
সত্যব্রতর অবশ্য সে-সব কিছু দেখার সময় ছিল না। তিনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যতটা দূরে যাওয়া যায়, যেতে চাইছিলেন। রাত এখন কত তিনি জানেন না। কেবল জানেন তাঁকে পালাতে হবে। কারণ, আবার যদি ধরা পড়েন, তাহলে ওরা তাঁকে আর বাঁচিয়ে রাখবে না। সঙ্গে-সঙ্গেই মেরে ফেলবে। ওরা অবশ্য এমনিতেই ওঁকে কোনদিন ছেড়ে দিত বলে তাঁর মনে হয় না। নিজেদের কোন স্বার্থেই তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। কারণ, তিনি অনেককিছু জেনে গেছেন, তার উপর সাইকেল মাহাতোর স্বরূপটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার এখন তাঁর কাছে। অতএব তাঁকে ছেড়ে দিলে তিনি যে সাইকেলকে ছেড়ে দেবেন না, তা সাইকেল এবং তার দলের অন্যরাও জানে। আর সাইকেল ধরা পড়লে, কান টানলে মাথা আসের মতো দলের চাঁইরা ধরা পড়ে যেতে পারে। অতএব তাঁকে বাঁচিয়ে রাখতে কোনদিনই চাইবে না তারা। হয়তো ওরা অপেক্ষা করছিল, তাঁর অন্তর্ধানের ব্যাপারটা নিয়ে কেমন হৈ-চৈ হয়, সেটা দেখার জন্য। অথবা অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল।
নুনিয়া যা বলেছে, যতটুকু আভাস দিয়েছে তাঁকে, এখনও পর্যন্ত যতটুকু ক্লু এবং পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় করতে পেরেছেন, তাতে মনে হয়, এখানে একটা স্পষ্ট হিউম্যান অরগ্যানস্ ট্র্যাফিকিং-এর কাজকারবার চলছে এবং সাইকেল তার মাথা না হলেও অন্যতম একজন হেল্পিং-হ্যান্ড। কিন্তু এর মাথাটি কে, সেটাই এখনও জানা যায়নি। কোনওদিন সেই মাথাটি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারা যাবে কি? যদি তিনি বেঁচে ফেরেন, তাহলে বেশি দেরি না করে, সোজা গিয়ে হাজির হবেন শাক্য সিংহের কাছে। সব খুলে বলবেন। সেইসঙ্গেই নিজের বক্তব্য যাতে ক্যামেরাবন্দি করে রাখা হয়, তার অনুরোধ করবেন। কারণ, এরা যা খুশি তাই করতে পারে। তাঁর জীবন এখন সরু সুতোর ওপর ঝুলছে।
লোকটি কাটা কলাগাছের মতো পড়ে যাওয়ার পরে একমুহূর্ত তিনি কাঠ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ডাক্তার, মানুষের প্রাণ বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করাই তাঁর কাজ, প্রাণ নেওয়া নয়। একটা অপরাধবোধ মুহূর্তের জন্য তাঁকে আচ্ছন্ন করেছিল। তিনি নিচু হয়ে অতি সাবধানে লোকটির নাড়ি দেখেছিলেন। দেখে আশ্বস্ত হয়েছিলেন। ধীরে হলেও চলছে আস্তে-আস্তে। ঘণ্টা দেড়েক কি দু’য়েকের মধ্যে জ্ঞান ফিরে আসবে লোকটির। আর জ্ঞান ফিরে এলেই সে যেটা করবে, তা হল, ফোন। সভ্যতার এই একটি অবদানের হাত ধরে হাজার মাইল দূরে থাকা শত্রু-মিত্র খবর পেয়ে যায়, আর সাইকেল মাহাত তো বলতে গেলে ঘাড়ের কাছেই হয়তো বসে আছে কোথাও। এখনই পিশাচপাহাড়ে ফিরে যাওয়ার বান্দা সে নয়। অতএব ফোন পেলেই নিজের এবং গোটা দলটার অস্তিত্বরক্ষার তাগিদেই সে ছুটে আসবে। আর তারপর তোলপাড় করে ফেলবে গোটা এলাকা। মুশকিল হচ্ছে, সত্যব্রত এই জঙ্গলের ঘাঁতঘোঁত চেনেন না। তার উপর রাতের বেলা জঙ্গলে পথ খুঁজে পাওয়াও দুষ্কর। ভালুক, বুনো হাতি, বুনো শুয়োর কিংবা সাপের পাল্লায় পড়লে জান এমনিতেই বেরিয়ে যাবে।
বসন্তকাল। সাপেরা শীতঘুম শেষে বেরিয়ে আসছে একে-একে গোপন বিবর ছেড়ে। এতদিনের বিষ জমে আছে তাদের ঝুলিতে। উগরে দেওয়ার জন্য তারা উন্মুখ। এর মধ্যে দিয়েই তাঁকে চেষ্টা করতে হবে পালানোর। কিন্তু তার আগে লোকটির কোন ফোন থাকলে, সেটির একটা ব্যবস্থা করতে হবে। লোকটির জ্ঞান যাতে ফিরে না আসে, তার জন্য সাবধানে তাকে চিত করে দিয়ে তার বডিসার্চ করলেন সত্যব্রত। নাহ্, কোনও মোবাইল খুঁজে পেলেন না। লোকটি কি মোবাইল ব্যবহার করে না? কিন্তু তা কী করে হয়? এইখানে পাহারার কাজে নিযুক্ত আছে, অথচ মোবাইল ব্যবহার করে না, এমন তো হওয়ার কথা নয়। এখানে এদের প্রতি পদে-পদেই বিপদ, বাধা। যখন-তখন খবর আদান-প্রদানের কাজ করতে হয়। সেক্ষেত্রে মোবাইল ছাড়া এ-যুগে এই-ধরণের কাজ এক কদমও চলতে পারে না। তাহলে মোবাইল আছে। কিন্তু কোথায়?

