স্বদেশী তৎপরতার বিষয়ে রাজা প্রথমে নীরব কিংবা সহানুভূতিশীল থাকলেও পরবর্তী সময়ে যখন রাজ্যে গণচেতনার উন্মেষ ঘটে ও রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই রাজ প্রশাসন এ সবের বিরুদ্ধে সক্রিয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে থাকে। যাইহোক, সেদিন এই আন্দোলনের প্রতি রাজা বা রাজপ্রশাসনের ভূমিকা যাই থাক না কেন, রাজ্যের প্রজাবৃন্দ যে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং কেউ কেউ স্বদেশী তৎপরতার সঙ্গে সরাসরি যুক্তও ছিলেন তার নানা তথ্য ছড়িয়ে আছে সেদিনের ইতিহাসে।
ব্রিটিশ বাংলার লাগোয়া পার্বত্য ত্রিপুরার বিভিন্ন এলাকা সেদিনকার অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সাক্ষী হয়ে আছে। এ প্রসঙ্গে কৈলাসহরের কথাও উল্লেখ করা যায়। ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন সিলেট সীমান্তের ত্রিপুরার এই জনপদটিতে সেদিন স্বাধীনতা আন্দোলনের ছোঁয়া লেগেছিল। ১৯২৭-২৮ সালের কোনও এক সময় কৈলাসহরের মনুভ্যালি চা বাগানে আত্মগোপন করেছিলেন বিখ্যাত বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত। পুলিশের চোখে ধূলো দিয়ে তিনি পালিয়ে এসেছিলেন সীমান্ত সংলগ্ন এই চা বাগানটিতে। বিখ্যাত অলিন্দ যুদ্ধের তিন নায়ক বিনয়-বাদল-দীনেশের কথা কে না জানে! কিন্তু এদের মধ্যে দীনেশ যে কিছু দিনের জন্য হলেও কৈলাসহরের মনুভ্যালিতে আত্মগোপন করে ছিলেন তা অনেকেরই অজানা।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৯৮ : বিনা বিচারে আটকদের নিয়ে রাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্যকে চিঠি লিখেন নেহরু

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৫৪: শূর্পনখার কাহিনিতে, ষড়রিপুর প্রভাব, এক শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত নয় কী?

উত্তম কথাচিত্র পর্ব-৮৮ : নেকলেস

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-১০১ : সত্য সামনে দাঁড়িয়ে হাসে, আর মূর্খ অন্যের ব্যাখ্যায় তাকে খোঁজে!
মনুভ্যালিতে থাকার সময়ে দীনেশের বিপ্লবী তৎপরতা সম্পর্কে অবশ্য কিছু জানা যায়নি। এই চা বাগানটিতে তাঁর এক নিকট আত্মীয় কর্মরত ছিলেন। সেই সূত্রেই দীনেশ এখানে পালিয়ে এসেছিলেন। এমন হতে পারে যে, রাজা শাসিত ত্রিপুরায় ব্রিটিশ পুলিশের ভয় নেই, আবার অদূরেই ব্রিটিশ বাংলা, বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগেরও সুবিধা। সে জন্যই দীনেশ আত্মগোপনে চলে এসেছিলেন মনুভ্যালি চা বাগানে। শুধু মনুভ্যালি নয়, কৈলাসহরের আরও একটি চা বাগান কালীশাসনও বিপ্লবী তৎপরতার সাক্ষী হয়ে আছে। একদা কৈলাসহরে অনুশীলন সমিতির তৎপরতার কেন্দ্রভূমি ছিল কালীশাসন চা বাগান। কালীশাসনে কিছু দিন ছিলেন বিপ্লবী সাধক কবি শরচ্চন্দ্র চৌধুরী। তখন তিনি এই চা বাগান থেকেই অনুশীলন সমিতির কাজকর্ম পরিচালনা করতেন।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৫৯ : ভোরের রক্তাক্ত কবিতা

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু!, পর্ব-১২৮: অমিতাভ হত্যারহস্য / ৯
খিলাফৎ ও অসহযোগ আন্দোলনের অঙ্গ হিসেবে কৈলাসহরে যে ধর্মসভা স্হাপিত হয়েছিল তার নেতৃত্বে ছিলেন সতীশচন্দ্র চৌধুরী ও আব্দুল মুজাহির মজুমদার। ১৯৪২ সালে কৈলাসহর বাজার এলাকায় মিলন সমিতি নামে একটি সংগঠন গড়ে উঠেছিল। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের অন্যতম অম্বিকা চক্রবর্তী দুবার কৈলাসহর সফর করে মিলন সমিতির সদস্যদের উৎসাহিত করেন। কৈলসহরের জনমানসেও সেদিন স্বদেশানুরাগের প্রাবল্য ছিল। প্রায় শতবর্ষ আগে প্রকাশিত ‘ত্রিপুরা রাজ্যে ত্রিশ বৎসরঃকৈলাসহর বিভাগ’ গ্ৰন্হে ব্রজেন্দ্র চন্দ্র দত্ত লিখেছেন—”…. মণিপুরীদের লাইছাম্পি, পরী ও পাছড়া, দুবরা প্রভৃতি অদ্যাপি স্বদেশানুরাগী দিগের নিকট সবিশেষ সমাদর লাভ করিতেছে।… স্বদেশী আন্দোলনের ফলে লোকের মনের গতি ক্রমশঃ স্বদেশানুরাগে পরিবর্তিত হইতেছে।’
প্রাক স্বাধীনতা যুগে প্রখ্যাত চারণ কবি মুকুন্দ দাসও কৈলাসহর সফর করেছিলেন।কৈলাসহরে তিনি দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করে সবাইকে দেশাত্মবোধে উদ্দীপ্ত করেছিলেন। সেই আমলে কৈলাসহরে চারণ কবি মুকুন্দ দাসের সফর ও অনুষ্ঠান থেকে এটা স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তদানীন্তন সময়ে স্হানীয় জনমানসে স্বদেশানুরাগ কতটা প্রবল ভাবে দানা বেঁধেছিল।
প্রাক স্বাধীনতা যুগে প্রখ্যাত চারণ কবি মুকুন্দ দাসও কৈলাসহর সফর করেছিলেন।কৈলাসহরে তিনি দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করে সবাইকে দেশাত্মবোধে উদ্দীপ্ত করেছিলেন। সেই আমলে কৈলাসহরে চারণ কবি মুকুন্দ দাসের সফর ও অনুষ্ঠান থেকে এটা স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তদানীন্তন সময়ে স্হানীয় জনমানসে স্বদেশানুরাগ কতটা প্রবল ভাবে দানা বেঁধেছিল।
আরও পড়ুন:

