গোত্রা নামের স্যান্ডপাইপারদের কথা পড়তে গিয়ে আর একধরনের পাখির নাম জেনেছিলাম অজয় হোমের লেখা “চেনা-অচেনা পাখি” থেকে। পাখিটির নাম তিনি বলেছেন বিলের বালুবাটান। তবে আরও একটা নাম তিনি বলেছেন – ছোট গোত্রা। বলাবাহুল্য এই নামটি অজয়বাবুর নিজের দেওয়া। ইংরেজিতে পাখিটির নাম ‘Marsh Sandpiper’। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘Tringa stagnalitis’। সত্যি বলতে কি পাখিটিকে আমি দেখেছি নাকি দেখিনি তা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। আসলে গোত্রার সাথে বিলের বালুবাটানের মিল এতটাই বেশি যে আমার মতো এক আনাড়ি পাখিপ্রেমীর পক্ষে দূরে থেকে একে শনাক্ত করা অসম্ভব। তাই হয়তো দেখেছি ভেবে নিয়ে এই পাখিটি সম্বন্ধে লিখতে মনস্থ করলাম।
বিলের বালুবাটান পাখিটি সুন্দরবন অঞ্চলে নদীর ধারে বা খাঁড়ির মুখে কিংবা নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে যেখানে জোয়ারের সময় জল পৌঁছে যায় সেখানে দেখা যায়। অনেকসময় প্লাবিত ধানজমিতেও ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। এরাও গোত্রার মতো পরিযায়ী পাখি। অজয়বাবু লিখেছেন, এরা নোনা জলের থেকে মিষ্টি জল বেশি পছন্দ করে। আর তাই মিষ্টি জলের জলাভূমিগুলিতে এদের প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়। কিন্তু সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ অঞ্চলও যে ওদের পছন্দের জায়গা তা ওদের উপস্থিতি প্রমাণ করে দেয়।
বিলের বালুবাটান হল বেশ স্লিম আকারের পাখি। দৈর্ঘ্য ২২-২৬ সেমি, ডানা বিস্তার করলে ৫৫-৬০ সেমি এবং ওজন ৪৫-১২০ গ্রাম হয়। এদেরও পা হলুদাভ সবুজ, গোত্রাদের মতো। তবে গোত্রার তুলনায় পা কিছুটা বেশি লম্বা। চঞ্চু লম্বা, সরু ও সোজা। সুন্দরবন অঞ্চলে যে বিলের বালুবাটানদের দেখা যায় তাদের প্রজনন পালক তৈরি হয় না কারণ সুন্দরবন ওদের প্রজননক্ষেত্র নয়। এই সময় এদের পিঠের দিকের পালকের রঙ হয় ধূসর। ডানার পালকগুলোও ধূসর রঙের হয়। তবে ডানার প্রতিটা পালকের ধারের দিক সাদাটে। ডানার উড্ডয়ন পালকগুলোর উপরে আড়াআড়ি কালো বা বাদামি ডোরা দাগ দেখা যায়।
প্রজনন ঋতুতে এদের পিঠ ও ডানার রঙ হয়ে যায় অনেক গাঢ় ধূসর, আর বাদামি ছোপের পরিমাণও বেড়ে যায়। এই সময় বাদামি ছোপগুলো ত্রিকোনাকার দেখায়। এদের লেজটা ছোটখাটো। লেজের উপরের পালকের রং সাদা, কিন্তু তার উপরে বাদামি রঙের আড়াআড়ি ডোরা থাকে। বিলের বালুবাটানের মাথার চাঁদি, ঘাড় ও চোখের পিছনের অংশের রং হালকা ধূসর হলেও পালকের প্রান্তে সাদা দাগ দেখা যায়। দুই গালে সাদা পালকের ওপরে রয়েছে বাদামি ছিট। গলা, বুক ও পেটের রং সাদা। যদিও গলা ও বুকে খুব পাতলা পাতলা কয়েকটা বাদামি ছিট দেখা যায়। প্রজনন ঋতুতে মাথা ও বুকে বাদামি ছিটের আকার ও সংখ্যা বেড়ে যায়। এদের কালো চোখ ঘিরে সাদা রঙের সূক্ষ্ম একটা বলয় দেখা যায়। আর চোখের উপর দিকে সাদা রঙের কিছু পালক থাকে। দেখে মনে হয় যেন সাদা ভ্রুওয়ালা এই বিলের বালুবাটান। এদের চঞ্চুর রং হয় কালচে আর পায়ে নখের রং কালচে সবুজ।
