শনিবার ৭ মার্চ, ২০২৬


কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।

মহর্ষি নারদ ইন্দ্রপ্রস্থনগরে ময়দানবনির্মিত সভায়, যুধিষ্ঠিরকে, বহুবিঘ্নসঙ্কূল রাজসূয়যজ্ঞানুষ্ঠানের পরামর্শ দিয়ে বিদায় নিলেন। মহর্ষি সেই প্রসঙ্গে এই যজ্ঞানুষ্ঠানের মাহাত্ম্য ব্যাখ্যা করলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, যুধিষ্ঠিরকে রাজসূয় যজ্ঞ সম্পাদনে অনুপ্রেরণাদান। অতঃপর যুধিষ্ঠির রাজসূয়যজ্ঞের মাহাত্ম্য স্মরণ করে, সভাসদদের সঙ্গে রাজসূয় যজ্ঞের অনুষ্ঠান বিষয়ে পরামর্শ শুরু করলেন। রাজসূয় যজ্ঞের লক্ষ্য ছিল ধর্মাচরণের অঙ্গরূপে সর্বলোকের কল্যাণসাধন। নির্বিশেষে মানুষের মঙ্গল হতে পারে কীভাবে সেটাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। সেই বিষয়ে তিনি মনোনিবেশ করলেন। এই বিষয়ে তাঁর কর্মোদ্যোগ কেমন ছিল? যুধিষ্ঠির ক্রোধ ও অহঙ্কার ত্যাগ করে, প্রজাদের নির্দেশ দিলেন, যাঁর যা প্রদেয় (ঋণ প্রভৃতি) সেটি দিয়ে দাও। সর্ব্বেষাং দীয়তাং দেয়ং মুঞ্চন্ কোপমদাবুভৌ। তাঁর মুখে এক কথা ধর্মই সঠিক। এই অবস্থায় প্রজারা তাঁর প্রতি পিতৃতুল্য আস্থাশীল ছিলেন। যুধিষ্ঠিরের প্রতি কেউ বিদ্বেষপরায়ণ ছিলেন না। তাই তিনি ছিলেন অজাতশত্রু। নরেন্দ্র যুধিষ্ঠিরের শাসনে, ভীমের রক্ষণাবেক্ষণে, বীভৎসু অর্থাৎ অর্জুনের শত্রুনাশের কারণে, মহান নকুলের কর্মতৎপরতাহেতু, বুদ্ধিমান সহদেবের কাজের পরামর্শদানের দরুণ, যুধিষ্ঠিরের অধিকৃত দেশটি ছিল বিবাদহীন, নির্ভয়, সেখানে সকলে (প্রজারা) নিজ নিজ ধর্মে নিরত ছিলেন।
দেশটি ছিল পর্যাপ্ত বৃষ্টিবহুল ও সমৃদ্ধ। সেখানে সুদের বৃদ্ধি হতো মহাজনদের, যজ্ঞের উপকরণাদি, গোরক্ষা, কৃষিকাজ, বাণিজ্য— এই সবকিছু রাজা যুধিষ্ঠিরের উদ্যোগে বিশেষভাবে উন্নত হল। যুধিষ্ঠির নিত্য ধর্মরত থাকায়, (পূর্ববৎসরের) দেয় কর, অত্যাচারের মাধ্যমে করসংগ্রহ, ব্যাধি, অগ্নিকাণ্ডজনিতভয়, মোহনিবন্ধন দুষ্কর্ম প্রভৃতি ছিল না। এমন কি দস্যু, রাজকর্মচারী, পররাজ্যস্থিত রাজার প্রিয়পাত্রদেরও পরস্পর আলাপচারিতায় মিথ্যাচার শোনা যেত না। অন্যান্য রাজারা সন্ধিবিগ্রহাদি ষড়বিধবিষয়ে, অবশ্যকর্তব্য উপহারদানের জন্যে যুধিষ্ঠিরের কাছে, নীচজাতীয় প্রজা ও বণিকদের মতো অনুনয়সহকারে উপস্থিত হতেন। নিত্য ধর্মপরায়ণ যুধিষ্ঠিরের রাজত্বকালে, লোভহেতু যথেচ্ছ অন্নবস্ত্রাদিভোগকারী রজোগুণপ্রধান মানুষজনের কারণেও দেশ সমৃদ্ধ হয়েছিল। সর্বব্যাপী প্রভাবশালী, সর্বগুণান্বিত, সর্বংসহা, সার্বভৌম, মহাযশস্বী,রাজ্যশ্রীতে উজ্জ্বল, সম্রাট যুধিষ্ঠির, অধিকৃত দেশের শাসক হয়েছিলেন। দশদিকের প্রজাবৃন্দ, এমন কি গোপালকরা পর্যন্ত, রাজা যুধিষ্ঠিরের প্রতি (নীতিশিক্ষাদিগ্রহণবিষয়ে) পিতার ও (বাৎসল্যাদি মাতৃগুণহেতু) মাতার থেকেও বেশি অনুরক্ত ছিলেন। বাগবিদদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ,রাজা যুধিষ্ঠির, ভাই ও মন্ত্রীদের আহ্বান করে রাজসূয়যজ্ঞসম্বন্ধে বার বার নানা প্রশ্ন করতে লাগলেন। মন্ত্রীদের সঙ্গে সহমত হয়ে সকলে, যজ্ঞ করতে ইচ্ছুক, মহাপ্রাজ্ঞ যুধিষ্ঠিরকে যুক্তিসঙ্গত পরামর্শ দিলেন। রাজ্যে অভিষিক্ত নৃপতি, জলেও আধিপত্য বিস্তার করে থাকেন, সামর্থ্যহেতু সেই রাজার, জলস্থলের সর্বত্র আধিপত্যরূপ, সম্রাটের গুণের লিপ্সা থাকে।
আরও পড়ুন:

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১৪০: রামের সত্যরক্ষা, প্রবাদপ্রতিম রামরাজ্যের স্রষ্টার বৈরাগ্যের রূপ

উত্তম কথাচিত্র, পর্ব-৭৭ : রাজা সাজা

পিতার ঔজ্জ্বল্য কখনও ম্লান হয়নি পুত্রের খ্যাতিতে

উপন্যাস: দেওয়াল পারের দেশ, পর্ব-১২: এ দিন যাবে, রবে না

কুরুনন্দন যুধিষ্ঠির, সম্রাটের গুণে গুণান্বিত। তাই মন্ত্রীবর্গসহ স্বজনদের প্রস্তাব—এটি তাঁর রাজসূয়যজ্ঞসম্পাদনের যথাযোগ্য সময়। ক্ষত্রিয়গুণসম্পদ যুধিষ্ঠিরের আয়ত্তাধীন বলে এটাই সঠিক সময়। এই যজ্ঞে প্রশস্তব্রহ্মচর্যে নিরত দ্বিজগণ, সামবেদের মন্ত্র পাঠ করে ছয়টি অগ্নি স্থাপন করে থাকেন। যে রাজসূয়যজ্ঞ (সর্বফলসাধক) দর্ব্বীহোমের মতো গুণযুক্ত এবং সমস্তযজ্ঞের ফলদায়ক। যজ্ঞান্তে রাজা সাম্রাজ্যে অধিষ্ঠিত হন,তাই এই যজ্ঞ সর্ব্বজিৎ যাগ নামে অভিহিত। পরামর্শদাতারা রাজা যুধিষ্ঠিরকে বললেন, আপনি এই যজ্ঞানুষ্ঠানের যোগ্য অধিকারী।আমরা সকলে আপনার বশংবদ। তাই আপনি অচিরেই এই রাজসূয়যজ্ঞ করতে সমর্থ হবেন। সমর্থোঽসি মহাবাহো! সর্ব্বে তে বশগা বয়ম্। অচিরাত্ত্বং মহারাজ! রাজসূয়মবাপ্স্যসি।। রাজার মন্ত্রণাদাতারা প্রত্যেকে পৃথকভাবে এবং সম্মিলিতভাবে বললেন, রাজা যেন বিশেষ বিচারবিবেচনা না করে রাজসূয়যজ্ঞে মনঃসংযোগ করেন। শত্রুহন্তা পাণ্ডুপুত্র যুধিষ্ঠির, সমবেত ক্ষমতাসীন ব্যক্তিত্বদের উর্বরমস্তিষ্কপ্রসূত অভিপ্রেত উত্তম কথাগুলি শুনে, মনে মনে সেগুলি গ্রহণ করলেন। যুধিষ্ঠির, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সেই সব কথা শুনে এবং নিজের সামর্থ্যবিষয় স্মরণ করে,রাজসূয়যজ্ঞে মনোনিবেশ করলেন। বুদ্ধিমান ও মন্ত্রণাকুশল ধর্মজ্ঞ রাজা যুধিষ্ঠির, ভাই,মহান ঋত্বিকবর্গ, মন্ত্রীবৃন্দ, পুরোহিত ধৌম্য ও দ্বৈপায়ন প্রভৃতি ঋষিগণের সঙ্গে মন্ত্রণা শুরু করলেন।
আরও পড়ুন:

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১৩০: কাদাখোঁচা

উপন্যাস: আকাশ এখনও মেঘলা, পর্ব-৪৮: আকাশ এখনও মেঘলা

যুধিষ্ঠির বললেন, এই রাজসূয় নামে মহাযজ্ঞ সম্রাটদের যোগ্য যাগ। বলুন, এ বিষয়ে গভীর শ্রদ্ধাশীল আমার ইচ্ছাটির, সাফল্যলাভ কিভাবে সম্ভব? ইয়ং যা রাজসূয়স্য সম্রাড়র্হস্য সুক্রতোঃ। শ্রদ্দধানস্য বদতঃ স্পৃহা মে সা কথং ভবেৎ।। সকলে বললেন, রাজসূয়মহাযজ্ঞের যথাযোগ্য পুরুষ হলেন যুধিষ্ঠির। পুরোহিত ও মুনিগণের বক্তব্যের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন যুধিষ্ঠিরের ভাই ও মন্ত্রীরা। যিনি মহাপ্রাজ্ঞ আবার তিনি জিতচিত্ত, সেই রাজা যুধিষ্ঠির, লোকেদের হিতকামনায় (কীভাবে যজ্ঞ সম্পন্ন হবে, প্রাণহানি হবে না, এমন) বিচার করতে লাগলেন। প্রাজ্ঞ ব্যক্তি, নিজের সামর্থ্যানুযায়ী, পরিবেশ ও সময়,আয়ব্যয়ের হিসাব বিবেচনা করে,কাজ শুরু করলে, ব্যর্থ হন না। নিজের বুদ্ধি অনুসারে রাজসূয়যজ্ঞারম্ভ ঠিক নয়—এমন চিন্তা করে,যাগকর্তা যুধিষ্ঠির যত্নসহকারে যজ্ঞসম্পাদনের জন্য, সর্বলোকে শ্রেষ্ঠ নারায়ণরূপধারী কৃষ্ণকে মনে মনে স্মরণ করলেন। পাণ্ডুপুত্র যুধিষ্ঠির যুক্তি-সহ চিন্তা করলেন, দেবকর্মতুল্য যাঁর কর্মতৎপরতা সেই অতুলনীয় মহাবীর নারায়ণ, স্বেচ্ছায় মানবলোকে জন্ম নিয়েছেন। কৃষ্ণের অজ্ঞাত কিছু নেই, কৃষ্ণের অসাধ্য কিছু নেই। তাঁর পক্ষে, কোনও কিছুই অসম্ভব নয়। এমন নিশ্চিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, পার্থ যুধিষ্ঠির, জগদ্গুরুকৃষ্ণের কাছে সত্বর দূত পাঠালেন। সেই দূত দ্রুতগামী রথে আরোহণ করে যাদবদের কাছে উপস্থিত হয়ে, দ্বারকায় দ্বারকাবাসী কৃষ্ণের সাক্ষাৎ পেলেন। পৃথাপুত্র যুধিষ্ঠিরের দর্শনাকাঙ্খায় অচ্যুত কৃষ্ণ সারথি ইন্দ্রসেনের সঙ্গে ইন্দ্রপ্রস্থের উদ্দেশে রওনা দিলেন। জনার্দন কৃষ্ণ, দ্রুতগামী বাহনে, বিভিন্ন দেশ অতিক্রম করে, ইন্দ্রপ্রস্থে পার্থ যুধিষ্ঠিরের কাছে পৌঁছলেন। সেখানে মাধব, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির ও ভীমের দ্বারা সম্মানিত হয়ে, পিতার ভগিনীর (দেবী কুন্তীর) সঙ্গে দেখা করলেন। কৃষ্ণ, সুহৃদ অর্জুনের সঙ্গে সাক্ষাতান্তে পরমানন্দ লাভ করলেন। যমজ ভাই দুজন,নকুল ও সহদেব তাঁকে গুরুতুল্য বন্দনা করলেন। সুন্দর পরিবেশে কুশলে অবস্থানরত (সকলের মনোবাঞ্ছাপূরণহেতু) কল্পতরুবৎভাবমূর্তিতে বিরাজমান কৃষ্ণের কাছে, যুধিষ্ঠির স্বয়ং উপস্থিত হয়ে, নিজের কর্মোদ্যোগবিষয়ে বলতে লাগলেন। যুধিষ্ঠির জানালেন, হে কৃষ্ণ, আমি নিজের ইচ্ছায়, রাজসূয়যজ্ঞ করতে উদ্যত হয়েছি যা কেবল নিজের ইচ্ছায় করা সম্ভব নয়, সে তো তুমি আদ্যোপান্ত জান। প্রার্থিত রাজসূয়ো মে ন চাসৌ কেবলেচ্ছয়া। প্রাপ্যতে যেন তত্তে হি বিদিতং কৃষ্ণ!সর্ব্বশঃ।। যাঁর দ্বারা সবকিছু সম্ভব, যিনি সর্বত্র সম্মানিত হন এবং যে রাজা সকলের প্রভু তিনিই রাজসূয়যজ্ঞ করতে সক্ষম। হয়তো যুধিষ্ঠির কৃষ্ণের মুখ থেকে শুনতে চাইছেন, সেই যাগকর্ত্তার যোগ্যতা যুধিষ্ঠিরের আছে কি না। তং রাজসূয়ং সুহৃদঃ কার্য্যমাহুঃ সমেত্য মে। তত্র মে নিশ্চিততমং তব কৃষ্ণ! গিরা ভবেৎ।।
আরও পড়ুন:

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৪৫: জরুরি একটি ফোন

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৮৬: বক্সনগরে আবিষ্কৃত হয়েছে বৌদ্ধ স্তুপ, চৈত্যগৃহ ও একটি মঠ

সুহৃদ্বর্গ সকলে মিলে বলছেন এটি (রাজসূয় যজ্ঞ) আমার কর্তব্য। তোমার কথাতেই শুধু আমি নিশ্চিত হতে পারি। কেউ শুভাকাঙ্ক্ষী হলে দোষ সম্বন্ধে বলেন না, আবার অন্যরা স্বার্থ চিন্তা করে শুধুমাত্র মনোরঞ্জক প্রিয়কথা বলেন। কেউ কেউ কেবল নিজের যেটা হিতকর সেটাই লাভ করতে ইচ্ছুক হন। প্রয়োজনের সময়ে এমন নানা লোকের নানা কথা শোনা যায়। এইসব কথা পরিহার করে, কাম অর্থাৎ স্বার্থপরতা ও ক্রোধ পরিত্যাগ করে, যেটি জগতে পরম কল্যাণকর সেই কথাটি যথাযথভাবে বলতে পার শুধু তুমিই।

মহর্ষি নারদের অনুপ্রেরণায় ধর্মচেতনায় উদ্বুদ্ধ ধার্মিক যুধিষ্ঠিরের রাজসূয়যজ্ঞসম্পাদনের মূল লক্ষ্য ছিল সার্বিক আধিপত্যবিস্তারের মাধ্যমে জনকল্যাণসাধন। মহাভারতকার বলেছেন, ভূয়শ্চাদ্ভুতবীর্য্যৌজা ধর্ম্মমেবানুচিন্তয়ন্। কিং হিতং সর্ব্বলোকানাং ভবেদিতি মনো দধে।। তাই, আশ্চর্যবলশালী ও শৌর্যবান যুধিষ্ঠির ধর্ম স্মরণ করে, সর্বলোকের মঙ্গলকামনায় মনোনিবেশ করলেন। যুধিষ্ঠির যে নিজে ধার্মিক রাজা, হয়তো তাঁর ধর্মবোধপ্রমাণের প্রয়োজন হয় না। তবু উদারমনা যুধিষ্ঠির ক্রোধ ও অহঙ্কার বর্জন করে নিজের ধর্মবোধে উদ্বুদ্ধ করেছেন প্রজাদের। যাঁর যে ঋণ সেটি সর্বদাই পরিশোধ করা কর্তব্য, ধর্মবোধ রাজা যুধিষ্ঠিরের চেতনার উজ্জীবনমন্ত্র। তাঁর মুখে সর্বদা এক কথা, সাধু ধর্ম্মেতি ধর্ম্মেতি নান্যৎ শ্রূয়েত ভাষিতম্। তাঁর মুখে ধর্ম সৎ, ধর্ম সাধু, এ ছাড়া অন্য কোন কথা নেই। প্রজাদের কাছে ঠিক পিতার মতোই আস্থাভাজন তাঁর ভাবমূর্তিটি।
আরও পড়ুন:

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১৭ : কাঞ্চনজঙ্ঘা: দেখা হবে চন্দনের বনে