রহস্য উপন্যাস: পিশাচ পাহাড়ের আতঙ্ক, পর্ব-১৩০: চুপি-চুপি আসে

এই দেশ এই মাটি, সুন্দরবনের বারোমাস্যা, পর্ব-১১৫: পাতি গাঙচিল

পৃথিবীর সর্বোচ্চ একক আর্চ ব্রিজের নির্মাণে বিনয়ী এক অধ্যাপিকা

ত্রিপুরা: আজ কাল পরশুর গল্প, পর্ব-৭৩: রাজা গোবিন্দমাণিক্য চেয়েছিলেন ঘরে ঘরে পুরাণ পুঁথির প্রচার হোক

মহাকাব্যের কথকতা, পর্ব-১২৮: স্ত্রী সীতার ব্যক্তিত্বের প্রভায় রামচন্দ্রের আলোকিত উত্তরণ সম্ভব হয়েছে কি?
লোকটির সঙ্গে কাদের-কাদের যোগাযোগ ছিল, তা জানার জন্য তার কললিস্টই যথেষ্ট। যদিও সত্যব্রতর মনে হল, এই তৃণমূলস্তরের কর্মীদের সঙ্গে নিশ্চয়ই সাইকেল মাহাতোর মতোই মিডলম্যানেরাই যোগাযোগ রাখত। দলের চাঁইরা নিশ্চয়ই এত সহজে এদের ফোন করবে না। অতএব সাইকেলের নাম্বারে বারবার কল গেছে, তা জানাই যায়। তবে কেবল সাইকেল তো আর নয়, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে আরও অনেক মিডলম্যানদের ফোন করতে পারে লোকটি। তাদের নামও জানা যাবে। সত্যব্রত মোবাইলটা খোলার চেষ্টাও করে দেখলেন না, সন্তর্পণে সেটির পিছনের দিকটা খুলে সিমকার্ডটা বের করে নিয়ে আলাদা করে পকেটে ঢোকালেন। মোবাইলটার স্যুইচ বন্ধ করে দিতে পারতেন, কিন্তু বিশেষ একটা কারণে দিলেন না। এই জঙ্গলে রাতের বেলা দরকারে মোবাইলের টর্চ কাজে আসবে। সেই কারণেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া।
বেরিয়ে আসবেন, এমনসময় মনে হল, এভাবে লোকটিকে খোলা ফেলে গেলে চলবে না। জ্ঞান ফিরে আসার পরে লোকটি অবধারিতভাবে প্রথমেই তার ফোন খুঁজবে। সেটি না পেয়ে সে নিশ্চয়ই আর কারও ফোন থেকে সাইকেলকে জানাবে। আশেপাশে লোকালয় নিশ্চয়ই আছে, না-হলে বনের মধ্যে হঠাৎ করে কেউ স্কুল খোলে না। তবে স্কুলটা নিশয়ই লোকালয়ের একটেরে। একেবারে গ্রামের মধ্যিখানে নয়। সেজন্যই সম্ভবত এত নির্জন, নিরিবিলি বলে মনে হচ্ছে। চারপাশে জঙ্গলের নিজস্ব শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। অবশ্য এখন অনেক রাত হয়েছে নিশ্চয়ই। আর এইসব অঞ্চলের মানুষেরা সন্ধ্যের পরেই খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ে। কোনও কোনও অল্পবয়সীরা আজকাল জেগে থাকতে পারে সন্দেহ নেই, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যায়, কারণ ভোরে উঠেই আবার তাঁদের জীবনযুদ্ধে সামিল হওয়ার জন্য দৌড়াতে হবে। এই লোকটি অতএব জ্ঞান ফিরে পেয়ে গ্রামের মধ্যে গিয়ে অন্য কারুর ফোন চেয়ে তাঁর পালিয়ে যাওয়ার কথা জানাতে পারে। সেই কাজটি যাতে লোকটি সহজে