বললাম বটে প্রজনন ঋতুতে বিলের বালুবাটানের চেহারার কথা কিন্তু এ চেহারা আমরা সুন্দরবনবাসীরা দেখতে পাই না। পুরো প্রজনন ঋতুতে অর্থাৎ গ্রীষ্মকালে অবস্থান করে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ, মধ্য ও দক্ষিণে রাশিয়া থেকে মধ্য এশিয়া হয়ে একদিকে বৈকাল লেক ও অন্যদিকে মঙ্গোলিয়া ও তুরস্ক পর্যন্ত। এখানে এরা ঘাসবহুল স্তেপ ও তৈগা তৃণভূমি অঞ্চলের জলাশয় এবং জলাভূমি এলাকা প্রজননক্ষেত্র হিসেবে পছন্দ করে। তারপর যখন ওই অঞ্চলে তীব্র শীত নামে তখন ওরা ভারত, বাংলাদেশ, মায়ানমার, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, বিভিন্ন আরব দেশ ও আফ্রিকায় পাড়ি দেয়। মিষ্টি জলের জলাভূমি তো বটেই উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকাতেও এদের দেখা যায় অন্যান্য পরিযায়ী পাখিদের সঙ্গে। তবে এরা একা বা অল্প কয়েকটি পাখি একসঙ্গে থাকতে পছন্দ করে।
ভারতে এরা আগস্টের মাঝামাঝি পৌঁছে যায়। তারপর প্রায় সাত মাস এরা এখানে কাটায়। এপ্রিল মে মাস নাগাদ এরা আবার ফিরে যাওয়া শুরু করে নিজেদের প্রজননস্থলে। অজয় হোমের লেখা “চেনা-অচেনা পাখি” থেকে এদের পরিযান সংক্রান্ত একটি আকর্ষণীয় তথ্য উদ্ধৃত করি।
“জুওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া থেকে ডঃ বিশ্বময় বিশ্বাসের তত্ত্বাবধানে কিছু বালুবাটানকে আঙটি পরানো হয়। তাতে দেখা গেছে ২৬ মার্চ ১৯৬৫ তারিখে কলকাতার লবণ হ্রদ থেকে যাদের ছাড়া হয়, তার মধ্যে একটি ধরা পড়ে ২৫ মে ৬৫-তে স্রেভনাইয়া, ওলেকমা, টুনগিরো, ওলেকমিস্ক, সোবিয়েত রাশিয়ার চিতা অঞ্চলে। অপর একটি ২ এপ্রিল ৬৫ তারিখে ছাড়ার পর, রাশিয়ায় আলমাজনিয়ি, ইয়াকুতিয়ানের মিরনিয়ির কাছে পৌঁছয় ২৫ মে ৬৫ তারিখে। মানচিত্রের উপর সোজাসুজি লাইন টানলে দেখা যায় দুটির দূরত্ব যথাক্রমে ৪৫০০ ও ৫২০০ কিমি। আরও কিছু আঙটি পরিয়ে ছাড়া হতে থাকে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে। তার মধ্যে একটিই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। ৬ এপ্রিল ৬৭ -তে আঙটি পরিয়ে যাদের ছাড়া হয়, তাদের মধ্যে একটিকে পাওয়া যায় ৪৮ দিন পর ২৪ মে ৬৭ তে রাশিয়ার সুসুমানের কাছে মাগাভান অঞ্চলে। মানচিত্রে দেখা গেল সোজাসুজি দূরত্ব ৬২০০ কিমি। সংগ্রহ তারিখ থেকে বোঝা যায় তাদের প্রজননক্ষেত্র ওখানেই। কত দূর থেকে যে আমাদের দেশে পরিযানে আসে ভাবলে বিস্ময়ে রোমাঞ্চিত হতে হয়।”
এরা এককভাবে কিংবা আরও অনেক পরিযায়ী স্যান্ডপাইপার জাতীয় পাখিদের সঙ্গে মিশে থেকে খাবারদাবার সংগ্রহ করতে পারে। চিংড়ি, কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুক, জলজ পোকামাকড়, ছোট মাছ ইত্যাদি হল এদের খাদ্য। হাঁটু জলে পা ডুবিয়ে নদীর তীরে বা চড়ায় ছোটাছুটি করে খাবার সংগ্রহ করে। কখনও কখনও খাদ্য শিকারের জন্য জলের মধ্যে পুরো মাথাটাও ডুবিয়ে দেয়। আবার কখনও কাদার মধ্যে লম্বা চঞ্চুকে ঢুকিয়ে দিয়ে নাড়াচাড়া করে কাদার ভেতর থেকে শিকারকে টেনে তোলে।
