মূল্যবোধের জগতে পরিবর্তন আসছে। যুগের হাওয়া, দেশ-কালের গতিবিধি মানুষের বোধের জগতেও আলোড়ন তোলে। এককালে যা ভালো বলেই মনে হয়েছে, তা আজ আর ততটা ভালো নয়। এককালে যা গর্হিত বলেই বিবেচিত হতো, আজ তা গৃহীত। তবে এ-ও আপেক্ষিক, সকলের কাছেই যে নৈতিকতার বোধ সমতুল, এমন নয়। তবে কিছু কিছু আচরণীয় বিষয় মানুষের জগতে ছিল ও আছে, যা থাকবে। অন্ততঃ আছে বলে মনে হয়, ভবিষ্যতেও থাকা উচিত বলেই মনে হয়। কেন না, না থাকলে পৃথিবীর বুকে মানুষের অস্তিত্ব ও আধিপত্যের মূল ভিত্তিটুকুই সঙ্কটাপন্ন হয় বৈকী। নানা মানবিক গুণাবলীর যথাযথ মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি, নানা মনুষ্যকৃত দোষের উপলব্ধি ও পরিহার, দোষ-গুণের সম্মিলনেই পূর্ণ মানবসত্তার বিকাশ ইত্যাদির সমন্বয়ে মানুষের জাগতিক অস্তিত্বের সঙ্কট ও সাফল্য বহুমাত্রিক। এই বিস্তৃত পরিসরে আছে বিশ্বাস, ক্ষমা, শৌচ, শান্তি, কল্যাণের মতো বিষয়, আছে আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্ম-উন্মোচন, উপলব্ধি, বিবেচনা, পরিমিতি, আত্মরক্ষণ, উপায়, চতুর্বর্গ, ষাড়গুণ্য, পারস্পরিক সম্পর্কের পরিসর। পারস্পরিক সম্পর্ক পরিবার থেকে বিস্তৃত সামাজিক নানা স্তরে নানা রূপে দেখা দেবে। সেখানে যূথবদ্ধতার পাশেই থাকে টানাপোড়েনের সঙ্কট। থাকে কৃতজ্ঞতা ও কৃতঘ্নতা। কৃতঘ্ন সে-ই যে উপকারীর উপকার স্বীকার করে না। আজকের সংক্ষিপ্ত কাহিনি সেই কৃতজ্ঞতা ও কৃতঘ্নতার আপেক্ষিক পরিসর নিয়ে, জাতকমালা থেকে।
বোধিসত্ত্ব সেই জন্মে বারাণসীর এক মহাবিত্তবান শ্রেষ্ঠী। এক প্রত্যন্তদেশীয় শ্রেষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর মৈত্রী ছিল, তবে উভয়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ কখনও হয়নি। একবার প্রত্যন্তদেশের সেই শ্রেষ্ঠী পাঁচশ’ শকটে পণ্য পরিপূর্ণ করে কর্মচারীদের বারাণসীতে পাঠালো। সেখানে তারা নির্দেশমতো শ্রেষ্ঠিরূপী বোধিসত্ত্বের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁকে উপঢৌকন দিলে তিনি তা গ্রহণ করলেন। তারা শ্রেষ্ঠীকে নিজেদের আগমনের উদ্দেশ্যটি নিবেদন করল অর্থাৎ পণ্য উপযুক্ত মূল্যে বিক্রয়ের ব্যবস্থা করে বিনিময়ে অন্য পণ্য ক্রয়ের ব্যবস্থা। শ্রেষ্ঠী তাদের যথাযথ আপ্যায়ন করলেন, বাসস্থানের ব্যবস্থা করে আহারের মূল্য দিলেন, পণ্য যথারীতি বিক্রয় করে অন্য পণ্য ক্রয়ের ব্যবস্থা করে দিলেন। এরপর তারা ফিরে গেল, প্রভুকে জানালো সবকিছু।
এরপর একদিন বারাণসীর শ্রেষ্ঠী পাঁচশ’ গাড়ি পণ্য একই উদ্দেশ্যে প্রত্যন্ত দেশে প্রেরণ করলেন। তাঁর কর্মচারীরা শ্রেষ্ঠীকে প্রভুর নাম জানিয়ে আগমনের উদ্দেশ্যটি জ্ঞাপন করলো। তিনি উপঢৌকন গ্রহণ করে বাঁকা হেসে বললেন, ওই নামে তো কতলোক-ই আছে হে। অর্থাৎ তিনি পরিচিতি ও পূর্ব উপকার অস্বীকার করলেন। এরপর তিনি আগন্তুকদের আহার বা বাসস্থান কিংবা পণ্য বিক্রয়াদির কোনও ব্যবস্থাই করলেন না। কর্মচারীরা নিজের সামর্থ্যমতো পণ্য বিক্রয়ের ব্যবস্থা করে বিনিময়ে অন্য পণ্য ক্রয় করে বারাণসী ফিরে গিয়ে প্রভুকে সকলকিছু জানালো।