পঞ্চতন্ত্র: রাজনীতি-কূটনীতি, পর্ব-৯০: শত্রুকে হারাতে সব সময় অস্ত্র নয়, ছলনারও আশ্রয় নিতে হয়

পর্ব-৩৭: বানরেন্দ্র-জাতক: শক্তি না বুদ্ধি?
সত্যব্রত একটা কাজ করলেন। যে বিছানা তাঁকে শুতে দেওয়া হয়েছিল, তার উপর তেলচিটে একখানা চাদর পাতা ছিল। জ্ঞান ফিরে পেয়ে সেটি দেখে সরিয়ে একপাশে ফেলে রেখেছিলেন তিনি। এখন সেটাই কাজে লাগালেন। সস্তা সিনথেটিক চাদর। চাদরটিকে অনেক কষ্টে তিনভাগে ছিঁড়ে ফেললেন। একভাগ দিয়ে লোকটির পা, আর একভাগ দিয়ে লোকটির হাত পিছমোড়া করে বাঁধলেন। তিন নম্বর ফালি দিয়ে লোকটির মুখ বেঁধে দিলেন ভালো করে। ব্যস, এবার কিছুক্ষণের জন্য নিশ্চিন্তি। একটা বিপদ আছে। এখানে এই লোকটি ছাড়া এখন আর কেউ আছে কি-না তা তিনি জানেন না। তবে দুপুর থেকে আর কাউকে দেখেন নি বলেই ধরে নিচ্ছেন, এই লোকটি ছাড়া এই মুহূর্তে আর কেউ নেই। তবে এই গ্রামে এর যদি কোন স্যাঙাত থেকে থাকে, তাহলে সে হয়তো এর খোঁজে আসতে পারে, এখানে রাত কাটাতে আসাও বিচিত্র নয়। আর তেমন কেউ এসে পড়লে, খুব তাড়াতাড়ি যথাস্থানে খবর পৌঁছে যেতে দেরী করবে না সে। অতএব যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাঁকে এখান থেকে পালাতে হবে।
লোকটির দিকে আর-একবার তাকালেন। লোকটি নিথর হয়ে শুয়ে আছে। আর দেরী না করে বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। তখনই মনে হল, এঁটো হাত না ধুয়েই এতক্ষণ যা-করার করছিলেন। এখন এঁটো হাতে শুকিয়ে কড়কড় করছে। হাতটা ধুয়েদ নেওয়া দরকার। এক্ষেত্রে অবশ্য ভাগ্য তাঁর সহায়ক হল। ঘরের বাইরেই একটা ছোট বালতিতে জল রাখা ছিল, তা দিয়েই হাতখানা পরিষ্কার করে নিলেন তিনি। মুখটাও মুছে নিলেন ওপর থেকে। তারপর আস্তে-আস্তে এদিক-অদিক তাকিয়ে দাওয়া থেকে নেমে এলেন। জাল দেওয়া গেটটা বন্ধ ছিল, তবে তালা দেওয়া ছিল না। দুপুরবেলা পিছনের দিকটা দেখে গিয়েছিলেন তিনি। ফলে এই স্কুলবাড়ির চৌহদ্দি ছেড়ে বেরিয়ে আসায় অসুবিধা হল না কোন। পিছনের গেটে অবশ্য একটা মামুলি তালা ঝুলছিল। তবে গেটটিতে উঠে পড়ে টপকে ওধারে যেতে তেমন অসুবিধা হল না।
মুশকিল হচ্ছে, এবার কোন দিকে যাবেন তিনি। জঙ্গলে ঘুরঘুট্টে অন্ধকার। পিছনদিকে একটা খেলার মাঠ দেখেছিলেন তিনি। সেখানেই কেবল গাছপালা নেই বলে নক্ষত্রখচিত আকাশ চোখে পড়ছিল অনেকখানি জুড়ে। মাঠটা ধরে এগিয়ে দেখবেন না-কি? কিংবা অন্যদিকে যাবেন? ভাবতে-ভাবতেই মনে হল, মাঠটা ধরে গেলে নিশ্চয়ই লোকালয়ে পড়তে পারেন। সেক্ষেত্রে এক-আধজনও যদি তাঁকে এই সময় দেখে ফেলে, তাহলে অচেনা লোক বলে গণ্ডগোল বাধাতে পারে। তখন ধরা পড়তে আর দেরি হবে না। আবার হায়েনার মুখে ফিরে আসতে হবে। আর তারপর কী পরিণাম হবে, তা তো তাঁর জানা আছেই। এই জন্য তিনি মাঠের দিকে না গিয়ে, উল্টোদিক ধরলেন। যেতে গিয়ে দেখলেন, যতখানি ভেবেছিলেন, ততখানি সমস্যাসঙ্কুল নয়, একটা পায়ে-চলা পথ এদিকেও আছে। আবার যতখানি ভেবেছিলেন যে দ্রুত যেতে পারবেন, অন্ধকারে অনেক ভেবেচিনতে এগুতে হচ্ছিল বলে, ততখানি তাড়াতাড়ি যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না।