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৪৪: কবি-কন্যার প্রিয় বান্ধবী

যুধিষ্ঠিরের কোনও শত্রু ছিল না। পাঁচ ভাই পাঁচটি গুরু দায়িত্ব পালন করতেন। ফলে দেশ ছিল বিবাদমুক্ত, ভয়হীন, প্রজাদের ধর্মাধর্মাচরণে কোনও বাধা ছিল না। বৃষ্টিবহুল দেশ ছিল কৃষির উর্বরতায় সমৃদ্ধ। যেমন ব্যবসায়িক ঋণদান তেমন যজ্ঞোপাদানসংগ্রহ ও গোসম্পদরক্ষায় রাজার সমান আনুকূল্যদান ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। আবার সাধারণের কৃষি, বাণিজ্য সবকিছু তাঁর উৎসাহে উন্নত হয়েছিল। এগুলি একজন প্রতিষ্ঠিত রাজার সমৃদ্ধির প্রতীক। এই সব বলা যায়, প্রজাকল্যাণে নিয়োজিতপ্রাণ রাজার উন্নতির ঊর্ধ্বগামী রেখা। প্রজাদের আর্থিক অবস্থার পরিচায়ক তাঁদের যথাসময়ে করদান। সেই সময়ে করদানবিষয়ে রাজকর্মচারীদের উৎপীড়নের আশ্রয় নিতে হয়নি। যুধিষ্ঠিরের রাজত্ব রোগের প্রাদুর্ভাব বা অগ্নিভয় অর্থাৎ, হঠাৎ কোনও দুর্বিপাকের সম্ভাবনা ছিল না। সুরক্ষার বাতাবরণে প্রজাদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য বিষয়ে কোনও দুর্ভাবনার অবকাশ ছিল না। একজন সার্থক রাজার প্রজাদের সুরক্ষাদান নিশ্চিত করতে এর থেকে বড় পদক্ষেপ আর কি হতে পারে? যুধিষ্ঠিরের শাসনে রাজকর্মচারী, চোর, বিভিন্ন রাজ্যবাসী,রাজার প্রিয়জনরা ছিল দ্বিচারিতামুক্ত।বোধ হয়, নৈতিকতার নির্মল আবহ ছিল সর্বত্র। অন্যান্য রাজারা তাঁর সঙ্গে সন্ধি, বিগ্রহ, যান, আসন, দ্বৈধীভাব, সংশ্রয় প্রভৃতি বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন। অর্থাৎ পররাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কবিষয়ে তিনি চিন্তামুক্ত ছিলেন। রজোগুণপ্রধান ভোগাসক্তিতে নিমজ্জিত মানুষরা থাকা সত্ত্বেও দেশ সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল।