গল্পবৃক্ষ, পর্ব-৫২: কূটবণিক্-জাতক — ভাণ্ডার তোর পণ্ড যে হয়

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-২৬ : ‘বসন্তবায় মোরে জাগায় পল্লব কল্লোলে’
উদয়পুরেও স্বাধীনতা আন্দোলনের ছোঁয়া লেগেছিল সেদিন। উদয়পুরের কেবিআই’র ছাত্রেরা ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সমর্থনে মিছিল বের করেছিল। ছাত্রদের মিছিল করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন সে সময়ের শিক্ষক পরবর্তী সময়ে ত্রিপুরা মধ্যশিক্ষা পর্ষদের সভাপতি অনিল দাশগুপ্ত। ‘আমার দেখা উদয়পুর’ গ্ৰন্থে পৃথ্বীশ চন্দ্র ভট্টাচার্য বলেছেন, ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সমর্থনে কিরীটি বিক্রম ইনস্টিটিউশনের উঁচু ক্লাসের ছাত্র সত্যেন্দ্র দত্ত ছাত্রদের জমায়েত করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভাষণ দিয়েছিলেন। বিলোনীয়াতেও ৪২-এর আন্দোলনের ভালো প্রভাব পড়েছিল। চট্টগ্রাম-নোয়াখালির আন্দোলনে বিলোনীয়ার ছাত্র-যুবকরা প্রভাবিত হয়। ছাত্রেরা ধর্মঘট করে। এরপর নোয়াখালী জেলার কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ-সহ বিলোনীয়ার ক’জন ছাত্র-যুবক উদয়পুর, সোনামুড়া মহকুমা সফর করেন। ত্রিপুরার রাজ সরকার সে সময় বিলোনীয়ার তদানীন্তন দারোগা সহ পুলিশ কর্তৃপক্ষকে এ সব বিষয়ে অবহিত করে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৪৪: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী— অলিভ রিডলে কচ্ছপ

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৮: ঘরে চুরি, বাইরে চুরি
এদিকে অগ্নিযুগে অনুশীলন সমিতির সদস্যদের অনেকেই কুমিল্লা ও সন্নিহিত অঞ্চল থেকে উদয়পুরে এসে আত্মগোপন করতেন বলে জানা যায়। প্রখ্যাত বিপ্লবী ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী উদয়পুর এসে আত্মগোপন করে স্বদেশীদের অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দিতেন। অনুশীলন সমিতির সদস্যরা উদয়পুরের পুরান রাজবাড়ি এলাকার গভীর জঙ্গলে লুকিয়ে থাকতেন। এলাকাটি তখন গভীর জঙ্গলে ঢাকা ছিল।বাংলার বিপ্লবীরা বিলোনীয়ার বোকাফা ও মাইছড়াতে কৃষি খামার কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন কার্যত যা ছিল বিপ্লবীদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এ রকম কৃষি খামার উদয়পুরের মাতাবাড়ির কাছে ধোপাইছড়ির বনের মধ্যে একটি হয়েছিল বলে জানা যায়। সাব্রুমের পশ্চিমদিকে হার্বাতলী-বেতাগার গভীর জঙ্গলেও গড়ে উঠেছিল এমন খামার। যাতে দিনের বেলায় স্হানীয় মানুষ কৃষি কাজ করতেন, রাতে বিপ্লবীরা দিতেন অস্ত্র প্রশিক্ষণ। বিপ্লবীরা বেতাগার জঙ্গলে একটি চানমারিও গড়ে তুলেছিলেন। ত্রিপুরার দক্ষিণাঞ্চলের মতো উত্তরাঞ্চলের কৈলাসহরেও মূর্তিছড়া চা বাগান এলাকায় এমন কৃষি খামার গড়ে ওঠার কথা জানা যায়।
এই ভাবেই সেদিনের স্বাধীন পার্বত্য ত্রিপুরাতেও দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রভাব পড়েছিল। আন্দোলনের দুটি ধারা, গান্ধীজির অহিংস অসহযোগ এবং সশস্ত্র তৎপরতা দুটিরই প্রভাবে নৃপতি শাসিত ত্রিপুরা প্রভাবিত হয়েছিল। —চলবে।
এই ভাবেই সেদিনের স্বাধীন পার্বত্য ত্রিপুরাতেও দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রভাব পড়েছিল। আন্দোলনের দুটি ধারা, গান্ধীজির অহিংস অসহযোগ এবং সশস্ত্র তৎপরতা দুটিরই প্রভাবে নৃপতি শাসিত ত্রিপুরা প্রভাবিত হয়েছিল। —চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।


