গল্পকথায় ঠাকুরবাড়ি, পর্ব-১৩০: ঠাকুরবাড়ির জামাই রমণীমোহনকে মন্ত্রী করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ

রহস্য উপন্যাস: হ্যালো বাবু! পর্ব-৯৮: গ্রিন টি /৬
কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, ক্রমশ পায়ে-চলা পথটি কাঁটা-খেজুর, মানুষপ্রমাণ ঘাস আর ঝোপঝাড়ে ভরা কিছুটা জায়গা পার হয়ে জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছে। হয়তো এ-পথ ধরে জনপদের মানুষজন জঙ্গলে কাঠকুটো কিংবা কাঁচা শালপাতা সংগ্রহ করতে যায়। কিন্তু জঙ্গলের দিকে যাওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। অন্যদিকে যেতে হবে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, উল্টোদিকে প্রায় ঘাড়ের কাছ থেকে জঙ্গল শুরু হয়েছে। কাঁটাঝোপ আর ঘাসের জন্য সেই দিকের জঙ্গল এক ইঞ্চিও জমি ছাড়তে রাজি নয়। এখন বাধ্য হয়ে তাঁকে জঙ্গলে ঢুকতে হবে। কিন্তু জঙ্গলে ঢুকে তিনি কী করবেন ? নিশ্চয়ই এদিকে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে তিনি আরও গভীরতর জঙ্গলের মধ্যে গিয়েই পড়বেন। তাহলে তো ইহজন্মে মুক্তির আশা অসম্ভব।
এতক্ষণে ভয় পেলেন সত্যব্রত। এর আগে ওদের হাতে বন্দি হয়েও তাঁর মাথা ঠাণ্ডা ছিল। কিন্তু এখন একেবারে সসেমিরা অবস্থায় তিনি দরদর করে ঘামতে শুরু করলেন। বুঝতে পারছিলেন, তিনি সম্ভবত একটা ফাঁদে পড়ে গিয়েছেন। তাঁর উচিত ছিল, এদিকে না এসে, খেলার মাঠ পার হয়ে উল্টোদিকে যাওয়া। লোকালয় আছে মানেই রাস্তাঘাট আছে। এবং এরা যেহেতু দূরে-দূরে কাজ করতে যায়, অতএব বড় রাস্তার সঙ্গে কিংবা এমন কোন রাস্তার সঙ্গে গ্রামটির যোগ আছে, যা ধরে গেলে বড়রাস্তায় পৌঁছান যাবে। সুতরাং লোকালয়ের মাঝখান দিয়ে গেলেই হয়তো সেই রাস্তায় পড়তে পারতেন। যদিও সাইকেল মাহাতোর কোন স্যাঙাতের চোখে পড়ে গেলে ওদিকে বিপদ ছিল, কিন্তু এদিকে তার চেয়ে কিছু কম বিপদ নেই। কী করবেন ভাবছেন, এমনসময় হঠাৎ চমকে উঠলেন। মানুষের গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না? এত রাতে এখানে মানুষের গলার আওয়াজ? তবে কি লোকটির জ্ঞান ফিরে এসেছিল? কোনওভাবে সে নিজেকে বন্ধনমুক্ত করে খবর দিয়েছে সাইকেল মাহাতোকে? কিন্তু এত তাড়াতাড়ি লোকটির জ্ঞান তো ফিরে আসার কথা নয়, যদি-না আর-কেউ সেখানে এসে লোকটির অবস্থা দেখে তার জ্ঞান ফিরিয়ে না আনে। তেমন কেউ কি এসেছিল? আর তার কাছ থেকেই খবর পেয়ে তাঁকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছে সাইকেলের দলবল?