যুধিষ্ঠির অপরিমিত প্রভাবশালী ছিলেন এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তিনি ছিলেন গুণবান, সহিষ্ণু, মহাযশস্বী, সাম্রাজ্যের শ্রীবৃদ্ধিহেতু দীপ্যমান এক শাসনকর্তা।সমাজের সর্বস্তরের প্রজারা পিতামাতার অধিক রাজার প্রতি অনুগত ছিলেন। তা সত্ত্বেও নিজের একচ্ছত্র আধিপত্যপ্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর রাজসূয়যজ্ঞায়োজনের উদ্যোগ। যুধিষ্ঠির এই বিষয়ে ভাই, মন্ত্রী, বিশ্বস্ত মাননীয় পুরোহিত ধৌম্য এবং ঋষিগণের অনুমোদনের প্রয়োজন বোধ করেছিলেন। তিনি রাজকীয় পরিমণ্ডলের সকলের সম্মতি নিয়ে এই রাজসূয়যজ্ঞসম্পাদনে উৎসাহিত হয়েছিলেন। যে কোনও বড় কর্মোদ্যোগ গ্রহণ করলে সকলের সম্মতির প্রয়োজন। রাজকীয় বা পারিবা রিক পরিমণ্ডলে, এটাই বিচক্ষণতার পরিচয়। সকলের পূর্ণ সমর্থন লাভ করেছিলেন রাজা যুধিষ্ঠির। তা সত্ত্বেও তিনি বার বার লোকহিতকর এই কর্মোদ্যগের বিষয়ে গভীর চিন্তাশীল হয়েছেন। এর কারণ মহাভারতকার বলেছেন, —সামর্থ্যযোগং সম্প্রেক্ষ্য দেশকালৌ ব্যয়াগমৌ। বিমৃষ্য সম্যক্ চ ধিয়া কুর্ব্বন্ প্রাজ্ঞো ন সীদতি।।
কলকাতায় বৃষ্টি

ছবি: প্রতীকী। সংগৃহীত।

যুধিষ্ঠির সেই প্রাজ্ঞ বিজ্ঞজনের মতোই পরিবেশ, পরিস্থিতি, সময়, আয়ব্যয়েরহিসেব প্রভৃতি বিবেচনা করে বিরাট এই যজ্ঞেকর্মের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চেয়েছেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি তাঁর আত্মবিশ্বাসের অভাব বলে মনে হতে পারে, প্রকৃতপক্ষে এটি যুধিষ্ঠিরের বিচক্ষণতার পরিচয়। এত সব অনুমোদন লাভ করেও যুধিষ্ঠির সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তিনি পরম শ্রদ্ধেয়, সর্বজ্ঞ, গুরুপ্রতিম কৃষ্ণের শরণাপন্ন হয়েছেন। কারণ কৃষ্ণের অকপট স্বীকৃতির বড় প্রয়োজন ছিল তাঁর। কারণ কৃষ্ণের মতামত হবে, সৌভ্রাতৃত্বহেতু দোষ গোপন করে কোনও পক্ষপাতদুষ্ট মতামত নয়, নয় কোনও স্বার্থনিষ্ট প্রিয়সমর্থন। ধার্মিক রাজা যুধিষ্ঠির তাই রাজোচিত সিদ্ধান্তগ্রহণের আগে পরমনির্ভর কৃষ্ণের নিরপেক্ষ সমর্থন বিশেষ প্রয়োজন বলে মনে করেছেন। যে কোনও গুরুত্বপূর্ণবিষয়ে, সার্বিক বিজ্ঞতার কারণে নির্ভরতার আশ্রয় কোন মহান ব্যক্তিত্ব। তাঁর অনুমোদন প্রয়োজন। রাজতন্ত্রে তো বটেই, যে কোনও শাসনব্যবস্থায় এমন ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি হয়তো প্রয়োজন।কৃষ্ণের অনুমোদন, ভবিষ্যতে কেন বার বার পাণ্ডুপুত্রদের কার্যোদ্ধারের সহায়ক হয়েছে সে কথা, সময় বলে দিয়েছিল। এমন একজন কৃষ্ণ হয়তো লোকচক্ষুর আড়ালে বৃহত্তর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের নিয়ামক হয়ে থাকেন, সময় শুধু তার হিসেব রাখে। —চলবে।

* মহাকাব্যের কথকতা (Epics monologues of a layman): পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় (Panchali Mukhopadhyay) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সংস্কৃত বিভাগ, যোগমায়া দেবী কলেজে।

গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম

‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com


Skip to content