এরপর আবার একদিন প্রত্যন্তদেশীয় শ্রেষ্ঠী পণ্যভার প্রেরণ করলেন বারাণসীতে। পাঠক মনে করতে পারেন, কৃতঘ্নতার প্রতিফল কোনও দৈব উপায়ে, অলৌকিক পথে লাভ করবে শ্রেষ্ঠী। কিন্তু জাতকমালার কাহিনির গতি অন্যতর।
বারাণসীর শ্রেষ্ঠীর কর্মচারীরা পূর্বে ঘটে যাওয়া অপমানের প্রতিশোধ নেবে স্থির করলো। তারা আগত প্রত্যন্তবাসীদের দেখেই বলল, দেখি, প্রভু এদের আহার বাসস্থানের ব্যয় কী করে দেন। তারপর তারা আগন্তুকদের নিয়ে গেল নগরের বাইরে, একটি মনোমত স্থান তাদের দেখিয়ে সেখানেই তাদের থাকার ব্যবস্থা করলো। জানালো, প্রভুর গৃহ থেকে আহারের দ্রব্য ও অন্যান্য সামগ্রী আসবে। শকটের বলদ খুলে দিয়ে বিশ্রামের ব্যবস্থা হল। এরপর মধ্যরাত্রিতে তারা সদলবলে ঝাঁপিয়ে পড়ল, লুণ্ঠন করল পাঁচশ’ শকট, আগন্তুকদের প্রায় বিবস্ত্র অবস্থায় তাড়িয়ে দিল, তাড়িয়ে দিল সকল বলদ, গাড়ির চাকা খুলে নিল। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে প্রত্যন্তবাসীরা দ্রুতবেগে পালিয়ে গেল।
শ্রেষ্ঠিরূপী বোধিসত্ত্ব যখন কর্মচারীদের কাছ থেকে সকল বৃত্তান্ত জানলেন, তখন তিনি বললেন, পূর্বের উপকার ভুলে গিয়েই তিনি এই প্রতিফল লাভ করেছেন। অন্যের উপকার স্মরণ করেও যে কৃতজ্ঞতা জানায় না, সে আবার যখন বিপন্ন হয়, তখন তার পাশে কেউ থাকে না।
কৃতঘ্নের চিরকাল-ই এই পরিণতি ঘটে।—চলবে।
* ড. অভিষেক ঘোষ (Abhishek Ghosh) সহকারী অধ্যাপক, বাগনান কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগ থেকে স্নাতকস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। স্নাতকোত্তরের পর ইউজিসি নেট জুনিয়র এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে সাড়ে তিন বছর পূর্ণসময়ের গবেষক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। সাম্বপুরাণের সূর্য-সৌরধর্ম নিয়ে গবেষণা করে পিএইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। আগ্রহের বিষয় ভারতবিদ্যা, পুরাণসাহিত্য, সৌরধর্ম, অভিলেখ, লিপিবিদ্যা, প্রাচ্যদর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব, চিত্রকলা, বাংলার ধ্রুপদী ও আধুনিক সাহিত্যসম্ভার। মৌলিক রসসিক্ত লেখালেখি মূলত: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন জার্নাল ও সম্পাদিত গ্রন্থে। সাম্প্রতিক অতীতে ডিজিটাল আর্ট প্রদর্শিত হয়েছে আর্ট গ্যালারিতে, বিদেশেও নির্বাচিত হয়েছেন অনলাইন চিত্রপ্রদর্শনীতে। ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন নিজের চিত্রকলা। এখানে একসঙ্গে হাতে তুলে নিয়েছেন কলম ও তুলি। লিখছেন রম্যরচনা, অলংকরণ করছেন একইসঙ্গে।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com