কথাটা মনে হতেই, সত্যব্রত প্রায় ছুটে যেদিকে খেজুরগাছ আর ঘাসের জঙ্গল ছিল, সেদিকে গিয়ে একটা ছোট খেজুরঝোপের আড়ালে বসে পড়লেন। সেখান দিয়ে তাকিয়ে রইলেন ফুরিয়ে আসা পথের দিকে। তিনি আশা করছিলেন, যে-পথে তিনি এদিকে এসেছেন, সেই পথ ধরেই দলবল নিয়ে সাইকেলের স্যাঙাতরা আসবে। কিন্তু তাঁকে অবাক করে দিয়ে উল্টদিকের জঙ্গল থেকে একদল লোক বেরিয়ে এল। একজনের হাতে পাঁচ ব্যাটারির টর্চ। ওদের দেখে স্থানীয় আদিবাসী বলে মনে হচ্ছিল না। দিব্যি শহুরে পোশাক পরা। দু’একটি ইংরাজি শব্দও কানে এল। তাহলে পেটে বিদ্যেও আছে কম-বেশি। কিন্তু এরা কী করছিল এত রাতে জঙ্গলের ভিতর? না-কি এরা সকলে ফরেস্ট গার্ড। কিন্তু ফরেস্ট-গার্ডদের পিঠে কি রুকস্যাক থাকে?
লোকগুলি সংখ্যায় চারজন। ওরা সত্যব্রতকে দেখতেও পায়নি। এইরকম সময়ে এখানে যে কেউ থাকতে পারে, তা তাদের ভাবনাতেই আসেনি। এরা শত্রু-কি-মিত্র তা বুঝতে পারছেন না তিনি। ফলে এখনই আত্মপ্রকাশ করা ঠিক হবে না। তবে একটা কথা তিনি বুঝতে পারলেন যে, যারা এইমাত্র জঙ্গল ফুঁড়ে বেরোল, তারা যেভাবে নিশ্চিন্ত হয়ে কথা বলছে, তাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, এই জঙ্গলে এই তাদের প্রথম আসা নয়। তাও আবার এত রাতে। লোকগুলি কি পোচার হতে পারে? না-কি এরাও সাইকেল মাহাতোর গ্যাং-এর সঙ্গে যুক্ত? উত্তরহীন একের-পর-এক প্রশ্ন মনের মধ্যে যখন জেগে উঠছিল, তখন তাঁকে আবারও অবাক করে দিয়ে লোকগুলি যেদিকে তিনি লুকিয়েছিলেন, সেদিক দিয়েই জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেল। ওরা এত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল, যে তাদের কথা শুনে খুব বেশি কিছু বুঝতে না-পারলেও এটুকু বোঝা গেল, তাদের জন্য কোথাও গাড়ি অপেক্ষা করছে। যত তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে পড়া যায়, ততই ভালো।