বিলের বালুবাটানদের প্রজননকাল হল এপ্রিল থেকে জুন মাস। জলাভূমির কাছাকাছি ঘাসযুক্ত অঞ্চল প্রজননের জন্য এরা পছন্দ করে। বালুবাটানরা একগামী পাখি অর্থাৎ একটি স্ত্রী ও পুরুষের জোড় স্থায়ী। মাটির উপর সামান্য আঁচড়ে সেখানে ঘাস পাতা বিছিয়ে অগভীর একটি বাসা বানায়। স্ত্রী ও পুরুষ উভয়ে মিলে বাসা বানায়। তারপর স্ত্রী বালুবাটান বাসায় দুই থেকে চারটি হালকা হলদে-বাদামি রঙের ডিম পাড়ে। তবে ডিমের ওপরে খুব ঘন ঘন বাদামি রঙের ছোপ থাকে। স্ত্রী ও পুরুষ উভয়ই ডিমে তা দেয়। ২২ থেকে ২৫ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরিয়ে আসে। ডিম ফুটে বেরোনোর কিছুক্ষণের মধ্যেই বাচ্চারা পোকামাকড় শিকার করতে শিখে যায়। এই সময় বাবা ও মায়ের পেছনে পিছনে এদের ঘুরতে দেখা যায়। এরা এমনিতে স্বভাবে শান্ত স্বভাবের পাখি হলেও ওড়ার সময় বেশ জোরে “টুটিইয়া টুটিইয়া” বা “চিউই চিউই”শব্দ করে ডাকে।
বর্তমানে সুন্দরবন অঞ্চলে বিলের বালুবাটানদের তেমন কোনও সঙ্কটের কথা শোনা যায়নি। কিন্তু যেভাবে ম্যানগ্রোভের পরিমাণ কমছে এবং পর্যটন শিল্পের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধির কারণে সুন্দরবনের সর্বত্র মানুষ ও যন্ত্রচালিত জলযানের উপস্থিতি বাড়ছে তাতে এদের সঙ্কট তৈরি হওয়া সময়ের অপেক্ষা। বিভিন্ন পরিযায়ী পাখিসহ বিলের বালুবাটানদের সুন্দরবনে নির্ভয়ে কয়েকটা মাস বিচরণ করতে দেওয়া আমাদের কর্তব্য – এটা যেন ভুলে না যাই। —চলবে।
* সৌম্যকান্তি জানা। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র। নিবাস কাকদ্বীপ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। পেশা শিক্ষকতা। নেশা লেখালেখি ও সংস্কৃতি চর্চা। জনবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য ‘দ্য সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ২০১৬ সালে ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ এবং শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ ২০১৭ সালে ‘অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি সম্মান’ প্রদান করে সম্মানিত করেছে।
গল্প ও উপন্যাস পাঠানোর নিয়ম
‘সময় আপডেটস’ -এর এই বিভাগে যাঁরা গল্প ও উপন্যাস পাঠাতে চান তাঁরা ছোটদের ও বড়দের আলাদা আলাদা গল্প পাঠাতে পারেন। বুঝতে সুবিধার জন্য ইমেলের ‘সাবজেক্ট’-এ বিভাগের উল্লেখ করবেন। ছোটদের গল্পের জন্য ১০০০ শব্দ ও বড়দের গল্পের জন্য ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে পাঠাতে হবে ইউনিকোড ফরম্যাটে। সঙ্গে ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে ভুলবেন না। গল্প বা উপন্যাস নির্বাচিত হলে যোগাযোগ করা হবে। ইমেল: samayupdatesin.writeus@gmail.com