রাধাকিশোর মাণিক্যও (১৮৯৬-১৯০৯ খ্রি:) ঊনকোটি গিয়েছিলেন। কালের কবলে পড়ে ভূমিকম্প- সহ নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ঊনকোটির অনেক মূর্তি ইতিমধ্যেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। শতাধিক বছর আগেই পণ্ডিত চন্দ্রোদয় লিখেছেন, ‘পর্ব্বত পার্শ্বে বহুসংখ্যক মূর্ত্তি খোদিত ছিল, কালক্রমে সমস্তই বিনষ্ট হইয়া গিয়াছে। এখন যাহা আছে, তাহাও আর বেশি দিন থাকিবে বলিয়া বোধ হয় না। কারণ প্রস্তর ক্রমে ধসিয়া পড়িতেছে।’
প্রায় একশ বছর আগে ব্রজেন্দ্র চন্দ্র দত্ত তাঁর “ত্রিপুরা রাজ্যে ত্রিশ বছর, কৈলাসহর বিভাগ” গ্রন্থে ঊনকোটির বিগ্রহ সকল সম্পর্কে লিখেছিলেন, “শত শত বৎসরের সুপ্রাচীন এই সকল প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন কালের প্রভাবে এখন ধ্বংসের মুখে।” ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি লিখেছেন, “খৃষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগে কালা পাহাড় কর্ত্তৃক বহুস্হানের দেবমূর্ত্তি বিভগ্ন হয়, ঊনকোটি তীর্থের দুর্দ্দশাও তৎকর্ত্তৃক সাধিত হইয়াছিল বলিয়া অদ্যাপি কথিত হয়।”
যাইহোক, ঊনকোটির পীঠ মাহাত্ম্যের কথা নানা প্রাচীন গ্রন্থে বর্ণিত আছে। ‘রাজমালা’তে রয়েছে রাজাদের ঊনকোটি পরিদর্শনের কথাও। ধারণা করা হয়েছে রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় সেখানে মন্দির নির্মিত হয়েছিল। কিন্তু ঊনকোটির বিগ্রহ সমূহের সৃষ্টির তথ্য নেই প্রাচীন পুস্তকাদিতে। ত্রিপুরার মাণিক্য রাজবংশের প্রতিষ্ঠা পঞ্চদশ শতকে। আর প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, ঊনকোটির বিগ্রহ সমূহের সৃষ্টি শুরু হয় অষ্টম-নবম শতাব্দীতে। অর্থাৎ মাণিক্য রাজবংশের অনেক অনেক আগের সৃষ্টি ঊনকোটি।কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতা যাদেরই থাক না কেন বিগ্রহ নির্মাণ সহ পীঠভূমি সৃষ্টিতো হয়েছিল এই ভূখণ্ডেই!তাই ঊনকোটির আবৃত ইতিহাস উন্মোচন খুবই প্রয়োজন। কারণ এই ভূখণ্ডের ইতিহাসের সঙ্গে ঊনকোটি অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত।
এবার কাছাড়ের ভুবন পাহাড়ের কথায় আসা যাক। ভুবন পাহাড়ে রয়েছে নানা দেবদেবীর বিগ্রহ, সুড়ঙ্গ পথ। তবে বহুআগে থেকেই বিগ্রহের ভগ্ন দশা চলছে। ইতিমধ্যেই অনেক বিগ্রহ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। এক সময় ভুবন পাহাড়ে প্রস্তর নির্মিত মন্দির ছিল। কথিত আছে যে, পাহাড়ের উপরের একটি বৃহৎ প্রস্তর স্হানচ্যুত হয়ে মন্দির ও অনেক বিগ্রহ বিধ্বস্ত হয়। ত্রিপুরার ঊনকোটির মতো কাছাড়ের ভুবনও এক শৈব তীর্থ। কেউ কেউ এমনও মনে করেন যে ঊনকোটিরও আগে ভুবনের সৃষ্টি শুরু হয়েছিল।
সুদূর অতীতে কাছাড়ের ভুবন ও সন্নিহিত অঞ্চলে ত্রিপুরার রাজাদের রাজত্ব ছিল। ‘কাছাড়ের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, সুপ্রাচীন কালে ভুবন পাহাড় থেকে আজকের ত্রিপুরার কৈলাসহর পর্যন্ত এক বিস্তীর্ণ জনপদ ছিল এবং কালক্রমে তা ঘোর অরণ্যে পরিণত হয়। এ থেকে ঊনকোটির শিল্পকর্মের সঙ্গে ভুবনের এক যোগসূত্রের ধারণা করা যেতে পারে। শিলচর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে মণিপুর সীমান্তে ভুবন পাহাড়ের অবস্থান। পাহাড়টির সর্বোচ্চ অংশের উচ্চতা প্রায় তিন হাজার ফুট হবে। এক সময় ভুবন পাহাড়ে ছড়িয়ে ছিল বহু দেবদেবীর বিগ্রহ। কিন্তু কালের কবলে পড়ে, অযত্নে অবহেলায় তার অধিকাংশই আজ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।
শতাধিক বছর আগে প্রকাশিত ‘কাছাড়ের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে ‘ভুবনেশ্বর’ বিগ্ৰহের এরকম বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, “এক্সকৌপিনবস্ত্র পরিহিত, দ্বিভুজ, দ্বিনেত্র, কৃশোদর, বাম হস্ত বাম জানুর নিম্নে রক্ষিত এবং দক্ষিণ হস্ত হৃদয়ে ধারণ করত পূর্ব্বাভিমুখে পাষাণোপরি দণ্ডায়মান। গলদেশে প্রস্তর নির্ম্মিত মালা শোভা পাইতেছে। বিগ্ৰহের উচ্চতা প্রায় সার্দ্ধ দুই হস্ত।’ অনুরূপ ভাবে ‘ভুবনেশ্বরী’ বিগ্রহ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘…এই বিগ্রহের দক্ষিণ হস্ত ভগ্ন,মস্তক হইতে কটির উপরিভাগ পর্য্যন্ত অনাবৃত, কটিদেশ হইতে জানু পর্য্যন্ত প্রস্তরবসন পরিহিত এবং তম্নিম্নভাগ ভূমিতে প্রোথিত।”—চলবে।
* ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পান্নালাল রায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৫৪ সালে ত্রিপুরার কৈলাসহরে জন্ম। প্রায় চার দশক যাবত তিনি নিয়মিত লেখালেখি করছেন। আগরতলা ও কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে ইতিমধ্যে তার ৪০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস ভিত্তিক তার বিভিন্ন গ্রন্থ মননশীল পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সে-সব উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। রাজন্য ত্রিপুরার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সম্পর্ক, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক রচনা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত ব্যতিক্রমী রচনা আবার কখনও স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ইত্যাদি তাঁর গ্রন্থ সমূহের বিষয়বস্তু। সহজ সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্থাপনই তাঁর কলমের বৈশিষ্ট্য।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com