সত্যজিতের রায়, অপু থেকে আগন্তুক, পর্ব-১০ : নায়ক ও মহাপুরুষ

আলোকের ঝর্ণাধারায়, পর্ব-১১০: মা সারদার মানবীলীলার অবসান
তার কথা শুনে আর-একজন বলল, “যাই বল। আমাদের ডিলটা মন্দ হয় নি। রহমৎ মোল্লা কথা রেখেছে।”
অন্য একজন বলল, “রহমতের ব্যাপারে আমি একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি, যা সে পারবে, তা সে কথা দেয়, যা পারবে না, তা সে ভুলেও কথা দেয় না। এইদিক থেকে লোকটি খুব সাচ্চা, আর তেমনই ধুরন্ধর বুদ্ধি। তা-না-হলে মুঙ্গের থেকে মাল এনে এখানে ব্যবসা চালাচ্ছে এতদিন ধরে!”
প্রথম জন বলল, “ভাগ্যিস চালাচ্ছে। তা-না-হলে আমাদের মুভমেন্টের কী অবস্থা হত বুঝতে পারছো?”
আগের জন বলল, “তা আর পারছি না? নাও নাও চল। আর বেশি কথা বলো না। কে কখন দেখে ফেলবে তার ঠিক আছে?”
ওরা সত্যব্রত যেখানে লুকিয়ে ছিলেন, তার প্রায় গা ঘেঁষেই ঢুকে পড়ল জঙ্গলের ভিতর। জঙ্গলে ঢুকেই ওরা টর্চ জ্বালল। ক্ষীণ আলোর রেখা দেখা দিয়েই যেন হারিয়ে গেল। সত্যব্রত এক পলক চিন্তা করলেন। এই সুবর্ণ সুযোগ হেলায় হারাতে দেওয়া যাবে না। ওরা ভালো হোক বা মন্দ, ওদের পিছু-পিছু গেলেই বড়রাস্তায় পৌঁছানো যাবে। ওদের কথা শুনে অন্তত সে-কথাই বোঝা গেল। অতএব এখন যদি ওদের অনুসরণ না করেন, তাহলে আর বেঁচে ফেরার কোন চান্স নেই। হয় বুনো জন্তুর হাতে, নয়তো সাইকেল মাহাতোর দলের হাতে মারা তিনি পড়বেনই। অতএব যা থাকে কপালে, সে-কথা ভেবেই তিনিও ঢুকে পড়লেন জঙ্গলে, ঠিক ওরা যেখান দিয়ে ঢুকেছিল।
প্রথমে আলো দেখা গেল না। কোন কথাও বলছে না ওরা এখন। তারপরেই হঠাৎ করে দূরে আলো দেখা গেল। বুঝতে পারলেন, ওরা একটানা আলো জ্বালছে না। মাঝেমধ্যে জ্বেলে পথের অবস্থা দেখে আবার নিভিয়ে দিচ্ছে। যাই হোক, আপাতত, সামনের দিকেই এগিয়ে যেতে হবে। অতএব এগিয়ে গেলেন তিনি। কিন্তু ওদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তিনি পারবেন কেন ? তার উপর শুকনো পাতার উপর পা টিপে-টিপে হাঁটতে হচ্ছে তাকে। যাতে বেশি আওয়াজ না হয়। ওরা যদি টের পায়, ওদের তিনি অনুসরণ করছেন, তাহলে তাঁর সঙ্গে কী ব্যবহার করবে, তা তিনি জানেন না। মনে হয়, ওরা কোন অবৈধ কারবারের সঙ্গে যুক্ত। সেইজন্য রাতের অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যে ডিল করতে হয়। যারা এইরকম করে তাদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র থাকা অস্বাভাবিক নয়। অতএব সত্যব্রতকে তারা পুলিশের খোঁচড় ভেবে আক্রমণ না শাণিয়ে বসে।
কিন্তু সত্যব্রতর উপায় নেই। যা থাকে কপালে বলে তিনি এগুতে থাকলেন। ওরা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল। মাঝেমধ্যে থেমে এদিক-ওদিক দেখে নিচ্ছিল টর্চ জ্বেলে। সেইসময় কোনরকমে লুকিয়ে পড়তে হচ্ছিল সত্যব্রতকে। গাছগুলির শত-শত বৎসরের মোটা গুঁড়ি তাঁর প্রাকৃতিক সুরক্ষাবর্ম হিসাবে কাজ করছিল।
আধঘণ্টারও সামান্য বেশি সময় হাঁটার সময় সৌভাগ্য বলতে হবে যে, কোনও বন্য জন্তুর মুখোমুখি তিনি হননি। আর তারপরেই দূর থেকে বড় গাড়ি যাওয়ার আওয়াজ শুনলেন তিনি। তার মানে বড় রাস্তা এত কাছে ছিল? তিনি বেঁচে গেলেন? আনন্দে তাঁর প্রাণ নেচে উঠল। এমনসময় হঠাৎ ঘাড়ে কার যেন শীতল স্পর্শ পেয়ে আঁতকে উঠলেন তিনি! —চলবে।


















